প্রশ্নচিহ্ন
মৌমিতা ঘোষ

বাড়ি বদলাতে হবে। বাড়িওয়ালা নোটিশ দিয়েছেন। কোন ঝগড়াঝাঁটি নয়। জাস্ট এমনিই। বলছে তো নিজের ছেলে ফিরে আসছে, তাই ঘর লাগবে, ভগবান জানে কী কারণ!
মেজাজটা খিঁচড়ে আছে মধুমিতার। বয়স বাড়ছে। তেতাল্লিশ পূর্ণ হবে কদিন পরেই। এই ধকল আর সহ্য হয়না। আর ভাড়াবাড়িতে থেকে এত জিনিস কারো থাকে? উফফ্।
দালালকে ফোন করলো।
“হেলো বিল্লু , বাড়ি বদলাতে হবে, দেখাতে থাকো, কাল থেকেই…
“ওখানে কী হল?”
“দু’বছর তো হল। এবার উঠে যেতে বলেছে। থ্রি বেডরুম ছাড়া হবেনা আমাদের। জানোই তো।”
বিল্লু অপর প্রান্তে বাড়ির খোঁজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখে দেয়।

এখনো সময় আছে হাতে। ছেলের আইসিএসসির রুটিনটাও দিচ্ছে না বেটারা। মধুমিতার বিরক্তি বাড়ে। শরীরটা আজকাল একদম ভালো যায়না। নিজের মৃত্যু এভাবে নিজে কেউ কামনা করতে পারে, তাও আবার রোজ রোজ, ও নিজেকে না দেখলে বিশ্বাসই করতো না। ওর একদম বাঁচতে ইচ্ছে করে না। ও খুব ক্লান্ত। ভীষণ ক্লান্ত। একটানা সংসারের বোঝা টানতে টানতে ক্লান্ত। অনর্থক একটা সংসারের। রোজগার করতে করতে ক্লান্ত। লোকে আরো বেশি রোজগার করতে চায়। ও আর চায়না। ওর রোজগার ওর নয়। বারোভূতের শ্রাদ্ধের। তাই বেশি করলেও ওরাই খাবে, কম করলেও ওরাই খাবে। ওর কাছে মায়া হয়ে টাকা আসে, মায়া কেটে যায় মাসের প্রথম সপ্তাহেই।

একটা বাড়ি খুঁজতে হবে। কী থাকলে বাড়ি হয়? খাট, বিছানা, ফার্নিচার? মায়া, মমতা, ভালোবাসা? একটা ছাত? মশলার গন্ধ? ওয়াশিং মেশিনের ঘড়ঘড়? ওর জানা নেই। ওর বাড়ি নেই। বাড়ি বানানোর ইচ্ছে নেই। নতুন একটা জায়গায় যায়, ওর জীবনে ওটাই পরিবর্তন। ঘরগুলো বদলায়, বাথরুমের অ্যাকসেসরিজ বদলায়, দুএকটা ফার্নিচার ভাঙে, দু একটা নতুন বানানো হয়। জানলায় বিপরীত দিক থেকে আলো আসে, আর কোন জায়গায় কমন ছাতে থাকে ফুল, কোথাও শুধুই জামাকাপড় মেলার তার, সব জায়গায়ই ওই ছাতটির নিচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে মধুমিতা। আকাশও বদলায়। হুঁ। বদলায়। ওর আকাশের রঙ কেমন পাল্টে গেছে বারবার। ঋতমকে বিয়ে করেছিল ভালোবেসে। ভালোবাসা প্রমাণের জন্য বিয়ের পরেই জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে বলা হয়, মধুমিতা খোলেনি বলে অন্ততঃ এটা প্রমাণিত হয়েছে যে ভালোবাসা নেই। এতে যদিও তেমন কোন বদল হয়নি জীবনের। বিয়ের তিন বছর পর থেকে ধীরে ধীরে ব্যবসার হাল খারাপ হতে হতে বন্ধ হয়ে গেল। ব্যবসা যখন খুব ভালো চলছিল, ঋতম কাকুতি মিনতি করলো, “তুমি তো চাকরি করো, আমি তো আইটি ফাইলে বেশি দেখাই না, আর আমার ক্রেডিট স্কোরও খারাপ। তুমি নাও লোন, আমার একটা জিনিস কিনতেই হবে এ ব্যবসায়, আমি ইএমআই দিয়ে দেবো মাসে মাসে।” লোন নেওয়া হল। প্রথম ইএমআই টা দেওয়ার পর আর কোনদিন ইএমআই এর এক টাকাও দেয়নি ঋতম। মধুমিতা গোটা সংসার ঘাড়ে করে টেনেছে, আবার ইএমআই দিয়েছে। পার্সোনাল লোনে তো হাই ইন্টারেস্ট রেট। লোন শোধ করেই দিয়েছিল, ক্রেডিট কার্ডটা ঘেঁটে গেল দু’বার সংসারের প্রয়োজনের চাপে। যখন ব্যাঙ্কের লোকেরা ওর নতুন অফিসে খুঁজে খুঁজে ঠিক পৌঁছে গেল, সম্মান বাঁচাতে সেটেলমেন্ট এ আসতে হল। দুটো ব্যাঙ্ক মিলিয়ে প্রায় এক লাখ টাকা দিতে হল। বহু নিগোশিয়েট করে সেটা তিনটে ইনস্টলমেন্টে করেছিল মধুমিতা ‌। শ্বশুর, বর সবাইকে অনুরোধ করেছিল কিছু টাকা দিতে, শ্বশুর তার নিজের ছেলেকে বেশ কয়েকবার টাকা জোগাড় করে দিয়েছেন, কিন্তু বৌমাকে দিলেন না। বৌমা ধার চেয়েছিল, শোধ করে দিতো। বর তো সবসময় হাত তুলেই আছে। এরকম সব বিশ্বাসঘাতকতা পেরিয়ে আজ ও যে বেঁচে আছে, সেটারই কোন কারণ খুঁজে পায়না মধুমিতা। একটা আলো ভর্তি বাড়ি খুঁজতে থাকে। ওটাই ওর একমাত্র ক্রাইটেরিয়া থাকে প্রতিবার। এখন যে বাড়িটায় থাকে, সেটায় ঘর লাগোয়া একটা ছাদ আছে। এক্কেবারে নিজেদের । পরের বাড়িতে এরকম ভাবে ‘নিজের ছাত’; ‘নিজের আকাশ’ ভেবে ভেবে এত বছর গেল। ভালোই লাগে এখন। কেমন একটা উদাসীন জীবন। যেখানে যাই, সেখানে ঠাঁই। কিছুই সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায় না, তবু মানুষ ‘আমার, আমার ‘ করে। ওর বলে কিছু নেই এ সংসারে, এটা সারসত্য বুঝেছে। কোন অ্যাসেট বানাতে চায়না ও। যত জিনিস হবে, তত আটকে থাকবে এ সংসারে। কে চায়? ওর ছোট থেকে ইচ্ছা,ট্র্যাভেলর হবে। ছেলের প্লাস টু টা হয়ে গেলে বেরিয়ে পড়বে।

বাড়ি দেখার কাজ শুরু হল। মধুমিতা জানে অপরপক্ষের উপর নির্ভর করে লাভ নেই।প্রথম বাড়িটা বেশ সুন্দর। একটা বাথটাব আছে। বহুদিনের সখ ওর ওরকম একটা বাথটাব থাকবে। মধুমিতা তো ভেবেই ফেললো, এখানে কী কী রাখবে, বাথসল্ট, বডি ওয়াশ, বডি বাবলস, এসেন্সিয়াল অয়েল, বিভিন্ন রকমের সুগন্ধি ইত্যাদি। বাথটব আর বাকি বাথরুমের মধ্যে পর্দাটিও ও দেখতে পেলো মানসচক্ষে।

নিজেই হাসে ও। তারপর বাড়িওয়ালার ফোন নম্বর নেয় দালালের থেকে। এ বিল্লু নয়। এ হল দালাল ভায়া দালাল। তারপর ফোন করে। ভদ্রমহিলা বলেন কুড়ি হাজার টাকা ভাড়া। শুনেই বাথটাবের ছবিটা দ্রুত মুছে দেয় মধুমিতা মন থেকে। “কী বলছেন ম্যাডাম? যে বাড়িতে আমি থাকি তার চেয়ে অনেক ছোট আপনার ফ্ল্যাট। কুড়ি হাজার কী করে বলছেন?”
“কত লোক তো নিতে চাইছে। আর তাছাড়া আমি আপনাকে এখন প্রমিস করতে পারবোনা, আগে থেকেই আমার এক বন্ধু নেবে বলে রেখে বলেছে। ও যদি পরশু অবধি না নেয়, তবেই আপনার সঙ্গে কথা বলা যাবে।”
“আপনি ওঁকেই দিয়ে দিন ম্যাডাম। বাই।
শালা তোর ওই পুঁচকে ফ্ল্যাট শুধু বাথটাবের জন্য আমি নেবো নাকি কুড়ি হাজার দিয়ে? ন্যাকা! এত লোক রাজি তো দিচ্ছিস না কেন?”

পরের দুদিন আরো চারটে বাড়ি দেখলো মধুমিতা। এর মধ্যে একটা ঠিকঠাক। অনেকটা বড়। পাশে একটা বড় মাঠ। ওখানেই দুর্গাপুজো আর অন্ততঃ চারটে বড় মেলা হয়। মাইকের অত্যাচার সহ্য করতে হবে তখন, এটাই নেগেটিভ পয়েন্ট। কিন্তু ফ্ল্যাটটা দারুণ। আরেকটা ফ্ল্যাট ওর এখনকার বাড়ির একদম পাশেই ছিল। কিন্তু তার পাশেই একটি ক্লাব যেটা বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ সবেতেই ভাড়া দেওয়া হয়, এছাড়া যতরকমের অনুষ্ঠান হতে পারে, রক্তদান শিবির থেকে নন্দীগ্রাম দিবস, সব অনুষ্ঠিত হয়। ওই বাড়িটা দেখেই রিজেক্ট করলো মাইকের অত্যাচারের ভয়ে।

এবার এলো অপরজনের দেখার পালা । শর্টলিস্ট করা বাড়ি দেখে উনি ফাইনাল মতামত দেবেন। তিনি দেখলেন। তারপর দুটো বাড়ি স্থির করা হল, এর একটা ফাইনাল করা হবে। একটা ওই মাঠের পাশের বড় ফ্ল্যাটটা। আরেকটা একদম নতুন একটা ফ্ল্যাট, কেউ ঢোকেনি এখনো, এখনো ইলেকট্রিকের কাজ চলছে। কিন্তু বাড়িটায় ঢুকতে গেলে গলিটা ভীষণ নোংরা। বাড়ি ফেরার ইচ্ছেটাই থাকবে না। অথচ ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর। আর একদম নতুন, আনকোরা।

সবদিক ভেবে ওই মাঠের পাশের বাড়িই ফাইনাল হল। প্রথমে পাঁচ হাজার ট্রান্সফার করে বুক করে রাখলো মধুমিতা। যেই পাঁচ হাজার দেওয়া হয়ে গেল, বর বললো, “তুমি তাড়াহুড়ো করলে তো, ফেব্রুয়ারি মাসে আমার কাছে কোন টাকা আসবে না। তুমি ম্যানেজ করে নিও।”
“সদ্য ছেলেকে ইলেভেনে ভর্তি করার নব্বই হাজার টাকা দিয়েছি। আমি কি টাকার পাহাড়? “
“তবে করলে কেন তাড়াহুড়ো?”
“আচ্ছা।”
মধুমিতা তক্ষুণি ফোন করে ম্যানেজ করে নিল বাড়িওয়ালাকে যে মার্চেই শিফ্ট করবে।এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে সিকিউরিটি ডিপোজিটের তিরিশ হাজার দুভাগে দিয়ে দেবে।
ফোন শেষ করে বরকে খবর দেয়, “মার্চেই শিফ্ট করবো। আশা করি তোমার টাকা এসে যাবে।”
বরের মুখটা ছিল দেখার মতো।

এবারে একে একে প্যাকারস, এসি, ওয়াটার পিউরিফায়ার, চিমনি সব আনইন্সটল করে ইন্সটল করার লোককে কনট্যাক্ট করার পালা। মধুমিতা করলো। তারপর নিগোশিয়েশন চললো। ক’দিন ধরেই চলছে শরীর খারাপ। একটা আশ্চর্য ইনফেকশন যোনি পথে। কী যে কারণ সেটাই বুঝতে পারে না মধুমিতা। সেক্স নেই জীবনে। তাতেও এত বিপত্তি! এ সমস্যা বহুদিন ধরে চলছে। আজ অসহ্য হয়ে উঠেছে। যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে তলপেট। আর পুরো ভ্যাজাইনাল পাথটায় জ্বালা, মধুমিতা ঘুমোতে পারছে না কিছুতেই। আগেই এর জন্য যে অ্যান্টিবায়োটিক পুশ করতে হয়, দুটো নিয়ে নিয়েছে। আজ আবার নেওয়া ঠিক হবে না। ডাক্তার তো একটাই দেয়। যন্ত্রণায় পাগল হয়ে যাবার জোগাড়। এতবার উঠছে, ছটফট করছে, বাথরুমে যাচ্ছে, বর একবারও টের পাচ্ছে না? মধুমিতা জানে এইসব সময়ে মানুষ নির্লজ্জ রকম উদাসীন থাকতে পারে। ভোরবেলা যন্ত্রণা আর সহ্য না করতে পেরে ধাক্কা দিয়ে ডাকলো বরকে, বললো ,”আমি আর সহ্য করতে পারছি না, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো।”

বর শুনে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘুমিয়ে পড়লো। মধুমিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ ঋতমের দিকে। তবে বেশিক্ষণ নয়। যন্ত্রণাটা সহ্যের বাইরে। পাগলের মত ফোন করতে থাকলো সব চেনা ডাক্তারকে। ভোর ছটা। কেউই ধরলো না। তারপর এক চেনা ডাক্তার দিদি ফোন ব্যাক করলেন, রিনাউনড গাইনিকোলজিস্ট। অ্যাপয়েন্টমেন্ট হল দুপুর একটায়।

এদিকে মধুমিতার অফিসের দুটো গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে দুপুরে। ডাক্তার দিদি বললেন , “ঠিক একটায় চলে এসো।” মধুমিতা সেই বুঝে‌ আড়াইটেয় একটা কল রাখলো অনলাইনে। সোয়া তিনটেয় একটা। দুটো বেজে গেল, ডাক্তার এলেন না। ঠিক দুটো পঁচিশে ঢুকলেন। ততক্ষণে ওখানে বসেই ভিডিও অফ করে কলে সবে লগ ইন করেছে মধুমিতা।

ডাক্তার সব শুনে বললেন ক্যান্সার অ্যান্টিজেন টেস্ট আর প্যাপ স্মেয়ার টেস্ট করাতে। আর কয়েকটা রুটিন ব্লাড টেস্ট। মধুমিতা বললো, “এখনই করে নিই? আরেকদিন আসা চাপ, এত কাজের মধ্যে।”
দিদি বললেন, “হ্যাঁ, ওদের সঙ্গে বাইরে কথা বলে নাও।”
মধুমিতা জুম কল চালিয়ে ভিডিও অফ করেই টেস্ট করালো। খুব আশ্চর্য লাগছিল যে প্যাপ স্মেয়ার টেস্ট হচ্ছে আর একটু দূরে টেবিলে ল্যাপটপ রাখা। ওইটুকু সময় ও অন্যজনকে একটা কিছু বলতে দিয়েছিল।
ক্লিনিকের সবাই খুব অবাক না বিরক্ত হয়ে তাকাচ্ছে ও বুঝতে পারছে না। বেরিয়ে খুব কান্না পেলো ওর। সত্যি যদি ক্যান্সার ধরা পড়ে?

ও তো মরতেই চেয়েছে। এতদিন পরে একটা সুযোগ যখন এসেছে তখন তো খুশি হওয়াই উচিৎ। কিন্তু আর দুটো বছর বাঁচতেই হবে আর চাকরি থাকাকালীন মারা যেতে হবে। যতই অসুস্থ হোক চাকরি গেলে চলবে না। ছেলের বারো ক্লাসের পরীক্ষা হয়ে গেলে ওকে একটা ঠিকঠাক কোন কোর্সে ঢোকাতে হবে ভালো ইনস্টিটিউশনে। তার আগে মরলে ছেলেটা ভেসে যাবে। আর চাকরি করতে করতে মরতে হবে কেননা ওর সিটিসির বারো গুণ হল ওর ইনসিওরেন্স কভার কোম্পানি থেকে। মানে, এক কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা। ওর ব্যক্তিগত ইনসিওরেন্স কভার এক কোটি। সব মিলিয়ে দুকোটি কুড়ি লক্ষ টাকায় ছেলের পড়াশোনা, ভালো একটা জীবন তৈরি হয়ে যাবে। ছেলে আঠেরো হবে দু-বছর পরে। তখন ওকে নমিনি ক’রে তবে ওর মরে শান্তি।

হাসি পেয়ে যায় মধুমিতার , এতদিন রোজ মরতে চেয়ে এখন এত ক্যালকুলেশন? তারপর আবার চোখে জলও আসে। ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে বরকে ফোন করলো। ফোন তুলতেই গড়গড়িয়ে সব বলে গেল মধুমিতা। ওপার থেকে উত্তর এলো,”এখন ইলেকট্রিকের কাজ করাচ্ছি, বাড়ি এসো ,তারপর কথা বলবো।” রাগে, দুঃখে কেঁদে ফেলে হাউহাউ করে মধুমিতা। বাড়ি ফেরে। চারদিন বাদে রিপোর্ট দেবে। কাল বাড়ি বদলের দিন। মধুমিতা ফেরার বহু পরে ঋতম ফেরে। কথা তো হয়ই না। বরং সামান্য বিষয়ে অসহ্য আচরণ ক’রে, ছেলের সঙ্গে তুলকালাম হয়।

পরের দিন সব শুনে ঋতম নির্বিকার বলে, “ও, কিছু হবে না তোমার, আমি নিশ্চিত। চাপ নিও না।”
সকাল থেকে খাটনি, বাড়ি বদল। যুদ্ধ চলছে। প্রতিবার বদলানোর সময় একগাদা অপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে দেয় মধুমিতা। এবারেও বাতিল জিনিস স্তূপ করেছে। তাতে জামাকাপড় থেকে, টেবিল ল্যাম্প ,বইপত্র ও আছে। যে লোকটি পরিস্কার করে দিয়ে যাবে ঘর তাকেই দেবে। কিছু পরিচারিকাদের দিয়েছে। সারাদিন ধরে চলছে এ বাড়ি, ও বাড়ি। অক্লান্ত পরিশ্রম। শরীর আর দিচ্ছে না মধুমিতার। হঠাৎ তারস্বরে চিৎকার ঋতমের। “তোমার আক্কেল কবে হবে?”
“কেন?”
“এটাও দিয়ে দিয়েছ? এটা আমাদের বিয়ের জোড়।”
“ও। খেয়াল করিনি।”
“খেয়াল করোনি মানে? বিয়ের জোড় কেউ দেয়?”

ওই একই কথা কতরকম ভাবে যে বলল ঋতম! মধুমিতা বুঝলো যে বিয়ের জোড় ওর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সেদিন রাতে হাক্লান্ত সবাই ঘুমিয়ে পড়লো। দোকান থেকে খাবার এনে খাওয়া হয়েছিল। পরের দিন সকালে উঠে পা ফেলতে পারছে না মধুমিতা। কিন্তু কাজ তো করতেই হবে। ওর সমস্যা আবার কে কবে শুনেছে? তলপেটে ও বেশ ব্যথা।
একসময় কেঁদে ফেলে মধুমিতা বলে, “আমি আর পারছি না কাজ করতে। আমি মরে যাবো।”
“ঢঙ ক’র না। টেনশন করছো বলে বেশি শরীর খারাপ করছে। টেনশন ক’র না। ঠিক হয়ে যাবে।”
“পরশু রিপোর্টটা তুমি এনে দেবে তো?”
“দেবো, এখন তাড়াতাড়ি হাত চালাও।”
“স্বার্থপর,” বলে বইয়ের তাক গোছাতে বসে মধুমিতা।‌ এত বই কেন, এটা ঋতমের বরাবরের রাগের কারণ। তা নিয়ে খুব একচোট ঝগড়া হয়ে গেল এখন।

পরের দিন সারাদিন গোছগাছ চলে। ওরা বাড়ি বদল করে করে এখন এক্সপার্ট হয়ে গেছে। অন্যদের যেটা ছয়মাস লাগে‌, ওরা তিনদিনে গুছিয়ে ফেলে; তাও ওদের এই বিপুল পরিমাণ জিনিসপত্র।
পরের দিন রিপোর্ট আনার কথা। আজ সকাল থেকে ও ওরা গুছিয়েই যাচ্ছে , আজকের মধ্যে শেষ করতেই হবে। মধুমিতা দেখলো নড়ার নাম ও করছে না ঋতম। অগত্যা পাঁচটার সময় বিল নিয়ে,”আমি রিপোর্ট আনতে যাচ্ছি” বলে বেরোল। রিপোর্ট পাওয়া অবধি ধড়ফড় করছে বুক। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি বলল , ক্যানসার অ্যান্টিজেন রিপোর্ট,বাকি ব্লাড রিপোর্ট ফার্স্ট ফ্লোরে। প্যাপ স্মেয়ার রিপোর্ট সেকেন্ড ফ্লোরে। সেকেন্ড ফ্লোরে উঠতে উঠতে ও ওর প্রিয়তম বান্ধবী রুম্পাকে ফোন করলো, ও ডাক্তার। রুম্পা বলল, ধরে আছি, তুই নে। রিপোর্ট হাতে পেয়ে ওকে পড়ে শোনালো মধুমিতা।
“এই তো নেগেটিভ, চিন্তার কিছু নেই।”
মধুমিতা কেঁদে ফেলে, সাথে রুম্পাও। তারপর চা খেতে ঢোকে একটা টী-পার্লারে। জোড়ের গল্পটা নিয়ে একটু খিল্লিও করে ওরা। দু’জনেই হাসে।
“সত্যিই তো বিয়ের জোড় বলে কতা, তোদের জুড়ে রেখেছে তা, সেটাই তুই দিয়ে দিচ্ছিলি? বিয়েটা কত ইম্পর্ট্যান্ট একটা জিনিস বলতো।” হাসতে হাসতে রুম্পা বলে ।

“হুঁ। বিয়ে, এই প্রতিষ্ঠানটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

রুম্পার সঙ্গে একচোট হাসাহাসি করে ঋতমকে ফোন লাগায় মধুমিতা। এখন অনেকটা হালকা লাগছে।
” হেলো।”
” হেলো। রিপোর্ট নেগেটিভ।” উচ্ছ্বসিত গলায় বলে মধুমিতা।
” কোন রিপোর্ট?”
” কোন রিপোর্ট মানে? তুমি ভুলেই গেছো? চমৎকার।”
“আরে বলো না কোন রিপোর্ট?”
“আসার আগেও তো বলে এলাম রিপোর্ট আনতে যাচ্ছি। চারদিন চিন্তায় অতিষ্ঠ থাকলাম,আর তোমার কাছে কোন ব্যাপারই না?”
“ওহ্। মনে পড়েছে। যাক গে। ভালো হয়েছে। কতক্ষণে বাড়ি আসছো?”
“যখন ইচ্ছা হবে।”
“মানে? ইয়ার্কি করছো? “
“বিয়েটাই তো ইয়ার্কি। এই একসাথে থাকাটাই তো ইয়ার্কি।”

অনেকটা পথ হাঁটে মধুমিতা। সবকিছু তেতো লাগে। আবার রিপোর্টের কথা যখনই ভাবে, হালকা লাগে। বোকার মতো হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে মধুমিতা। গভীর রাতে ছাতে দাঁড়িয়ে উপর থেকে উড়িয়ে দেয় বিয়ের জোড়‌। জ্যোৎস্নার মধ্যে উড়তে উড়তে চলে যায় সে জোড়, কী এক অলীক সুখ!

ঝরঝরে লাগে মধুমিতার। প্রশ্নচিহ্ন সরে গেলে বরাবরই ফুরফুরে লাগে মধুমিতার।

6 Comments

  • Manas Ranjan De Amin

    Reply January 1, 2022 |

    পুরোন মৌমিতা। সহজ ভাবে জীবনের গভীর ডিলেমা তুলে ধরা এক মোহহীন মানুষ যার সহজ প্রশ্ন গুলো আচমকাই শিকড় ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে যায়।

  • Moumita Ghosh

    Reply January 2, 2022 |

    ধন্যবাদ

  • অদিতি সেন চট্টোপাধ্যায়

    Reply January 2, 2022 |

    ভালো লাগলো খুব।

  • roychowdhury sanghamitra

    Reply January 2, 2022 |

    ছোটো ছোটো আঁচড়ে অসামান্য ছবি ফুটে উঠেছে। তুচ্ছতা থেকে এক অমূল্য অনুভবে উত্তরণ!

    • Suptasree Som

      Reply January 2, 2022 |

      ভালো লাগলো।

  • Chandreyee

    Reply January 2, 2022 |

    বাস্তব জীবন

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...