ছবিতে একা
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

বাগানের গেটটা ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে একবার জুঁই গাছটার দিকে তাকাল সুরভি।কেমন মাটি ছেড়ে দেওয়াল ধরে ধরে দোতলার ব্যালকনিতে উঠে গিয়েছে।গাছটার আস্পর্ধা আছে।সারা শরীর জুড়ে ফুল সাজিয়েছে এমন,যেন ডেকে হেঁকে বলছে আমাকে দেখো।গন্ধে তো মাতাল করে দেয় আজকাল।এই গাছটা ওর পোঁতা। ওরও তো এমনই হওয়ার কথা।অথচ হতে পারল কই?জুঁইএর নমনীয়তাটুকু পেয়েছে,সাহসের ধারটা পায়নি।
বাজারের ব্যাগটা রান্নাঘরে রেখে সুরভি একবার তাকাল পেছন ফিরে।ছটা বাজে।নমিতা এসেছিল কাজে।ওর কাছে চাবি রাখা থাকে।ঘরদোর পরিষ্কার করেছে। বাসন সব উপুর করে সিঙ্কের নিচে স্টিলের টাবে রাখা।
ও পা ধুয়ে এসে চায়ের জল চাপাল স্টোভে।সোফায় হেলান দিয়ে হাতে তুলে নিল দৈনিক কাগজটা।
এই সময়টা সুরভির নিজস্ব।রাতুল অফিসে,বাপাই কলেজ থেকে ফেরেনি।চা বানিয়ে, পা ছড়িয়ে, একা একা আমেজ করে খাবে ও। কেবল এইটুকু সময়ে নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারে সুরভি।
আজ স্কুলে পারমিতা বলছিল কাল ও খাওয়াবে।ওর বিবাহবার্ষিকীর খাওয়া।সবাই হই হই করে উঠল।শুধু ও চুপচাপ ছিল।গত জুলাইয়ে রানার বাবা খুব বিরক্ত হয়েছিল।
চেঁচিয়ে বলেছিল “মাংস আনতে কে বলেছে তোকে?মা?”
রানা হেসেছিল “মা যে বলেনি সে তুমি ভাল করেই জানো।তোমাদের বিয়ের তারিখ বলেই আমি আনলাম।“
রানার দিকে না তাকিয়েই “ফুঃ” বলে আওয়াজ করে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল রাতুল।
নিজেকে কোথায় লুকোবে ভেবেছিল সুরভি , ঠিক তখনই রানা এসে পেছন থেকে গলা জড়িয়েছিল ওর।চোখটা জ্বালা জ্বালা করলেও রানার সামনে চোখের জল ফেলেনি ও। বাথরুমে ঢুকে গিয়েছিল।
বাপাই খেতে বসে মুচকি মুচকি হাসছিল।বাবার দিকে আর মার দিকে তাকিয়ে যেন মজা দেখছিল আয়েস করে।
রানা এখন হস্টেলে ।বি টেকের প্রথম বছর। রানার বাড়িতে থাকা না থাকায় অনেককিছুই আসে যায় ওর। কেননা একমাত্র রানার সঙ্গেই কিছু কথা হয়,বাদবাকি সময় ও একেবারেই বোবা একজন মানুষ।

#

ঘটনার সূত্রপাত বিয়ের একবছরের মধ্যেই।তখন এম এ পড়ছে ও।মফস্বল থেকে কলকাতায় পড়তে আসা। বাড়িতে শনি রবি দুদিন ট্যুশানি করে সেই পয়সায় পড়ার খরচ চালানো। বাবার পয়সা নেই।পড়ানোর ইচ্ছেও নেই। নিজের জেদে এম এ পাসের চেষ্টা। কাকিমার হিসেবী চোখ এড়িয়ে কাকুমনির সামান্য হাত বাড়ানো।তাতে কিছুটা হলেও সাহায্য হয় বই কি। তাই পড়তে গিয়েও নিজেকে যতদূর সম্ভব গুটিয়ে রাখত সুরভি। ।রাতুলই এগিয়ে এসে আলাপ করে। বন্ধুত্ব বাড়তে দেরি হয়নি।
পরপর ঘটে গিয়েছিল সবটা। তেমন করে ঘটনাটা ও বুঝেছিল কী?প্রথমে ওর স্কুলে চাকরি।তারপর রাতুলের ব্যাঙ্কে চাকরি।তারপর বিয়ে।
রাতুলের মায়ের আপত্তি ছিল।বলেছিলেন, “বাবার নিঃস্ব অবস্থা।তিন তিনটে মেয়ে।ওখানে বিয়ে করলে তোকে শালিদের পুষতে হবে।”এসব কথা রাগের মাথায় রাতুলই বলেছে কখনো সখনো।
তখন বোঝেনি ও।বুঝল বিয়ে হয়ে যাবার পর।নির্মলা ছিলেন বিধবা ।একটু জটিল প্রকৃতির রাশভারি মহিলা।বড় দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়ে যেতে ছোট ছেলেকে নিয়ে স্বামীর মোটা পেনশানের টাকায় সংসার চালাতেন তিনি।
এক দিনের জন্য সুরভির সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেননি।সুরভিরও দোষ আছে।ওনাকে সমীহ করেছে সারাক্ষণ।ভেবেছিল ওভাবেই মন পাবে। বুঝতে দেয়নি ও একজন মানুষ,ওর ও কিছু চাওয়া পাওয়া আছে।
বাপাই হবার সময় স্কুল থেকে ফিরে শুধু এককাপ চা আর দুটো বিস্কুটের বরাদ্দে থাকতে না পেরে রাতুলকে বলেছিল একদিন।নিজে কিছু বানিয়ে খাওয়া যাবে না,কিনে আনলে সবাইকে বিলিয়ে সামান্য কিছু ভাগে পড়বে।ফাঁকা পেটে ঘরের কাজ ,স্কুলের কাজ, দিনদিন অসহ্য হয়ে উঠতে রাতুলকে জানিয়েছিল বাধ্য হয়ে।যদি কিছু সুরাহা হয়।
রাতুল বলল “না পোষালে বাপের বাড়ি চলে যাও।আমি মাকে কিছু বলতে পারব না।”
সেই শুরু।রাতুলের বিরক্তি,ওর মায়ের রাগ,সেসব মানিয়ে নিতে নিতেই বাপাই জন্মাল।পেটের সন্তান আর ওর নিজের অপুষ্টির হাত থেকে ওকে বাঁচিয়েছিলেন স্কুলের মায়াদি।উনি বলেছিলেন, “নিজেকে অবহেলা করতে পার,বাচ্চাকে নয়।স্কুলেই ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।ছুটির পরে রোজ দুতিন খানা রুটি ,একটা ডিমসেদ্ধ আর একগ্লাস দুধ আসবে সামনের চায়ের দোকান থেকে।টাকাটা তুমি মাসের শেষে হিসাবমত দিয়ে দেবে।”
ওনাকে কিছু বলেনি ও।উনি ওর দিন দিন শুকিয়ে যাওয়া চেহারা দেখেই কিছু আন্দাজ করেছিলেন হয়ত।বাপাই জন্মের পর অশান্তি বাড়ল আরো। ছেলের যত্ন করার জন্য ছিল ও,আর খুঁত ধরার জন্য ছিলেন শাশুড়ি মা। বাচ্চাকে নিয়ে ওনার মাত্রা ছাড়ানো আদিখ্যেতা দেখে অবাক হয়ে যেত মাঝেমাঝে।
বারবার উনি মনে করাতেন বাচ্চা ওদের বাড়ির আর ও পরের বাড়ির। ঠিক তখনই রাতুল কথা বলা বন্ধ করল ওর সঙ্গে।দিনের পর দিন একা একা কাটাতে কাটাতে বাপাই বড় হয়ে গেলো যে কবে,ও মনে করতে পারেনা আর।তেমন ঘোরপ্যাঁচের বুদ্ধি ছিলনা। শাশুড়ি কোন ফাঁকে ওইটুকু বাচ্চার মগজ ধোলাই করেছেন সেটাও সুরভি টের পায়নি একদম।
ঠাকুমার কাছে শুত বাপাই।বড় হবার পর একটা দিন ছাড়েননি ওকে।রাতুল ট্যুরে গেলে ঠায় একা শুতে হত ওকে।
চুপিচুপি একদিন বলেছিল বাপাইকে, “আজ ঠাকুমাকে বল,মায়ের কাছে শোব।”
বাপাই বলল “না।তুমি কি ঠাকুমার মত গল্প জানো?ঠাকুমার মত পা টিপতে পারবে?আমি তোমার কাছে শোবনা।কিছুতেই না।”

#

রাতুলকে কখনো ভালবেসেছিল ও,বা রাতুল চেয়েছিল ওকেই বিয়ে করতে, কথাগুলো কেমন যেন বিশ্বাস হয়না আর।
রাতের বেলা শরীরে উঠে আসা মানুষটা দিনের বেলায় কেমন খোলস পাল্টায়,সেটাই কি দেখা ছিল আগে?
রানা হবার আগে সাত সাতটা বছরের প্রতিটি দিন কী ও মৃত্যুকামনা করেনি?বলেনি কী “আমাকে নাও ঠাকুর।এই একদম একা একা দিন কাটাতে আর পারছিনা।”
ঠিকমত হিসেব করলে সাত সাতটা বছর একদম বোবার জীবন কাটিয়েছে ও।বাপের বাড়িতে মা নেই,বলবে কাকে?বোনেরা যে যার সংসারে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময়েই এলো রানা।রানার জন্মের বছর ঘুরল না,শাশুড়ি চলে গেলেন।
রাতুলের মুখের বুলিই ছিল “এই ছেলেটা আমার মাকে খেয়েছে।এবার আমাকে খাবে।”কথাটা ওদের দূরত্ব বাড়াত আরো।
রানার সময় শাশুড়ি মা প্রায় ক্ষমতাহীন।তবু দাঁতে পিষতে ছাড়েননি। বলতেন, “এর গায়ের রঙ গেছে মামার বাড়ির দিকে।চেহারায় আমাদের বাড়ির ধার নেই এককণা।“
বারবার এক কথা। শুনতে শুনতে শুধু একবার ছোবল দিয়েছিল ও। বলেছিল, “কৃষ্ণকে যে পুজো করেন মা, সেও তো আমার বাপের বাড়ির ধাত পেয়েছে।”
কট্‌কট্‌ করে ওর দিকে তাকিয়েছিলেন খানিকক্ষণ।তারপর উত্তর খুঁজে না পেয়েই চুপ করে গেছিলেন হয়ত।

#

রানার স্বভাবে সেন বাড়ির ছাপ নেই কোন।তবু কোথায় যেন দুষ্টুমি ভর করে মাঝেমাঝে।রানা বাবাকে অনায়াসে বলতে পারে , “মায়ের বয়স বাড়ছে,কাজ কমছে না।তুমি জামা কাপড় দোকানে ইস্ত্রি করাও।মায়ের দ্বারা আর সম্ভব নয়।”
চিরকাল বাড়িতে পা দিয়েই মাকে ডাকে ও।বাড়ি থেকে বেরোবার সময় মাকে বলে যায়।
রাতুলকে সেদিনও ডাকছিল ও,”বাবা এসো।আমার নতুন মোবাইলে মার সঙ্গে একটা ছবি তুলে নিই।”
ওর কথা শুনে বাপাই ঠোঁট টিপে হাসল।ছুটির দিনের সকাল। টেবিলে গরম গরম লুচি ভেজে সবার পাতে দিচ্ছিল সুরভি।রাতুল খেয়ে তোয়ালেতে মুখ মুছে রেডি হল।বাপাই গিয়ে দাঁড়াল ওর পাশে।টাইমার দিয়ে গ্রুপে ছবি তুলবে বলে রানা ডাকতে এলো ওকে।
কড়াইয়ে শেষ লুচিটা ছেড়ে দিয়ে ও বলেছিল , “নারে গ্রুপ ছবিতে আমাকে ডাকিস না।আমি কোন গ্রুপে নেই।একা। আমি একেবারেই একা।আমার সিঙ্গল ছবি তুলিস কেমন।”

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...