দ্বিচারী
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


মানুষ, মানুষ, তুমি কার?
যে ভালবেসে কাছে টানে আমি তার।
মানুষ, মানুষ, তুমি কার?
যে ভালবেসে দূরে ঠেলে আমি তার।
কেন এই দ্বিচারী যাপন?
কী যে করি, মানুষের মন!

মল্লিকার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি। নিতান্ত প্রয়োজন না থাকলে আজকাল আমি বড় একটা পুরোন শহরতলির দিক মাড়াই না। এড়িয়ে যাবার একটা না একটা অজুহাত জুটেই যায়। আসলে জন্মের শহরে ফিরে যাবার আকাঙ্ক্ষাটাই ফিকে হয়ে আসছে। বাবা চলে গিয়েছিল ক্লাস ইলেভেনে, কার্গিলের যুদ্ধে। মা ঘামের গন্ধ লাগা ইউনিফর্মের স্মৃতি আঁকড়ে আরো বছর দশেক টিঁকে ছিল। ততদিনে আমি মফঃস্বলের গণ্ডি পার করে, নিজের জন্য মোটামুটি একটা সংস্থান করে ফেলেছি। ঢাক পিটিয়ে বলে বেড়াবার মতো না হলেও, চাকরিটা সরকারী, বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। মা থাকতে সপ্তাহান্তে যাতায়াত ছিল, চলে যাবার পর ক্বচিৎ কদাচিৎ, পালা-পার্বণ, অনুষ্ঠানে।
কাকা অনেকবার বলেছে, পৈতৃক বাড়িটার একটা বন্দোবস্ত করা দরকার, মেন্টেনেন্স নেই, শরিকরা একটা নয়া পয়সা ঠেকায় না, ছাদের চাবড়া খসে পড়ছে। গত সপ্তাহে কাকার জরুরি তলব এসেছিল, প্রোমোটারের সঙ্গে ফাইনাল মিটিং, উপস্থিতি আবশ্যিক। সকালে হাওড়া থেকে ভিড়ের উল্টো দিকের ট্রেন ধরেছিলাম। অন্যদিন ট্রেনে উঠে ভিড়ে হাঁপ ধরে, আজ জানলার ধারে জায়গা পেয়ে গুনগুন করে গান ধরেছিলাম, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি…। একজন পাখি-ব্যবসায়ী আট-দশটা খাঁচায় টিয়া মুনিয়া নিয়ে হুড়মুড় করে কামরায় উঠে পড়ল। মাটিতে খাঁচা নামিয়ে রেখে দরজার সামনে গ্যাঁট হয়ে বসে আয়েস করে বিড়ি ধরাল। যত দূর জানি, পাখি বেচাকেনা অবৈধ বাণিজ্য, তবু মানুষ পাখি পোষে, নিয়ম করে ছোলা খাওয়ায়। মন দিয়ে পাখিদের সম্মিলিত ডাকাডাকি শুনছিলাম, খেয়াল করিনি সে কখন ট্রেনে উঠেছে, পাখিওলা ও পাখিদের ডিঙিয়ে আমার সামনের সীটে এসে বসেছে।
একটা অস্বস্তি হল, যেন কেউ ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, অথচ আমার পিঠ ঠেকে আছে কামরার দেওয়ালে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে হামেশাই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়টাতে শান দিয়ে রাখতে হয়। ডান হাতটা অজান্তেই কোমরের কাছে চলে যায়। সচেতন হয়ে সামনে তাকিয়ে দেখলাম অবিকল মল্লিকার মতো দেখতে এক ভদ্রমহিলা আমাকে আপাদমস্তক জরিপ করছে। চোখে চোখ পড়তেই সে চোখ সরিয়ে নিল। তখন মনে হল, তার মল্লিকা হতে বাধা নেই। অবশ্য চিবুকের নিচে মেদ বেড়েছে, মুখের ত্বকে রুক্ষতা। এতদিন পর… হয়তো নেমে কামরা বদলে নিলেই ভাল হত, কিন্তু ট্রেন ছেড়ে দিল।
চলতি ট্রেন থেকে নেমে পড়া যায় না বলে জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন আছ মলি?”
মল্লিকা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল, যেন শুনতেই পায়নি। অথবা সে আদৌ মল্লিকা নয়। তার চোখের তারায় চলমান গাছ-গাছালি, মাঠ, ঘাট, পুকুরের অসমান ছায়া সরে যাচ্ছিল। মল্লিকার চোখের মণি ঈষৎ কটা, এই ভদ্রমহিলারও তাই, ছায়া দেখে মনে হচ্ছিল রোদ পড়ে এসেছে। বিকেল হতে খুব বেশি দেরি নেই। অথচ ঘড়িতে সবে সকাল সাড়ে ন’টা। সে মুখ ফেরাল, আঁচল টেনে হাতের কালশিটের দাগ ঢেকে বলল, “ভাল… খুব ভাল।”
তারপর ফিরে প্রশ্ন করল, “তুমি কেমন আছ?”
আমি বেকুবের মতো চুপ করে রইলাম। আমার শরীরে তো লুকোবার মতো একটাও দাগ নেই। কী উত্তর দেব? হ্যাঁ, গলার বাঁ-দিকে কলারের নিচে একটা লম্বা ছুরিতে চেরা দাগ আছে কিন্তু সেটার সঙ্গে এই প্রশ্নের কোনো সম্পর্ক নেই। আমতা আমতা করে বললাম, “চলছে একরকম…”
একজন মাঝবয়সী মহিলা ভিক্ষার পরিবর্তে খঞ্জনী বাজিয়ে গান শোনানোর জন্য কাছাকাছি এসে পড়ায় আমি কথাটা শেষ করার দায় থেকে বেঁচে গেলাম। অবশ্য উত্তর শোনার জন্যও মল্লিকা খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। কথার পিঠে কুশল জিজ্ঞেস করতে হয় তাই করা। আমিও কথা চালাতে, “অনেক দিন পর…”, বলে থেমে গেলাম। কারণ অনেক দিন পর মল্লিকার সঙ্গে দেখা হয়ে ভাল লাগছে কি মন্দ, সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। বাকি কথাগুলো আলজিভের সঙ্গে পুরনো সর্দির মতো জড়িয়ে রইল, প্রকাশ্যে এল না। মল্লিকা বলল, “ক’দিন ধরে তোমার কথা ভাবছিলাম। আর দেখো…”
আমি আশ্চর্য হলাম, মল্লিকার সঙ্গে দেখা হয় না প্রায় বছর আষ্টেক। আমার কথা মল্লিকা এখনও ভাবে? আমি তো ভাবি না। মল্লিকা এখন আর আমার স্বপ্নে আসে না, স্খলনেও না। মল্লিকার বিয়ে হয়ে যাবার পর প্রথম প্রথম বুকের ভেতর খুব জ্বলত, যেন অম্বল হয়েছে, গলার কাছে টক জল উঠে আসত। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। পুরনো কথা মনে পড়তে মল্লিকার সিঁথির দিকে তাকালাম… ফ্যাকফ্যাকে সাদা, যেন কস্মিনকালেও সিঁদুর ছোঁয়নি। মনে হল সিঁথি চওড়া হয়ে খুলির চামড়া প্রকট হয়েছে, চুল উঠে যাচ্ছে বলে ডাক্তার হয়তো বারণ করেছে পরতে। সিঁদুরে আজকাল আকছার ভেজাল থাকে, অবশ্য গ্রামগঞ্জের জলে আর্সেনিক প্রদূষণও চুল উঠে যাবার কারণ হতে পারে। কোথায় যেন বিয়ে হয়েছিল মল্লিকার, আদিসপ্তগ্রামে নেমে বাসে করে যেতে হত… শুনেছিলাম ওর বরের পরিবারের খানদানি লোহা-লক্কড়-রদ্দির ব্যবসা আছে, সচ্ছল অবস্থা।
আমি তখন হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছি। পাশ কোর্সে বিএসসি, কে আর আমার জন্য প্লেটে করে চাকরি সাজিয়ে বসে থাকবে? মল্লিকারা তিন বোন, মল্লিকা মেজো, মল্লিকার বড় দিদি যূথিকার বিয়ে হয়েছিল টাউনেই, নামকরা ভ্যাগাব্যান্ড শশাঙ্কদার সঙ্গে। যূথিকাদি প্রায়ই ঝগড়া করে বাপের বাড়ি এসে বসে থাকত। সাধারণত দিন পনেরো পরে শশাঙ্কদা শ্বশুর বাড়ির উঠোনে নাকে খত দিয়ে যূথিকাদিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। একবার সাড়ে তিন সপ্তাহ হয়ে গেল শশাঙ্কদা এল না, খোঁজখবর করে জানা গিয়েছিল গঙ্গার ধারে তার লাশ পেয়েছে পুলিশ। জলচর জন্তুতে তার চোখ মুখ খুবলে খেয়েছিল বলে আগে শনাক্ত করা যায়নি। এই অবস্থায় মল্লিকার বিয়েতে আপত্তি করার কোনো প্রশ্নই ছিল না। আমার সঙ্গে কতদিনেরই বা অন্তরঙ্গতা! সব কিছু ঠিক হয়ে যাবার পর মল্লিকা একবার দেখা করতে চেয়েছিল, ছোট বোন ঝিলিককে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিল, ঝিলিকের ভাল নাম মাধবীলতা, আমি আর যাইনি। গেলেও কিছু বদলাত না, মল্লিকা ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাছাড়া আমিও খুব একটা নিশ্চিত ছিলাম না, দু’-একবার যখনই মল্লিকার শঙ্খের মত বুকের ওপর কান পেতেছি, ঢেউ ওঠাপড়ার গুম গুম শব্দ শুনতে পেয়েছি। মনে হয়েছে মল্লিকা অনেক দূরের সমুদ্র পাড়ি দিতে চায়। নাবিক হবার কোনো যোগ্যতাই তখন আমার ছিল না।
মল্লিকা বলল, “একবার আসতে তো পার, বেশি দূর তো নয়, ক’টাই মাত্র স্টেশান…”
আমি ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে বললাম, “আসব, একদিন।”
“আজকেই চল না…”
“আজকে?” বলে ভাবলাম প্রোমোটারের সঙ্গে মিটিং সেই সন্ধেবেলা। সারা দিন মায়ের ঘরে শুয়ে ঘুমোবার প্ল্যান ছিল। মা মারা যাবার পর ঘরটা অমনি পড়ে আছে, কাকী মাঝেমধ্যে বিছানার চাদর বদলে দেয়, অবরে-সবরে আমি গেলে ওই ঘরেই থাকি। ঘরে ঢুকলেই মায়ের গায়ের গন্ধ পাই। পড়ে পাওয়া ঘুমটা কেবল হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাতে বিশেষ কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। মল্লিকার সঙ্গে যাওয়াই যায়। আগে কোনোদিন ওর শ্বশুরবাড়ি যাইনি। বিয়ের সময় কী একটা অজুহাতে জামশেদপুর চলে গিয়েছিলাম এক বন্ধুর বাড়ি। একেবারে অষ্টমঙ্গলা কাটিয়ে ফিরেছিলাম। একটু লোভও হচ্ছে মল্লিকার সুখ-দুঃখ সংসার দেখবার, বিকেল বিকেল ফিরে এলেই হবে। মল্লিকা আবার বলল, “চল না…”


পাখপাখালির কিচির-মিচির ছাপিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একটা গোঙানির শব্দ পাচ্ছি। মল্লিকা তাদের বৈঠকখানা ঘরের তক্তাপোষের ওপর আমায় বসিয়ে রেখে ভেতরে গেছে। এই ঘরটাকে বৈঠকখানা বলাই উপযুক্ত, তক্তাপোষের ওপর একখানা রঙ জ্বলে যাওয়া শতরঞ্চি পাতা, পুরনো আমলের মোজাইক টাইল বসানো মেঝে, একটা হাতল ভাঙা কাঠের চেয়ার, বড় বড় জানলা, আমি পা ঝুলিয়ে বসতে না বসতেই তক্তাপোষের নিচে থেকে একটা কেঁদো বেড়াল আমার দু পায়ের ফাঁক গলে বেরিয়ে জানলার গরাদ পার করে পালাল। জানলার বাইরে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা, শিউলি, কাঠচাঁপা, করবী গাছগুলো ইচ্ছে মত ফুল ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পায়ের কাছে বুনো গোলাপ, ঘাস আর আগাছার জঙ্গল, বোঝা যায় বাড়িতে যত্ন করার লোকের অভাব।
গোঙানির শব্দটা বাড়ছে। বাড়ির ভেতরে যাবার দরজার সস্তা কাপড়ের ফুলকাটা পর্দা সরিয়ে মল্লিকা চায়ের কাপ হাতে করে ঢুকল। প্লেটের পাশে দুখানা আধ ভেজা বিস্কুট। তক্তাপোষের ওপরই চা নামিয়ে রেখে আবার পর্দার আড়ালে ফিরে গেল। নিজের চায়ের কাপ নিয়ে ফিরে এল, সামনে রাখা কাঠের চেয়ারে বসল। তার মুখে ভরা বর্ষার মেঘ। দশ বছর আগে হলে বৃষ্টির সম্ভাবনায় খুশিই হতাম। জানতাম বৃষ্টি থামলেই ঝকঝকে রোদ উঠবে। আমাদের সাত শরীকের বাড়ির ছাদের সুরকী-পেটানো মেঝে থেকে ভাপ উঠে বেড়াল ছানার মতো আমাদের পা জড়িয়ে ধরবে, উরুতে আঁচড় কাটবে। আমি আর মল্লিকা দুপুরবেলা পা টিপে টিপে ছাদে উঠে গেছি, কেউ দেখেনি। অন্ধকার সিঁড়িতে আমি মল্লিকার হাত ধরেছিলাম, সে ছাড়িয়ে নেয়নি, বরং আমার শক্ত কড়া পড়া হাতের মধ্যে তার কবুতরের বুকের মত নরম হাতের চাপ বেড়েছে। তখন সবে বুঝতে শিখেছি প্রত্যেক মানুষই আসলে সাপুড়ে, শরীরের মধ্যে সাপ পোষে। সাপ এমনিতে সজ্জন, দুধ-কলা খায়, কেবল পাখির বাসা দেখলেই ছোঁক ছোঁক করে।
মুখ বিকৃত করে মল্লিকা বলল, “নাটক, নাটক…”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কে?”
মল্লিকা দুহাতের চেটো দিয়ে চোখ ডলে নিল, যেন সেখানে রাজ্যের ক্লান্তি জমে আছে। অথবা সেই অছিলায় চোখের কোলে ঘনিয়ে আসা জল মুছে নিল। তারপর জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নিরাসক্ত গলায় বলল, “কে আবার, আমার পতি, পরম গুরু…”
আমি মেঘ-বৃষ্টি-আলোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, সশব্দে বাজ পড়ল। এতক্ষণ ভাবছিলাম বয়স্ক কেউ, শুনেছিলাম মল্লিকার শ্বশুরবাড়ি যৌথ পরিবার, ওর শ্বশুর ভাসুর কেউ হবে। মল্লিকার স্বামী যে অসুস্থ সে খবর জানা ছিল না। মল্লিকা নিজে থেকেই জানাল, স্ট্রোক হয়েছিল, পক্ষাঘাতে ডানদিকটা পুরোপুরি পড়ে গেছে, বিছানা থেকে উঠতে পারে না। কথা জড়িয়ে গেছে, সারা দিন সারা রাত ওই ভাবে গুঙিয়ে যায়।
আমি বললাম, “এত অল্প বয়সে…”
মল্লিকা বলল, “হবে না? যখন সুস্থ ছিল, তখন কি কম অনিয়ম করেছে! তোমার কাছে আর কী লুকবো? অর্ধেক দিন ঘরে ফিরত না, বেশ্যামাগীদের কাছে পড়ে থাকত।”
মল্লিকা এমন ভাবে ‘বেশ্যামাগী’ বলল যেন তাদের সঙ্গে গলাগলি ভাব। আমি আশ্চর্য হলাম। ওর গলায় অনুযোগ নেই, বরং বিরক্তি, বলছিল, “শ্বশুর মশাই যতদিন ছিলেন, শক্ত হাতে ব্যবসা চালাতেন, ঘর সামলাতেন। তিনি মারা যাবার পর ছেলেদের মধ্যে বিষয় সম্পত্তি ভাগাভাগি হল, সব যে যার মতো সরে পড়ল। হাতে কাঁচা টাকা পেতেই সে নিজের মূর্তি ধরল। ব্যবসা লাটে উঠল, মদ মেয়েছেলে নিয়ে চুর হয়ে পড়ে থাকত… হাজার বললেও কারো কথা কানে নিত না।”
এমন ভাবে বলছিল যেন মল্লিকা এই নাটকের কোনো চরিত্র নয়, দর্শক মাত্র। আমার বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছিল। বললাম, “কোনোদিন জানাওনি তো!”
মল্লিকা বলল, “তুমি কোনোদিন খোঁজ নিয়েছ? আর জানলেই বা কী করতে?”
তা অবশ্য ঠিক, নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম, মল্লিকার দিকটা ভেবে দেখিনি। বললাম, “পাশে এসে দাঁড়াতে পারতাম অন্তত।”
“কিছু লাভ হত না। বিয়ের আগেও তো জানিয়েছিলাম, এসেছিলে?”
কিছু কিছু প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না। চুপ করে রইলাম। মল্লিকা বলল, “চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেয়ে নাও।”
চায়ের কাপ হাতে নিলাম, গুঁড়ো গুঁড়ো সর ভাসা লালচে রঙের একটা লিকার-সর্বস্ব ক্বাথ। এক চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখলাম। মল্লিকা বলল, “পার্কস্ট্রীটের একটা নার্সিংহোমে আয়ার কাজ করি, কাল নাইট ডিউটি ছিল। একা রেখে যাই না, রাতে বেরোলে এক ননদ এসে থাকে। তারা পুরী বেড়াতে গেছে, কী করি! খাইয়ে দাইয়ে তালাবন্ধ করে রেখে গিসলাম, সকালে এসে দেখি বিছানা নষ্ট করে রেখেছে। ঘরে বাইরে আয়ার কাজ…। খুব মাথা ধরেছিল, এসেই চায়ের জল চড়িয়ে দিয়েছিলাম, চাদর বালিশ বদলে চা ছাঁকতে দেরি হয়ে গেল, তেঁতো লাগছে কী?”
জিভটা বিস্বাদ লাগছিল। মনে হচ্ছিল চায়ের থেকে বেশি তেঁতো কিছু কেউ জোর করে মুখে গুঁজে দিয়েছে। তাও বললাম, “না না, ঠিক আছে।”
জোর করে আর এক চুমুক খেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “তোমাদের ছেলেমেয়ে…?”
মল্লিকা হাসল, “সে সুযোগ আর হল কোথায়? এখন নেহাত উপায় নেই তাই হাত ধরে…”
কথাটা মাঝপথে থামিয়ে মল্লিকা কান খাড়া করে কিছু শোনার চেষ্টা করল। জড়ানো স্বরে কেউ ডাকছে। মল্লিকা উঠল, বলল, “আবার কী হল… দেখি গে। তুমি বস।”
বললাম, “আমি আসব তোমার সঙ্গে?”
মল্লিকা না বলতে গিয়েও থমকাল, বলল, “এস।”
ঘরে ঢুকতেই সস্তার ট্যালকম পাউডার আর ফিনাইলের গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। মল্লিকার সঙ্গে না এলেই বোধ হয় ভাল হত। একটা কদর্য, অর্ধেক চোয়াল ভাঙা মুখ দেখার থেকে রেহাই পেতাম অন্তত। একটা চোখ বোজা, অন্যটা ঠেলে বেরিয়ে আসছে। নীল চেককাটা লুঙ্গি পরা কঙ্কালসার শরীরটা বিছানায় আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে। বাঁ হাতটা মাঝে মাঝে উঠে হাওয়া ধরার চেষ্টা করছে। মল্লিকা কাছে যেতেই সাঁড়াসির মতো আঙুল দিয়ে তার হাত ধরে উঠে বসল। মল্লিকার হাতে কালশিটের দাগের রহস্যটা বুঝলাম। একটা প্রায় অথর্ব শরীরের বেঁচেবর্তে থাকা ক্ষমতাটুকু বাঁ-হাতের মুঠোয় এসে জমা হয়েছে। ঘাড়টা একদিকে বেঁকে আছে। ঘড়ঘড়ে গলায় কিছু বলার চেষ্টা করছে। আওয়াজটা বাড়ছে, ষাট ডেসিবেল, সত্তর, আশী… একশ… আমার হাতটা নিশপিশ করে উঠল, মনে হল ওই আওয়াজটা চিরকালের মতো বন্ধ করে দিই।
মল্লিকা লোকটার দিকে তাকিয়ে প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত সেবিকার নির্লিপ্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “পেচ্ছাপ করবে? ইউরিন্যাল দেব?”
লোকটা মাথা নেড়ে না বলল। তারপর চোখের ইশারায় আমায় দেখিয়ে জানতে চাইল, কে? আমি বুঝলাম, মল্লিকাও বুঝল, তির্য্যক হেসে বলল, “মুরোদ নেই কানাকড়ির, আজকাল আবার সন্দেহ বাতিক হয়েছে… কেউ ঘরে এলেই হাঁকুপাঁকু করে জানার জন্যে, কে এল…”, জোর করে হাত ছাড়িয়ে শরীরটাকে শুইয়ে দিয়ে মিশমিশে গলায় বলল, “আমার নাগর এসেছে গো… রসের নাগর… ”
আমি বললাম, “আঃ, মলি! কী হচ্ছে?”

যে মোবাইল ফোন যত সস্তা তার রিং-টোন তত উদ্ধত হয়। মল্লিকা আমায় তক্তাপোষের ওপর বসিয়ে রেখে চান সারতে গেছে, মাথার দিব্যি দিয়ে গেছে – জলখাবার না খেয়ে যেতে পারব না। আমি একা একা দেওয়াল আলমারির বইপত্র হাঁটকে দেখছিলাম, সময় কাটানোর মতো কিছু খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। মল্লিকা ভুল করে হাতের মোবাইলটা কাঠের চেয়ারের ওপর ফেলে গিয়েছিল। সেটা বেমক্কা অসভ্যের মতো চীৎকার করতে শুরু করল। চুপ করানোর হাতে তুললাম, যেই ফোন করে থাকুক… বলতে গেলাম, একটু পরে ফোন করতে, ফোনের মালিক ধারে কাছে নেই। কিছু বলার আগেই ওদিক থেকে একটা লোক কর্কশ গলায় শাসিয়ে উঠল, “খানকি মাগী, গতরে কি চর্বি জমেছে? ফোন ধরতে এতক্ষণ সময় লাগে?”
আমি চুপ করে রইলাম, যে ফোনের ওপারে আছে তাকে খামোখা নিজের পরিচয় দেবার মানে হয় না। লোকটা আমার নৈঃশব্দের তোয়াক্কা না করেই বলল, বিকেলে শ্যামল আসবে, তার হাতে গান্নিব্যাগটা ফেরত পাঠিয়ে দিতে। ফোনটা কেটে দিল নিজেই। আমি আবার দেওয়াল আলমারির কাছে ফিরে গেলাম। গান্নিব্যাগ মানে চটের ব্যাগে কিছু মূল্যবান সামগ্রী রাখা আছে মল্লিকার হেফাজতে, সেটা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে শ্যামল নামের একজন লুচ্চা আসবে বিকেলের দিকে, বিকেল হবার এখনও অনেক দেরি, তার আগে মল্লিকাকে খবরটা দিয়ে দিলেই হবে। মল্লিকাদের দেওয়াল আলমারিতে পুরোন সাময়িকীর ভিড়ভাট্টার মধ্যে কিছু কাগজপত্র পেলাম যেগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং। একটা তাকের কোণে খুচরো পয়সা, পুরনো জং ধরা চাবির গোছার পাশে একটা কন্ডোমের মুখ খোলা প্যাকেট চোখে পড়ল, ভেতরে দু-চারটে সীল না-খোলা রাংতাও উঁকি দিচ্ছে দেখলাম।
ভেতর থেকে মল্লিকার চিৎকার শুনতে পেলাম, শয্যাশায়ী স্বামী ও নিজের ভাগ্যকে আগাপাশতলা শাপশাপান্ত করছে। কাগজগুলো ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম, পরে দেখলেও হবে, এমন কিছু জরুরি নয়। মল্লিকার অনুমতি না নিয়েই ভেতরে গেলাম। মল্লিকার স্বামী আবার বিছানা নষ্ট করেছে। মল্লিকা ফোঁপাচ্ছে, “সকালে একবার পরিষ্কার করে গেছি, এই চান করে এলাম, এখন আবার গু-মুত ঘাঁটতে কার ভাল লাগে? থাক পড়ে…”
মল্লিকার স্বামী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, মল্লিকা চান করে একটা আটপৌরে তাঁতের শাড়ি জড়িয়ে এসেছে, খোলা চুল থেকে জল ঝরে পিঠের ব্লাউজটা ভিজে, আমায় দেখে থামল, বলল, “তুমি আবার উঠে এলে কেন?”
“যদি তোমার কোনো হেল্প লাগে…”
“কী আর হেল্প করবে?” মল্লিকা বিছানা পাল্টাতে পাল্টাতে বলল, “দেখে যাও আমার কেমন সুখের সংসার, সেই দেখতেই তো এসেছিলে।”
বললাম, “আমি তো নিজে থেকে আসতে চাইনি। তুমিই আসতে জোর করলে।”
মল্লিকা সব ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, তার চোখ জ্বলছে, হাত জোড় করে বলল, “আমার ভুল হয়েছে তোমায় ডেকে এনে, আর কোনোদিন আসতে বলব না, তুমি যাও।”
আমি পেছন ফিরলাম, মল্লিকার সংসার দেখার লোভ আমার মিটে গেছে। এবার এখান থেকে চলে যাওয়াই ভাল। এক পা এগোতেই মল্লিকা পেছন থেকে কান্না ভেজা গলায় ডাকল, “সত্যিই চলে যাচ্ছ?”
ওর দিকে ফিরে বললাম, “তুমিই তো বললে চলে যেতে।”
মল্লিকা এগিয়ে এসে আমার বুকের কাছের শার্ট খিমচে ধরে বলল, “যখন যা বলি, তাই শোনো, তাই না?”
মল্লিকা আমার শরীরের এত কাছে সরে এসেছে যে আমি ওর কাঁধের ওপর দিয়ে অন্ধকার কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসা একটা মাত্র নাজেহাল চোখ দেখতে পাচ্ছিলাম, গোঙানি থামিয়ে লাথি খাওয়া কুকুরের মতো মল্লিকার একচোখো স্বামী আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার অস্বস্তি হল, মল্লিকার নেল পালিশ উঠে যাওয়া আঙুলের গিঁট থেকে শার্ট ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললাম, “আঃ মলি, কী করছ? তোমার স্বামী দেখছে।”
মল্লিকা ঠোঁট বেঁকাল, “দেখতে দাও, দেখা ছাড়া হারামীটা আর কীই বা করতে পারে!”
মল্লিকার মুখ-খারাপের থেকে রাতজাগা বাসি গন্ধ আসছিল। আমি মুখ ফিরিয়ে নিতে গেলাম। তার আগেই মল্লিকা আমার ঠোঁটের ওপর দাঁত বসাল। কতদিন… ওহ কতদিন পর… পাতা-পচা পুকুরের জলের মতো নরম মল্লিকার ঠোঁট, আমি জলের নিচে তলিয়ে যাচ্ছি, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, মল্লিকার হাত দুটো সাপের মতো আমায় পাকে পাকে জড়িয়ে ধরছে। সাঁতার শেখানোর সময় বাবা পুকুরের মাঝখানে টেনে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিত, বলত – যা সাঁতরে পাড়ে ফিরে যা। নিজে পাশে পাশে সাঁতার দিত, কখনও হাত পা ছেড়ে দিয়ে জল গিললে পেটের নিচে হাত রাখত, বাবা তুমি কোথায়? বাবা বলল, “এই তো আমি।”
মল্লিকাকে দু-হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছলাম। মল্লিকার স্বামী আবার গোঙাতে শুরু করেছে, বললাম, “মলি, না… এরকম কোরো না।”
মল্লিকা বলল, “কেন না?”
আমি মল্লিকার পা থেকে মাথা পর্যন্ত জরিপ করে বললাম, “তুমি খুব অন্যরকম হয়ে গেছ, মলি।”
মল্লিকা এক ঝটকায় বুকের আঁচল ফেলে দিয়ে বলল, “দেখো, ভাল করে দেখো, তোমার মলি একটুও বদলায়নি।”
আমি অন্য দিকে মুখ ফেরালাম, মল্লিকার ঘাঁটা বা না-ঘাঁটা শরীর দেখার জন্য আমি আজ তার শ্বশুরবাড়ি আসিনি, এই কথাটা মল্লিকাকে বোঝানো মুশকিল। বললাম, “তুমি যখন চানে গিয়েছিলে, তখন বাজিত পালের ফোন এসেছিল।”
মল্লিকা থমকে গেল, তারপর মেঝেতে লুটনো আঁচল তুলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, “বাজিতদা… কী বলল?”
আজকাল মোবাইল নম্বর থেকে নাম খুঁজে নেওয়া খুব সহজ, মল্লিকার মুখ থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ না সরিয়ে বললাম, “তোমার কাছে যে চটের বস্তাটা জমা আছে ওটা নিতে শ্যামল আসবে, বিকেলে…”
মল্লিকার মুখের একটা পেশীও কাঁপল না।

“পার্কস্ট্রীটে যে নার্সিংহোমটায় কাজ কর, সেটার নাম কী?”
বেশ কিছুক্ষণ হল গোঙানির শব্দটা পাচ্ছি না। মল্লিকার স্বামী বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। বেলা পড়ে আসছিল, মল্লিকা লুচি, বেগুনভাজা আর আলু-ফুলকপির তরকারি বানিয়েছিল। মল্লিকাদের বাড়িটা পুরনো হলেও খোলামেলা। খাবার ঘরে একটা পালিশ চটা সেগুন কাঠের টেবিল। জনা আষ্টেক লোক অনায়াসে হাত পা মেলে, জানলার গরাদে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে খেতে পারে। সকালে খাঁচার পাখিদের কিচির-মিচির শুনেছিলাম, এখন বনের পাখিদের কিচির-মিচির শুনতে শুনতে মনে হল দুই দলের উল্লাস-শব্দ একদম আলাদা। মল্লিকা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে দুটো স্টীলের প্লেটে লুচি সাজিয়ে নিয়ে বসল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কী যেন নাম বললে?”
মল্লিকা বলল, “বলিনি তো!”
“বলনি?”
“না…”, মল্লিকা মাথা নিচু করে বসে আছে, নখ দিয়ে বেগুনভাজা খুঁটছে।
“কোথায় যাও?”
“যে যেমন ঠিকানায় ডাকে…”
“আয়ার কাজ, নাকি…?”
মল্লিকা জবাব দিচ্ছে না, মুখ নামিয়ে রেখেছে।
“মলি…”
যেন অনেক দূর থেকে সাড়া দিচ্ছে, মল্লিকা বলল, “যার যেমন দরকার…”
বললাম, “আমার কাছ থেকেও আড়াল করছ?”
মল্লিকা এবার মুখ তুলল, ছলোছলো চোখে বলল, “আড়াল করার মতো আর কিছু বাকি পড়ে নেই গো। এই শয়তান লোকটাই আমায় শেষ করে দিল… ওষুধ, হাসপাতাল, পথ্য… খিদে পেলে এমন চেঁচায় পাড়াপড়শী ছুটে আসে।”
“তাই বলে…”
“তোমায় আর লুচি দেব?”
“না…”
মল্লিকা আমার খালি প্লেটটা টেনে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। যেন আমার সামনে থেকে সরে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমি রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম, “বাজিত পাল লোকটাকে কতদিন ধরে চেন?”
মল্লিকা বাসন ধুচ্ছিল, ঘাড় ফিরিয়ে বলল, “কেন? বছর দেড়েক… ঘরের লোকটাকে নিয়ে যখন সরকারি হাসপাতালে মাথা কুটছি, বাজিতদা খুব হেল্প করেছিল, ওর অনেক চেনাজানা।”
বাজিত পালের সঙ্গে আমারও কয়েক দিন হল চেনাজানা হয়েছে। বলা ভাল ‘বাজিত পাল’ নামটার সঙ্গে। আর্মসের যে কনসাইনমেন্টগুলো সীমান্ত পার হয়ে দেশে ঢোকে বাজিত পাল সেগুলো রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় চালান দেয়। কোনক্রমে তার নাগাল পেলেও তাকে চেপে ধরে রাখা যায় না, পাঁকাল মাছের মত পিছলে পড়শী রাষ্ট্রে পালিয়ে যায়। আজ সকালে যে নম্বরটা থেকে মল্লিকার কাছে ফোন এসেছিল সেটাও আমার চেনা, গত তিন মাস ধরে বন্ধ ছিল। মল্লিকার সঙ্গে বাজিতের সাম্প্রতিক যোগাযোগের খবরটাও আমার অজানা ছিল না।
আমি নিশ্চিত বাজিত পালের আসল পরিচয় বা ওই বস্তায় কী আছে, মল্লিকা সবই জানে। আমি যে জানি সেটা সম্ভবত এখনও আঁচ করে উঠতে পারেনি। মল্লিকা দশ মিনিটের জন্যে বেরিয়েছিল সকালে, ওষুধ কিনতে, সেই ফাঁকে ওদের ভাঁড়ার ঘরের মিটসেফের আড়ালে রাখা চটের বস্তাটার মুখ খুলে দেখে এসেছি, হ্যান্ড গ্রেনেড, দেশী পিস্তল, গুলি-বারুদ… শ্যামলের জন্য বিকেল অব্দি অপেক্ষা না করলেই নয়। শ্যামলকে ধরে বাজিত পাল। রোগটাকে শেকড়-সুদ্ধু ওপড়াতে না পারলে, দেশটাকে এরা ঝাঁঝরা করে দেবে। বাবা এই দেশের জন্যে সেধে নিজের বুকে গুলি নিয়েছিল, আর আমি বসে বসে আঙুল চুষব? মল্লিকা বাসন মাজা শেষ করে আঁচলে হাত মুছছে, জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ বাজিতদাকে নিয়ে পড়লে কেন?”
“কোথায় থাকে জানো?”
“ঠিক জানি না, নৈহাটির দিকে কোথাও… এত জেরা করছ কেন বলতো?”
আমি সাবধান হলাম, “হিংসে হচ্ছে, এত বাজিতদা বাজিতদা করছ… ভাবছিলাম একবার দর্শন করে আসব।”
মল্লিকা বলল, “তোমার আবার হিংসে! অবশ্য ভাবতে ভাল লাগে…”
আমি হাসলাম। মল্লিকা হাসল না, বলল, “বাজিতদা না থাকলে না খেয়ে মরতে হত।”
জিজ্ঞেস করলাম, “এখন বেশ বেঁচে আছ, তাই না?”
মল্লিকা বলল, “খোঁটা দিচ্ছ? তোমার কি মনে হয় মরে যাওয়াটা এর থেকে সহজ ছিল?”
জানি না কেন মল্লিকাকে ধাক্কা দিতে ইচ্ছে হল, বললাম, “রোজই তো মরছ মলি, কলকাতার পার আওয়ার রেটের হোটেলের ঘুপচি ঘরে কিম্বা তোমার বাজিতদার সঙ্গে দীঘা বা তেজপুরে…”
মল্লিকা এবার সত্যি কষ্ট পেল, যেন ডুবে যাচ্ছে, সাঁতার জানে না, হাঁস-ফাঁস করতে করতে, দু-হাত দিয়ে জল সরাতে সরাতে বলল, “বোঝোই তো সব… পার না এই নরক থেকে আমায় উদ্ধার করে নিয়ে যেতে?”
বললাম, “আর তোমার স্বামী? সে বেচারার কী হবে?”
মল্লিকা আমার সামনে এসে দাঁড়াল, চোখে চোখ লাগিয়ে বলল, “এস আমার সঙ্গে। আমি ওর ভাল দিকের হাত আর পাটা চেপে ধরছি, তুমি ওর মুখে বালিশ ঠেসে ধর।”
আমি বেশিক্ষণ মল্লিকার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না, চোখ নামিয়ে বললাম, “স্যরি মলি, আমার দ্বারা হবে না।”
মল্লিকা আমার হাত চেপে ধরে অনুনয় করে বলল, “আমার জন্যে এটুকুও করতে পারবে না?”
কখনও মানুষ খুন করিনি তা নয়। কিন্তু সে সব নেহাত জীবন অথবা জীবিকার প্রয়োজনে, আক্রান্ত হলে। একটা অসহায় পঙ্গু লোককে মারার মতো নার্ভের জোর আমার নেই।
মল্লিকার হাত ছাড়িয়ে রান্নাঘরের দরজা ছেড়ে ফিরে যেতে যেতে মনে হল, আহা, মল্লিকাকে যদি সত্যি সত্যি এই নরক থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারতাম! রূপকথার রাজপুত্রের মতো রাঙা ঘোড়ায় চেপে মল্লিকার শ্বশুরবাড়ির উঠোনে এস দাঁড়াতাম। খোলা চুলে, এক মুখ আলো নিয়ে মল্লিকা ঘর থেক দৌড়ে বেরিয়ে এসে বলত, চল, কোথায় নিয়ে যাবে! এক হাতে মল্লিকার কোমর জড়িয়ে ওকে ঘোড়ার পিঠে তুলে তেপান্তরের মাঠ পার হয়ে চলে যেতাম। একটা ঝিরঝিরে নদী খুঁজে নিয়ে তার ধারে কুটির বানিয়ে থাকতাম দুজনে। কিন্তু আমায় উপায় নেই, শ্যামলের জন্যে আমায় আদি অনন্তকাল অপেক্ষা করে বসে থাকতে হবে। সে যখনই আসুক, তার সঙ্গে দেখা হওয়াটা জরুরি। শ্যামল, বাজিত পাল… মুম্বাই থেকে কার্গিল, কার্গিল থেকে বেনাপোল, শুয়োরের বাচ্চাগুলো যে যেখান দিয়েই বর্ডার ক্রস করার চেষ্টা করুক না কেন, বাবার ক্যাস্কেট ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কাউকে রেয়াত করব না।
সত্যিই কি তাই? নাকি বর্ডার সামলাতে সামলাতে অজান্তে নিজের সীমান্তেও কাঁটাতারের বেড়া লাগিয়েছি, চব্বিশ-সাত পাহারা বসিয়েছি! সাধারণ তাপ উত্তাপের আসা যাওয়াতেও বৈধতার কাগজ-পত্তর দেখতে চাইছি! মল্লিকার আপত্তি নেই, সে তো সারা শরীরে ভালবাসার দোকান সাজিয়ে বসে আছে… এক সে শুণ্ডিনি দুই ঘরে সান্ধঅ… তার দ্বিচারিতার তবু তো একটা অজুহাত আছে, আমি কেন সাহস করে তার কোমরের খাদে হাত রাখতে পারছি না? ভালবাসা কি কখনও অবৈধ হয়? নাকি ভয়? মল্লিকা যদি জেনে যায় তার শরীরে পাখির বাসা দেখে যে সাপটা ফণা তুলত আমি তাকে অনেকদিন আগেই গলা টিপে মেরে ফেলেছি।
দরজায় বেল বাজল, শ্যামল এল কি? পজিশন নেবার জন্য আড়াল খুঁজতে খুঁজতে আমার শরীরের অলিগলিতে হঠাৎ আপতকালীন রক্তের উচ্ছ্বাস এল। প্রত্যেকটি পেশী লোহার মতো শক্ত হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল একটা ক্ষুধার্ত রাক্ষস লোভীর মতো আমার চেতনার দখল নিয়ে নিচ্ছে, আমার যাবতীয় বুদ্ধিশুদ্ধি হাঁ করে গিলে নিচ্ছে। তবে কি সাপটা সত্যি সত্যি মরেনি, কেবল মরণের ভান করেছে? জল-জঙ্গল-অন্ধকারের মধ্যে গিয়ে এখনও কোথাও লুকিয়ে বসে আছে? লাঠির খোঁচা দিলে আবার ফোঁস করে উঠবে।
কে জানে কখন সেই আদিম সরীসৃপের শীতঘুম ভেঙে যায়! মল্লিকা পেছন থেকে বলল, “জানতাম, পারবে না। তুমি যা ম্যাদামারা! সেদিনও পারোনি, আজকেও না।”

4 Comments

  • ঝর্না বিশ্বাস

    Reply November 3, 2020 |

    অসম্ভব ভালো লাগা গল্প সিদ্ধার্থদা।
    “রেইনকোট” মুভিটা মনে পড়ছিল, ওতে যেমন দুজন মানুষের বহুদিন পর সাক্ষাৎ হয়, এখানে প্রধান দুটি চরিত্রের দারুন ভাবে এগিয়ে যাওয়া। আপনার গল্প মানেই আলাদা কিছু, তাই পত্রিকা পড়ার শুরু আপনার গল্প দিয়ে।

    • bdmagadmin

      Reply November 3, 2020 |

      ভাল লাগল। বিজয়ার শুভেচ্ছা নেবেন।

      • chayan

        Reply November 6, 2020 |

        কি লিখেছ বস। কুদোস।

  • Gorachand Chakraborty

    Reply November 6, 2020 |

    সিদ্ধার্থ, একটি অনবদ্য গল্প পড়লাম। খুব ভালো লাগলো।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...