আরশিনগর
হিন্দোল ভট্টাচার্য

লালনের মধ্যে যে অন্য কেউ প্রবেশ করেছে, এ বিষয়ে লালনের কোনও সন্দেহ না থাকলেও, তার আশেপাশের মানুষদের তা যথেষ্ট পরিমাণে থাকায়, ক্রমাগত অবিশ্বাসের পারদ তাকে নিয়ে বাড়তে থাকে এবং সাধারণ মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই বলা যায়, তাকে পাগল হিসেবে চিহ্নিত করাটা হয়ে যায় সহজ। ফলে, কিছুদিন গোবরা মানসিক হাসপাতালে কাটাবার পরে, লালন এটুকু বুঝতে পারে, নীরবতাই একমাত্র রাস্তা এবং তার আর কাউকে কিছু প্রমাণ করার দায় নেই। এ হেন পবিত্র অনুভূতিমালা তার মনের ভিতরে আসার স্বাভাবিক কারণেই লালন ক্রমশ গোবরা হাসপাতালে থাকার অনুপযুক্ত হিসেবে সার্টিফিকেট পেয়ে যাওয়ায় কলকাতার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে আর কোনও বাধা থাকে না।

লালন সম্পর্কে এটুকুই আমি জানি। আমার সম্পর্কে বলতে হয় তবে কিছুটা। ঘটনাচক্রে যেহেতু আমি গল্পটা বলছি আপনাদের, আর প্রতি মুহূর্তে এটা যে গল্প নয়, তা দাগিয়ে দেওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও, সৌজন্যহেতু তা আপনারা করবেন না, তাই, বলি, কাকতালীয় হলেও, মেনে নিতে হবে, যে আমার নামও লালন। আমি এক সামান্য লেখক। কিন্তু আদতে ভবঘুরে। লালনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় গাঁজা কিনতে গিয়ে। মার্কাস স্কোয়ারে গলতার মধ্যে সেই বুড়ো রহস্যময় লোকটা, গাঁজা বিক্রি করার সময়ে যার চোখে ফুটে উঠত এক আশ্চর্য করুণা, যাকে আমার স্বয়ং গৌতম বুদ্ধর এক অবতার বলে মনে হত, যিনি গাঁজার প্য্যাকেট এমন ভাবেই দিতেন, যেন বিভূতি দিচ্ছেন, তিনি এক সময়ে আমাদের দুজনকে দেখে বলে উঠেছিলেন, ‘ এক নামের দুই গাঁজাখোর একসঙ্গে আজ। দিনটা ভাল যাবে।’ সেদিন থেকেই লালন বসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ও সেদিনই জানতে পেরেছিলাম লালনের দুই প্রেমিকার একজন থাকে হাড়কাটায় এবং আরেকজন কোথায় থাকে তা না জানতে পারলেও, তাকে মাঝেমাঝে পাওয়া যায় কলকাতার বিভিন্ন আধা অন্ধকার গলির মধ্যে। সে সবসময়ই কোথাও না কোথাও যায় একটু রাত্রি হলেই। কলকাতা শহরের রহস্যময় কুয়াশা থেকে উঠে এসে রহস্যময় কুয়াশার মধ্যেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েদের মধ্যে সেও হয়তো একজন।

লালনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব জমে উঠতে দেরি হয় না। ক্রমে গাঁজা থেকে বাংলা এবং যৌনতা থেকে সাহিত্য, সব বিষয়ের মধ্যেই গড়িয়ে যায় এই বন্ধুত্ব। কিন্তু যেটা আমি কোনওদিন বুঝে উঠতে পারতাম না, তা হল, লালনের সঙ্গে যখন আমার দেখা হত, মনে হত, অন্য কেউ একজন আছে সঙ্গে। এই কথাটি অবশ্য সে আমাকেও বলতে ভুল করত না। যদিও আমি বুঝতাম না আমার সঙ্গে কে আছে। হয়তো সেও বুঝত না, তার সঙ্গে কে আছে।

ক্রমশ বুঝতে পারলাম সে আমার মতো কম প্রতিভাবান নয়। অতি কম বয়সে সে অধ্যাপক হয়ে যায়। যদিও ক্রমশ প্রতিভাবানদের নিয়মানুযায়ী তার মধ্যে জন্ম নিতে থাকে এক আত্মধ্বংসী ব্যাপার। শুধু গাঁজাই নয়, সবরকম নেশার মধ্যে সে ডুব দেয়। ক্রমশ লালন, আমার থেকে অনেক দূরেই চলে যায়। তার প্রেমিকাদের সঙ্গে সময় কাটাতে থাকি আমি। আর জানতে পারি, সে, তাদের কাছেও আসা ছেড়ে দিয়েছে।

হয়তো আর যোগাযোগও হত না, যদি কয়েক মাস আগে তার কাছ থেকে একটি টেলিফোন পেতাম।

– আমি লালন।

– আরে, অনেকদিন পর। তোর তো কোনও খবর নেই।

-আমি… আমি…আচ্ছা… তুই সত্যিই বুঝতে পারতিস…

– কী বল তো

– মানে, অন্য কেউ একজন আছে…

– আমি ঠিক জানি না, মানে কেন জিজ্ঞেস করছিস?

– তুই পিঙ্কির সঙ্গে শুচ্ছিস?

– হ্যাঁ।

– রোজির সঙ্গেও?

– সরি, তোর খারাপ লাগছে…

– আরে দূর! খারাপ লাগছে না। কিন্তু তুই আমাকে বল… সত্যিই অন্য কেউ আছে কী করে বুঝতিস?আমার মনে হত, আমি একটা ভ্যাপসা গন্ধ পেতাম।

ভ্যাপসা গন্ধ?

অনেকদিন ধরে কোনও বাড়ি বন্ধ রেখে তার পর দরজা খুললে যেমন একটা গন্ধ পাওয়া যায়, তেমন

আমার গায়ে, তেমন একটা গন্ধ?

মনে হত ওটা তোর গায়ের গন্ধ নয়।

না, ঠিক। আমার গায়ের গন্ধ নয়। ওটা অন্য কেউ। আমি তোকে একটা কথা বলব। কিন্তু তা ফোনে না।

বল না।

না, আমায় লক্ষ্য করছে। ওরা নজর রাখছে।

কারা?

একজন বা অনেকে, জানি না, কিন্তু লক্ষ্য রাখছে।

এই নম্বরটা তোর তো?

– হ্যাঁ, কিন্তু পারলে নিজের নম্বরটাও পালটে নে।

ফোন কেটে গেল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কিন্তু এর পরে দীর্ঘদিন ধরে লালনের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ হয়নি। কারণ ওর ওই নম্বরে ফোন করে আনঅ্যাভেলেবল ছাড়া কিছুই পাইনি। এই কিছুক্ষণের কথাকে কেমন রূপকথা মনে হত।

বাবুদার চায়ের দোকানে সারাদিন পড়েই থাকে লালন। কে বলবে অর্থনীতিতে স্বর্ণপদক পাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বাড়িতে বাবা-মা-ভাই-ভায়ের বউ- প্রায় কারো সঙ্গেই তার কোনও কথা নেই। শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকালেই প্রবল এক অস্বস্তির মধ্যে পড়ে লালন। কেন যে এই অস্বস্তি, তার হদিশ না পেলেও এটুকু বুঝতে পারে, মায়ের মুখের মধ্যে যে কান্না থমথম করছে, তা লালনের বুকের মধ্যেও কোথাও বেজে ওঠে। মা, পৃথিবীর একমাত্র ঈশ্বর। কোন সে মৃত্যুর মধ্যে হয়তো লালন তলিয়ে গিয়েছিল একদিন। আবার মহাজগতের আশ্চর্য ঘূর্ণনের মধ্য দিয়ে অন্ধকার ডিঙোতে ডিঙোতে স্বয়ং ঈশ্বরী তাকে জন্ম দিয়েছেন ফের। লালন জন্মান্তুরবাদে বিশ্বাস করে। মৃত্যু কোনওমতে শেষ কথা হতে পারে না। এই দুঃখ, এরও কোনও অর্থ আছে। এই নিজের জীবন কাঁধে করে বয়ে যাওয়ার কোনও অর্থ আছে। আর যদি অর্থ না থাকে, তাহলে সবকিছুই আলগা, বাই চান্স, আর কিছু নয়।

মা আগে লালনের সামনে বসে বসেই কাঁদত।

এখন মা আর কাঁদে না।

লালনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

লালন এই তাকিয়ে থাকার অর্থ বোঝে না। শুধু তখন লালনের ঘরের ভিতরে একটা ছায়া ঘুরে বেড়ায়।

লালন যখন প্রথম এই ছায়াটিকে দেখেছিল, ভয়ে চমকে উঠেছিল। তার পর ভেবেছিল হয়তো গাঁজার ফল। কিন্তু একদিন সেই ছায়াটি এগিয়ে এসে লালনের সামনে রাখা চেয়ারে এসে বসল। লালন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, ছায়াটি চেয়ারে এসে গা এলিয়ে দিল। হাঁটুর উপর আরেকটা পা তুলে দিল। যেন নীরিক্ষণ করছে লালনকে।

লালন সেদিন ভয়ে কথাই বলতে পারছিল না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সে একটি বিষয়ে খুব ভাল করে জানে। পৃথিবীতে সমস্ত মুহূর্তই আকস্মিক এবং সব ঘটনাই অপ্রত্যাশিত। তাই, যখন সে ছায়াটি সম্পর্কে কিছুই জানে না, তখন তাকেই কথা বলতে দেওয়া উচিত ভেবে সেও শুধুই অপেক্ষা করে থাকে সেদিন। আশ্চর্যের বিষয় হল এই, যে, ছায়াটিও আর কিছুই বলে না। যেন সে চেয়ারে বসে লালনকে দেখার জন্যই এসেছে।

অবশ্য এর পর থেকে শুধু ঘরের মধ্যেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ থাকে না।

লালনের সঙ্গে সেই ছায়াটা ঘুরে বেড়ায় বাজারে, কলেজে, ক্লাসে, বইয়ের দোকানে, এমনকী বাথরুমেও।

– তুমি কেন আমাকে ফলো করছ? কী বলতে চাও? বলে ফেলো।

লালন অনুনয় বিনয় করলেও কোনও উত্তর আসেনি। লালনের কোনও ক্ষতিও হয়নি। কিন্তু লালন যে এই সকলের মধ্যে ছায়াটিকে দেখতে পায়, তা আস্তে আস্তে সকলের মধ্যেই জানাজানি হয়ে যায়।

গোবরায় তাকে রোজ নিয়ম করে দেখতে আসত ছায়াটি।

রাতে, তার পাশেই শুয়ে থাকত।

ছায়াটির গায়ে এক স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ টের পেত লালন।

ক্রমশ যে ছায়াটি ছিল তার অস্বস্তির কারণ, সেই তার কাছে নিরাপদ এক বন্ধুর মতো হয়ে যায়। অন্তত, একটা বিষয় সম্পর্কে লালন নিশ্চিত ছিল গোবরা থেকে বেরোনোর পর। ছায়াটিকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তখনই মনে পড়ে যায় তার লালন দাসের কথা। ও একদিন বলেছিল, ‘তুই যখন আসিস, মনে হয়, তোর সঙ্গে আরও একজন এসেছে।’ ও কি তবে দেখতে পেত ছায়াটিকে?

কিন্তু আর তো কেউ দেখতে পায় না।

যে ছায়াটির ভ্যাপসা গন্ধ আমি পেতাম, তাকে প্রথমে কিছুতেই দেখতে পায়নি লালন। কিন্তু আমি দেখতে না পেলেও টের পেতাম। ধরুন, কেউ যদি একটা ডিওডোরান্ট মেখে ঘুরে বেড়ায়, তাহলে সেই গন্ধ যেমন সে যেখানে যায়, সেখানেই ছড়িয়ে পড়ে, ব্যাপারটা অনেকটা তেমন। এর থেকে মনে হতে পারে, আমার হয়তো বলার মতো তেমন কোনও গল্প নেই। সেক্ষেত্রে আমি বলব, বানানোর মতো তেমন কিছু গল্প নেই। বিশেষ করে কোনও ঘটনা যদি না ঘটে, যদি কিছু ভেবেই থাকি, তাহলেই বা তা গল্প হবে না কেন? তবে, জানাই, লালনকে আমি যেদিন থেকে গন্ধটার কথা বললাম, আমাকেও যেন কোনও একটা গন্ধ তাড়া করে বেড়াতে শুরু করল। একটা হাল্কা মিঠে গন্ধ। যেন বা কোথাও কোনও ফুল ফুটেছে। কেন এই গন্ধ পাচ্ছি, তা আমি জানি না। লালন যেদিন আমার বাড়ি এল, সেদিনও আমি তেমন গন্ধই পাচ্ছিলাম।

তবে, লালন আসার পরে আর নয়।

আবার একটা অন্য নম্বর থেকে ফোন করে লালন আমার বাড়ি এল। আমাদের উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ি। পুরনো ইঁট বার করা। বাবা মারা গেছেন। একতলায় মা বোন আর জ্যাঠা জেঠিমারা থাকেন। উপরের তলাটা কেবল আমার। বারান্দা আর আমার ঘর শুধুই। তো, যেদিন লালন এল, সেদিন আর অন্য কেউ কিছুই লক্ষ্য করেনি। শুধু লালন আসার পরেই বলল, ‘ ঘরে কেউ আছে?’

– না, তুই চা খাবি?’

– না না, শুধু জল খাব। একটু কথা আছে। খুব তাড়ায় আছি।

– কীসের তাড়া?

( আমতা আমতা করে বলল) তুই তো আমাকে জানিস, আমি আসলে অপেক্ষা করে থাকি। কিছু একটা ঘটবে। আর সে তো ঘটবেই। কিছু না চাইলেও কিছু একটা ঘটেই। তা সে যতই ন্যাচরাল কিছু হোক বা আনন্যাচরাল।

– হুম। কিন্তু তুই ফোনে…

– তুই কি এখনও ওই গন্ধটা পাচ্ছিস?

আমি চুপ করে রইলাম। সত্যিই, আমি কোনও গন্ধ পাচ্ছিলাম না।আমি কিন্তু কোনও গন্ধ পাচ্ছি না।

– না পাওয়ার তো কথা না।

– কেন?

– কারণ তিনি এখানেই আছেন।

– কোথায়?

– আরে সেটাই তো বলতে এসেছি।

– লালন, তুই ভুলভাল বকছিস।

– দ্যাখ লালন, তুইও অন্যদের মতো করে কথা বলিস না। আমিও প্রথমে ভয় পাচ্ছিলাম।

কিন্তু আর ভয় পাই না আমি।

– কেন ভয় পাস না, কী বলতে চাইছিস, কিছুই বুঝছি না।

( লালন এগিয়ে এসে আমার কানে ফিসফিস করে বলল) কারণ সে আমাকে ছেড়ে কোনওদিন যাবে না কোথাও। আমাকে ছাড়া তারও আর অন্য কোথাও যাওয়ার নেই।

– এখন আছে? এখানেই?

– কেন বল তো, মেরুদণ্ড দিয়ে শিরশির করে কিছু নেমে গেল? এমনটা হয়। আচমকা যদি তেমন কিছু দেখতে পায় কেউ্‌, যা তার দেখার কথা নয়।

– যে কেউ শুনলে এটাকে ভূতের গল্প ভাবতে পারে।

– কী ভাবে কে ভাববে তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। আমি কিন্তু একটা কড়া মিঠে গন্ধ পাচ্ছি।

– কড়া মিঠে গন্ধ?

ঘরের ভিতরটা যেমন, তেমনই রয়েছে। নতুন কেউ আছে বলে বুঝতে পারছিলাম না। এমন সব অলৌকিক কাণ্ডে আমি কখনও বিশ্বাস করিনি। কিন্তু মাঝেমাঝে আমি গন্ধ পাই। আর অনুভব করি যা দেখছি, সেটাই শেষ কথা নয়। আরও ভিতরে ঢুকে দেখতে হবে। এই যেমন, অন্য কেউ যে নেই আমার এই দোতলার ঘরে, তা ঠিক নয়। কারণ অন্য কেউ তো ছিল। একটা সময় ছিল, এখন নেই। কিন্তু সেই সময়টাও তো সম্পূর্ণভাবে চলে যায়নি।

– আমি বুঝতে পারছি লালন, তোর সঙ্গে থাকা ভদ্রলোক এখানে এসেছেন। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি না। তিনি হয়তো আমাকে দেখা দিতে চান না।

– না না তা নয়, তিনি দেখা দিতে পারেন না।

– পারেন না কেন?

– কারণ আমিই সে।

– লালন, এটা বাড়াবাড়ি হচ্ছে। তুই যদি সে হোস, তাহলে তুই আর সে আলাদা কী করে? কী করে তুই তাকে দেখতে পাস তোর থেকে বেরিয়ে এসে সামনে চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে?

– তা তো জানি না।

মুচকি মুচকি হাসতে লাগল লালন।

– আমি কাউকে কখনও দেখিনি, কিন্তু স্পষ্ট অনুভব করতাম তোর সঙ্গে কেউ একজন আছে।

– ঠিক অনুভব করতিস, আমি কোথাও একলা নই। সে আছে। আমি যখন মায়ের পেটে ভ্রুণ, তখন থেকেই সে আমায় দেখছে। আলাদা। কিন্তু আমার মধ্যে। আমাকে লক্ষ্য রাখছে বাবু। আর তার পর আমার জন্মানো বড় হওয়া ইত্যাদি হেন তেন সব। আবার যখন মৃত্যু আসবে আমার কাছে, তখনও সে আমাকে লক্ষ্য করবে। যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় আমি কুঁকড়ে যাব, তখনও। যখন তলিয়ে যাব এক দীর্ঘস্থায়ী বিস্মৃতির মধ্যে এই কাঠের চেয়ারের হাতলটার মতো, তখনও।

– অথচ সে মরবে না?

– এটা সম্পর্কে আমি জানি না। সেও কি মরে যায়? সেও কি আমার মতোই তখন বাঁচতে চাইবে? সেও কি একবিন্দু হাওয়ার জন্য বা এই পৃথিবীটাকে আর একটিবার দেখার জন্য কাতর হয়ে উঠবে?

– সে সম্পর্কে হয়তো কোনওদিনই কেউ জানতে পারে না।

– পারে।

– কী করে?

– তুই তো তার গন্ধ পাস। এখন পাচ্ছিস না কেন বল তো?

– কেন?

– ভাল করে ভেবে দ্যাখ, আমার সঙ্গে যতদিন দেখা হত, তুই টের পেতিস তাকে, কিন্তু আজ টের পাচ্ছিস না। কারণ কী?

– আমি বুঝতে পারছি না লালন।

– কারণ তখন সে তোকে অনুভব করতে দিতে চাইত, তাই। এখন সে অনুভব করতে দিতে চায় না। নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে। মুখোস পরার মতো।

– সে, মানে তুইই নিজেকে তবে লুকিয়ে ফেলেছিস?

– হ্যাঁ।

– কিন্তু কেন?

– কারণ তুই কোনওদিন নিজের মুখোসটা আমার কাছে খুলিসনি। আমার বান্ধবীদের প্রতি তুই আকৃষ্ট ছিলি, আরে, লজ্জা পেতে হবে না, আমার এতে কিছু এসে যায় না, কিন্তু কথা হল, সেটা তুই আমার কাছে কখনও খোলসা করে বলিসনি। বরং, আমার সামনে অনাগ্রহ দেখিয়েছিস। আর মরালিটির কথা বলেছিস।

– ভেবেছিলাম, তুই আঘাত পাবি।

– কিন্তু পরে যখন শুনেছি, তখন ওদের জন্য না, তোর জন্য আমি বেশি কষ্ট পেয়েছি। তুই আমাকে কেন বলিসনি, তার জন্য। আমাদের মধ্যে তো এমন বন্ধুত্ব ছিল না লালন।

– লালন, সব বিষয়ে কাছের বন্ধুকেও বলা যায় না। এ কথা তো মানতে হবে, আমরা আলাদা। আমরা সবাই আলাদা।

– আলাদা। একদম। আর একা। হ্যাঁ, মানতেই হবে। আই এগ্রি উইথ ইউ। আমাদের কোনও অতীত নেই, কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আমাদের কোনও পরিবার নেই, ইতিহাস নেই। আমরা আচমকা এসেছি। আচমকা হাঁটছি। আচমকা চলে যাব। ফুড়ুৎ। এটাই হল আমাদের ধর্ম। এটা ছাড়া আর অন্য কোনও ধর্ম নেই।

– লালন, আমরা আসলে নিজেরাই নিজেদের কাছে খুব অন্ধকার। আমরা নিজেরাও নিজেদের মধ্যের সেই অন্ধকার দিকগুলো জানি না।

– আলোর দিকগুলোও জানি না। মৃত্যুর মতোই সব আচমকা আসে। হরিণ বাঘ হয়ে যায়, বাঘ হরিণ। কিন্তু এটাই যদি ভবিতব্য, তাহলে কেন মুখোস পরে থাকব? একটাই তো জীবন। সালা জীবনের নব্বই শতাংশ মুখোস পরে কাটিয়ে দেব? আমি যদি বানচোদ হই, তাহলে আমার চারপাশের লোকজন কেন ভাববে আমি স্বামী ইন্দ্রিয়ানন্দ?

এইবার একটু ভয় করতে শুরু করল আমার।

লালন কি প্রতিশোধ নিতে এসেছে? ওর এমন ঠান্ডা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার শক্তি খুঁজে পাচ্ছিলাম না আর।

– লালন, আই অ্যাম সরি।

– আবার সরি! কেন? তুই তো তোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই কাজ করেছিস। আর সবচেয়ে বড় কথা, তোর ঘরের ভিতরে যে তুই, সে-ই করেছে সব।

– মানে?

– মানে, আমার আসল যুদ্ধ তো তার সঙ্গে।

– যুদ্ধ?

– এই যে কথাগুলো বলছি, কাকে বলছি?

– কাকে?

– তাকে।

– কিন্তু সে কেন এমন হবে?

– আরে, সে এমন নয়। সে, এমন কখনও হতে পারে না। কারণ সে, আর আমার সে-এর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। তবু তারা আলাদা।

– লালন, আমার মনে হয়, আমরা আর বন্ধু নেই?

লালন হো হো করে হেসে উঠল। এই হাসিটা ঠিক লালনের আগের হাসির মতো ছিল না। বাইরের দিকে তাকালাম। একটা অদ্ভুত আলো । এই আলোটাকে আমি বিশ্বাস করি না। বৃষ্টির ভিতর দিয়ে রোদের যে আলো তেমন। কেন বিশ্বাস করি না, তা বুঝতে পারি না। কিন্তু মনে হয়, এই আলোয় সবকিছুই সন্দেহজনক। লালন ঠিক কী করতে চাইছে আমার সঙ্গে? লালন কি আমার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে? কিন্তু কীভাবে প্রতিশোধ নেবে? চমকের মধ্যে একটা বিষয় মাথায় আসা মাত্র আমি ঘুরে ওর দিকে তাকালাম।

লালন হাসছে।

লালনেরা একে অপরের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতেই তাকিয়ে থাকবে চিরদিন, এই হয়তো মানবসভ্যতার ভবিতব্য। কিন্তু সেই ভবিতব্য সম্পর্কে দুঃখিত মানুষজনও এই সন্দেহ থেকে বেরিয়ে আসার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা করবে না, এটাও হয়তো আরেকটি ভবিতব্য। এরই মধ্যে প্রবেশ করে গেছি আমি, যাকে নিয়ে দুই লালনেরই কোনও মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু এটুকু বোঝা উচিত ছিল, আমি না চাইলে কিছুই হবে না। অর্থাৎ, এই পুতুলখেলার আসল সুতো আমার হাতেই। এই যে আমি দলিত মানুষের জীবন বা গরিব মানুষের দুঃখকষ্ট নিয়ে কোনও গল্প লিখলাম না, বা আমি লিখলাম না কোনও সদ্য প্রেমের অশরীরী প্রেমালাপ, এ নিয়েও আমার আসলে কোনও দুঃখ নেই।কারণ আর কিছুই নয়, আমি তাদের সম্পর্কে জানি না। তাদের সম্পর্কে তারাই জানেন। আমি তাদের বাইরে থেকে জানতে পারি বটে, কিন্তু মনের ভিতরে ঢুকতেই পারি না। কী করে আর ঢুকব! এই না পারা নিয়ে গল্প লেখাও আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তাহলে কি আদতেই একটি ভূতের গল্প লেখা বা একটি রূপকথা লেখা আমার উচিত ছিল? অবশ্য আপনারা তো বুঝতেই পারছেন না, আমি কে? আমি কেবলমাত্রই একজন আগন্তুক। শুধু এটুকু জানি, আমাদের প্রতিটি মুহূর্তই আসলে গল্প। আবার প্রতিটি গল্প মুহূর্ত নয়।

লালনকে হাসতে দেখে আমাদের আরেক লালন এগিয়ে গেল লালনের দিকে। লালন বসু একটু থমকে গেল।

– তুই কি আমাকে খুন করতে এসেছিস?

– তোকে খুন করা কি আমার সাধ্যের মধ্যে আছে? আমি তোর শরীরটাকে খুন করতে পারি। কিন্তু তাকে মেরে লাভ কী?

– তাহলে তুই এসেছিস কেন?

– আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে দেখতে পাবি। কিন্তু পেলি না। মানে, এখনও তুই মুখোস পরে আছিস। আমি তোকে দেখব ভেবেছিলাম। কিন্তু দেখতে পেলাম না ওই কারণেই।

– তাহলে তো চুকেই গেল। আমিও তোকে দেখতে পেলাম না, তুইও আমাকে দেখতে পেলি না।

– কিন্তু আমি যে তোকে দেখতে চাই।

– মানে?

– মানে, তোর মুখোসটা খোল। আমি তোকে দেখতে চাই।

এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার নিশ্চয় কিছু একটা করা উচিত ছিল, কিন্তু আমি কিছুই করিনি। আমার কিছু না করাকেও আপনারা কিছু করা বলে ভাবতেই পারেন। অনেক সময় নির্লিপ্ত থাকার মধ্যে দিয়েই অনেক কিছুই করা সম্ভব। আর বিশেষ করে, যখন প্রশ্নটি তথাকথিত অস্বাভাবিক একটি ঘটনা সম্পর্কে হয়।

লালন দাস, লালন বসুর এই কথাটি শুনে আর স্থির থাকতে পারল না।

কারণ সে অনুভব করছিল তার ঘরের মধ্যে একটা বাঘ ঢুকে পড়েছে। বাঘের গায়ের একটা বোঁটকা গন্ধ সে টের পাচ্ছিল। লালন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন লক্ষ্য করছে লালনকে। কিন্তু মুখে হাসি। যেন এক নির্বিকার শিকারী শিকারের দিকে তাকিয়ে আছে। লালনের মধ্যে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। লালনকে যদি আটকানো না যায়, তবে, লালনই লালনকে খুন করবে।

– আমি শেষবারের মতো বলছি লালন, তুই আমার উপর প্রতিশোধ নিতে আসিস না। কথার মারপ্যাঁচে অনেকক্ষণ হল না কি?

– হাহাহাহা আস্তে আস্তে বেরোচ্ছে…

– লালন, তুই কিন্তু সত্যিই আমাকে চিনিস না…

– আমি তো এ কথাই তোকে বলতে চেয়েছি লালন, আমি তোকে চিনি না। তুই মুখোস পরে আছিস, আর তাই তুইও দেখতে পাচ্ছিস না আমাকে।

– চুপ! চুপ! একেবারে চুপ। আমি তোকে বিশ্বাস করি না। তুই পাগল, তুই শয়তান।

– আমি কিচ্ছু নই। আমি কেউ নই লালন। তুই আমাকে যতক্ষণ না দেখতে পাচ্ছিস, আমি কেউ নই। এমনকী তুই যতক্ষণ না তোকেও দেখতে পাচ্ছিস, তুইও কিছু নোস…

লালন উঠে দাঁড়াল। আর উঠে ঘরের একপাশে গিয়ে আয়নার সামনে চলে গেল। লালন দাস ওর পিছন পিছন হালকা পায়ে হেঁটে গেল।

– এই দ্যাখ, লালন্, আমি তাকিয়ে আছি আয়নার দিকে। দ্যাখ, দ্যাখ। অত অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার কিছু নেই। দ্যাখ। এই আমি দেখছি আমাকে। আমাকে কি আদৌ দেখতে পাচ্ছি বলে তোর মনে হয়? হু অ্যাম আই? এই প্রতিবিম্ব? না কি ওই ছায়াটা…তুই … তুই নিজেকে দেখতে পাস তোর আয়নায়? লালন, এগিয়ে আসছিস কেন ওভাবে?

লালনের অজ্ঞাতেই টেবিলের পাশে রাখা ফল কাটারন ছুরি হাতে নিয়ে নিয়েছে লালন দাস। লালন বসু জানতেই পারেনি।

লালনের রক্তাক্ত মৃতদেহ যে এভাবে আমারই সামনে, আমার ঘরের ভিতর পড়ে থাকবে কখনও, তা ভাবতেই পারিনি।

প্রথমে এই ঘটনার পর বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম।

একটা ভ্যাপসা কটূ গন্ধ টের পাচ্ছিলাম চারিদিকে।

তবে কি এই মরে কাঠ হয়ে পড়ে থাকা লালন বসুর ভিতরে থাকা সেই লোকটা বেরিয়ে এসেছে?

আমি আমার জামাকাপড় গুছিয়ে নিলাম। টাকাপয়সা নিয়ে নিলাম। কেউ বোঝার আগে এটিএম থেকে টাকাপয়সা তুলে নিতে হবে।

কিন্তু এই মৃতদেহটিকে নিয়ে কী করব?

আমি খুনি হয়ে গেলাম এটা ভাবতেই পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে আমাকে কেউ লক্ষ্য করছে।

আমার দিকে নজর রাখছে কেউ।

বারবার মনে হচ্ছে, আমাকে সে ছাড়বে না।

লালন, লালন বলে কতবার ডাকলাম, সে সামনে এলো না।

তার নাম আমি জানি না। কিন্তু লালনের কথামতো সে যদি লালনই হয়, তবে, তার আমার পিছু নেওয়া উচিত। আরও ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নেওয়া উচিত। সে কি আমার পিছনেই আছে? পাশে আছে? সে কি ঘরের দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে? এখুনি জানলা দিয়ে মুখ বাড়াবে? সে কি আয়নার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসবে? রাত্রিবেলা অন্ধকার হলেই আমার গলা টিপে ধরবে? যদি সে ছায়াই হয়, তবে তো অন্ধকার মানে সে ছাড়া আর কেউ নেই।

আমার তার হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই।

সন্ধে হয়ে আসছে।

ছায়া ঘনিয়ে আসছে ঘরের মধ্যে। ভ্যাপসা গন্ধটা ক্রমশই বাড়ছে।

শরীরটা ঝিমঝিম করতে লাগল লালনের। আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল লালন। ওদিকে মেঝের উপর পড়ে আছে লালন বসু। মুখটা কেমন যন্ত্রণা এবং দুঃখে কুঁকড়ে আছে। এমনই কি হয়? খুন হওয়ার সময়ে মানুষ অপমানে বেশি মরে? খুন হয়ে যাওয়া এমন এক ধরনের হেরে যাওয়া, যার পরে আর ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় নেই। এমন এক ধরনের অপমান, যার পরে আর মাথা তোলার উপায় নেই।

লালনের মুখে সেই ছায়া থমথম করছে।

খুট করে একটা শব্দে বিছানা থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল লালন দাস। যেন লালন অপেক্ষাই করছিল কিছু একটার।

সে এসেছে তাহলে।

একটা হালকা ছায়া বিছানার উল্টোদিকে রাখা চেয়ারে এসে বসল।

– জানতাম, আপনি আসবেন। আপনি বলব না তুই? লালন, আমি এটা ঠিক করলাম না রে। নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমার ভিতরে যে এমন একজন কেউ আছে, আমি ভাবতে পারিনি। তুই যে শাস্তি আমায় দিতে চাস, দে। আমি…অপেক্ষা করছি।

ছায়াটি লালনের সামনে এসে দাঁড়াল।

– কী রে কিছু বলবি না?

ছায়াটি কিছুই বলল না। কিন্তু ক্রমশ তার অবয়ব স্পষ্ট হতে লাগল। যত স্পষ্ট হতে লাগল তার অবয়ব, লালন দাসের মধ্যে তত বেশি আতঙ্ক চেপে বসল।

লালন উঠে বসতে চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। প্রবল ঘাম আর অস্বস্তি হচ্ছিল। চোখমুখ ঝাপসা হয়ে আসছিল।

কিন্তু ছায়াটির মুখ ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে এসেছে।

ছায়াটি এগিয়ে এল। লালন দাসের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ল।

লালন নিঃশ্বাস ফেলছে। কিন্তু আর কিছুই করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

একটা ভ্যাপসা গন্ধে ভরে গেছে ঘর। আর এই ছায়ার ভিতরে থেকে সেই ভ্যাপসা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। লালন দাসের দুই চোখ এবার জলে ভরে এল।

সে ভাবতেও পারছিল না, যে ছায়াটি তার দিকে এগিয়ে আসছিল, সে ছায়া তার নিজেরই।

5 Comments

  • Soumava

    Reply November 2, 2020 |

    অসাধারণ লাগলো। বেশ অন্যরকম লেখা। ভীষণ ভাল লেখা।

  • Shyamashri Ray Karmakar

    Reply November 3, 2020 |

    খুব আলাদা ধরনের একটি লেখা পড়লাম। খুব ভাল লাগল।

  • Mandira Ganguly

    Reply November 3, 2020 |

    এক নিঃশ্বাসে পড়তে হয়, এমন মন টেনে রাখা লেখা। অসম্ভব ভালো লেখনী।

  • subhankar guha

    Reply November 3, 2020 |

    আপনার গদ্যভাষা আমাকে মুগ্ধ করল। এত টান টান লেখা – যেন ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলাম। চমৎকার লেখা।

  • কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়

    Reply November 6, 2020 |

    একেবারে অন্যরকম ভাবনা থেকে লেখা গল্প। অসাধারণ কথার খেলা। আমাদের সকলের মধ্যেই একজন অন্য একটা সে আছে। কখনও তাকে অনুভব করি কখনও ইচ্ছে করে তাকে অবজ্ঞা করি, লুকিয়ে রাখি। বিষয়টা নতুন, আধুনিক এবং জীবন্ত । সামনে দাঁড়ানো দ্বিতীয় লালন কখন প্রথম লালনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়, যে আলাদা করা যায় না। বিষয়টি ভাবায়। একটা ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। নিজের ভিতরে থাকা অন্য মানুষকে খুঁজতে বলে… অসম্ভব ভালো লাগলো

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...