জীবন
চন্দন ঘোষ




লোকটা জীবনের কাছে বিশেষ কিছুই চায়নি। ভালোবাসায় বসার জন্য ঘন-পাতাভরা একটা বটগাছ, এনামেলের থালায় চাট্টি যেমন তেমন খাবার, মাটির গেলাস ভর্তি স্বপ্ন, আর ঘুমোনোর সময় পাখির শিস। কিন্তু সে কিছুই পায়নি। স্বভাবতই সে বিশেষ অখুশী ছিল।

সে তাই একদিন সটান জীবনের বাড়ি চলে গেল। চারদিকে উমেদারদের ভীড়। দরোয়ানরা তো ঢুকতেই দিচ্ছিল না। কিন্তু তার লাল চোখদুটো দেখে ভয় পেয়ে ছেড়েই দিল। জীবনের কাছে গিয়ে সটান বুক ফুলিয়ে সে বল্ল, ব্যাপারটা কী। সামান্য চাহিদাটুকুও কি মিলবে না তোর কাছে? জীবন থতমত খেয়ে বল্ল, সবই তো দিয়েছি তোমাকে। কোথায় তা?
সে বল্ল, ছাই দিয়েছ, কী দিয়েছ শুনি? জীবন বল্ল,
-কেন, কোটিপতি মা-বাবা দিয়েছি।
– না হলেও দিব্যি চলত।
– দামী শিক্ষা, বিদেশী চাকরি, ব্যাঙ্ক ভর্তি টাকা।
– কী দাম এসব ছাঁইপাশের।
-গাড়ী, বাড়ী, আরাম, আয়েশ, ফুর্তি কত কী!
– কে চায় এসব রদ্দি মাল।
– কেন সুন্দরী স্ত্রী, প্রেমিকাও, যশ, কীর্তি কী দিইনি তোমাকে?
– ক্লান্ত, ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি! আর পারছি না। আমার জিভ বিস্বাদ, চোখ ঝাপ্সা, কান বধির, মরে যাচ্ছি, চামড়ায় স্পর্শ উধাও! মরে যাচ্ছি আমি!

জীবনকে এই প্রথমবার চিন্তিত দেখাল। “সবাই তো এইসবই চায়, বাছা। পেলে তারা কত খুশী। তা বাছা, তুমি তাহলে কী চাও বল।”
লোকটা পাগলের মতো চুল ঝাঁকিয়ে বলে ওঠে, “আমার ভাসবার নীলটুকু ফিরিয়ে দাও, আমার ঝুপসি সবুজ ফিরিয়ে দাও, আমার সাদা মুকুট ফিরিয়ে দাও, আমার ঘুম পাড়ানো শিস ফিরিয়ে দাও।”

লোকটা আর পারছে না। হাঁটু মুড়ে বসেছে। মাথা ঝুলে পড়েছে, কশে গ্যাঁজা, চোখ বুজে আসছে। বিড়বিড় করে সে বলে চলেছে, “আমি তো শুধু তোমাকেই চেয়েছিলাম হে, আমাকে আমার জীবন ফিরিয়ে দাও!”

2 Comments

  • arkayan basu

    Reply November 3, 2020 |

    মুগ্ধতা জানাই প্রিয় অণুগল্পকার।

  • Sankar prasad Datta

    Reply November 3, 2020 |

    অসাধারণ লাগলো ,চারিদিকে যে ভাবে আমরা পরিবেশ দূষণ করে চলেছি তার বিরুদ্ধে বলজোরালো প্রতিবাদ

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...