অদ্বৈত সহায়
জয়া চৌধুরী

সহবাসের সহ-কে নেড়েচেড়ে দেখলে দ্বৈতের আভাস পাই। এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে ফেললে বাস না করে তো কোন উপায়ই নেই! আমরা তাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ি বসবাস করতে। অভ্যাস তো সবচেয়ে সহজ এক ফাঁদ। আমরা টুথব্রাশে অভ্যস্ত হই, পরিবারের আবরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি, নিরাপদ কাঠামোয় বাঁধা জীবনে অভ্যস্ত হতে হতে বুড়ো হই। একক মানুষ যেন মৌল বিশেষ। পরিবারের সঙ্গে সহবাস যৌগ উপাদানের বশেই যে হয় সেও তো জানা। অথচ পরিবার মানেই মূলতঃ একের বেশি মানুষ। অপরের সঙ্গে যৌগের যে যৌথতা, তাকেও কী সহবাস বলে নির্ণয় করে সমাজ? জানা নেই। কিংবা জানা আছেও বা। সহবাস যেন এক মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের বসবাস। আর এর সবচেয়ে মসৃণ পথ হল বাবা মায়ের সঙ্গে যাপন। এখানেও ভাগ হয়ে যাচ্ছে একের সত্ত্বা। কেননা বাবা এবং মা দুটি পৃথক মানুষ যাদের সঙ্গে যাপনকে দ্বৈত যাপন বলা যেতে পারে না। তাছাড়া বাবা মা ভাই বোনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে জীবনের সবকটি স্বাদ থাকে না। তাহলে এমন কোন সম্পর্ক থাকতে পারে জীবনে যাতে এর সম্ভাবনা রইল? বন্ধুত্ব অথবা দাম্পত্য। এর মধ্যে আবার দাম্পত্যকে বিশেষ করে পৃথিবীর প্রায় সবটুকু শতাংশের মানুষই নারীর সঙ্গে পুরুষের যাপনকেই ভাবে সহবাস। তো সে যাপনেও তো অনেক সময় পেরিয়ে গেলে ‘সহ’ মুছে যায়। অসহের বেদনা ধীরে ধীরে চেপে বসে দুজনের মনে । শরীর থেকেই যার শুরুয়াত ছিল। নাকি মন বা শরীর ঠিক কোনটা দিয়ে সহের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেও তো জানা হয়ে ওঠে না অসংখ্য একত্র যাপনকারীদের জীবনে। যৌনাঙ্গের মিলনও কি জোর গলায় দাবী জানাতে পারে যে দুজনে তখন সঙ্গেই ছিল! আসঙ্গ ও সঙ্গ কে এক বন্ধনীতে ফেলতে পারি না। তাহলে এমন কেন হয় যে সহবাসে চূড়ান্ত সুখ একজন পেলেও আরেকজনের তা অধরা থেকে যায়! ক্ষুদ্রার্থে সহবাসেও তো দুজনের যৌথ তৃপ্তির দাবী ঘোষিত থাকে। অতএব নারী পুরুষের দেহ মিলনেও যথেষ্ট প্রমাণিত হয় না তারা সহবাস করেছিল কী না। কেননা সন্তান কোন প্রমাণ নয় সহবাসের। সেটি বড় জোর শারীরিক মিলনের প্রমাণ ভাবা যেতে পারে। সহবাস সবসময়েই যৌথ অনুভূতির জন্য অপেক্ষা করে থাকে। আবার দুটি মানুষের সম্পর্কে সে নারী পুরুষ অথবা সমলিঙ্গের দুটি মানুষই হোক, দুই পক্ষেরই শারীরিক তৃপ্তি হলেও সেটির প্রভাব আমৃত্যু থাকা কতটা সম্ভব তা ভাববার বিষয়। কারণ যৌবন তো একসময় সবাইকেই ছেড়ে যায়। শারীরিক তৃপ্তির সঙ্গে শারীরিক যৌবনের বিশেষ প্রয়োজনীয় সম্পর্ক। সেটি অতিক্রান্ত হলে তখন তৃপ্তির সেই অনুভূতি একত্রে সহবাসে কতখানি উৎসাহ যোগাবে?

এরকম জায়গাতেই মনে করি সহবাসের কাছে আমাদের দাবী এর চেয়ে ঢের বেশি। আমরা অদ্বৈতকে খুঁজি এই সহ বাসের মধ্য দিয়ে। সেই অব্যক্ত, অবাঙমানসগোচর অস্তিত্ব কে আমরা সহবাসের আদর্শ লক্ষ্য বলে ভেবে নিয়েছি। যাপন করছি দুইজন অথচ দাবী এক ধারণা এক অনুভূতি এক আদর্শের। এই ভাবনা নিয়ে আমিও খুব স্বচ্ছ বোধের জায়গায় নেই। বরং অসহবাসকে বহুভাবে দেখেছি জীবনে।

ওরা ‘প্রেম’ করে বিয়ে করেছে। সন্তানের খুব জ্বর। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে তাকে। বাবার কোন তাপ উত্তাপ নেই। মা-টি নিয়ে যেতে চায় সন্তানকে ডাক্তারখানায়। বাবা আগ্রহী নয়। সে বরং রিল্যাক্স করবে বাড়িতে, যেতে হলে মা যাক একলা, এমনকি চাইলে শ্বশুরকেও নিয়ে যেতে পারে সেখানে। কিন্তু বাবা পারবে না। এর কোন ব্যাখ্যা দেয়া হলেও তার গ্রাহ্যতা নেই। অতএব মাকেই যেতে হয় সন্তান নিয়ে ডাক্তারখানায়। এরকম অবস্থা কি কখনও কারো জীবনে হয় না? হয় তো। তাহলে কী সে বাবা মা সহবাস বন্ধ করে দেয়? নাকি দায়িত্ব তার জায়গায় পালিত হতে থাকে মায়ের কাঁধে, আর শারীরিক বা সাংসারিক সহবাস চালু থাকে নিয়মমতই। আদতে এর নাম অসহবাসই তো হয়। জীবনযাপনের অসংখ্য ঘটনায় অসংখ্য অসহযোগিতার উদাহরণ পাওয়া যায়। অধিকাংশ পুরুষের দিকে হলেও নারীর দিক থেকেও অসহযোগিতা কম দেখা যায় না। পুরুষ যদি সন্তান ও স্ত্রীর সব আর্থিক বা অন্যান্য সাংসারিক দায় নিয়েও থাকে বহু স্ত্রী তবুও অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে, নিরন্তর অভিযোগ ও দোষারোপ করতে থাকে পুরুষটির প্রতি। কিংবা নিজের দায় অস্বীকার করে সম্বন্ধের সুযোগ নিয়ে থাকে এও যথেষ্ট চেনা ছবি।

তবে কি অসহযোগিতাই অসহবাস ত্বরান্বিত করে সম্পর্কে? দুজনের যাপনের যে সব দায় দায়িত্ব পালন করার কথা সেগুলি এক্কেবারে কপিবুক পালন করলেই কি বলা যেতে পারে সহবাস সম্পূর্ণ হয়েছে? হতে পারে সে যুক্তি কিছুটা প্রযোজ্য অবশ্যই। সহবাস কখন অসহবাস হয়ে ওঠে? অসহযোগিতা হলে তবেই তো! অফিসে কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী যখন অসহযোগিতা করে তাকেও অসহবাস বলে দাগানো হয় কি? নাহ সহবাসের এক এবং একমাত্র ইশারা সেই দাম্পত্যের দিকেই। মূলতঃ নারী পুরুষের একত্র বাসকেই সহবাস বলে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু তারা যদি একত্রে বাস না করতে পারে? তারা যদি নারী ও পুরুষ দুই ধরনের না হয়? তাহলেও কি অসহবাসের ক্লান্তি তাদের ঘিরে ধরতে পারে? এখানেই কাহিনীর মোচড়। বিবেকানন্দের কোন লেখায় পড়েছিলাম পৃথিবীতে একটিই চিন্তার তরঙ্গ বয়। মানুষের একক চিন্তা সবকটি সেই এক চিন্তা তরঙ্গের অংশ মাত্র। তারা সে তরঙ্গে যুক্ত করে অথবা তরঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয় মাত্র। দুটি মানুষের চিন্তার তরঙ্গ যদি মিলে যায় এবং তাদের পারস্পরিক চেনা হয়ে থাকে তাহলে শুরু হয় যৌথ জীবন। এই জীবনে ভাবনার যৌথতা শারীরিক নৈকট্য আনতেও পারে, আনাটাই স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। শরীরের যৌথতা দিয়ে সহবাস সম্ভব না হলেও মানসিক যৌথতা অবশ্যই সম্পর্ক রচনা করে। আর যে সম্বন্ধে মানসিক ও শারীরিক যৌথতা হয় তাঁকে আদর্শ যৌথ জীবন যাপন বলা যেতে পারে।

আবার অন্য দিক দিয়ে ভাবতে গেলে আদর্শ পুঁথিগত বিষয়। মানুষ আদর্শ হতে পারে না। আদর্শের কাছাকাছি হতে পারে কিন্তু একশ শতাংশ হওয়া সম্ভবই নয়। মহাভারতেই দেখুন। কৃষ্ণকে দেবতা বলে আখ্যা দিলেও তার প্রতিটি “অন্যায়” কে কূটনীতি, বা দমন নীতি বলে ব্যাখ্যা দিয়ে সামলাবার চেষ্টা করা হয়েছে। অথবা সে যদি আদর্শ হয়ে ওঠেও, তাহলেও সে অবস্থায় বাঁচাই সম্ভব নয় পৃথিবীতে। একটু ভাবলেই বোঝা যাবে কথাটির ভিতর দিয়ে কী বলতে চাওয়া হচ্ছে। শ্বাস না ফেলে কেউ বাঁচে না জগতে, আর শ্বাস ফেলা মাত্রই ব্যক্টেরিয়া মারা যেতে থাকে। অতএব বেঁচে থাকতে গেলে জীবহত্যা না করে আদর্শ অবস্থায় বাঁচা সম্ভবই নয় এক মুহূর্তও। মানে মুনি ঋষি অবতারদেরও ব্যাকরণগতভাবে আদর্শ মনুষ্য জীবন যাপন করা সম্ভব হয় নি কোনদিনও। সেই দিক থেকে বিচার করলে সম্পর্কে অসহবাস বিষয়টাও এমনটাই বাধ্যত এক পরিণতি। ভেবে দেখুন দুজন মানুষ একে অন্যের সঙ্গে থাকছে, ধরে নিচ্ছি তাদের নিজেদের বোঝাপড়া দারুণ। সাংসারিক প্রাত্যহিকতায়, বিছানায় সম্পর্কে সবকিছুতে ছবির মত সুন্দর। তবুও কেন ক্লান্তি আসে সেই সম্বন্ধেও? ইসাবেল আইয়েন্দের একটি গল্প পড়েছিলাম বহুবছর আগে। দুজন স্বামীস্ত্রী সহবাস করেন। স্বামীটি ডাক্তার। স্ত্রী সাধারণ কাজ করেন। কিন্তু দুজনের তুমুল বোঝাপড়া। বিজ্ঞান বলে একসাথে থাকতে থাকতে মানুষ মানে দম্পতি একে অন্যের মত দেখতে হয়ে যান কিছুটা। কথাটির যাথার্থ্য সেই লেখাটিতেও পেয়েছিলাম। শেষে অবশ্য একটি কারণে স্বামী নিজের আসন্ন মৃত্যুর সম্ভাবনা দেখে স্ত্রীকে বিষ ইঞ্জেকশন দিয়ে হত্যা করেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল তাঁকে ছাড়া স্ত্রী বাঁচতে পারবেন না একা একা। কিন্তু স্ত্রীকে হত্যা করার পরে তিনি আত্মহত্যা করতে নিজের গায়ে ইঞ্জেকশন ফুঁড়তে পারেন না। নিজেকে হত্যা করা সবচেয়ে চরম এক মানসিক অবস্থা। কাতর হয়ে একজনকে অনুরোধ করেন ফোনে যাতে তিনি তাঁকে মারতে সাহায্য করেন। এইখানেই ধরা পড়ে যায় জীবনের আসল নগ্ন সত্য। মানুষ কখনই অন্য কোন মানুষের সঙ্গে আদর্শ সহবাস করতে পারে না। এমনকি সব কিছুর শেষেও তাঁর নিজের প্রতি আচরণে পক্ষপাতিত্ব থেকেই যায়। অথচ পুঁথিগত ভাবে এবং সাধারণ মানসেও সহবাসের শর্ত দুই পক্ষের সমান অংশীদারিত্ব। সেখানে এক মাত্রা হলেও প্রত্যেক মানুষের স্ব-সত্ত্বা এগিয়ে থাকে। সুতরাং এখানেই সে কিছুটা হলেও আদর্শের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। আর অসহবাসের কথা এক্ষেত্রে আলোচনা না করাই মঙ্গল। কারণ সম্পর্কে একঘেয়ে লাগছে বা বিরক্ত হয়ে উঠছি দিনকে দিন একই লোকের সঙ্গে এক ছাদের তলায় থেকে… এ সব কিছুই ইঙ্গিত করে মানুষের চাহিদার দিকে। যেখানে একজন মানুষ অন্যজন সহবাসীর কাছে স্বাভাবিক চাহিদা রাখে যতক্ষণ ততক্ষণ কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু সারা জীবন একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় প্রতিক্ষণে এক রকম থেকে যাওয়া। মানুষ তো দেবতা নয়। থাকতে থাকতে একজন যখন অপর জনের কাছে ১০০ শতাংশ সহযোগিতা দাবী করছে অন্য মানুষের কাছে তখনই সেটা মেটানো কঠিন হয়ে যায়। স্বাভাবিক। আমরা কজন চাইতে চাইতে চাওয়ার রাশ টানতে পারি? তখন প্রাপ্তির বিনোদনে ঘাটতি হলেই বিরক্তি উৎপাদন। এ বিরক্তির আসল নাম স্বার্থপরতা। অতএব সম্বন্ধ থাকলে বিচ্ছিন্নতা থাকছেই। আমাদের শুধু ভাল থাকছি ভাবনাটুকুই সম্পর্কে বেঁচে থাকার অস্ত্র। তবে কি সত্যি সত্যি ভাল থাকি না? থাকি তো। তবুও সে থাকাও ধ্রুব কিছু নয়। সহবাস জীবনব্যাপী তখনই চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে যখন অসহযোগিতার, অসহবাসের অম্লটুকুও রইবে। একটু খাদ না মেশালে সোনার গহনা তো বানানো সম্ভব নয়। আসলে সহবাসও সম্পর্কের এক আদর্শ ধারণা মাত্র, যেখানে দ্বৈতের কাছে দাবী করা হয় অদ্বৈত অস্তিত্ব নিয়ে থাকার। যা আসলেই সোনার পাথরবাটি অথবা সাধকের ধ্যানলব্ধ।

6 Comments

  • yashodhara Ray Chaudhuri

    Reply January 2, 2022 |

    ভালো লাগলো৷ ইসাবেল আয়েন্দের গল্পটা ভয়ানক!!

    • Tanima Hazra

      Reply January 3, 2022 |

      দারুণ সব দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করা হয়েছে।

      • Jaya Kundu

        Reply January 4, 2022 |

        Thank uou

    • Jaya Kundu

      Reply January 4, 2022 |

      Thank you yasho di

  • Anjanaa Chattopadhyay

    Reply January 4, 2022 |

    আলাদা একটা দিক ফুটে উঠেছে লেখাটিতে। ভালো লাগলো।

    • Jaya Kundu

      Reply January 4, 2022 |

      Thank you

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...