মায়াপুন্নিম
সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়


সদরের পাশের পেঁপেগাছটার ছায়া যেখানে এসে থামে সেখানেই রোজ নগেনকে বসিয়ে দেয় ঝিমলি। ওখানে একটা ঢিবি মত আছে। জলে রোদে আগাছায় ঢাকা। ওই ঢিবিতেই হেলান দিয়ে শুয়ে বসে দিন কাটে নগেনের। দুপুর মাথার ওপর উঠে এলে ঝিমলি ভাতের থালাটাও ওখানেই দিয়ে যায়। পেঁপেগাছের ছায়াটা বাড়তে বাড়তে ঠান্ডা ভাত চচ্চড়ির ওপরে এসে থামে। অবশ্য তেমন তেমন মেঘের দিনে ছায়া পড়ে না আলাদা করে। তবে শীত গ্রীষ্ম বারোমাস ভোরের আলো ফুটল কী ফুটল না বিছানা থেকে হেঁচড়ে তুলে বগলের নিচে হাত দিয়ে ঘষটে টেনে বাইরে এনে বসায় ওকে ঝিমলি। শুধু বৃষ্টির দিনগুলোতে রান্নাঘরের এককোণে ঠাঁই। তবে তখন রান্নার কাজটুকু সেরে দেয় নগেন। নইলে ভিজে মাটিতে বসে সারাদিন ঝিমোনো ছাড়া আর তো কিছু করার নেই।
বোশেখের রোদ্দুরের মত বেলার সাথে সাথে ঝিমলির মেজাজ চড়তে থাকে। রাগ আর বিরক্তি পালা করে করে পোড়ায় এ সংসারকে। তারই মধ্যে কালেভদ্রে একটু মায়া জুটে যায় বটে তবে সে যেন ওই গোটা মাসে এক দিন একছটাক পুন্নিমার আলো। অবশ্য আর একটা জিনিস ঝিমলি উজাড় করে দেয়। গালিগালাজ। বেশিরভাগটাই দেয় নিজের ভাগ্যকে। ভাগ্য কত খারাপ হলে মানুষের জীবন এভাবে নষ্ট হয়, সেইই মূল কথা। তার সঙ্গে আছে বসে খাওয়ার খোঁটা। বসে খাওয়ার ভাগ্য বলেই নগেনকে ভগবান ওর গলায় ঝুলিয়েছিল।
তা নগেন চেষ্টা করে না তা নয়। কিন্তু কোমর থেকে পঙ্গু হয়ে যাওয়া শরীরটা নিয়ে কিই বা কাজ করবে ভেবে পায় না। এক ভিক্ষে করতে পারে মন্দিরটন্দিরের সামনে বসে। সে কথা একবার তুলেওছিল। শুনে ঝিমলি হাউমাউ করে কাঁদল খানিক। শেষে ঠিক হল নগেন ঘরে বসে ঠোঙা বানাক। ঝিমলিও হাত লাগাবে। কিন্তু নগেনের ওই গুলি ওঠা মেশিন চালানো হাতে ঠোঙা ঠিকঠাক হয় না। আঠা কম বেশি পড়ে যায়। একটার সাথে একটা জুড়ে যায়। মাঝখান থেকে কাগজের টাকাটা গুণগার গেল। নগেন ভেবেছে আবার একবার চেষ্টা করে দেখবে। যা সবাই পারে তা ও পা্রবে নাইই বা কেন! তারপরই মনে হয় যা আর কারুর সাথে ঘটেনি তা তো ওর সাথেই ঘটেছে।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার দুদিন পরে তারক, স্বপনরা এসে বলেছিল কমপেনসেশনের জন্য খুব হইচই হচ্ছে। ওরা দেখে নেবে মালিককে কি করে কমপেনসেশন না দেয়। বলেছিল তুই মনখারাপ করিস না নগেন। আমরা আসব মাঝেমাঝে। এই ঘর তোর নামে করে দিতে হবে ওদের। ছাড়ব না কাউক্কে। ঝিমলি চা বিস্কুট ধরে দিয়েছিল সামনে তারপর ঠান্ডা গলায় বলেছিল “আমি কথা বলে টাকা যা পাব নিয়ে আসব। এ তো ফ্যাক্টরির বস্তির ঘর না যে ঘর আমাদের দিয়ে দেবে অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে বলে। আপনাদের কষ্ট করতে হবে না। আর ওরও এখন একটু বিশ্রাম দরকার। ক’টা দিন যাক। পরে কিছু দরকার হলে আমিই আসতে বলব ‘খন”। সুর যেন কেটে গেল একটু। বন্ধুরা গা মোড়ামুড়ি দিয়ে আচ্ছা, চলি রে বলে চলে গিয়েছিল।সবাই চলে যাওয়ার পর ঝিমলি নগেনের দিকে তাকিয়ে বলেছিল “হুজ্জুতে লোকজন সব। কাজে তো লাগবে না কেউ শুধু বদ মতলব। টাকা যা দেবে তা কারুর মারফতে নেওয়ার দরকার নেই আমাদের” সেদিন প্রথম নগেন টের পেয়েছিল কতটা অক্ষম হয়ে গেছে সে।
পেয়েছিল কমপেনসেশন। ইউনিয়নের পাইকবাবু নিজে থেকে কিছুটা সাহায্য করেছিলেন বটে। তবে সামান্য সে টাকার অনেকটাই নগেনের ওষুধপথ্যিতেই চলে গেছে। বাকি গেছে সংসারে। ডাক্তার বলেছিলেন চিকিৎসার তো শেষ নেই। পুষ্টি আর ফিজিওথেরাপি করে নকল পা লাগানোর উপযুক্ত মাসল তৈরি করতে পারলে পরে সেও চেষ্টা করা সম্ভব। কিন্তু ওইটুকু টাকায় এত জোর ছিলনা যে থাইয়ের মাসল তৈরি হবে। তাই ঘা সারানোর মত ওষুধ ইঞ্জেকশন আর বসে থাকার মত জোর আনতে কোমরে কবিরাজি তেল মালিশ অব্ধিই দৌড় ছিল ওদের। ওই মালিশের তেল কিনতে গিয়েই ঝিমলি একদিন দেখেছিল লাইটপোস্টে সাঁটা বিজ্ঞাপন – ঘরে বসে উপার্জন। মাস গেলে তিনহাজার। তারপর কোন মন্ত্রবলে যে এই পেঁপেপাতার ছায়ায় রাখা ভাতটুকু জুটতে শুরু করল তা নগেন নিয্যেস জানে। কাজটা কঠিন নয়। চিকমিকি কাগজ দিয়ে রঙিন মালা গাঁথা। ওই মালা ঠাকুরের গলাতেও যায় আবার দূর পাল্লার ট্রাক, বাসের সামনেও ঝোলে। খুব চাহিদা বাড়ে শ্রাবণ মাসে। লোকে বাবার মাথায় জল ঢালার বাঁকেও জড়ায় মালা। পঁচাত্তরটা মালা গাঁথলে দশ টাকা। তিনহাজার টাকা রোজগার করতে মাসে কত মালা গাঁথতে হয়? নগেন হিসেব করতে পারে না অত। তবে ঝিমলি দুবেলা খেতে যে দেয় তা মানতেই হবে। গুছুনিও সে খুব। একবার চা করে চা পাতা ফেলে দেয় না। রোদ্দুরে মেলে শুকিয়ে রাখে। সেই পাতা দিয়ে আরও ক’বার চা বানায়। রং আর স্বাদ সমানুপাতে কমতে থাকে, কিন্তু ঝিমলি হার মানেনা। বাতাসা আর আদার খোসা দিয়ে ফুটিয়ে নেয়। কোনোদিন দুপুরের ভাতের ফ্যানটাই রাতে আলুসেদ্ধ আর নুন দিয়ে খায় দুজনে। মোটকথা বেরোজগেরে নগেনকে খালি পেটে ঘুমোতে হয় না এইই কি যথেষ্ট নয়?
নগেনের মনে পড়ে খাঁকি পোশাকে বন্ধুদের সাথে ফ্যাক্টরিতে ঢোকার মুখে সদানন্দদার দোকানের চায়ের কথা। আদা গোলমরিচের চা ঠান্ডার দিনে। ভোরের শিফটে সে চা ছিল অমৃত। কখনও লেবু আর বিটনুনের চা খাওয়াত সদা-দা।
ভাবতে ভাবতেই এক কাপ চা আর কটা সবজি বসিয়ে দিয়ে যায় ঝিমলি। চড়াইগুলোর কিচিরমিচিরের মধ্যে বসে ছুরি দিয়ে সব্জি কাটে নগেন। ওদিকে ঘরের দরজাটা ঠাস ঠাস করে খোলা বন্ধ করে ঝাঁট দেয়, মোছে ঝিমলি। গেরস্থালি এসব আওয়াজগুলো মনে করিয়ে দেয় নগেনের স্বপ্ন ছিল যেমন করে হোক একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেবে একদিন। একটা ঘর, কলঘর, ঘরের লাগোয়া বারান্দার একদিক ঘিরে রান্নার জায়গা। আর তারই উল্টোদিকে দুটো চেয়ার, একটা মোড়া। বিলু, স্বপন, তারকরা আসবে ছুটির দিনে। মাসে একদিন মাংস। দুপুরে তাস। খেলতে খেলতে জল খেতে ঘরে উঠে যাবে নগেন। সারা দিনের কাজের ধকল সেরে বউ ঘরে ফ্যান চালিয়ে এলোমেলো হয়ে আয়েস করবে সে সময়। নগেন জলের আছিলায় ঢুকে বউয়ের বুকে একটু হাত রাখবে। চুমু খাবে অল্প ফাঁক হওয়া ঠোঁটে, তারপর আবার তাসের আড্ডায় গিয়ে বসবে। সে বাড়ির দরজায় আলাদা একটুকরো কাঠে নাম লেখা থাকবে ঝিমলি দাঁ, নগেন দাঁ।
এই আঁটিসুটি স্বপ্নটার কথা বিয়ের মাস দুয়েক পরে মুড়ি চিবোতে চিবোতে নগেন বলেছিল ঝিমলিকে এক কুয়াশা মাখা ভোরে। ততদিনে বউয়ের গন্ধ জড়িয়ে গেছে নগেনের গায়ে। বউয়ের কপালের লাল টিপের দিকে তাকিয়ে নগেন চাঁদ দেখতে শুরু করেছে আহ্লাদে। যদিও ফ্যাক্টরির ধোঁয়া ওদের লাগোয়া বস্তির ঘরগুলোকে মুড়ে রাখত এবং অনভ্যাসের সে ধোঁয়ায় ঝিমলির চোখ জ্বালা করত সারাদিন, তবু ঝিমলি আর নগেন আদরে সোহাগে গুছিয়েই তুলছিল সংসারটুকু। দরজায় দাঁড়িয়ে বউকে একবার দেখে নগেন বেরিয়ে গেলে ঝিমলি বেণী খুলত হালকা হাতে। চুলের গোড়ায় অল্প তেল ঘষতে ঘষতে আলাপ করত আশেপাশের বউ ঝিদের সঙ্গে। কদিন পরেই দেখা গেল কলঘরের দখল নিয়ে মেয়েমানুষের ঝগড়ায় সে ধীরে ধীরে সড়গড় হতে শুরু করেছে। বালতি, জারিকেন, প্লাস্টিকের কলসি নিয়ে জলের মালিকানা বুঝতে শিখছিল ঝিমলি, শিখছিল মায়ের বয়সী বানীবউদির কাঁচা রসিকতায় হাসতে, এমনকি পাশের ঘরের কমলার ছেলের যেখানে সেখানে প্যান্ট নামিয়ে বসে পড়াও প্রায় মানিয়েই নিয়েছিল শুধু রাতে জানলা দিয়ে আসা নর্দমার গন্ধ ঝিমলিকে কিছুতেই খোলামেলা হতে দিচ্ছিল না তখনও।
পাটভাঙ্গা ঝিমলির গন্ধবাতিক যে ভালোই তা নতুন বউকে নিয়ে বাজারে গিয়েই বুঝেছিল নগেন। কিছু জিনিস যা বিয়ে না হলে পুরুষ কেনেনা, সেইসব চাকি বেলনা, আটা চালুনি, ছোট শিলনোড়া, একটা জলের জাগ, চাটু, ভাঁজ করা ফ্রেমে লক্ষ্মী, কালী আর মহাদেব একসাথে তিন ঠাকুরের ছবি কিনেছিল ঝিমলি ঘুরে ঘুরে। তারপর কিনল ধুপ, সাবান আর গায়ে মাখার পাউডার। বাড়ি ফিরে বিয়েতে পাওয়া নতুন চাদরের একখানা খুলে বিছানায় মেলে দিয়েই কী খুশি! ঘরের এই কোণ থেকে দেখে, ওই কোণ থেকে দেখে। সত্যি বলতে কী ঘরটার চেহারাই যেন পাল্টে গেছিল। নগেন অবশ্য তাও বলেছিল তুলে রাখতে। ভাল দিনটিন দেখে বাড়িতে কেউ এলে না হয় পাতা যেত। ঝিমলি শোনে নি। হেসে বলেছিল আমার বাপু ঘেন্না করে পুরোনো হাজামজা চাদরে শুতে। কতদিনের চাদর! তেলাপোকার গায়ের গন্ধ যেন। থাক, কালই ভালো করে কেচেকুচে নেব। পরের দিন ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে নগেন দেখেছিল পুরোনো চাদরটি চার চৌকো ভাঁজ করে পুরোনো বালিশের ওয়াড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে সেলাই করে পাপোষ বানিয়ে ফেলেছে তার আটপৌরে বউ। বড় অহংপ্রবণ কটা দিন এসেছিল তার ভাগ্যে। এজমালি কলে হাত পা ধুয়ে সে ঘরে এসে বসত এক কাপ চা নিয়ে। ঝিমলিও গা ধুয়ে পাউডার ছড়িয়ে সন্ধের ধুপটি জ্বেলে মুখখানা উঁচু করে শাঁখে ফুঁ দিয়ে সন্ধে নামাত। সেদিকে তাকিয়ে নগেন মুগ্ধ হয়ে ভাবত তারও তবে সংসার হল।
রাতে রুটি আর পাঁচমিশালি ডাল রান্না করত ঝিমলি। দু চারটে সব্জি দিত ডালে। কখনও ডিম ভেঙ্গে মিশিয়ে নিত। বলত আজ ডিম তর্কা মেনু। খেতে বসে বেছে বেছে সব্জি, ডিম নগেনের পাতে তুলে দিত। কিন্তু কিছুতেই কাঁচা পেঁয়াজ খেতে দিত না ঘরে। বলত বন্ধ ঘরে পেঁয়াজের গন্ধ ঘোরে। আমার ঘুম আসে না। এদিকে জানলাও খুলতে দেবেনা নর্দমার গন্ধ সহ্য হয় না বলে। এইসব দিনেই ঝিমলিকে বলেছিল নগেন জানো, আমার শখ ছিল বৌ হলে তার আর আমার নাম গায়ে গায়ে ওপর নিচে করে লিখব একটা কাঠে। লাগাব বাড়ির দরজায়। পুরো স্বপ্নটুকু বলতে পারেনি। কে জানে কদ্দিনে সে সব হবে। তা সেই ফলকের স্বপ্ন ঝিমলিরও দিব্যি লেগেছিল। ফিক করে হেসে বলেছিল সে তো বেশ হয়। বানিয়ে এনে লাগিও। পাশাপাশি একরকম এতগুলো ঘরের মধ্যে কোনটা আমাদের ঘর চিনতে পারবে সবাই।
সবজি কাটতে কাটতে সেই বস্তির ঘরখানা, কারখানার সাইরেনের আওয়াজ, নর্দমা ভর্তি ফ্যাক্টরির রঙ মেশা নোংরা জলের ভাবনার মধ্যে ডুবে যেতে যেতে নগেন শুনতে পায় বাইরের দরজার আওয়াজ। অবতার সিং এসেছে। অবতার সিং নামটা শুনলে যেমন মাসলওলা দামড়া টাইপের একটা ছোঁচাগুঁফো লোক মনে হয় লোকটাকে দেখতে একেবারেই তেমন না। বরং একটা খুনখুনে ক্ষয়াটে ছিঁচকে চোরের মত দেখতে। দরজার আওয়াজে ঝিমলি আঁচলে হাত মুছে বেরিয়ে আসে। হাসি মুখে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসায় লোকটাকে। এই ঘর অব্‌তারেরই ঠিক করে দেওয়া। ওই মালা গাঁথার কাজ ওইই দেয় ঝিমলিকে। বস্তির ঘর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না যখন তখনই অবতার আসে ওদের জীবনে।
ঝিমলি বলে সিংবাবু আমার মালিক। মালিকের মতই মাথা উঁচু করে আসে যায় লোকটা। মাঝে মাথা নিচু করে থাকা নগেনের দিকে তাকায় না পর্যন্ত। নগেন জানে অবতার সিং-এর সামনে ও আর কোনোদিন মাথা তুলতে পারবে না। সেই যে সেদিন, মেশিন পড়ল ওর পায়ে… থেঁতলে গেল থাইয়ের গোড়া থেকে, সেইদিন এক মুহূর্তের জন্য মাথা নিচু করে কেটে নেতিয়ে পড়া পা-টা দেখতে পেয়েছিল নগেন। তারপর আর জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান এল দুদিন পর। চোখ খুলে হাসপাতালের বেডে শুয়ে শরীরে নিচের দিকেই তাকিয়েছিল নগেন। সেই থেকেই নিচের দিকে তাকানো অভ্যেস করে ফেলল। তাই আজও ঝিমলি যখন সিংবাবুকে ওর মালিক বলে তখন দাঁতে দাঁত চিপে ওর বাদ পড়া পা দুটোকে খুঁজতে থাকে। কানে বাজে ওর বন্ধুদেরকে নিয়ে বলা ঝিমলির কথাগুলো “বদ মতলব”। তবে এই ভালো হয়ত। পাঁচটা নরম গাছে দড়ি বাঁধার বদলে একটা বড় গুঁড়িতে দড়ি বেঁধেছে ঝিমলি। বাঁধতে তো হতই।
ঘরের ভেতরের আওয়াজ বাইরে অব্ধি শোনা যায় না। তবে একটু পরেই দরজায় শব্দ করে বেরিয়ে আসে ঝিমলি। চুল এলোমেলো, হলুদ ব্লাউজ সেঁটে আছে ঘামে। নগেন খর দৃষ্টিতে দেখে। এই ঘাম ওই চুল নগেনের ছিল একদিন। দেখতে দেখতে কাটা সব্জির পাশ থেকে ছুরিটা তুলে নেয় হাতে। মালিকও বেরিয়ে আসে একটু পরেই। হেসে কি যেন বলে ঝিমলিকে। শোনা যায় না যদিও তবে দেখা যায় ঝিমলির হাসি উপছে উঠছে। রাগে হিংসায় নিজের হাতে চেপে ধরতে গিয়ে ছুরিটা বসে যায় মাংসে। সাদা আঠালো কচুর মুখির ওপর ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে পাশে গড়িয়ে যায় যেভাবে ঝিমলি বিছানায় গড়িয়ে সরে যায় নগেনের বুকের কাছ থেকে ধারের দিকে। ছুরিটা টেনে বার করতে গিয়ে যেন একটু বেশিই লাগে হাতে অথবা শুধুমাত্র অবতার সিং-এর সামনে নিজের অস্তিত্ব তুলে ধরতেই বোধহয় নগেন হাতের দিকে তাকিয়ে আহহ্‌ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। ঝিমলি সেদিকে না তাকিয়ে সিংকে জিজ্ঞেস করে, চা খাবেন তো?
মাঝখান থেকে হাত ঝাড়ার দরুন আরও একটু রক্ত বেরিয়ে বাকি কেটে রাখা সবজির ওপরে ছিটিয়ে যায়। লাল সাদার এই সমারোহে নগেনের মনে পড়ে বস্তির মায়াদি আর ওর মা কেবল লাল পাড় সাদা শাড়ি পরত। মায়াদির বাবা ওদের ফ্যাক্টরির কুলি ছিল তবে কাছাকাছি নিম্নবিত্ত মানুষদের বারোয়ারী পুজোয় পুজোও করত ফলে নৈবিদ্যের চাল কলা আর প্রণামীর শাড়ির সুখ সুবিধা ছিল ওদের ঘরে। এই এক সুবিধা নগেনের। এক ভাবনা থেকে অন্য ভাবনা সেখান থেকে আর এক ভাবনা করতে করতে বেলা কেটে যায়।

কে জানে কতক্ষণ পরে ঝিমলি অবতার সিংকে দরজা অব্ধি এগিয়ে দিতে আসে। নগেন তখন ঢিবিতে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে ভাবছে সেদিন, ফ্যাক্টরি যাওয়ার আগে খেতে বসেছিল যখন, ঝিমলি আর দুটো ভাত নিতে সাধছিল কত! নিতই না হয় দুটো ভাত আরও। খেতই না হয় একটু বেশিক্ষন ধরে। ঘড়ি ধরে হাজিরা দেওয়ার বদভ্যেসে ভাদুয়ার বাড়িয়ে দেওয়া বিড়িটাও সেদিন হাতে নেয় নি। যদি দুটো টান দিয়ে গেটে ঢুকত, তাহলেই ওর পায়ে এসে পড়ত না তো মেশিনটা। তাহলে তো ঝিমলি এই রক্তঝরা হাত উপেক্ষা করে চা খাওয়াতে বসত না অবতার সিংকে। ভাবতে ভাবতেই বুঝি মৃদু বিষাদ ফুটে ওঠে নগেনের ঠোঁটে। ওদিকে দরজাটা বন্ধ করে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে ঝিমলি। নিচু হয়ে সামনে থেকে সবজির থালা আর ছুরি তুলে নিয়ে তেজে ঝামরে উঠে বলে “একটা কাজ কী রক্তগঙ্গা না বইয়ে পার না করতে?” নগেন উপেক্ষা করে এই মুখঝামটাটুকু যেভাবে একটু আগে অবতার সিং ওকে উপেক্ষা করেছিল কিন্তু ঝিমলির বোধহয় মনে পড়ে সেদিনের সেই রক্তগঙ্গার কথা, গলায় সেই পুন্নিমের মায়া এসে যায়। হাতটা ছুঁয়ে জিজ্ঞাসা করে লেগেছে খুব? দেখি… তারপর আলতো করে জিজ্ঞাসা করে চা খাবে একটু? বেঁচেছে”
নগেনের বুকের ভেতরটা যেন ইলিবিলি দিয়ে নেচে ওঠে। ঝিমলি তবে ওর হাতের কাটাটুকু দেখেছে! ঝিমলির তবে একটু হলেও কষ্ট হয়েছে নগেনের এই রক্তক্ষয়টুকু দেখে! ব্যাস ওতেই হবে। ওই দেখাটুকুতেই নগেনের মুখে মিষ্টি স্বাদ ছড়িয়ে যায়। কাঠফাটা রোদ্দুরের নিচে শুয়ে ঝিমলির গলার মহার্ঘ্য মায়াটুকু তুলে নিয়ে সামান্য চায়ের লোভটুকু ফিরিয়ে দেয় নগেন অনায়াসে।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...