নার্সিসিজ়ম ও নার্সিসিস্ট
অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়

দাম্পত্যজীবন কি দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে? মনে হচ্ছে কি, সব ভুল, যা ভেবেছিলেন কিছুই মিলছে না? একটু মন পাওয়ার জন্য কত চেষ্টা করত একসময়, এখন যেন কিছুতেই খুশি হয় না, পদে পদে শুধু অসন্তোষ, অভিযোগ আর অপমান। যদিবা একটা ভালো কথা বলে, তার পিঠে এমন একখানা বাঁকা মন্তব্য গেঁথে দেয় যে প্রশংসা হয়ে ওঠে আপাদমস্তক ব্যঙ্গ! আপনারই বন্ধুর সঙ্গে ওঁর নির্লজ্জ ফ্লার্টিংয়ে মন কাঁদে? আদরের উপবাসে শরীর কাঁদে? বুকের ভেতরে কি শুধু জমাট পাথরের ভার? লোকদেখানো দাম্পত্যের অভিনয়ে ক্লান্ত লাগে, হতাশ অবসাদগ্রস্ত মুহূর্তে এমন ভাবনাও কি মনে জাগে যে অর্থহীন জীবনটাতে ইতি টানলেই হয়?

জানবেন, এই সবকটি লক্ষণ একটা বাস্তবের দিকেই অঙুলি নির্দেশ করে – আপনি একজন নার্সিসিস্টের সঙ্গে বাস করছেন। 

নার্সিসিস্ট শব্দটির সঙ্গে আমরা এখনও তেমন পরিচিত নই কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এইজাতীয় চরিত্র আমাদের অচেনা নয়। শিশু যেমন ফুলের পাঁপড়ি ছিঁড়ে অবোধ আনন্দ পায়, এঁরাও মানুষের মন ছিঁড়েখুঁড়ে বিবেকহীন তৃপ্তি পান। আপাতসুস্থ অথচ বিকৃতমনষ্ক নার্সিসিস্ট সম্বন্ধে সচেতনতা ও সতর্কতা গড়ে তোলাই আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য ।

নার্সিসিস্ট কাকে বলে?

নার্সিসিস্ট কথাটা এসেছে নার্সিসাস থেকে। গ্রীক পুরাণে বর্ণিত পরম সুদর্শন নার্সিসাস সরোবরের জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে এত মোহিত হয় যে সুন্দরী জলকন্যা ইকোও তাকে ভোলাতে পারে না। বিভোর চোখে শুধু নিজেকে দেখতে দেখতে একদিন নার্সিসাস মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, আর পরদিন সরোবরে সেই জায়গায় ফুটে ওঠে অপরূপ সুন্দর, সৌরভে মাতোয়ারা এক ফুল, সরোবরের জলে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে ঝুঁকে আছে যার মুখ! সেই ফুলেরও নাম হয় নার্সিসাস। মনোবিকারগ্রস্ত আত্মপ্রেমী নার্সিসাসের ব্যঞ্জনাময় কাহিনি নিয়ে ওভিড থেকে শেলি – বহু সাহিত্যিক মুগ্ধবিস্ময়ে লিখে গেছেন, চিত্রশিল্পীরাও তাঁকে নিয়ে কম নাচানাচি করেন নি। এক পম্পে শহরেই পাওয়া যায় নার্সিসাসকে নিয়ে আঁকা অন্তত ৫০টা ইরটিক ফ্রেস্কো!

এছাড়া মনোবিজ্ঞান বা সাইকোথেরাপিতেও নার্সিসাসের অনুষঙ্গ মেলে তবে সেটা নান্দনিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত অক্ষে, যেখানে মানুষের এক জটিল মানসিক বিকারের নাম নার্সিসিজ়ম । গ্রীক পুরাণের নার্সিসাসেরই মতো নিজের রূপে ও গুণে বিমুগ্ধ থাকেন নার্সিসিজ়মগ্রস্ত ব্যক্তি অর্থাৎ নার্সিসিস্ট । নারীপুরুষ নির্বিশেষে যেকেউ নার্সিসিস্ট হতে পারেন তবে গত তিন দশকের গবেষণা বলে, এনপিডি বা নার্সিসিস্ট পার্সোনাল ডিজর্ডারে ভুগে থাকেন আনুমানিক 7.7% পুরুষ আর মাত্র 4.8% নারী। সুতরাং স্পষ্টতই পুরুষদের মধ্যে নার্সিসিজ়ম বেশি দেখা যায়। মনে রাখতে হবে এঁরা রোগী নন, পার্সোনালিটি ডিজর্ডার অর্থাৎ ব্যক্তিত্বের ব্যাধির শিকার। এই ব্যাধির কোনও চিকিৎসা নেই। 

নার্সিসিস্টের বৈশিষ্ট্য

আমরা প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর নার্সিসিজ়মে ভুগে থাকি। আত্মপ্রীতি কার নেই? প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে? সমালোচনা শুনলে কার না খারাপ লাগে? নিজের কথা কে না বলতে ভালোবাসে? এমন অনেকে আছেন যাঁদের বাক্য শুরু এবং শেষ হয় ‘আমি’ দিয়ে, নিজেকে যাঁরা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বলে মনে করেন। এঁরা হামবড়া, বিরক্তিকর, বোরিং কিন্তু ক্ষতিকারক নন। এগুলোই যখন অবসেশন হয়ে নিজের এবং চারপাশের মানুষের ক্ষতি করার পর্যায়ে চলে যায়, তখন সেটা বিকারের রূপ নেয়। নার্সিসিস্টের বৈশিষ্ট্য, নিজের, অন্যদের এবং বাস্তবজগৎ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ বিকৃত ও ভ্রান্ত একটা ধারণা রচনা করে সেই মতো চলা। মনে মনে কিন্তু নিজেদের অক্ষমতা ও অযোগ্যতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকেন এবং সেজন্য তীব্র হীনম্মন্যতায় ভোগেন। এই জটিল বৈপরীত্য এঁদের বিকারের একটা লক্ষণ। এঁরা নিজেদের চেয়ে উন্নত মানুষদের প্রতি আকৃষ্ট হন অথচ ভেতরের হীনম্মন্যতায় তাঁদেরই প্রতি অস্বাভাবিক হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ ক’রে প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কায় উল্টে তাঁদেরই প্রত্যাখ্যান করার ভয় দেখিয়ে অযৌক্তিক অত্যাচার করেন। অতিরিক্ত প্রশংসাপ্রিয়, আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর নার্সিসিস্ট অপরাধবোধের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গঠনের অক্ষমতায়ও ভোগেন। এঁরা বুদ্ধিমান কোনও অবস্থাতেই নন কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তিতে পশুদের মতো সজাগ। অথচ পশুদের বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের লেশমাত্র এঁদের থাকেনা । নার্সিসিস্টরা সুদর্শন, আকর্ষণীয়, বাকপটু ও নিজেদের কর্মক্ষেত্রে প্রশংসিত হয়ে থাকেন। মিথ্যা এঁদের মুখের লব্জ আর লোককে মন্ত্রমুগ্ধ করায় অদ্ভুত পারদর্শী হন। অপরাধপ্রবণ ও ধূর্ত নার্সিসিস্ট সমাজের পক্ষে তো বটেই, নিজের পক্ষেও ক্ষতিকারক। নার্সিসিস্টের নানান রকমফের হয় তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক সংস্করণ হলো সোশিওপ্যাথ, যাঁরা স্পষ্টতই শৃঙ্খলা লঙ্ঘণ প্রবণ, নৈতিকতাবোধশূন্য এবং বিবেকহীন হন। নার্সিসিস্টকে অপরাধী বলে প্রমাণ করা মুশকিল কিন্তু সোশিওপ্যাথকে আইনত দণ্ডণীয় অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। 

নার্সিসিস্ট হয়ে ওঠার কারণ

স্নেহশূন্য, নিরাপত্তাবোধহীন অসহায় শৈশবে বারবার নিষ্ঠুরভাবে পরিত্যক্ত হবার অভিজ্ঞতা যখন একটি শিশুর সুকোমল বৃত্তি এবং মানবিক বোধের বিকাশ রুদ্ধ করে দেয়, তখন জন্ম নেয় এক বিবেকহীন বোধহীন নার্সিসিস্ট। নার্সিসিস্ট-পিতামাতার অন্যায্য প্রশংসা এবং অন্যায় প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা সন্তান আত্মকেন্দ্রিক ও ভুয়ো ইমেজের দাস হয়ে যায়। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালে এই বিকার প্রকাশ পায়। ক্রমে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে সেটাকে অবমাননা মনে ক’রে বক্তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হন। সেদিক থেকে নার্সিসিস্টকে ক্যাকটাসের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ক্যাকটাসের প্রকৃতিও আর পাঁচটা গাছের মতো সজল স্নিগ্ধ হতে পারতো কিন্তু সে বেড়ে ওঠে রসহীন, ছায়াহীন বিশুষ্ক মরুভূমির অস্বাভাবিক পরিবেশে, তাই অন্তরের সামান্যতম রসটুকুকে সে স্বার্থপরের মতো আগলে রাখে, যে-ই কাছে আসে তাকে নিষ্ঠুর কাঁটায় রক্তাক্ত করে দূরে সরিয়ে দেয়। একটি সুস্থ স্বাভাবিক শিশুও ভালোবাসাহীন নিরাপত্তাহীন অনিশ্চিত শৈশবের অভিঘাতে অস্বাভাবিক নার্সিসিস্ট হয়ে যায়। ।   

নার্সিসিস্টের প্রেম

গোড়ার দিকে নার্সিসিস্টকে অমায়িক, পরোপকারী এবং মরমি বলে মনে হয়। আপনার মনমতো কথা বলেন, বিপদে-আপদে না চাইতে বন্ধুর মতো পাশে থাকেন আর দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। এই যে অল্প সময়ের মধ্যে কাছে চলে আসা, এটাই কিন্তু নার্সিসিস্টকে চিনে নেবার সবচেয়ে বড় সঙ্কেত! কিন্তু এঁদের নিপুণ অভিনয়ের কারণে আপনার সন্দেহ জাগে না, বিশেষত যদি আপনি মানসিকভাবে দুর্বল একটা স্থিতিতে থাকেন এবং নির্ভরতার কাঙাল হন। মনে রাখবেন, আপনাকে সাহায্য করা বা সমবেদনা জানানোটা এঁদের ছল, কৌশলে আপনাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনাই আসল উদ্দেশ্য। একবার দাঁড়াবার জমি পেলে ব্যস, শুরু হয়ে যায় বিকৃত পীড়ণ। সবকিছু এত তাড়াতাড়ি ঘটে যায় যে আপনি টেরও পান না কোথা থেকে কি হলো, ধীরে ধীরে আপনি আত্মীয়বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকে কি করে, কবে যেন দূরে সরে যান। হঠাৎ একদিন উপলব্ধি করেন, স্বজনহীন একা মরুভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন আর আপনার পায়ের তলার মাটি চোরাবালির মতো আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। উঠতে বসতে অপদস্ত আর অপমানিত হতে হতে একসময় আপনার নিজের ওপর আস্থা আমূল টলে যায়, আর আপনি যতো দুর্বল হন, ওপক্ষের স্বৈরাচার তত বাড়তে থাকে। দিনে দিনে আপনার ঔজ্জ্বল্য স্তিমিত, শক্তি ক্ষীণ এবং আত্মবিশ্বাস ভেঙে চূড়মার হয়ে যেতে থাকে। লোকসমক্ষে আপনাকে হেয় করেন, দায়দায়িত্ব সব আপনার ঘাড়ে চাপিয়েও অভিযোগের অন্ত থাকে না, অন্যের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন আর তার জন্য আপনাকেই দায়ী করেন, আর এইসব বিবেকহীন আচরণ ও যুক্তিহীন অভিযোগের অভিঘাতে আপনি হতবিহ্বল বিমূঢ় হয়ে ভাবেন, তবে কি এটাই আপনার আসল পরিচয়? ডানা ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়ে অসহায়ভাবে আপনি ছটফট করেন, কাতরান, কিন্তু মুক্তির পথ খুঁজে পান না কারণ আপনার সব প্রাণরস নিঙড়ে নেওয়া হয়েছে, সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! সর্বক্ষণ শুনতে হয় যে আপনার মানসিক ভারসাম্য নেই, এবং একসময় আপনি সন্দেহ করতে থাকেন যে সত্যিই হয়তো আপনি মানসিক ভারসাম্যহীন, পাগোল। সেই অসঙ্গত অসত্যের চাপ সহ্য করতে না পেরে সত্যিই একদিন মানসিক ভারসাম্য খুইয়ে বসতে পারেন, এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণও হয়ে উঠতে পারেন। আবার সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে মুক্তির আস্বাদও পেতে পারেন। ঝড় কেটে গেলে নিজেই বুঝতে পারেন কী অশুভ ঘোরের মধ্যে ছিলেন, নিজেকে কিভাবে সম্পূর্ণ হারিয়ে বসেছিলেন!

কভেটেড বা গুপ্ত নার্সিসিস্ট

নার্সিসিস্টদের মধ্যে এক শ্রেণী আছেন যাঁদের বলা হয় কভেটেড বা গুপ্ত নার্সিসিস্ট। এঁরা পুরোমাত্রায় নার্সিসিস্ট হলেও চাতুর্য ও ধূর্ততার দ্বারা নিজেদের বিকারকে নিপুণভাবে লুকিয়ে রাখেন । দেশিবিদেশি বহু প্রতিষ্ঠিত, বিখ্যাত, প্রতিভাশালী মানুষের মধ্যে খুঁজলে এক নার্সিসিস্টকে পাওয়া যেতে পারে। দেখা যাবে, এঁদের স্ত্রী(বা স্বামী) রূপ, গুণ ও প্রতিভায় সাধারণের চেয়ে উন্নত হওয়া সত্ত্বেও বিকশিত হবার বদলে দিনে দিনে মূর্চ্ছিত হয়ে গেছেন। যেহেতু নার্সিসিস্ট পুরুষ সংখ্যায় বেশি তাই অনায়াসে বলা যায় যে পাদপ্রদীপ থেকে দূরে সরে থেকে নিঃশব্দে নার্সিসিস্ট স্বামীকে সাফল্যের পথে এগিয়ে দেওয়া আত্মবিলোপী স্ত্রীদের সংখ্যা বেশি। এইসব মহিলারা যদি স্বামীর কাছ থেকে যথাযোগ্য উৎসাহ ও সমর্থন পেতেন, দেশেবিদেশে কুরি দম্পতির মতো আরও বহু দম্পতিকে নিশ্চয়ই আমরা পেতে পারতাম!   

নার্সিসিস্ট ও এমপ্যাথ

নার্সিসিস্টের স্বামী/স্ত্রী, এবং বহু ক্ষেত্রে সন্তান, ‘এমপ্যাথ’ অর্থাৎ সহানুভূতিশীল ব্যক্তি হন। এমপ্যাথ সৎ, ধর্মপরায়ণ, দায়িত্বপরায়ণ ও ক্ষমাশীলও হন । এককথায়, নার্সিসিস্টের মধ্যে যেসব গুণের অভাব তার সবকটি থাকে এমপ্যাথের মধ্যে। লক্ষণীয়, এমপ্যাথের এই গুণগুলি নার্সিসিস্টের সংস্পর্শে এসে দুর্বলতাদোষে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সংবেদনশীল এমপ্যাথ নার্সিসিস্টের শত অপরাধ ক্ষমা করেন, তাঁর পাকানো জট বারবার খুলে দেন, বারবার তাঁকে বিশ্বাস করেন আর নিজের অজান্তে সহানুভূতির নামে নারিসিস্টকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেন। শুধু বিবাহিত জীবনে নয়, অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাবান যেকোনও ব্যক্তি যেমন অফিসের বস, বাবা-মা বা গুরু স্থানীয় কারও সঙ্গেও এমনটা ঘটতে পারে। শার্লট ব্রন্টির জেন আয়ার উপন্যাসে মি. রচেস্টার, সাত পাকে বাঁধা-র মা (অভিনয়ে ছায়া দেবী) এবং হলিউড ছবি ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান-এ লিওনার্ডোর বাবা (অভিনয়ে ক্রিস্টোফার ওয়াকেন) নার্সিসিস্ট চরিত্রের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।  তুমূল জনপ্রিয় তিন ভুবনের পারে যে আসলে নার্সিসিস্ট ও এমপ্যাথের গল্প, সেটা কেউ খেয়াল করেছেন? একটা কঠিন বাস্তব সমস্যাকে দর্শকভোলানো অবাস্তব রোমান্টিকতার রসে চুবিয়ে পরিবেশন করা হলো আর রোমান্সপ্রিয় বাঙালি দর্শক সেই মিলনান্তক রূপকথায় মোহিত হয়ে ভেসে গেলেন। সিনেমায় নায়ক শুধরে যায়, ক্ষমা চায়, ভুল বোঝাবুঝি মিটে ব্যস দুজনে সুখী দাম্পত্যজীবন কাটাতে থাকে, সৌমিত্র-তনুজার হিট জুটি বক্স অফিস মাত করে দেয়! এটাই তো মনোরঞ্জনপ্রিয় দর্শক চান! সুতরাং এমপ্যাথও সিনেমা শেষে চোখের জল মুছে ভুয়ো আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন। বাস্তব চিত্রটা একেবারে আলাদা। কারণ বাস্তবে নার্সিসিস্ট আত্মবিশ্লেষণে অপারগ ও আত্মসংশোধন বিমুখ হন, ফলে অনুতাপ প্রকাশ করার প্রশ্ন ওঠে না, যদিবা করেন সেটা অভিনয়, পুনর্মিলনের পর ফের অত্যাচার আর উল্টে সম্পর্কের আরও অবনতি। জনতারঞ্জক সিনেমায় এসব দেখানো যায় না।

নার্সিসিস্টের সন্তান

নার্সিসিস্টের সন্তান তীব্র আত্মপ্রত্যয়হীনতা ও হীনম্মন্যতায় ভোগেন। অন্যভাবেও তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন যেমন, হয় সংবেদনশীলতা হারিয়ে নার্সিসিস্ট হয়ে ওঠেন আর নিদারুণ বিদ্বেষে অপরের ক্ষতিসাধন করেন, নতুবা মাত্রাতিরিক্ত সংবেদনশীলতার দরুন এমপ্যাথ হয়ে ওঠেন আর কোনও নার্সিসিস্টের শিকার হন। একজন আবেগহীন বিকৃতির পথে চলে যান, আরেকজন আবেগের আতিশয্যদোষে ভুল মানুষের খপ্পড়ে পড়ে চট করে আকর্ষণ ঝট করে অন্তরঙ্গতা এবং ঝটিতি বিবাহে (বা সম্পর্কে) জড়িয়ে পড়েন। বিয়ের পর এমপ্যাথ বুঝতে পারেন কত বড় ভুল করেছেন, কিন্তু ভুল স্বীকার করার মনোবল তাঁর থাকে না। তার মানে তো আবার সেই পরিত্যক্ত হওয়ার যন্ত্রণা, আবার সেই ব্যর্থতা! তার চেয়ে মিথ্যে আশায় নিজেকে ভুলিয়ে রাখা সহজ – নিশ্চয়ই বদলাবে, শুধু একটু ধৈর্য, একটু ক্ষমা! কিছুই বদলায় না বরং অত্যাচার বেড়ে চলে যতদিন পর্যন্ত না এমপ্যাথ ভেঙে চূর্ণ হয়ে যান, নিজেও নার্সিসিস্টে পরিণত হন অথবা সচেতনতা অর্জন করে নার্সিসিস্টকে ত্যাগ করার শক্তি পান।

মুক্তির উপায়

এমপ্যাথ যেই নার্সিসিস্টের নিয়ন্ত্রণ কেটে বেরোতে যান, শুরু হয়ে যায় নতুন নাটক। নার্সিসিস্ট ধরেন তাঁর আগের মোহন রূপ, ব্যবহারে মধু, পদে পদে অনুনয়-বিনয়-ক্ষমাপ্রার্থনা, পায়ে পড়তেও দ্বিধাবোধ করেন না! জানবেন, নার্সিসিস্টের পক্ষে এমপ্যাথ অপরিহার্য তাঁর বিকৃত রসদের জোগানদার হিসেবে । কিন্তু এমপ্যাথের পক্ষে নার্সিসিস্ট পরম বিপজ্জনক ও পরিত্যাজ্য। অতএব এমপ্যাথের একমাত্র কর্তব্য নিজেকে রক্ষা করা, নিজেকে শক্তিশালী করা। উপকারী বন্ধুদের সনাক্ত করুন। বিশ্বস্ত কারও পরামর্শ নিন। অভিজ্ঞ থেরাপিস্টের খোঁজ করুন। মনকে বশে আনতে ধ্যান শিখুন। এই সবের মাধ্যমে আগে নিজেকে ভালো করে জানুন। যেকোনও পরিস্থিতিতে নিজের ভেতরকার স্থিতি বুঝতে পারলে বাস্তবকে বোঝা সহজ হয় আর বাস্তবকে বুঝতে পারলে তার মোকাবিলায় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়। তখন আর দাম্পত্যজীবনে অ-সহবাসের অপমান বরদাস্ত করতে হয় না বা অসহ-বাসের যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে অমূল্য জীবন ক্ষয় করতে হয় না!

অতএব নার্সিসিস্টের পীড়ণে যদি আপনার প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন, হাল ছাড়বেন না। জানবেন মুক্তির উপায় আছে। বিশ্বস্ত বন্ধু। অভিজ্ঞ থেরাপিস্ট। ধ্যান। যেটা পারেন বেছে নিন আর অবিলম্বে নিজের মঙ্গলসাধনে ঝাঁপিয়ে পড়ুন!

11 Comments

  • Dipankar Dasgupta

    Reply January 1, 2022 |

    ঋদ্ধ হলাম

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply January 4, 2022 |

      অনেক ধন্যবাদ।

  • দেবলীনা

    Reply January 2, 2022 |

    নার্সিসিজ়ম ও নার্সিসিস্ট … খুবই ভালো লাগলো বিষদে বিষয়টিকে জেনে!

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply January 4, 2022 |

      ধন্যবাদ!

  • Dipankar Dasgupta

    Reply January 2, 2022 |

    awesome

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply January 4, 2022 |

      Thank you!

  • Dipankar Das Gupta

    Reply January 2, 2022 |

    awesome

  • yashodhara Ray Chaudhuri

    Reply January 2, 2022 |

    অত্যন্ত জরুরি অত্যন্ত কার্যকরী লেখা।।এমন লেখা আরো দরকার।

    সিনেমার বিশ্লেষণ খুব ঋদ্ধ করেছে।

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply January 4, 2022 |

      আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ!

  • Tanima Hazra

    Reply January 3, 2022 |

    অসাধারণ একটা লেখা পড়লাম।

    • Anjanaa Chattopadhyay

      Reply January 4, 2022 |

      লেখাটি পড়ে মন্তব্য দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...