অসহবাস
নূপুর রায়

ওবাড়ি গেলেই ওরা আমাকে বড়ো বেশি ‘আয় আয়, বোস বোস’ করে। মানে সোজা কথায় আপ্যায়ন করে। ধরুন, আমি ওপরে উঠছি, পাপু আমার আগে আগে উঠে আলো জ্বালিয়ে দিল। অথচ সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ আমারও তো একই রকম চেনা। অন্ধকারে আমিও উঠেছি। তখন সিঁড়ির নিজস্ব কোন আলো ছিল না। আমরা দুদ্দাড় উঠতাম। আর ধাপগুলো যেন নিজেই আলো ফেলত আমাদের পায়ে পায়ে…
মাআ… জল খাব। মা বলত, কলসিতে জল আছে। বাইরে ফেলবি না। হাত ধো। আগে হাত ধো… এখন জলের বোতলটা ধরার আগেই ছিপিটা খুলে কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়। হাত ধোয়ার পাটও  চুকে গেল। এই যে সেজেগুজে ভালবাসা এসে দাঁড়ায় এমন মেদবহুল বাহুল্যে, মনটা ভার হয়ে থাকে। আহা, কাঁসার গ্লাসে সেকি ঠান্ডা মিঠে জল! আঃ, বলে উঠি আনমনে। ছলাৎ করে গ্লাস থেকে চলকে পড়ে একটুখানি! কবেকার কলসিটা ঠোঁট টিপে হাসে! 
বাড়ির পিছনে পুকুর। কত ছোট বড়ো মাছ সারাদিন খেলা করে।  কতদিন দেখেছি।ওপরের বারান্দা থেকে দেখি পুকুরের দিকে হেলে গেছে যজ্ঞডুমুর গাছটা। একটা কাঠঠোকরা ঠক ঠক করে ছাল চামড়া তুলে আরও ভিতরে গর্ত করছে। যত গভীর, তত কালো। প্রকৃতি তো বেণী বাঁধতে শেখেনি। তাই খোলাচুলেই সে আজও সামনে এসে দাঁড়ায়।
এখন পুকুরে বড়ো বড়ো মাছ ঘাই মারে!  খেলাধুলাকরা ছোট ছোট মাছগুলো কোথায় যে হারিয়ে গেল! নাকি ওরা সবাই একসঙ্গে বড়ো হয়ে গেল, কি জানি!সমূহ ভালবাসা একদিন যখন কাজল পরে, একদিন ওষ্ঠরঞ্জনী লাগিয়ে সুন্দরীর তকমা আঁটে, তখন পুরনো মৌতাতটা আর জমে না। ভিজে মাটির কাঁচা গন্ধটুকু কেমন যেন ঢাকা পড়ে যায়।জ্যোৎস্নার ফেলে আসা ছায়ার গায়ে কুকুরের আঁচড়ানোর দাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 
ভালবাসার ওপরের এই গড়িয়ে যাওয়া উদবৃত্তটুকু তো চাইনি কোনদিন। মনকেমন মৃদুস্বরে কড়া নেড়ে যায়। আয় পাপু, ছোটবেলার মতো ঝগড়া করি। তুই পিছন থেকে এসে আমার চুল টেনে দে… আমি তারস্বরে চিৎকার করে মাকে ডাকি… এখন অবশ্য ডাকলেও কেউ সাড়া দেবার নেই। এখন একপ্লেট মিষ্টি নিয়ে পাপু আমাকে জোর করবে। “খা না… এই ধোসাটা খেয়ে নে। এটা স্পেশাল। আমি কিন্তু তোর জন্যই ‘আশা’ থেকে এনেছি।”
      এই সেদিনও আনমনে প্লেটটা টেনে নিয়ে আমারটা পাপুই হাফের ওপর খেয়ে নিত…

1 Comment

  • Tanima Hazra

    Reply January 3, 2022 |

    মোহ মাধুরীর হলুদ রঙের ক্যানভাস

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...