হাত বাড়ালেই ভিজতে পারি
সৌমী আচার্য্য

অবৈধ সম্পর্কের মতো জীবনে জেগে আছে সুপ্রতীক। সংসারের এককোণায় মাকড়সার জালের মতো লেগে থাকে দিনের পর দিন। রঞ্জিনী বিরক্ত হয়। ঝেড়েপুছে সাফ করতে চায় তবু বারবার ফিরে আসে সুপ্রতীক। আমিও ওর আশায় একফালি বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে বসে থাকি। গত পরশু ভোরের নরম হাওয়ার মতো ধীর পায়ে এসে বসেছিল সিঁড়িতে। গায়ে কটকটে গোলাপি চাদর।
-কার থেকে বাগালে হে এমন চাদর!
-ঠিক জানিনা বৈভব দা, বোধহয় কারো অনাদরের ফসল। পেঁচিয়ে পড়েছিল গ্রিলের বারান্দায়। তুলে এনেছি। আমার প্রয়োজন উষ্ণতা আর ওর প্রয়োজন সঙ্গী। দুয়ে মিলে  অতি উৎকট তবে দুজনারই  পরস্পরের  প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। অবহেলার প্রতি আমার আকর্ষণ গভীর।
 আমার থেকে বয়সের হিসেবে কিছু ছোটো হলেও ওর বোধের সীমানা ঈর্ষণীয়। মাঝেমাঝে ভাবি একটা অল্প বয়েসী বড় বটগাছ যেন। শেকড় ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীর শেষতম অংশ উপলব্ধি করতে। কেবল রঞ্জিনীর তাচ্ছিল‍্য বুঝে উঠতে পারে না। হয়তো নগণ‍্য ক্ষুদ্রতা ওকে স্পর্শ করে না। চনমনে চোখে পথের দিকে চেয়ে থাকে। পথ ভুল করে মাঝেমধ্যে অরু বৈরাগী, পথে পথে যে ভিক্ষা করে ফেরে, আমার বাড়ির দোর গোড়ায় এলে সুপ্রতীক যেন পরমান্ন হয়ে ওঠে। ওর শরীর তখন সুগন্ধী।
-আহা অরু,তোমায় ঈর্ষা করি কতখানি তা তুমি জানো না। সুপ্রতীক বলে।-বোঝো কতা! আমার এই নিঘিন্নি জীবন তাকে কিনা ঈর্ষা। গোঁসাই তুমি ছলনা জানো বড়।
-না গো না। এই যে পথের বাঁধন ছাড়া আর কিছু তুমি মোটেই স্বীকার করো না, এটাই আমায় ভেতর থেকে কাঁদায়। রোজ গিয়ে ঐ চিনির বস্তা, তেলের শিশি ছুঁতে আমার মন চায় না। একটা তেলচিটে গন্ধ আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে অরু। পথে বেরতে পারলে বেঁচে যাই।
-তা হ‍্যাঁ হে সু গোঁসাই’,  তোমার মুদির দোকানে সেঁকো বিষ নেই? -না গো এত মহার্ঘ বস্তু আমার মতো সাধারণের থাকলে চলে? আমার আছে নিত‍্য অভাব, তারই জ্বালায় জ্বলতে থাকি। লোকে ভাবে পাগল ছাগল। কেবল ভিকু পাগলটা মাঝেমধ‍্যে কল্কে দেয়।
-সে তো ভিকু আমারেও ভালোবাসে। গত হপ্তায় আমার মাধুকরীর প্রসাদ চেটেচেটে খেল আর যাবার আগে মুখভরি থুথু ছিটায় গেল। সেই থেকে পবিততো বোধ করছি। অরু বৈরাগী একগাল হেসে জবাব দেয়।
আমি অবাক হয়ে দেখি শুনি ওদের কথা। চায়ের কাপে সংসার নিস্তেজ হয়ে আসে।ভিকু পাগল অরু বৈরাগীর মুখে থুথু দেয় কেন? জিজ্ঞাসা করতে ভীষণ লজ্জা হয়।অনুমান করি এরা আমার ঈর্ষণীয় এমনি এমনি নয়। এত দুর্বোধ‍্য ঘেরাটোপ ছেড়ে উঠতে মন চায় না। শরীরসর্বস্ব সংসার হাঁক পাড়ে। অলস তাচ্ছিল‍্যে বাজারের থলে হাতে পথে নামি। ছায়ার মতো এঁটে থাকে সু।
-আচ্ছা সু, অরুর মুখে থুথু নামলে ওর আনন্দ হয় কেন? আমার তো মরে যেতে ইচ্ছে করতো।
-হাসালে যে বৈভব দা। ইচ্ছে না হলেও যা আসে তার জন্য আবার ইচ্ছে কি? মৃত্যু কি তোমার ইচ্ছার দাস? ভিকু পাগল বলেই তো যার খায় তার পাতে মোতে। তুমি আমি সেয়ানা বলে হেঁ হেঁ হাসি আর আড়ালে নিন্দে করি। তাই অরু আনন্দ পায় যে সে জাত পাগলকে প্রসাদ বিলিয়েছে।
-সু আমাকে ছেড়ে যেও না হে। এমন প্রলাপ, এমন কথা আমার আয়ু বাড়িয়ে দেয়।
-বৈভব দা গো, তোমার এমন হা পিত‍্যেশ মনটাকে ছাড়ি কি করে বলোতো। চলো নিকুঞ্জ পালের থেকে মোচা কিনে নাও আগে ভাগে। তোমার গৃহিনীর প্রিয়। খুশি হবে।
কি করে যে মনে রাখে কে জানে! আমি কেবল ভুলি। ভুলতে ভুলতে ভুল করে রাতের সোহাগে কলঙ্ক মেশাই। রঞ্জিনীর বুকে হাত রেখে বলে ফেলি, ‘সু তোমার ভালো লাগা গুলো আমার চে বেশি বোঝে’। ফেটে পড়ে ভিজে থাকা মাটির মতো নারী। চাঁদের আলো মরে আসে আমার পায়ের পাতায়।

-একেক সময় মনে হয় তুমি কি সুপ্রতীক কে হিংসে করো! তোমার এই কুতকুতে বোধহীন চোখ কি ঐ সুঠাম বাউলের মধ্যে নিজেকে যেভাবে দেখতে চেয়েছিলে তারই ছায়া দেখতে পায়? তোমার এই ভুঁড়ি, এই স্থূলতা কি আসলে  তোমাকে হীনমন্য করে তোলে? সত‍্যি বলো তো?  ভুরু কুঁচকে রঞ্জিনী প্রশ্ন করে।  
-না তা কেন? আজ মোচাটা, মেটে আলুটা ঐ তো কেনালো। আবার ফিরতি পথে দোকান খুলে প্রথম খরিদ্দারি তোমাকেই  রাখলো। বললো, বৌদির নামে পোস্ত দিলাম দুশো! সারাদিন নেশায় আসবে গ্রাহক। আমার তো বেশ লাগে। তোমাদের মিলমিশ হলে আমার জীবন সুখের হয় রঞ্জিনী।
-সুখ কাকে বলে বলতে পারো? সারাদিন চামারের মতো সংসারের গু মুত ঘাটলে সুখ?নাকি অফিসের জাবদা খাতায় মুখ গুঁজে সুখ? নাকি  তোমার মতো পুরুষ হয়ে পুরুষে মজে থাকায় সুখ!  
আমি কি তবে সু তে মজে আছি? কিন্তু কই ওকে দেখলে কোনদিন আমার লাঙল ঠেলতে ইচ্ছে হয়নি তো! সে তো কেবল রঞ্জিনীর বেদীমূলেই নিবেদিত। তবে, তবে কেন এই টান। সুপ্রতীকই বা এত আসে কেন? একেক দিন কোনো কথা হয় না। দুজনা সাদা পোর্সিলিনের কাপে অবজ্ঞা চুমুক দিই গরম গরম। তারপর পায়ের কাছে কাপ নামিয়ে মৃদু স্বরে সু বলে, ‘জানো বৈভবদা, পশ্চিম পাড়ার রমাকান্ত জ‍্যেঠু আজ ভোরে চলে গেলেন। আমি চেয়ে দেখলাম চিরকেলে ঘেমো লোকটা কেমন ফিঙের মতো হালকা হয়ে ঝিরঝির করে উড়ে গেল। কারো দিকে তাকালো না, কাঁদলো না। কেবল উঠোন ছুঁয়ে,টোপাকুলের গাছ ছুঁয়ে, বাড়ির ছাদে দুদণ্ড বসলো। আর তারপর আমাদের এই খোয়ার রাস্তাটাকে ফিসফিস করে বললো,”চলি গো,চলি! আবার দেখা হলে চিনে নিও। আমি হলাম…।” কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নিজের নাম বলতে পারলো না। কেবল শিস দিয়ে উঠলো।
-এসব তুমি দেখলে?
-দেখলাম গো। তবে কি করে দেখলাম বা দেখার কলটা কি তা তোমায় ব‍্যখ‍্যা দিতে পারবো না বাপু। সে তুমি বুঝি নাও। তবে সেই থেকে মনটা বড় কাঁদছে।
আমি বুঝতে পারিনা বলেই জড়িয়ে থাকি। সু এর মতো দেখতে চাই। আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে আমার চোখ কুতকুতে বলেই কম দেখি। সত‍্যিটা দেখি না বা দেখতে পাই না। যেমন দেখতে পাইনি এইসব গল্পের মাঝে মূর্তিমান সত‍্য হয়ে ওঠে আমার বৌ।
-যাদের ঘরদোর বলে কিছু নেই, গেরাস্তি নেই তারা যেভাবে বাউণ্ডুলে হয়ে পরের দোরে থাকে বাসি ঝাঁটালের মতো, তোমার ঠিক তেমনটাই যদি হবার ইচ্ছে তবে আমায় বিদায় দাও। আমার বাবা এখনো ওকালতি করেন ।দুবেলা ঠিক দুমুঠো জুটবে।
সুপ্রতীক কি করবে বুঝে না পেয়ে এদিক ওদিক পথ খোঁজে। শেষে কাপটা হাতে নিয়েই খানিক এগিয়ে আবার ফেরত আসে।

-দোষ যা কিছু তা আমার। অকারণ কথায় দাদার সব কিছু গোলমাল করে রাখি। নাহলে মানুষটা তো একমুখী।
-যে লোক পর সে আমার নিজের মানুষের কথা বলবে এ যেন আমার কাছে অভিশাপ।এখন আপনি সিদ্ধান্ত নিন, আমাদের যৌথ পথে আপনার লাগানো আয়নায় মুখ দেখবো নাকি নিজেদের দিকে তাকাবো।
ফ‍্যালফ‍্যাল করে চেয়ে সু পা চালায়। আমি দেখতে পাই না ওর চলে যাওয়া। মনে হয় এই বুঝি ডেকে উঠবে,’বৈভব দা আমি এলাম।’ সরে সরে যায় ওর ছায়া। অফিসের কেবিনে ছটফট করি যেন ছাদ নীচু হয়ে বুকের উপর উঠে বসেছে। নিশ্বাস নিতে পারি না। উল্টো দিকের টেবিলে লো-কাট ব্লাউজে শ্রুতিপর্ণা।
-ঘোষদা, আপনার কাছে লাস্ট মান্থের ট‍্যালিশিটটা আছে? একটু দিন না।
কি অদ্ভুত কায়দায় গলা নামিয়ে বুকের খাঁজে সময়কে টুঁটি চেপে ধরে রেখে দেয়। মেয়েটার যেন সম্মোহন বিদ্যা জানা আছে। কী অবলীলায় নিজের কাজ করিয়ে নেয় আমাকে দিয়ে। যাওয়ার সময় ফাঁকা দপ্তরে দুবাহু দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে ডান কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে বলে যায়, গুড বয়। আর সেই সুযোগে ওর সবজে টিপ আমার কানের উপরের চুলের গুচ্ছে ফাঁস লেগে ঝুলে পড়ে। বাড়ি ফেরার পর রঞ্জিনী হতবাক হয়ে দেখতেই থাকলো। গরম চায়ের কাপ মার্বেলের মেঝেতে আছড়ে পড়লো। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে রান্নাঘরে চলে গেল বৌটা। বেয়াড়া রকম টান অনুভব করলাম বাইরে যাবার। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। বিমলের ছেলের আতুর ওঠার পুজো চলছে। সাথে কীর্তন। হরিনামের অপার মহিমা। আমার বুকের ভেতর কান্না দলা পাকিয়ে আসছে। আরো এগিয়ে বাজারের মধ‍্যে গিয়ে দেখি সুপ্রতীকের মুদি দোকানে বেশ হৈ হল্লা। বিষয় যত না গুরুতর চিৎকার চ‍্যাঁচামেচি তার দশগুণ। আর যাকে নিয়ে এত কাণ্ড সে নির্বিকার ভাবে কাঠের টুলে বসে আছে। সুপ্রতীকের দোকানের সামনে থেকে ভীড়টা পাতলা হলে জিজ্ঞেস করলাম-
-হ‍্যাঁ হে, ব‍্যাপারটা কি? কি এমন বাঁধালে?
-মানুষ বড় কাঁদছে গো বৈভবদা,বড় কাঁদছে।
চমকে উঠলাম। চরবিলের পাড়ে যে ইঁটভাঁটা আছে সেখানেই যাতায়াত বেড়েছে সুয়ের। কদিন ধরে শুনছিলাম এর ওর মুখে। শ্রমিক গুলোর অসুখের খোঁজখবর নেওয়া, সূর্য ডাক্তারের থেকে হোমিওপ‍্যাথির পুরিয়া সাপ্লাই দেওয়া, বাচ্চাগুলোর জন‍্য মুড়ি বাতাসা খিচুড়ির যোগান এইসব নিয়েই তার দিন কাটে আজকাল। আমার ভোরের চায়ের কাপ সঙ্গীহীন। বাজারের থলি স্পর্শ পাবার আকাঙ্খায় ব‍্যাকুল। তবু কিছুই বলতে পারিনা।বোকার মতো বলে ফেলি, ‘এদের দাবি কি? চরবিলের  পাড় থেকে তোমায় উৎখাত করতে চায়?’
-আচ্ছা ওরা যদি একটু ভালো থাকে তাতে মালিকের রাতের ঘুম উড়ে যায় কেন? আমি নাকি ওদের কাছে প্রমাণ করে দিয়েছি মালিকশ্রেণি উদাসীন ওদের নিয়ে। আচ্ছা আমার কী লাভ বলতো? আমার তো ক্ষমতা নেই ইটভাটা বানানোর।
ভিকু চরম ঔদাসীন‍্যে হেঁটে যায়। মুখ ঘুরিয়ে আমাদের দেখে। কীসব বিড়বিড় করে, গালে হ‍্যাঁচড়-প‍্যাঁচড় চুলকিয়ে দুপা পিছিয়ে আসে। আমি দেখি ওর মুখে শান্তি। কোথায় পায় এমন নির্ভার জীবন কে জানে? ময়লা সরু আঙুল তুলে আমায় কী যেন বলতে চায়। ওর মুখের কোণায় বড় বড় থুথুর ঝাঁক তাড়াহুড়ো লাগায় বাইরে বেরোনের ইচ্ছায়।শব্দরাও পিছু পিছু ছিটকে আসে।
-পিশাচের কাছে কাঁদলে জল আরো লবণ হয়। মানুষের কাছে কাঁদ, জল মিষ্টি হবে। যা যা মানুষ খোঁজ।
ভিকু আমায় পিশাচ বললো নাকি? সুপ্রতীক আমার গায়ে হাত রাখলো হঠাৎ। ভালো লাগায় আকুল হয়ে উঠলাম। এই স্পর্শকে কী বলে রঞ্জিনী? মন, আত্মা তৃপ্তিতে ঘুমিয়ে পড়তে চায় এ কেমন ছোঁয়া!
-চল বৈভবদা, আজ আর খরিদ্দার আসবে না। ঝাঁপ বন্ধ করি। চল তোমায় একটা জায়গায় নিয়ে যাই।
শ্মশানের চিতাকাঠে জ্বলছে কারো অমূল‍্য সময়। ঝুঁকে আছে বাঁশের ঝাড় খালের জলে।এই খালে এক সময় নাকি গঙ্গার জল আসতো। অথচ মাইল মাইল দূরে গঙ্গা। ট্রেনে চাপলে আধঘন্টা। তবু কি এক বিশ্বাসে এখানেই তৃপ্তি খোঁজে আমাদের এই ছোট্ট জনপদ। সুয়ের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা আসলে প্রাপ্তি। যদিও পেটের ভেতর আর তারো নীচের দিকে গভীর ভাবে সংসার //??? দাপাদাপি শুরু করবে বলে তৈরী হচ্ছে। আকাশের বুকে কালপুরুষ।
-একেক সময় ভাবি কেন এলাম পৃথিবীতে? কী দেখবো বলে? কী করবো বলে?
-কেন সংসার, জীবন সব উপভোগ করবো বলে।
-কী বলো গো? আর কোনো কারণ নেই। শুধু চাই আর চাই। ভাতের পাতে পেঁয়াজটা, লঙ্কাটা না হলে খাওয়া হয় না, পাশের বাড়ির কাঁঠালপাতা আমার সীমানায় আসলে চলে না, ভালোবেসে দুটো কথা বললে স্বার্থের পোড়া গন্ধে জগৎ ঢেকে যায়। বৈভবদা মনে হয় চলে যাই। অরু বৈরাগীর সাথে কবেই বেরিয়ে পড়তাম শুধু বুড়ি মায়ের কাশির দমকে “ও বাবা ও বাবা” ডাকটা আমায় বেঁধে রেখেছে।
-সে বিড়ম্বনা সবার জীবনেই আছে হে। আজ শ্রুতিপর্ণার কান্নায় মন দিতেই বাড়িতে কুরুক্ষেত্র, কাপ ভাঙলো,মার্বেলে চায়ের তাত লাগলো তা কী করবো বলো। মন যা চায় আমি তাই করি এই আমার জন্মানোর সারমর্ম।
-শ্রুতিপর্ণার কান্নায় মন দিলে? নাকি নিজেকে সঁপে দিয়ে কান্না বাড়ালে অন‍্য কোথাও?যার গায়ে বেদনার চাদর সরে না কখনো সেই অসহ বাসের ভেতর সহবাস করো কী করে?
-আমারো যে ভিজতে ভালো লাগে,পুড়তে ভালো লাগে। অশ্রদ্ধার ছাইয়ের গ নোংরা মেখে বসে থাকতে ভালো লাগে না যে।
ঝিরঝির করে হেসে ওঠে সুপ্রতীক। ওর শরীরে কি যেন এক মায়া আছে। হাসলে বুঝতে পারি আমি এক মরুভূমি। রিক্ত শূন‍্য। তাই ওকে আঁকড়ে থাকি বেশি করে। রঞ্জিনী কেন ওকে সহ‍্য করতে পারে না কে জানে?
-ও বৈভবদা ভিজতে গেলে মেঘ ডাকতে হয় যে  আর তেমন ভাবে পুড়তে গেলে তেমন মাটি হতে হয় যে। চলো যাকে চোট দিয়েছো তাকে সঙ্গ দেবে চলো।
আমার অনিচ্ছার বোধনে ধূপ দীপ জ্বেলে কি সুখ সুপ্রতীকের কে জানে? ক্লান্ত শরীর, অনিচ্ছুক মন নিয়ে ঠাণ্ডা ঘরের আগুন ভাঁটিতে ঢুকি। রঞ্জিনী টিভি সিরিয়াল দেখে না।বই পড়ে। ওর একগোছা চুল বেশ থোকার মতো পিঠের উপর লেপ্টে থাকে। ডান গালের তিলে অহংকার। খাবার টেবিলে ডাল, রুটি, আলুভাজা, চিকেন কোর্মা ঠাণ্ডা আহ্বান জানায়। আমি সব সেরে বিছানায় আসি। রঞ্জিনী কাঁদে না। ওর কপালের সিঁদুরের টিপ আমার চুলে ফাঁস নেয়না বরং আমার গায়ে রক্তের মতো ফুটে ওঠে। সব কলঙ্কিত ইতিহাসের দায়ভার মুছতে রগড়াই নির্ভেজাল ঠাণ্ডা মাংস। তাল তাল সৌন্দর্য বিকৃত মুখে ঘৃণা ছুঁড়ে দেয় আমার দিকে। আমি ভাবি এই মুখটা যদি সুপ্রতীককে দেখাতে পারতাম! ও বুঝতো কেন কান্না খুঁজি আমি।
আমার বোকাসোকা মন মাঝেমধ্যে বিদ্রোহ করে বসে। ডিসেম্বরের শীতে পুরীতে টেনে আনলাম ঘর বার সবটাই। ট্রেনে সারারাত চাদর চাপা দিয়ে শুয়েছিল রঞ্জিনী। সুপ্রতীক আড়ষ্ঠ। এসির শীতে জড়সড়। আমি ওর পাশে বসে অন্ধকারের ভেতর আলোর দৌড় দেখছি। লবণাক্ত জলের সামনে আমি বেশ ফুরফুরে অনুভব করি। মেরিন ড্রাইভ পার করে নির্জন পুরোনো বাড়ি, এই আপাতত আস্তানা। গাঢ় লাল শাড়ি পরলে যাকে বেশ মানাতো সে পরেছে ফ‍্যাকাশে নীল। সমুদ্র মুখে নিয়ে উল্টানো নৌকার গায়ে ঠেস দিয়ে কি যেন মাপছে নিরন্তর। বালির উপর চাদর বিছিয়ে আমি আর সুপ্রতীক বসে আছি।
-তোমার এ ভারী অন‍্যায় বৈভব দা। বলতে গেলে এ তোমাদের মধুচন্দ্রিমা। আমাকে খামোকা বগল দাবা করে আনলে কেন?
-কেন হে, তুমি বলবে আমি শুনবো। তোমার কথাগুলোর ভিতর বাস করতে আমার চমৎকার লাগে।
-তাহলে ঐ যে চুপ করে দাঁড়ানো বৌ তোমার, সে কথা বলে কার সঙ্গে?
-দেখ বাপু সু, তোমার কথার তল পাইনা বলে শুনতে ভালো লাগে। আর যার কথা বুঝে নিজেকে কেবল দোষী নিকৃষ্ট মনে হয় তার থেকে দূরে পালাই।
-তা বললে চলবে কেন? পথ বেঁধেছো যখন একই দিকে তখন উল্টোমুখে  চললে হবে কেন?
-কার হয়ে ওকালতি করছো? সে যে তোমায় জলজ‍্যান্ত এক আপদ ঠাওরায়।
মলিন মুখে হাসে সুপ্রতীক। দুহাতে মুঠি করে বালি ধরে ঝরঝর করে ঝরিয়ে দেয়। উদাস চোখে বলে, ‘সেই আমার প্রাপ্তি, কিছু যে তিনি ভাবেন তাই বা কম কি?’ আলো মাখা রাত নামে সমুদ্রে। ঘুমের গভীরে নেমে যাই। সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসি লাল শাড়ি পরা শরীরের কাছে। শুনেছিলাম স্বপ্নে রঙ দেখা যায় না। এ তবে সত‍্যি হবে হয়তো। হাত দিয়ে ছুঁয়ে নিই শরীর। কী তৃপ্তির উষ্ণতা। জোর করে ঘাড় ঘোরাতেই ছিটকে যাই। একি এতো সুপ্রতীক। মেয়েদের মতো শাড়ি পরেছে কেন? ওর অনুন্নত বুক প্রবল কান্নায় ভেসে যাচ্ছে। সুঠাম শরীরে রমণীয়তা।
-বৈভবদা, এই গণ্ডীবদ্ধ জীবন, ক্ষুদ্রতা ভালো লাগে না। চলো ভেসে যাই। সব সীমা ছাড়িয়ে ভেসে যাই চলো। ঐ দেখ আকাশ ছাপিয়ে আয়ু উড়ে চলেছে অনন্তে। বৈভবদা চলো যাই। এসো আমার হাত ধরো।
বহু কষ্টে টেনে হিঁচড়ে কাছে যেতেই মুখে থুতু ছিটিয়ে দিল ভিকু। আঙুল তুলে বলতে লাগলো, ‘শয়তান,শয়তান। পাপের আগুনে পুড়ে মর। মর। মর।’ ওর থুথু আমার নাকের উপর চেপে বসলো। দম বন্ধ হয়ে উঠলো। ধড়ফড় করে বসলাম খাটে। প্রথমটা ঠাহর করতে পারি না, কোথায় আছি? কে আমি? চতুর্দিকে অন্ধকার আর গর্জন। নোনা হাওয়া ভর করে বাইরে আসি। চাঁদ সাঁতরে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশের দিকে। সমুদ্রের জল ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলিষ্ঠ যুবক আর তাকে ছুঁয়ে, তাকে জড়িয়ে তার বুকে মাথা রেখে কাঁদছে এক নারী। কি সুখে যেন বাঁধ ভেঙেছে চরাচর। শঙ্খ লাগা দুটি আশ্চর্য সুন্দর শরীর শীৎকারে হারিয়ে দিচ্ছে সমুদ্রকে। আমি সরীসৃপের মতো বুকে ভর করে বিছানায় এসে উঠলাম। বেশ নিশ্চিন্ত লাগছে। ভোরের গর্জনে চোখ মেলতেই পানপাতা মুখটা আলো হয়ে দেখা দিল।
-বিয়ের দু বছর পর বেড়াতে আনলে তাও সাথে ঐ বাউণ্ডুলে চালচুলোহীনটাকে না আনলেই নয়। আমি তোমায় কোন সুখ দিতে পারিনা বলবে? কী পাও তুমি ওর থেকে?সত‍্যি করে বলতো ও তোমায় ঠিক কী সুখ দেয়?
আমার খুব ইচ্ছে হল রঞ্জিনীর মুখে থুথু ছিটিয়ে দিই। কিন্তু পারলাম না। অল্প হেসে ওকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গিয়েই ছ‍্যাঁকা খেলাম। ঠাণ্ডা। ভীষণ ঠাণ্ডা এক মাংসপিণ্ড। অথচ গতকাল রাতেই সমুদ্র ওর উষ্ণতা টের পেয়েছিল।

1 Comment

  • যুগান্তর মিত্র

    Reply January 17, 2022 |

    খুব সুন্দরভাবে বুনেছ গল্পটা। বেশ ভালো লাগল।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...