বোড়েকে এগিয়ে দিলাম
সমরজিৎ সিংহ

 
বাবা মা-কে নিয়ে তুলল নিজের বাড়িতে, অথচ অভ্যর্থনা জানাবার ছিল না কেউ। তুলল বটে, কিন্তু কোন ঘরে রাখবে, সেটা আগে ভাবেনি, বলে, মুশকিলে পড়ে গেল। বাড়িটা ছিল অনেকটা ইংরাজি টি অক্ষরের মত, টি-র ঐ লেজ ছিল ড্রয়িং রুম বা লোকজন এলে বসার ঘর। বাকি অংশে একদিকে তিনটে ঘর, আর একদিকে দু’টো ঘর। এর কোনোটাতেই মা’র জায়গা হল না। হবার কথাও নয়, কেন না, সবগুলি ঘর ব্যবহৃত হয়, মানে, রান্নাঘর,খাবার ঘর, ঠাকুর ঘর, বাকি দু’টো শোবার ঘর। সেখানে মা’র স্থান কোথায়?     

চুপচাপ, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মা, আর ঐ বসার ঘরে পায়চারি করছে বাবা। সারা বাড়ি নিথর হয়ে গেছে হঠাৎ, মনে হবে যেন এক মৃত্যুপুরী। আর কারও কোনো শব্দ নেই, না ভেতরে না বাইরে।      তখনই, শোনা গেল, অনি, তোমার আক্কেলজ্ঞান কি এখনও হবে না ? যাকে বৌ বলে নিয়ে এসেছ ঘরে, তার অভ্যর্থনার কোনো বন্দোবস্ত করনি কেন ? কেউ মানুক আর না মানুক, আমার ছেলে যাকে বৌ বলে এনেছে তাকে তো বরণ করা আমার কর্তব্য।      

এই কথা বলতে বলতে যিনি ঘরে এলেন, তিনি আমার ঠাকুরমা, মাধ, বলে, ডাকত লোকে, আসলে তার নাম ছিল মাধবী। বাবার নাম, এতক্ষণে, ঠাকুরমার মুখে শুনলাম, অনি, মানে, অনিরুদ্ধ।      

ঘরে ঢুকে, প্রথমেই, মা’কে টেনে নিলেন বুকে। তারপর, বললেন, বিশাখা, এই পাষণ্ডকে কেন পছন্দ করলে, জানি না, তবে তোমার কপালে দুঃখ আছে। আগে আমার আত্মীয় ছিলে, আজ থেকে তুমি আমার লক্ষ্মী হলে। এস, আমার সঙ্গে।     

বাড়ির পেছনে উঠোন, উঠোন পেরিয়ে, চার চালা এক ঘর, তিন কামরার ঘর এটা। এটাতেই মা’কে নিয়ে গেল ঠাকুরমা। এই ঘর ঠাকুরমার, রান্নাবান্না তিনি নিজেই করেন এই ঘরের একটা কামরায়। পাশের এক কামরায় মা’কে নিয়ে বললেন, এখানেই থাকবে তুমি। খাওয়া-দাওয়া সব আমার সঙ্গে । তুমি রান্না করতে পারবে তো?     

মাথা নেড়ে মা জানাল, হ্যাঁ।      

বেশ । এবার থেকে আমার ছুটি।            

মা’র জীবন যখন টালমাটাল, সামান্য স্থির হতে চলেছে, তার আগে, মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য দেহত্যাগ করেছেন, মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবী হয়েছেন রিজেন্সি কাউন্সিলের প্রধান। ত্রিপুরা অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল ভারতের সঙ্গে। এর ফাঁকে রাজ্যে তিন চারটে ঘটনা ঘটে গেল, যার কোনোটাই জানে না মা। জানবার কথাও নয়।      

১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত এক মহাসংকট কাল ছিল ত্রিপুরার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজদের পক্ষে ছিলেন মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য, না হয়ে উপায় ছিল না তাঁর।  ত্রিপুরার মহারাজা হলেও তিনি ছিলেন চাকলা-রোশনাবাদের জমিদার। এই জমিদারি ত্রিপুরার রাজারা পেয়েছিলেন ইংরেজদের থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানিলাভের পর থেকে সমতল ত্রিপুরার এই অংশ ব্রিটিশের দখলে যায়। সে অনেক কাহিনী। চাকলা রোশনাবাদের জমিদারি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা ভারতে চালু হবার পর ত্রিপুরার মহারাজারা পেয়েছিলেন। এদিক থেকে মহারাজারা অধীন ছিলেন ব্রিটিশের। একদিকে অধীন, অপরদিকে স্বাধীন রাজা, এ এক আশ্চর্য সমাপতন।

চাকলাবাদ-রোশনাবাদ এলাকা কম নয়। ব্রিটিশের হয়ে জমি পরিমাপ করেছিলেন কামিং সাহেব। তার হিসেবে ছিল সাড়ে পাঁচশ বর্গমাইলের একটু বেশি। ব্রিটিশ সরকারকে কর দেওয়া ছাড়া আর সব স্বাধীনতা ছিল মহারাজাদের। প্রজাদের কাছে, ব্রিটিশ নয়, মহারাজা ছিলেন সবকিছু, সাক্ষাৎ ভগবান। মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য, তাদের প্রিয় ছিলেন, কেন না তিনি তাদের উন্নতিকল্পে ভেবেছিলেন অনেক।      

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈন্য পাঠাতে হয়েছিল মহারাজাকে। এই সৈন্য পাঠাতে গিয়ে শুরু হল বিপত্তি, প্রজাদের মধ্যে রিয়াংরা বিদ্রোহ করল, তারা যেতে চাইল না যুদ্ধে। তাদের নেতা ছিলেন রতনমনি রিয়াং।      

এটা একটা দিক। যেদিকটা খুব কম বলা হয়েছে, তা হল, এই সময় দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিল বাংলা, যার প্রভাব এসে পড়েছিল ত্রিপুরাতেও। রতনমনির ছিল এক সংগঠন, যা মূলত ছিল ধর্মসাধনার। আশ্রম ছিল অমরপুরে। এই সংগঠনের মাধ্যমে রতনমনি দুর্ভিক্ষপীড়িত রিয়াং জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সরবরাহ থেকে শুরু করে সব রকমের সহায়তা দিতেন। এতে তার শিষ্যসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।     

এই রিয়াং সম্প্রদায়, বলা হয়, ত্রিপুরার প্রাচীন আদিবাসী। ঠিক কোথা থেকে রিয়াংরা ত্রিপুরায় এসেছিল, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এরা ছিল প্রাচীনতম ত্রিপুরার অধিবাসী। অধিকাংশ রিয়াং বৈষ্ণব হলেও খাদ্যরীতি ছিল আদিমতর। শুয়োর পালন ও তার মাংস ছিল প্রধান খাদ্য। মানে, জুম ক্ষেত থেকে আসত চাল, কুমড়ো, কাপাস, তিল, তিসি, ইত্যাদি ফসল । চাল মানে ভাত খেত তারা। সবজি প্রায় সেদ্ধ । আর, ছিল চুয়াক। চুয়াক ভাতের তৈরি মদ, নিজেরাই বানায়। 

জুমচাষ করত, বলে, এক স্থানে তারা থাকত না। জুম আদিম চাষপ্রথা। পাহাড়ের একটা জায়গা আগে ঠিক করে নিত তারা। তারও পদ্ধতি রয়েছে। স্থান নির্বাচনের পর, পূজা দিয়ে, শুরু হত চাষের প্রথম ধাপ, সে হল, ঐ জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া। বসন্তের শুরুতেই এই আগুন ধরিয়ে দিতে হয় । তখন মনে হয়, পলাশবন লাল হয়ে আছে। আসলে আগুনের দাউ দাউ শিখা। গাছপালা সব পুড়ে যেত। তারপর, প্রথম বৃষ্টি যখন নামবে, বৈশাখের শুরুতে, ছাই ভিজে মিশে যাবে মাটির সঙ্গে । এটা ফসলের জন্য জরুরি।

ছাই মিশে গেলে, ওরা তখন সেই স্থানে যায়, বীজধান, এবং নানান ফসলের বীজ নিয়ে। এবার, একদিকে মাটি কুপিয়ে, সেখানে সব বীজ এক সঙ্গে পুঁতে দিয়ে, পুনরায়, মাটি কোপায়, বীজ পুঁতে দেয় । এভাবে সারা পাহাড়। 

এই সরল জাতির কাছে রতনমনি হয়ে উঠলেন সাক্ষাৎ ভগবান। সবাই তার কাছে যায়, তার কথা শোনে। তাদের সুখদুঃখের কথাও বলে। 

রতনমনি সব শোনেন। তিনি জেনেছেন, প্রজাবিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে রাজ্যে।


শ্বাশুড়ীর আদরে মা’র নতুন জীবন শুরু হল বটে, কিন্তু কোথাও যেন তাল কেটে গেছে তার। তবু মানিয়ে নিতে হয় তাকে। বড় ঘরে স্থান নেই, খুব একটা কথা বলে না কেউ। দেওর একজন, নির্মল, মূলত চাষবাস পেশা। একদিন, বলল, তোমার এখানে খুব কষ্ট হচ্ছে, বৌদি ? মুখে না বললেও বুঝতে পারি গো । রাজরাণী ছিলে, এসে পড়লে এখানে। আমরাও কিছু বলতে পারি না দাদার মুখের উপর।

বিশাখা হাসল। সেই হাসি ম্লান। বলল, সব জেনেই এখানে এসেছি। এর বেশি কিছু পাবার আশাও করিনি। শুধু একটাই ভয়, যদি এই আশ্রয় ভেঙে যায় কোনোদিন, কোথায় দাঁড়াব আমি ?

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে বিশাখার দিকে। বিধবা হবার আগে দেখেছে সে, রাজরাণীর মত রাজপাট করেছে বিশাখা। গ্রামের সবচেয়ে ধনবান বাড়ির বৌ, কোনোদিন দেমাক দেখায়নি, না আচরণে না ব্যবহারে। সকলেই প্রশংসা করত বিশাখা। গ্রামের রূপসীতমা, একটুও অহঙ্কার ছিল না সে জন্য। এখন এক দোচালা ঘরে, প্রায় অন্ধকূপ, কাটাচ্ছে দিন। 

তবুও বলল, কোনো অসুবিধা হলে, আমাকে বল, বৌদি। আমি তোমার পাশে থাকব।

বিশাখার চোখে কি জল এল ? এই আশ্বাস যার কাছে থেকে পাবার কথা, সে এখন প্রায় অচেনা হয়ে যাচ্ছে, এই ক’দিনের তফাতে।

সেই রাতে, অনিরুদ্ধ এল তার কাছে। শ্বাশুড়ির সঙ্গে থাকলেও পার্টিশন দিয়ে তিনটি ঘর আলাদা করা ছিল, একটি রান্নার, বাকি দু’টিতে বিশাখা ও তার শ্বাশুড়ি। বলল, রুই একটা এনেছি, রান্না কর, আজ আমি তোমাদের সাথে খাব। রাতেও থাকব এখানে, তোমার সঙ্গে ।

বুকের ভেতর থেকে হূ হূ করে কান্না এল বিশাখার, কোনোরকমে তা চাপা দিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে। অনিরুদ্ধের সঙ্গে চলে আসার পর, এই প্রথম রাত, সে থাকবে বরের সাথে।

1 Comment

  • যুগান্তর মিত্র

    Reply November 3, 2020 |

    ভালো লাগছে পড়তে সমরজিৎদা।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...