এক মনে তোর একতারাতে…
অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষ। ধ্বংসপ্রাপ্ত জাপান আর্থিক নিষেধাজ্ঞার জেরে ধুঁকছে। এইরকম সময়ে আমেরিকায় পড়তে আসা দুটি জাপানী ছাত্রকে দেখা যায় পালা করে একজন লিখছে আর অন্যজন পেন্সিল কেটে তৈরি রাখছে। জাপানী পেনসিলের মান তখন খুব খারাপ, একটু লিখলেই শিস ভেঙে যায়, তাই ঘনঘন পেনসিল কাটতে হয়। বন্ধুরা বলে, এত কষ্ট করছ কেন? ইংলন্ডের তৈরি পেনসিল ব্যবহার করলেই পারো, দামেও সস্তা। ছেলেদুটি সজল চোখে বলে, “আমরাই যদি নিজেদের দেশের জিনিস না কিনি তবে অন্যরা কিনবে কেন? আজ আমাদের পেনসিল পৃথিবীর বাজারে দাঁড়াতে পারছেনা সত্যি কিন্তু দেখো, একদিন আসবে যখন সারা পৃথিবী জাপানী পেনসিল ব্যবহার করবে।” দেশের প্রতি এই সুগতীব্র আনুগত্য ও দায়বদ্ধতার জোরে সত্যিই জাপান ভবিষ্যতে শুধু বিশ্বসেরা পেনসিল প্রস্তুত করে না, বিশ্বের অন্যতম শক্তি হয়ে উঠে স্বদেশকে সবদিক থেকে উন্নত করে তোলে। ভারতীয়দের মধ্যে দেশের প্রতি এইরকম আনুগত্য ও দায়বদ্ধতা দেখা যায় না। তাদের কাছে দেশভক্তি আচারসর্বস্ব রোমান্টিকতা, ঐকান্তিক দায়বদ্ধতা তাদের মধ্য দেখা যায় না। আমরা সিনেমা হলে জাতীয়সঙ্গীত চালিয়ে দেশাত্মবোধ চর্চা করি, হয়তো প্রগাঢ় আবেগে গলাও মেলাই কিন্তু জাতীয় ছুটিগুলিকে আলাদা কোনো মর্যাদা দিই না, আর পাঁচটা ছুটির দিনের মত মাংসভাত খেয়ে, সিনেমা দেখে, আড্ডা মেরে ছুটি কাটাই। আমরা অবলীলায় দেশজ সামগ্রীকে অশ্রদ্ধা করে বিদেশী পণ্য তুলে নিই, বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভালো বলতে পারলে আত্মশ্লাঘা অনুভব করি, ধুতিশাড়িকে সেকেলে বলে বর্জন করে কোটপ্যান্ট পরাকে আধুনিকতা মনে করি আর সন্তান বিদেশে চাকরি করলে তো কথাই নেই, সমাজে নিজেরও কদর বেড়ে যায়। ভালো ছাত্রদের কজন স্বেচ্ছায় দেশে থাকে? কজন ভারতীয় দেশসেবায় এগিয়ে আসে? ১৯৩০ সালে নোবেল বিজয়ী ডাঃ সি ভি রমণ নাকি পুরস্কার নেওয়ার সময় দুঃখে কেঁদে ফেলেছিলেন, কারণ সবার নিজের দেশের পতাকা ছিল শুধু পরাধীন ভারতবর্ষের নাগরিক সি ভি রমণকে বৃটিশ পতাকার অধীনে পুরস্কার নিতে হয়, ভারতমায়ের গৌরবে কোনো পতাকা তিনি প্রদর্শন করতে পারেননি! আজকের ভারতীয় নোবেল বিজয়ীরা জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত সবকিছু সহকারে পুরস্কার নেন তবে তাঁরা কেউই তাঁদের স্বাধীন ভারতে বাস করেন না। দেশাত্মবোধক গান আজ শুধু কিছু আবেগী কথা, তার উচ্চারণে হৃদয় নিংড়ানো কোনো বোধ হৃৎপিণ্ডে ধাক্কা দেয় না। একজন ভারতীয় আরেকজন ভারতীয়কে আর সাহায্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। তাদের মধ্য আজ অনেক শত্রুতা, সন্দেহ আর দ্বন্দ্বের পাঁচিল। কেন এই দূরত্ব, বিরাগ, ঔদাসীন্য? কোথায় ভুল হল ?    

ভারতবর্ষ বহুতার দেশ। বহু রাজ্য, বহু সম্প্রদায়, বহু ভৌগোলিক বিশিষ্টতা, বহু ভাষাসংস্কৃতি। জাতপাত, অর্থ ও শিক্ষাগত বিভিন্নতা ভারতীয় সমাজের বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে একতা গড়ে তোলা সহজ নয়। এক ভূখন্ডে বাস করলেই হয় না, ঐক্যের জন্য দরকার একটা সাধারণ আবেগ যা সবার ধমনীতে প্রবাহিত হবে। সমস্ত ভারতীয়র হৃদয়ের একতারা একটি তারে বাঁধা হলে তবেই তারা এক সুরে ঝংকৃত হবে, যেমন গোটা ভারতবর্ষ একসময় স্পন্দিত হয়েছিল স্বাধীনতার ডাকে। ঐক্যের সেই একতারাটা আজ ভগ্ন, সুর লক্ষহারা ।  

৭৩ বছর ধরে নানাভাবে বিচ্ছিন্নতা জন্মে চলেছে তবে এর সূত্রপাত ঘটে ১৫ই আগস্ট মধ্যরাত্রে – যেদিন একটা দেশকে ধর্মের ভিত্তিতে ভেঙে দু-টুকরো করে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। বিদ্বেষের তীব্রতায় একই দিনে স্বাধীনতা পাওয়া দুটি যুযুধ্যমান দেশ স্বাধীনতা দিবস হিসেবে বেছে নেয় ভিন্ন ভিন্ন দুটি দিন – পাকিস্তান ১৪ই আগস্ট দেশজ ক্যালেন্ডার মতে আর ভারত ১৫ই আগস্ট ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসরণে। নিরর্থক, যুক্তিহীন, অশুভ একটা বিরোধ কায়েম হয়ে যায়। অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে স্বাধীন ভারত পথ চলা শুরু করলেও ব্রিটিশ শৃঙ্খল কেটে বেরিয়ে শক্তি ও ঐক্যের জমিতে স্বাধীন একটা পরিচয় গড়ে তুলতে সে অক্ষম হয়। বরং স্বাধীনোত্তর প্রতিটি পদক্ষেপে ভারত তার সনাতন ঐতিহ্য আর গৌরব থেকে সরে গিয়ে বিভেদের পথ প্রশস্ত করে আর বিচ্ছিন্নতাকে লালন করে ।

সেসময় আরেকটা গুরুতর প্রমাদ ঘটে। স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনাকালে ইংরেজি ‘secular’ শব্দটি হিন্দিতে অনূদিত হয় ধর্ম-নিরপেক্ষ । এটা এক মারাত্মক ভুল কারণ ধর্ম-নিরপেক্ষর আক্ষরিক অর্থ – যে ধর্মের অপেক্ষা রাখে না অর্থাৎ অধার্মিক! রাষ্ট্র কি করে অধার্মিক হবে? তাকে তো ধার্মিক (নৈতিকভাবে সদাচারী) হতে হবে এবং অধর্মাচারীকে শাস্তি দিতে হবে! ভুল ধরা পড়তেই তড়িঘড়ি ধর্ম-নিরপেক্ষ শব্দটিকে বদলে করা হয় পন্থ-নিরপেক্ষ (সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ)। দুর্ভাগ্যবশত, আজও ‘secular’ অর্থে ধর্ম-নিরপেক্ষ শব্দটিই চলে আসছে, পন্থ-নিরপেক্ষ কেউ ব্যবহার করেন না। প্রাচীন ভারতের উদার সার্বজনীন ধর্মভাবনা এইভাবে সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ অর্থে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। বিভেদের যে বীজ স্বাধীনতার জন্মলগ্নে উপ্ত হয়, তাতে পাকাপাকিভাবে ইন্ধন জোগানোর ব্যবস্থা হয়।

ভারতের জাতীয়সঙ্গীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলায় তৎসম শব্দাশ্রয়ে রচিত লেখা একটি গান। তৎসম অর্থাৎ যেসব সংস্কৃত শব্দ অবিকৃত রূপে ব্যবহার করা হয়। ভারতীয় ভাষামাত্রেই সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন তাই গানটি বাংলাভাষায় হওয়া সত্ত্বেও ভারতের সমস্ত প্রদেশের মানুষের বোধগম্য হয় এবং সবার হৃদয়কে এক আবেগে স্পন্দিত করে। বহুভাষাভাষী ভারতবর্ষকে বাঁধতে সংস্কৃতের এই শক্তি উপেক্ষনীয় ছিলনা। ভাষা হিসেবেও যে সংস্কৃত কত সমৃদ্ধ তার পরিচয় পাওয়া যায় 1786 সালে স্যার উইলিয়ম জোনস-এর রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রদত্ত একটি ভাষণে – The Sanscrit language, whatever be its antiquity, is of a wonderful structure; more perfect than the Greek, more copious than the Latin, and more exquisitely refined than either. সেই সংস্কৃতকে মৃত বলে পরিত্যাগ করা হয় আর হিন্দিকে জাতীয় ভাষা রূপে আরোপ করা হয়, যদিও হিন্দি আদৌ কোনো ভারতীয় ভাষা নয়! কি করে এটা সম্ভব হয় সে আলোচনার চেযেও বড় কথা, এর ফলে প্রাচীন ভারতবর্ষের ঐশ্বর্যাণ্বিত সংস্কৃত ভাষা যেমন লুপ্ত হয়, পাশাপাশি ভারতের প্রাদেশিক ভাষাগুলিরও অন্তর্জলিযাত্রা শুরু হয়। ভারতের প্রত্যেকটা রাজ্যের নিজস্ব ভাষা, শব্দভাণ্ডার, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং লিপি আছে যেগুলি দেশের সম্পদবিশেষ! এছাড়া আছে আঞ্চলিক উপজাতিগুলির সজীব ও ঐশ্বর্যশালী লোকভাষা, লোকজীবনসম্পৃক্ত সাহিত্য ও লোকশিল্প। যে সম্পদ জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সযত্নে সংরক্ষণ করা উচিত তা তিলে তিলে হত্যা করা হয়, হচ্ছে। এতে জাতীয় সম্পদ তো বিনষ্ট হলোই, সঙ্গে সমাজের সুস্থ সমণ্বয়বোধের অবক্ষয় ঘটে আর বিচ্ছিন্নতাবাদ পুষ্ট হয়।

পাশ্চাত্যের অনুকরণে ভারতে টীচার্স ডে চলন করা হয় এবং এমন একজন অধ্যাপক-শিক্ষকের জন্মদিনকে শিক্ষক দিবস বলে ধার্য করা হয় যার নাম তারই ছাত্রের থিসিস চুরির অপবাদে কলঙ্কিত। সত্যমিথ্যা ধার্য করারও আগে বিচার্য, এটা কি ছাত্রদের একটা নৈতিক দোটানায় ফেলে দেয় না ? একদিকে অপরের রচনা চুরি করলেও কি শিক্ষক শ্রদ্ধার পাত্র থাকেন? আর অন্যদিকে, ছাত্রদের কি শিক্ষককে অশ্রদ্ধা করা উচিত? এই দুই প্রশ্নের দ্বন্দ্ব জাগে। অপরিণত, বিকাশোন্মুখ, কোমল মনের ওপর এধরনের কঠিন নৈতিক সংঘাত চাপিয়ে দেওয়া কি ছাত্রদের পক্ষে ক্ষতিকারক হয় না? তাছাড়া আমাদের আদৌ আলাদা একটা শিক্ষক দিবসের দরকার ছিল কি? আমাদের চিরাচরিত গুরুপূর্ণিমা কি যথেষ্ট ছিল না? বরং টীচার্স ডে নির্দিষ্ট একজন শিক্ষকের জন্মদিনে পালিত হয় বলে ভাবনাটির পরিধি সংকুচিত হয়ে যায় কিন্তু গুরুপূর্ণিমা কোনো বিশেষ শিক্ষককে প্রাধান্য না দিয়ে সমগ্র শিক্ষককুলকে শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা জানায়। প্রথমটা মনকে সীমিত করে, দ্বিতীয়টা ব্যাপ্ত করে।

স্ট্যাচু অফ ইউনিটি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যে ভারতবর্ষে দেবদেবী থেকে শুরু করে শাস্ত্রকাব্যসাহিত্যশিল্প সর্বত্র প্রতীকের ছড়াছড়ি, যেদেশের প্রতিটি মন্দির ব্যঞ্জনাময় শিল্পের আধার, যেখানে পাথর-মাটি-বালি দিয়ে আজও নিত্য রচিত হয় সূক্ষ্মতা আর ব্যঞ্জনার অজস্র কারুকৃতি, সেখানে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে একজন রাজনৈতিক নেতার মূর্তি স্থাপন কি চৈতন্যের স্থূলতা আর শৈল্পিক দৈন্যেরই পরিচয় দেয় না? যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির অনুসরণে এই স্থপতি, তার মত রূপকাশ্রিত কোনো শিল্পভাবনা হলে সবদিক থেকে সঙ্গত হত না কি? এটা যুগপৎ লজ্জা এবং গ্লানির কথা যে, ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নির্মিত স্থপতি দেশের মানুষের ক্ষোভ, বিদ্বেষ আর বিচ্ছিন্নতার উৎস হল।

আর আছে কাশ্মীর সমস্যা, যা ভারতের পক্ষে এক চূড়ান্ত লজ্জা ও ব্যর্থতার ইতিহাস। এ এমন গভীর ক্ষতের জন্ম দিয়েছে যা ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে গিয়ে দেশের ঐক্য ও শান্তিকে আজ নিদারুণভাবে আক্রান্ত করেছে।

এই আলোচনার লক্ষ কে বা কারা এই বিচ্ছিন্নতার জন্য দায়ী সেটা প্রতিপন্ন করা নয়। কি কারণে ঘটেছে সেটাও এখানে আলোচ্য নয়। এই লেখার উদ্দেশ্য, এই বিচ্ছিন্নতা এবং উদাসীনতা সম্বন্ধে সচেতনতা জাগানো এবং এর একটা সুস্থ সমাধান খোঁজা। কি করলে ভাঙা একতারায় আবার উঠবে সুর?

সচেতনতা জাগানোর জন্য প্রথমেই দরকার নতুন গ্রন্থ রচনা করা। যেখানে ব্রিটিশদের কথা নয়, থাকবে নিজেদের সম্বন্ধে সঠিক কাহিনি ও তথ্য। ভারতীয়রা জানুক তথাকথিত বিখ্যাত পশ্চিমী গাণিতিকদের বহু আগে ভারতের ব্রহ্মগুপ্ত শূন্যকে প্রথম সংখ্যারূপে ঘোষণা করেছিলেন। একটি সংখ্যা থেকে সেই সংখ্যা বিয়োগ করলে বা শূন্যকে কোনও সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যে শূন্য মান হবে, এ-কথাও ব্রহ্মগুপ্তই প্রথম বলেন। ফরাসি গণিতজ্ঞ পিয়ের-সিমঁ লাপলাস(১৭৪৯-১৮২৭)বলেন, ‘কোনও সংখ্যার প্রকাশ পদ্ধতি, দশটি অঙ্ক দিয়ে স্থান-মান ও সাংখ্যমানের উদ্ভাবন ভারতে হয়। আজ যেটা নিতান্তই সরল বলে মনে হচ্ছে তার তাৎপর্য ও মহিমা যে আসলে কতখানি সেটা হয়তো আমরা সম্যকভাবে উপলব্ধিও করতে পারি না। স্বীকার করতেই হবে, গণনার যে পদ্ধতি ভারতে উদ্ভাবিত হয়েছিল সেটা গণিতের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় এক আবিষ্কার।’ কজন ভারতীয় একথা স্কুলে শুনেছে? কজন জানে পূর্ণাঙ্গ দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি প্রবর্তনের কৃতিত্ব ভারতের আর্যভট্টের, লাইবনিজের অনেক আবিষ্কার তার পাঁচশো বছর আগে ভাস্কর করে গিয়েছিলেন, ভারতের ভাস্করই প্রথম বলেছিলেন বীজগণিতে ঋণাত্মক রাশিকে ঋণাত্মক রাশি দিয়ে গুন করলে ফল ধনাত্মক হবে কিন্তু ধনাত্মক রাশি দিয়ে গুন করলে ফল হবে ঋণাত্মক? জ্যামিতিতে সমকোণী ত্রিভুজ আর সুষম বহুভুজ নিয়ে ‘পাই’-এর মান ৩.১৪১৬৬৬ যে ভাস্করই নির্ণয় করেছিলেন সেটা মনে গেঁথে থাকার মত করে আমরা শুনিনি কেন? পাইথাগোরাস, আর্কিমিডিস, নিউটনকে মনে রাখলাম অথচ আর্যভট্ট-ভাস্করকে ভুলে গেলাম কেন? কোথায় ঘটেছিল গলদ? গুগল সার্চে ৫ জন বিশ্বসেরা গণিতজ্ঞ আর বৈজ্ঞানিকের নাম খুঁজলে মুহূর্তে উঠে আসে নিউটন আর গাউসের নাম অথচ তাদের ৫০০ বছর আগে জাত ভারতীয় গণিতজ্ঞ আর্যভট্ট আর ভাস্করের উল্লেখ কোথাও নেই।কেন এঁদের নাম নথিভুক্ত হয় নি? বইয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, স্কুলে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয় না, নেটে নাম থাকে না, ভারতীয় কৃতিত্বের কথা কেন বারবার উহ্য থেকে যায়? ভারতের নাম ভারতীয় তথা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব কেন কেউ নেয় নি? প্রাচীন ভারতের অত্যাশ্চর্য কীর্তি, হাজার মাইল দূরত্বে প্রায় সরল রেখায় একই দ্রাঘিমা বরাবর নির্মিত ৫টি শিব মন্দির। স্যাটেলাইট বা আধুনিক টেকনোলজি ছাড়া এই অলোকসামান্য গণনা কী করে সম্ভব হল তা নিয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিকরা যুগপৎ বিস্মিত ও চমৎকৃত। অথচ ভারতীয়রা নিজেদের এই কৃতিত্ব সম্বন্ধে সম্যক অবগত নয়। এ লজ্জা কার?

নতুন প্রজন্ম পড়ুক এইসব তথ্য। তারা পড়ুক কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, হিপোক্রেটিস আর অ্যারিস্টটলের পাশাপাশি। জানুক বেদ-উপনিষদে ব্যাখ্যাত বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, দর্শন আর অধ্যাত্মবাদের কথা যা খৃষ্টেরও জন্মের আগে ভারতের ঋষিরা বলেছিলেন। সনাতন ভারতের যোগব্যায়াম আর ধ্যান স্কুলে স্কুলে শেখানো হোক। ধর্মের অর্থ হোক সম্প্রদায় নয়, সেই আচরণবিধি যা মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে। এ সেই সনাতন ধর্ম, যার কথা ‘ধর্মে সইবে না’, ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’ বা ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ প্রবাদে বলা হয়েছে, মহাপ্রস্থানের পথে যে ধর্ম সারমেয়বেশে যুধিষ্ঠিরের অনুগামী হয়েছিলেন, যে ধর্মকে সংস্থাপনার্থে শ্রীকৃষ্ণ যুগে যুগে আবির্ভূত হন। বাকি সব সম্প্রদায়। সাম্প্রদায়িক বিভেদ যেন আর ধর্মের নামে হিংসা ছড়াতে না পারে । একদিকে স্বদেশের প্রতি গর্ববোধ জাতীয় স্তরে হীনম্মন্যতা দূর করুক, অন্যদিকে আত্মিক অনুশীলন জাতীয় চরিত্রের জাড্য দূর করুক। তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশের হৃদয় এক স্পন্দনে স্পন্দিত হবে, ভাঙা একতারাতে আবার সুর জাগবে। আজ একে অলীক স্বপ্ন বলে মনে হতে পারে কিন্তু ভুললে চলবে না, বিধ্বস্ত জাপানও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, তার তৈরি পেনসিল বিশ্বের বাজারে সেরা খেতাব অর্জন করেছিল। ভারতবর্ষও সব বাধা অতিক্রম করে জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। মন্ত্রটা বহু পুরনো – হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর হও উন্নত শির নাহি ভয়!  

11 Comments

  • Swapan Brahma

    Reply November 4, 2020 |

    অসাধারণ খুব ভালো লাগলো

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply November 6, 2020 |

      ধন্যবাদ।

  • অ ঘোষ

    Reply November 4, 2020 |

    দারুণ লেখা। প্রসঙ্গত, ধর্ম ও বিজ্ঞান একে অন্যের পরিপূরক। কিন্তু অদক্ষ হাতে ধর্মের মোড়কে রাজনীতির প্রকাশ ও বিকাশ সমগ্র মানবজাতির পক্ষে সমূহ ক্ষতিকর।

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply November 6, 2020 |

      ধন্যবাদ অর্ণব।

  • Mita Chatterjee

    Reply November 8, 2020 |

    It’s a nice reading. Unfortunately most of us know our problems but its really hard to find a common ground within the diversity. So everybody is looking for an easy solution. Our criticism is creative. So instead of painting out the problem let’s try for a solution with one baby step at a time. Basic education is a must. I can join the bandwagon if there is a right direction.

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply November 9, 2020 |

      একদম যথাযথ। আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

  • Mohua Biswas

    Reply November 8, 2020 |

    অতি উচ্চমানের একটি লেখা।খুব ভাল লাগল।

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply November 9, 2020 |

      ধন্যবাদ।

    • Parbati Roy

      Reply November 9, 2020 |

      Anabadya lekha.satta ta dhare tulecha.amder garbita bodh kora uchit.neejer deser sampade.

      • Anjanaa Chattopadhyay

        Reply November 9, 2020 |

        আপনার মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  • Anjanaa Chattopadhyay

    Reply November 9, 2020 |

    একদম যথাযথ। আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...