অ-সহবাস
উত্তম বিশ্বাস



উঁচু বাঁধের ওপরে একটা বাঁশের মাচায় ওকে পাকাপাকিভাবে বসিয়ে দিলাম। পরনে পিওর কটনের পাঞ্জাবি-পাজামা। ওটা দেওয়ার সময় আমি ওকে বারবার করে বুঝিয়ে দিয়েছি, “পাজামার দড়িটা কিন্তু সবসময় খোলা রাখতে হবে ভায়া!” ওর আরও বিশেষত্ব হল, চওড়া বুকের ছাতি। ঘন লোমে ঢাকা। মুখে হালকা পাতলা দাড়ি। মোটা গোঁফ সুচারুভাবে ছাঁটা। আমি যখন ওর শোয়া আর আরামের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে ইন্সট্রাকশান দিচ্ছিলাম, ও বড়মুখ করে জানতে চাইল, “আমার কি নাম নেই?”
আমি বললাম, “কেন থাকবে না? সবার যেমন থাকে তোমাকেও তেমন একটা নাম দিলাম, ‘কামজ।’ কিন্তু নামটা নিয়ে ও দেখলাম খুব বেশি সম্মানিত বোধ করল না। অতএব এ ব্যর্থতার দায় সবচেয়ে বেশি আমারই। বললাম, “ঠিক আছে, কামরূপ বলেই তোমাকে ডাকব।”  
কামরূপ কথা কম বলে। তবে খোলা নাভির ওপরে নির্জন নিশিথে যখন সমুদ্রের উদ্দাম হাওয়া খেলে যায়, তখন ও আমাকে নির্লজ্জের মতো হাঁকাহাঁকি শুরু করে দেয়। পাছে কেউ শুনে ফেলে, এই ভয়ে আমি পাঁচিলের পেছন দোরের হুড়কো খসিয়ে পড়িমরি করে ওর কাছে ছুটে আসি, “হেই, আবার কী হল?”
-“মেয়েছেলে দাও। এভাবে আর কদ্দিন?” বলতে বলতে ও বাঁহাতখানা পুরে দেয় আত্মমন্থনে।
আমি ওর অস্থির হাতখানি ধরে অনুনয় করি, “হেই, এসব কী কর? রাতটুকানি কোনোমতে কাটিয়ে দাও। দেখছি কী করা যায়!”
দেখলাম ওর ধাতে ধৈর্য একদমই নেই! এবার কাম আমার হাত ধরে টানাটানি করলে আমি এক ঝটকায় ওকে পেড়ে ফেলি, “উঁহু! এসব একদমই না!”
-“কেন না?”
-“এদেশে যতদিন না এসব অ্যাভেলএবেল হচ্ছে ততদিন কোনোরকম বাড়াবাড়ি করা চলবে না!”
কাম আঠালো শামুকের মতো সমুদ্রের তীর বরাবর হাঁটতে থাকে। মাঝে মাঝে ভেসে আসে উত্তাল এক বাঁশির সুর! কে বাজাচ্ছে? কামরূপ? কই আমি তো ওকে এতকিছুর অনুমতি দেইনি!

সকালে ছোট স্টিমারে করে অনেকগুলো মেয়ে আসে। আমি কাঠালের মতো টিপেটুপে একটাকে তুলে নিয়ে বলি, “এসো এর পাশে শোও!”
মেয়েটি তার নেত্রপল্লব থেকে লবণের কুচি সরিয়ে আমাকে প্রশ্ন করল, “শোও মানে?”
-“শোও মানে শোও। এটাও বলে দিতে হবে? আমার বলার কাম আমি বললাম। এখন তুমি শুয়ে করবে নাকি দাঁড়িয়ে, সেটা তোমার ব্যাপার!”
মেয়েটি মাচার চটায় পাছা পেতে ঝপ্‌করে নেমে পড়ল, “এমা! এত শক্ত! গদি ছাড়া অসম্ভব!”
-“আর কিছু?”
-“আপনাকে সব বলতে যাব কোন দুঃখে শুনি? যার সাথে ঘর করব বলে আনা হয়েছে, ও যদি কিছু জিজ্ঞেস করে তবে বলব!”
-“ও কিছু বলবে না।”
-“কেন বলবে না?”
-“আপাতত ওর জন্যে কোনও সংলাপ রেডি হয়নি। তবে হ্যাঁ বিশেষ মুহূর্তে ও জোরে জোরে শ্বাস ফেলবে। তোমার মুখে, ঘাড়ের কাছে, তলপেটে দাড়ি ঘষবে, তোমাকে উত্তেজিত করতে দারুণ দারুণ খিস্তি মারবে, শেষ মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখতে শীৎকার করবে। আর…”
-“আর…?”
-“আগে সংসারটা তো পাতো। একেক করে সব জানতে পারবে।”
রাত শেষ হয়ে আসছিল। আমি চলে যাব বলে তাড়াহুড়ো করছিলাম। মেয়েটি হঠাৎ পেছন থেকে ডাকল, “আমিও কি অনামা?”
-“এমা! সত্যিই তো! এতক্ষণ হয়ত গোয়ালে হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে! আচ্ছা তোমার নাম দিলাম পরমা। সাতচড়েও কথা বলবে না। লজ্জা রাখবে। কামরূপ যখন যেভাবে চাইবে তুমি আপত্তি ওজর দেখাবে না। যদি কিছু মনে না কর কাল কিছু অভিনব মুদ্রা দিয়ে যাব।”
পরমা শাড়ির আঁচল কামড়ে শিউরে উঠল, “ইস! কথার কী ছিরি! ওসব কিছুই লাগবে না!”
-“তাহলে কথা দিচ্ছ কোনো কিছুর অভাব থাকলেও পাড়াময় করে ফেলবে না?”
পরমা অল্প একটু মাথা নাড়ল।
আমি আবেগ সামলে বললাম, “ঠিক আছে তাহলে সংসার করো। আস্তে আস্তে সব দিয়ে যাব।”

সকাল হতে না হতেই বাঁধের ওপরে ছুটে গেলাম। দেখলাম কামরূপ নুনের ঢিবির মতো একপাশে পড়ে আছে। আর পরমা সীমের সরু লিকলিকে একটা লতা পরম মমতায় মাচার চটার সাথে জড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছে। মুখে অপরূপ এক আলো। যে আলো আমি প্রতিদিন প্রত্যাশা করি! অথচ এত বছরের দাম্পত্য জীবনে আমার সাজানো সংসারে কোনোদিন পড়েনি! পরমা আমাকে একটা পাথরের খণ্ড দেখিয়ে দিয়ে বসতে বলল। আমি লাজ-শরমের মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম, “রাতে খুব হাওয়া খেলছিল!… তোমাদের অসুবিধা হয়নি তো?”
পরমা কথাটা শুনল কিনা বুঝলাম না। আমি আবারো বললাম, “এই দেখো না আমি আমাদের শোবার ঘরের পর্দাটা তোমাদের জন্যে খুলে এনেছি। বেলায় একটা জাজিম দিয়ে যাব।”
পরমা উদিত সূর্যের দিকে মুখ ফিরিয়ে একটুখানি হাসল। আমি চাইছিলাম, ওর চোখের নিচে কতটা কালি পড়েছে দেখব। আমি চাইছিলাম ওর কপালের কুমকুম কিভাবে ধ্যেবড়ে আছে দেখব। কিন্তু এসব কিছু মেপে নেবার আগেই সে বলে উঠল, “অনেকটা বেলা হয়ে গেল! এবার একটা পেতলের হাঁড়ি লাগবে তো!”
-“পেতলের হাঁড়ি কেন?”
-“ও বলছিল, আমার হাতের বিরিয়ানি খাবে!”
আমি মনে মনে অংক কষে নিলাম, বিরিয়ানি মানে আর পাঁচজনে যে চাল খায় তাতে হবেনা। ইণ্ডিয়া গেট লাগবে। মশলাপাতি, খাসি অথবা ভেড়ার মাংসও তো রেডি করে পাঠাতে হবে!

মাচার একপাশে ধোঁয়া উড়তে শুরু করল। একটা কচি ভেড়ার গলায় পোঁচ পড়ল! পরমা নেমে গেল জলে। সাগরের ফ্যানা দিয়ে মাথার চুলে আচ্ছা করে শ্যাম্পু করল। আমি ততক্ষণে পর্দা টাঙিয়ে ওদের জন্যে আড়াল এনে দিলাম। শক্ত চটার ওপরে জাজিম পেতে দিলাম। পরমা উঠে এলে ওর হাতে সুন্দর কালারের শাড়ি ব্লাউজ আর কিছু প্রসাধনী দিয়ে বললাম, “বাড়ি থেকে যেগুলো এনেছ, ওগুলো ফেলে দাও।”
পরমা সাথে সাথে ভিজে জামা-কাপড়গুলো গা থেকে খসাতে শুরু করল।
বহুকাল পর এই প্রথম যেন লজ্জা এসে আমার ললাট স্পর্শ করে গেল! আমি আনত থেকেই আদেশ করলাম, “উঁহু এখানে না! ভেতরে যাও। আর শোনো, আজ খুব হালকা সাজবে কেমন?”
পাকা পরিচালকের আদেশ যেমন একজন পেশাদার অভিনেত্রী নেয়, সে আমার কথাটাকে অন্তর থেকে গ্রহণ করল দেখে খুশি হলাম। পরমা পর্দা টেনে প্রসাধন করতে বসলে, আমি জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। কেননা ঘি জাফরান সহ আরও যেসব মশলাপাতি দরকার, কিছু কম আনা হয়েছে। বিশেষকরে তেজপাতা নিতে একদম ভুলে গেছি। পরমা বলল, “তেজপাতা নাহলে হাঁড়ির তলা ধরে যাবে তো! আর প্রথম পাকেই যদি খাবার পুড়ে যায়, এর প্রভাব দেহ মনেও…”
যাইহোক কাঁচা তেজপাতা গাছে উঠে আরও কিছু শেকড়-বাকড়ের সন্ধান পেলাম। ওগুলোও মুঠোয় পুরে এনে হাজির হলাম।
পেতলের হাঁড়িতে মাংস আর ভাতের ভাপ উড়ছে। কামরূপ মাঝে মাঝেই সরার ওপরে জ্বলন্ত কাঠকয়লা চাপিয়ে দিয়ে দম ফেলছে। আমি হামানদিস্তায় ঠুক্‌ঠুক্‌ করে ভেষজ গুড়ো করছি। পরমা কচি কলাপাতায় কাঠির মতো বাঁশি বানিয়ে কামরূপের কোল ঘেঁষে বসে ওর কানে গরম হাওয়া পুরে দিয়ে সরে যাচ্ছে। হঠাৎ কী জানি কোন কৌতূহলে কাম জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কি মশলা?”
-“হুম। তবে তোমার না হলেও এর এফেক্ট তোমাকে অফুরন্ত সুযোগ করে দেবে!”
পরমাকে বললাম, “এগুলো বড়ি করে দিয়ে যাচ্ছি। কুলোয় করে শুকিয়ে, কৌটো ভরে রেখে দেবে। রোজ একটা করে…!”
কথাটা শেষ করার আগেই ভ্যাক করে কেঁদে ফেলল পরমা, “আমি মা হতে চাই! রোজ রোজ এসব ছাইপাঁশ আমি গিলতে পারব না!”
-“বেশ ভালো কথা! কটা নেবে? প্রতিপালন করতে পারবে তো? দিনকালের গতিক দেখেছ?”
এবার দেখলাম সে আমার দেওয়া হীরের কুচি, ছোট্ট নাকছাবি, চুড়ি এসব খসাতে শুরু করে দিয়েছে। আমি ভীষণ বিব্রত বোধ করলাম, “আরে আরে! কর কী?”
-“আমি অতশত বুঝিনে! আমার বেবি চাই ব্যস!”
-“উত্তম প্রস্তাব! তাহলে তো কামকেও কাজে নামতে হয়!”
কথাটা কানে যেতেই কাম পাজামার দড়িতে গিঁট দিতে শুরু করল, “আমি যেটা পারি সেটা কাউকে শিখিয়ে দিতে লাগে না! কিন্তু ফালতু কাজে আমি নেই!”
-“তুমি সংসার পাতলে, কাজ করবেনা সে কেমন কথা?”
ততক্ষণে তলার মাংসে ধরা গন্ধ ছাড়তে শুরু করেছে। পরমা উভয় পক্ষকে সামাল দিতে চেষ্টা করছে, “ঠিক আছে। আপাতত ওর জন্যে একটা একাউন্ট খুলে দেন। দেশে যাদের অঢেল টাকা আছে অথবা টাকা রাখবার জন্যে যাঁদের সমস্যা আছে ওর একাউন্টেই চালান করবে। এর থেকে কামও খাবে, ওঁরাও যে যার মতো সুবিধা বুঝে নেবে!”
আমি চুপ করে গেলাম।
পরমা হাঁড়ির ঢাকনা খুলল। মুখের ওপরে এমনভাবে গরম বাষ্পের ঢেউ এসে লাগল আর একটুখানি হলে সুগ্রীবের মতো সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম আর কী!
কলার পাতায় কাঠের হাতা-চামচ দিয়ে বিরিয়ানি বেড়ে পরমা ডাকল, “আপনি এট্টু খান!”
-“না না তোমরা খাও!”
কামরূপ মজলিসের নবাব বাদশার মতো হাঁটু মুড়ে বসল।
এবার পরমা ঠুক্‌ঠুক্‌ করে হাঁড়ির কানায় ঘা দেয় আর জিজ্ঞেস করে, “আপনার বাড়িতে আর কে কে আছে?”
আমি কথা চিবিয়ে ফ্যানা করতে করতে বলি, “কে আর আছে! মরাধরা একটা বউ আছে! গোয়ালে কিছু আবাল বলদ আছে। চাড্ডি হাড়গিলে গাভী আছে! ঘাড় ক্যালানে কিছু হাঁসমুরগী আছে আর…”
-“উনি কি এসব খান?”
-“উনি যে কী খান আর কী খান না, একমাত্র উনার সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউই বলতে পারেনা না!”
এবার পরমা মাথার ঘোমটা উড়িয়ে দিয়ে বলল, “উনি আমার চেয়েও সুন্দরী নিশ্চয়ই?”
-“সে আর বলতে! ধাপা পড়া চাপকলের মতো চেহারা! সারারাত ধরে চাপলেও একফোঁটা ঘামে না! কী আর বলব! আস্ত একখান কঙ্কালের ওপর ভুত নেত্য করে করেই জীবন যৌবন সব মাটি করে দিলাম!”
-“বাচ্চাকাচ্চা…?”
-“ওই যে বললাম আছে কটা ভূতের বাচ্চা! ওরাও হয়েছে তেমনি! সকাল হতে না হতে হাড়মাস সব ছিঁড়ে খেতে থাকে!”
-“কিছুদিন কোথাও পালিয়ে থাকতে পারেন না?”
বুকের ভেতরটাতে সহসা যেন ষাঁড়াষাঁড়ির বান ডেকে উঠল! পরমার চোখে চোখ পড়তেই সেখানেও দেখলাম উত্তাল সমুদ্র। সাপের ফনার মতো কোটি কোটি তরঙ্গ! দিগন্ত জুড়ে কেবল রঙিন বুদবুদ। কোথায় যাব তবে আমি? কে দেবে আমাকে আশ্রয়?
বিরিয়ানির হাঁড়ি জুড়িয়ে আসে। পরমা তখনো কিছুই মুখে কাটছে না দেখে আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, “কী হল? খাও!”
দাঁত-খোঁচানো কাঠি খুঁজে কামরূপ উঠে গেল খেজুর বনের আড়ালে।
পরমা হাঁড়ির গায়ে ন্যাতা বুলোতে বুলোতে জিজ্ঞেস করল, “ঘরের মানুষটার সাথে এভাবেই কথা বলেন বুঝি? সত্যিই পুরুষজনম সার্থক আপনার!”
-“না না! তা কেন করব? ওকে তো আমি খুবই ভালোবাসি!”
-“আচ্ছা বেশ! বিশ্বাস করলাম!” বলেই পরমা কেমন করে যেন আমার দিকে একটুখানি তাকাল! মুহূর্তে আমার চারদিগন্ত চক্কর দিয়ে উঠল! আমি কি তাহলে বাদ দেওয়া বালিশের তুলোর মতো পরমার সামনে সবকিছু উপুড় করে দিলাম? আমার ঘরণী…আমার সাজানো সংসার…আমার একরত্তি মেয়েটা… আমার গোয়ালের অবলা প্রাণীগুলোর কানে যদি এসব কথা পৌঁছোয়? এই জীবনে ওরা আদৌ কি আমাকে আর ক্ষমা করতে পারবে?     
এবার পরমা বড় একটা পাতায় অনেকটা খাবার বেড়ে পাতাটা আচ্ছাকরে মুড়িয়ে বলল, “কিছুই তো মুখে দিলেন না! অথচ আমাদের জন্যে কত করলেন! এগুলো নিয়ে যান, উনি খেলে খুশি হব!”
সাতসমুদ্র আবারো উত্তাল হয়ে উঠল! সেইসাথে ভিজে ঝোড়ো হাওয়া। আমি পাতার পুঁটলিটা মুঠো করে নিয়ে দৌড়াচ্ছি। কিন্তু একী! আমার হাতে ধরা বিরিয়ানির মোড়কটা এক লহমায় নুনের ঢেলা হয়ে গেল কী করে? এখন তুমুল বৃষ্টি! সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে! ঘরে ফেরার রাস্তা কোনদিকে কিছুই বুঝতে পারছিনা! দৌড়াচ্ছি… দৌড়াচ্ছি…! নুনের দলাটা ক্রমশ গলে ছোট হয়ে যাচ্ছে…

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...