টিন্ডেলবাবু ও অন্যান্য
অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়


টিন্ডেলবাবু

গত ক’দিন ধরে লোকটাকে লক্ষ্য করেছে টিন্ডেলবাবু। রোজ সকালে গালুডির দিক থেকে  পা-দুটোকে টেনে-টেনে ঘষটাতে-ঘষটাতে নিয়ে আসে নদীর কাছে। সুবর্ণরেখার বুকে মহিষ-পিঠ পাথরে হেলান দিয়ে বসে থাকে…পায়ে জল ছুঁয়ে থাকে সারা দিন। একদৃষ্টে কী যেন দেখে।এদিকে ক্রাশার অবিরত পাথর  ভাঙছে, স্টোন চিপস লরীতে বোঝাই হচ্ছে, টিন্ডেল বুড়োকে খেয়াল রাখতে হয় সবকিছু। পাথরের হিসেব, লোক-লশকর, পুলিশের খোচর, আগন্তুক। যেন ভাঙচুরের দানো ঘাড়ের ওপর বসে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। নতুন কেউ এসে তাকে রেহাই না দিলে মুক্তি নেই, মরণ ছাড়া।তা এমন করে বেঁচে থাকার চেয়ে….কী মনে হতে উত্তেজনায় তড়াক করে উঠে দাঁড়ায় বুড়ো!এই লোকটাই যদি সেই সিন্ধবাদ হয়! মুক্তির দূত?


উমা

নন্দলাল মিস্ত্রি লেন। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রাচীন ঠাকুরদালান। সেখানে শরীকেরা পালা করে সম্বৎসরে একবার ঘরের মেয়েকে ঘরে আনে। বাকি সময় দালানে ঝুঁকে পড়া খড়ের কাঠামোয় চাঁদমালা শুকায়।ঘরের মেয়ে কিন্তু আরেকটিও আছে। ঠাকুরদালান ছাড়িয়ে ভেতর বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠে সে-কালের অন্দরমহল। এখন শরীকে-শরীকে ভাগ হয়ে অনেক দেওয়াল। তারই একটেরে একটা খোলা ছাতের পাশে এক-ঘরের বাপের বাড়িতে থাকে বাষট্টির উমা।দেওয়ালে তারই গাউন-পরা ছবি। সেই আগুনঝরা সত্তরের। পুরনো দেরাজে লুকানো অ্যালবামে এক গুঁফো যুবকের ছবি। দুটো ছবিতেই সিপিয়া রঙ ধরেছে।চানের পর খোলা ছাদে শাড়ি মেলে দিয়ে মেয়ের মনে পড়ে কিছু শোনা কথা, গালুডি, মাইনস, ….চুল শুকোতে শুকোতে বলে, যদি আসো…

নিত্যতা সূত্র

নিউ-টাউনের আটতলার ফ্ল্যাটে আলসেমি করে বিছানায় পড়ে আছে নেহা।আজ কিছুতেই কাজে যেতে ইচ্ছে করছে না। সুব্রত সেই যে গিয়েছে অডিট করতে, ফেরার নাম নেই। প্রথমদিকে এমন ছিল না। ডুয়ার্সের অডিট ক্যাম্প থেকে ফোন করত রাতের দিকে, গল্পে আর খুনসুটিতে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেত।কিন্তু আজকাল তাদের কথাবার্তা একাক্ষরী। ডাল নেবে? সকালের চিকেনটা? বিলটা দিয়েছো? টুরে গেলেও আজকাল বলে না কোথায় যাচ্ছে। ক’দিন।টাটানগরে নেমে ফোন করেছিল। তারপর থেকে ফোন অফ। নেহা ডায়েরি করেছিল। কিন্তু  মুক্ত বিহঙ্গ উড়ে গেলে এখনো রাষ্ট্র ব্যাকুল হয় না দেখা যাচ্ছে। আইনি বাঁধন তো ছিল না। এবার নেহাও হাল ছেড়ে দিয়েছে। 
 ভরবেগের মত সভ্যতা আর অরণ্যানীর প্রেম-অপ্রেমেও একধরনের  নিত্যতা কাজ করে মনে হয়।  
যতই মাটির বুক চিরে তার প্রাণের ধন টেনে আনো , মানুষের বুক থেকে ভালবাসা ফের টেনে যায় সেই মাটিই।

1 Comment

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...