অসদ্বিম্ব
চয়ন ভৌমিক

বাড়ি ফিরে চাবিটা টেবিলে রাখতেই মনে হল, ৩৫ বছরের অ্যালার্মটা বন্ধ হয়ে গেল। যে সময় তিনি এই চাকরিতে ঢুকেছিলেন সে সময় সরকারি চাকরি পাওয়া মুখের কথা ছিল না। পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলেও বহুদিন অপেক্ষা করতে হত, ফাইনাল অফার লেটার হাতে পেতে। তারপর আরও উপরে ওঠার যুদ্ধ। কিন্তু আজ যেন এক লহমায় সব স্তব্ধ।

অনিন্দিতা ঘরে ঢুকলেন। ত্রিশ বছরের দাম্পত্য তাঁদের। দশ বছর হল দীক্ষা নিয়েছেন। সকাল ৫টায় ওঠা, গোপাল সেবা, ভজন, ঠাকুরের বই। অনিন্দিতার জগৎ এখন মন্দির আর আশ্রম। রোজকারের মতই টুকিটাকি কথা বলে প্রশ্ন করলেন “চা খাবে?” “হ্যাঁ।” এইসব রুটিন এরপর বলবেন কাল কী কী বাজার করতে হবে। বেশির ভাগই ঠাকুরের জিনিস। নিরামিষ খান অনিন্দিতা। মাছ-মাংসের ঝামেলা কনজুগাল লাইফের মতোই মিটে গেছে দুজনেরই। তবুও অমিয় চাইছিলেন আজ কিছু অন্য কথা হোক। অর্থশাস্ত্রের বাইরে গিয়ে, দাম্পত্য কর্তব্যবোধের বাইরে গিয়ে, একটা নতুন শুরুর গল্প যেন খুব চাইছিলেন, যা তিনি এর আগেও চেয়ে এসেছেন একঘেয়েমি জীবনে এগোতে এগোতে। অনিন্দিতার মতো ভদ্র, সজ্জন ও স্নেহশীলা মানুষ হয় না। কিন্তু অমিয়র সাথে তাঁর যে কোথাও ফাটল বাড়ছে। আছে সহাবস্থান। দুটো মানুষ, একটা ছাদ কিন্তু তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

রিটায়ারমেন্টের অনেক আগে থেকেই এই ফাঁকের শুরু হয়তো। তাই হয়তো অনিন্দিতা দীক্ষা নিয়েছেন। তাঁর অনেক ভাই-বোন, সবাই দীক্ষিত। তাঁরা একসাথে স্তব করেন, নামগান করেন, মন্দিরে বসেন। অমিয়র ছুটির দিন মানেই শূন্য বিকেল, আকাশে সুদীর্ঘ ফাঁকা সময়। বিকেলে ছাদে বসে থাকেন। পাখি ওড়ে। পাশের বাড়ির বাচ্চা কাঁদে। নিজেকে বড্ড অপ্রয়োজনীয় লাগে যখন, তখন মানুষ দিশেহারা হয়ে যেতে থাকে, সে চাকরিতে আর ব্যবহারিক জীবনে আপনি যতই সফল হন না কেন।

৮ বছর আগে ফেসবুক প্রোফাইল খুললেন “অমিয় রায়”। অফিসের রিভলভিং চেয়ারে বসা হাসিমুখের চকচকে ছবি। চোখে দামি চশমা। রিলেশনশিপে লিখলেন – “কমপ্লিকেটেড”।

একদিন নোটিফিকেশন – “তৃণা সেন আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে।” অমিয় ভালো করে প্রোফাইল চেক করলেন। খুব বেছে তিনি বন্ধুত্ব করেন। প্রোফাইলে গোলাপি শাড়ি পরা ৪৫-৪৬-এর মহিলা। হাসি মিষ্টি। বায়োতে লেখা “গৃহিণী, বইপ্রেমী, রবীন্দ্রসংগীত”।

অমিয় অ্যাকসেপ্ট করলেন।

কদিন শালুক-দিঘির মতো নিস্তরঙ্গ ছিল সব। অমিয় ভুলেই গেছিলেন এই নতুন প্রোফাইলের কথা। জীবন একই প্রবাহে পানসি নৌকার মতো এ পার থেকে ওই পার আর ওই পার থেকে এই পার করছিল। অমিয় তখন চাকরিজীবনের তুঙ্গে তাই সময়ও কম। এরই মধ্যে এক বসন্ত বিকেলে, কনে-দেখা আলোয়, কৃষ্ণচূড়া গাছের রক্তিম পাপড়ির আড়ালে যখন কোকিল ডেকে উঠল প্রথম কুহু, সেদিন প্রথম মেসেজ তৃণার।

“আমরা বন্ধু হতে পারি?” সেই শুরু।

প্রথম প্রথম পনেরো-কুড়ি দিনে একবার। তারপর তা আস্তে আস্তে বেড়ে দু-তিন দিন অন্তর অন্তর। শুরুটা হবি। কাজের কথা। কবিতা, সাহিত্য আর ঘরোয়া কথাবার্তা। ক্রমে তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে।

“আপনার দিন কেমন গেল? লাঞ্চে কী খেলেন?” এগোতে এগোতে অফিসের কথা, তৃণার বাড়ির কথা, রান্নাবান্না, বৃষ্টি-রোদ, দুর্গাপুজো…

সময় এগিয়ে যায় – তিন বছর, চার বছর, পাঁচ বছর…

— আজ মন খারাপ। স্বামী ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে আমি আর টিভি।

— আপনার সাথে কথা বললে শান্তি লাগে, অমিয়দা।

“আপনি আমার বন্ধু। খুব কাছের।” কিছুই যেন আর বাদ থাকে না। যেন দুজনেই সোনাঝুরির লতা। একে অপরকে জড়িয়ে রোদ গায়ে মাখছে। তাঁদের ডালপালা লাইটপোস্ট, বিদ্যুতের তার, পোড়ো বাড়ির পরিত্যক্ত টালির চালে চালে ছড়িয়ে ছড়িয়ে গেল মন-উঠোনের দুরূহ কোণ পর্যন্ত।

— কখনও মনে হয়, আপনাকে সামনাসামনি দেখি।

তারপর লম্বা নিস্তব্ধতা। নীরবতা অসহ্য আর অনতিক্রম্য হতে থাকলে আবার তৃণার বার্তা আসে।

— না, থাক। সংসার আছে। দায়িত্ব আছে। ঠিক না।

তবুও কোথাও ঢেউ ওঠে। আটলান্টিকের গভীরে ডুব দেয় মনবাসিন্দা। ডুবুরির মতো ভাঙা জাহাজে কীসের খোঁজ? অমিয়র দিন আলুথালু হয়। কাজের মধ্যেও কী, ঢুকে আসে প্রশ্রয় আর প্রবেশ? এখন তো আরও সময় হাতে। অমিয় রিটায়ার্ড। কত বই পড়বেন, কতই বা গাছ আর ফুল সেবা?

— আজ দেখা করবেন? রবীন্দ্র সদন মেট্রো, এক্সাইড গেট, বিকেল ৪টে। আমি গোলাপি জামা পরব।

অমিয় রাজি হয়েছিলেন। কিছুই লুকাননি তিনি অনিন্দিতার কাছে। অনিন্দিতা বলেছিলেন, “বন্ধুর সাথে দেখা করো। বয়স হয়েছে, এখন আর পাপ-পুণ্য ভেবে লাভ নেই। মন ভালো রাখো।”

আট বছরে একবারও ফোন নম্বর চাওয়া হয়নি। ভিডিও কল হয়নি। ছবি দুটো। তৃণার প্রোফাইলের ছবি। ব্যস।

দুজনেই দায়িত্বশীল। দুজনেই জানতেন, এই বাঁধনটা ভার্চুয়াল থাকলেই সুন্দর। বাস্তবে নামলে ধুলো লাগবে।

কিন্তু অমিয়র বয়স ৬০। সময় কমে আসছে। তিনি জোর করলেন।

— একবার। শুধু একবার। চা খেয়ে চলে আসব।

তৃণা রাজি হল। “ঠিক আছে। ১৫ তারিখ। বিকেল ৪টে।”

১৫ তারিখ। বিকেল ৩.৫০

রবীন্দ্র সদন মেট্রোর এক্সাইডের দিকের গেট এই সময় ভিড়ে ভিড়। অফিস-ফেরতা কত মানুষ, তার মধ্যে অচেনা-চেনা কত মানুষ। অমিয় ধুতি-পাঞ্জাবি পরে এসেছেন। হাতে একটা ছোটো প্যাকেট। তৃণার জন্য বই। “শেষের কবিতা”। চারদিকে তাকাচ্ছেন। গোলাপি জামা। গোলাপি জামা। ৪.০০ বাজল। নেই। ৪.০৫। ফোনে মেসেজ দিলেন। “এসেছি। তুমি?” সিন হল। রিপ্লাই নেই।

৪.১০। বুকের ভেতর ধড়ফড়। ৮ বছরের অপেক্ষা। এভাবে? হঠাৎ পেছন থেকে পুরুষ কণ্ঠ। নরম, একটু কেঁপে কেঁপে।

— অমিয়দা?

অমিয় ঘুরলেন। সামনে ৪৭-৪৮-এর ভদ্রলোক। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে চশমা। চুলে পাক। হাতে একটা গোলাপি টোট ব্যাগ। মুখে অপরাধী হাসি। অমিয় ভ্রু কুঁচকোলেন।

— কে আপনি?

লোকটা মাথা নিচু করল।

— আমি… তৃণা।

পৃথিবীটা এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।

কাছের একটা কফি শপ। বাতানুকূল নিস্তব্ধতা চারিদিকে। এখন কফি শপ ফাঁকা। খালি সার্ভিস করার ছেলেমেয়েরা এককোণায় বসে নিচুস্বরে কথা বলছে, নিজেদের মধ্যে হাসাহাসিও চলছে বেশ।

লোকটা মানে তৃণা কথা বলছে। গলা কাঁপছে।

— আমার আসল নাম তৃণাঞ্জন সেন। বয়স ৪৭। ব্যবসা ছিল। একটা গার্মেন্টসের।

— আট বছর আগে আমার বউ আমায় পরিত্যাগ করে চলে গেল। ১০ বছরের সংসার। অন্য একজনের সাথে। চিঠি লিখে গেল, “তোমার সাথে আর থাকা যায় না। আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনও দামই নেই তোমার কাছে। তোমার নিজস্ব জগত, ব্যবসা, এসব আমার কাছে বোঝা। আমি অন্তঃসত্ত্বা, না, তোমার সন্তান সে নয়। রাতদিন একা সংসার ঠেলতে ঠেলতে যখন আমি ক্লান্ত, তোমার ঘুমিয়ে পড়া মদ্যপ রাতে আমি যখন দেহযাতনায় কুঁকড়ে অর্ধমৃত, যখন তুমি ঘুরেও জিজ্ঞাসা করোনি অর্থ ছাড়া আমার আর কিছু চাহিদা আছে নাকি, তখন আমাকে নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে বাধ্য হয়েছি আমি। টাকাপয়সা নেই অথচ আমার মন বোঝে এমন লোক আমি খুঁজে পেয়েছি। আমাকে ফিরে পাওয়ার বৃথা চেষ্টা না করাই সমীচীন…”

অমিয় চুপ। কফির কাপে চুমুক নেই।

— আমি ভেঙে পড়েছিলাম, অমিয়দা। রোজ মদ। রোজ ঝগড়া। বন্ধুরা ছেড়ে দিল। ব্যবসা লাটে। একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও কেন চলে গেল?’

— উত্তর পেলাম না। তারপর ঠিক করলাম, আমি ওর মতো হব। যে মহিলাটা আমাকে ছেড়ে গেল, তার জায়গায় আমি বসব। নারীর মন বুঝব। নারী হয়ে পুরুষকে ভালোবাসব। যদি বুঝতে পারি, তাহলে হয়তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারব।

অমিয়র হাত কাঁপছে।

— ফেসবুকে মেয়ের নামে আইডি খুললাম। তৃণা। আমার স্ত্রীর নাম ছিল তৃষা। তৃণা কাছাকাছি। প্রোফাইলে ওর মতো শাড়ির ছবি দিলাম। আর অপেক্ষা করতে লাগলাম। কেউ কথা বলুক।

— আপনি মেসেজ করলেন না দেখে আমিই করলাম। আমি সাহিত্যে স্নাতক, আগে লেখালিখিও করতাম, গান শুনতাম, ওয়েভ লেংথ মিলে গেল। মনে হল আপনিও ভীষণ একা। আমি আঁকড়ে ধরলাম। কারণ আপনি শুনতেন। বিচার করতেন না। আট বছর। আপনিআমার থেরাপি ছিলেন, অমিয়দা।

— আমি মিথ্যে বলিনি। শুধু নাম আর জেন্ডারটা বলিনি। বাকি সব সত্যি। আমার একা লাগা, আমার শূন্যতা, আপনার সাথে কথা বলে শান্তি পাওয়া… সব সত্যি।

অমিয় ধীরে বললেন, “তুমি পুরুষ?”

— হ্যাঁ। কিন্তু গত আট বছর আমি তৃণা হয়ে বেঁচেছি। শাড়ি পরেছি বাড়িতে। রবীন্দ্রসংগীত শুনেছি। রান্না শিখেছি। কারণ আমি বুঝতে চেয়েছি, একটা মেয়ে একা বাড়িতে বসে কী ফিল করে যখন তার স্বামী ফেরে না।

— আজ আসার আগে এক ঘণ্টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। গোলাপি কুর্তি পরব ভেবেছিলাম। পারলাম না। ভয় লাগল। যদি আপনি ঘেন্না করেন? তাই এই পাঞ্জাবি। কিন্তু ব্যাগটা গোলাপি। কথা দিয়েছিলাম তো।

অমিয়র চোখের সামনে ৮ বছরের চ্যাট ভাসছে। “আজ খুব মন খারাপ”। “স্বামী ফেরেনি”। “আপনার গলার আওয়াজ শুনতে ইচ্ছে করে”।

সব সত্যি। শুধু গলাটা অন্য।

অমিয় জল খেলেন। গলা শুকিয়ে গেছে।

— তৃণাঞ্জন, তুমি জানো এটা কী?

— প্রতারণা। আমি জানি। আমি ক্ষমার যোগ্য না। আপনি চাইলে আমি উঠে যাব। আর বিরক্ত করব না।

অমিয় তাকালেন। লোকটার চোখে জল। ৪৭ বছরের পুরুষ। ভেঙে গেছে।

অমিয়র মনে পড়ল অনিন্দিতার কথা। দশ বছর আগে দীক্ষা নেওয়ার পর বলেছিল, “মানুষের কষ্টটা দেখো। নাম-রূপ পরে দেখো।”

— তুমি ৮ বছর ধরে আমার সাথে কথা বলেছ। আমার রাতের ঘুম আসত না। তুমি গল্প শোনাতে। আমার বউ যখন ঠাকুর ঘরে, তখন তুমি বলতে, ‘অমিয়দা, চা খেয়েছেন?’

— সেটা কি মিথ্যে ছিল?

তৃণাঞ্জন মাথা নাড়ল। “না।”

“তাহলে?” অমিয় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “আমি ৬০ বছরে বুঝেছি, মানুষ একা। ভীষণ একা। আমরা সবাই একটা খোলস পরে থাকি। তুমি নারীর খোলস পরেছ। আমি ‘রিটায়ার্ড সরকারি অফিসারের’ খোলস। অনিন্দিতা ‘ভক্তের’ খোলস। খোলসের ভেতরের মানুষটা তো একই। কষ্ট পায়।”

তৃণাঞ্জন কেঁদে ফেলল। শব্দ করে না। শুধু জল পড়ছে।

— আমি আপনাকে ঠকিয়েছি।

“ঠকাওনি। তুমি বাঁচতে চেয়েছ। আর আমাকে বাঁচিয়েছ।” অমিয় প্যাকেটটা এগিয়ে দিলেন। “এটা তোমার জন্য। ‘শেষের কবিতা’। অমিত লাবণ্যকে বলেছিল, ‘তোমাকে আমি পাইনি, তাই তোমাকে পেলাম’।”

তৃণাঞ্জন প্যাকেটটা নিল।

— আমি কি খুব খারাপ মানুষ, অমিয়দা?

— খারাপ মানুষ ৮ বছর ধরে অন্যের খোঁজ নেয় না। খারাপ মানুষ ‘চা খেয়েছ’ জিজ্ঞেস করে না। তুমি হার্টব্রোকেন মানুষ। আর হার্টব্রোকেন মানুষ অদ্ভুত কাজ করে।

সমস্ত শহরটা যেন হঠাৎ কোলাহলহীন হয়ে গেছে। নিশ্বাসের শব্দে এক অস্বস্তিকর নীরবতা।

“এবার কী হবে?” তৃণাঞ্জন জিজ্ঞেস করল।

“এবার যা হওয়ার তাই হবে।” অমিয় হাসলেন। “তুমি তৃণাঞ্জন। আমি অমিয়। আমরা বন্ধু। ৮ বছর যা ছিল, তাই থাকবে। শুধু মিথ্যের পর্দাটা সরে গেল।”

— আপনি ঘেন্না করেন না?

“করলে কি আর বইটা দিতাম?” অমিয় উঠলেন। “চলো। বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।”

বাইরে সত্যিই বৃষ্টি। শ্রাবণের বৃষ্টি।

দুজন ছাতার নিচে। পাশাপাশি হাঁটছে।

“অমিয়দা,” তৃণাঞ্জন বলল, “আমি কি আবার তৃণা হয়ে আপনাকে মেসেজ করতে পারি?”

অমিয় থমকালেন। তারপর বললেন, “পারো। নামে কী আসে যায়? যে মানুষটা ৮ বছর ধরে আমার পাশে ছিল, সে তৃণা হোক বা তৃণাঞ্জন। মানুষটা তো একই।”

— কিন্তু লোকে কী বলবে?

— লোকে অনেক কিছু বলে। অনিন্দিতা সারাদিন গোপাল নিয়ে থাকে, লোকে বলে ‘পাগল’। আমি ফেসবুক করি, লোকে বলে ‘বুড়ো বয়সের ভিমরতি’। বলুক।

মেট্রো স্টেশনের আলোয় ভিজে যাচ্ছে দুজন।

“আচ্ছা অমিয়দা,” তৃণাঞ্জন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আপনার বউ যদি জানতে পারে?”

“জানবে।” অমিয় বললেন। “ওকে বলব। ও বুঝবে। ওর জগৎটা বড়ো। ওর কাছে মানুষ বড়ো, লিঙ্গ বড়ো না।”

বাড়ির সামনে এসে তৃণাঞ্জন দাঁড়াল।

— আসি?

“আসো।” অমিয় বললেন। “আর হ্যাঁ, পরের বার যখন মেসেজ করবে, নামের পাশে ‘তৃণাঞ্জন’ লিখে দিও। তৃণাকে আমি মিস করব। কিন্তু তৃণাঞ্জনকে জানতে ইচ্ছে করছে।”

তৃণাঞ্জন মাথা নাড়ল। চোখে জল, মুখে হাসি।

অমিয় বাড়ি ফিরলেন। ভিজে গেছেন।

অনিন্দিতা ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে বললেন, “কী, দেখা হল?”

“হ্যাঁ।” অমিয় তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বললেন, “ওর নাম তৃণাঞ্জন।”

অনিন্দিতা এক সেকেন্ড তাকালেন। তারপর বললেন, “তাই? ভালো। মানুষটা ভালো তো?”

“খুব ভালো।” অমিয় বললেন। “৮ বছর ধরে আমাকে ভালো রেখেছে।”

রাতে শুতে যাওয়ার আগে অমিয় ফোন খুললেন।

নতুন মেসেজ এসেছে –

তৃণাঞ্জন: “বাড়ি পৌঁছেছি। বইটা পড়া শুরু করেছি। ‘তোমাকে আমি পাইনি, তাই তোমাকে পেলাম’। লাইনটা বুকের ভেতর লাগছে। ধন্যবাদ, অমিয়দা।”

অমিয় রিপ্লাই দিলেন: “ঘুমাও। আর হ্যাঁ, আকাশটা আজ ভিজে। সুন্দর।”

ওপার থেকে উত্তর এল: “হ্যাঁ। আমাদের মতো। অচেনা, কিন্তু আপন।”

অমিয় ফোন রেখে জানালার দিকে তাকালেন। বৃষ্টি পড়ছে।আট বছরের একটা মিথ্যে আজ সত্যি হয়ে গেল। কারণ মিথ্যের ভেতরেও যে ভালোবাসা ছিল, সেটা মিথ্যে ছিল না।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...