ঠিকানা না লেখা চিঠি
তিলোত্তমা বসু



তোমার চোখ হচ্ছে লেটারবক্স। এত চিঠি জমে আছে। কতদিন তালা খোলে না কেউ। পড়ে না।
ছেলেটি বলেছিল। এমন করে কেউ বলে? বলে না। মেয়েটি খুলেছিল তালা। আর মন ছুঁয়ে গিয়েছিল তার। সেই চিঠি লেখার শুরু। চিঠি লিখতে সে খুব ভালবাসত — ছেলেটিকে।

বয়:সন্ধিক্ষণ। সবুজ একটা গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যায় সরস্বতী নদী। ফাঁকা ফাঁকা বাড়িঘর। জ্যোৎস্নায়, কুয়াশায়, শীতে আর গভীর রাতে রানারের পায়ের ঘন্টাধ্বনি বাজে। বাজে নাকি? ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম…

এই ছেলেটা, কী করছ? আরব সাগরের তীরে জাহাজের চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছ আমাকে ছেড়ে? চিঠি লিখবে তো? পড়ার টেবিলে লণ্ঠনের লাল ঘন আলো। বইএর নিচে গল্পের বই। তার মধ্যে ভাঁজ করা চিঠি। চিঠিতে অলি সেন্টের গন্ধ। এই চিঠি লুকোনো ছিল বুকের মধ্যে। তাই এমন গন্ধ হয়ে গেছে। কেমন একটা শিরশির। কেমন একটা অস্থির। বায়োলজি বইয়ের মলাটের ভিতরে লুকোনো চিঠি। বন্ধুর হাত দিয়ে পাঠিয়েছে। তার উত্তর যাচ্ছে ইতিহাস বইএর মলাটের মধ্যে করে… তোমার চোখ হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেটারবক্স।
খুলতে চাই। পড়তে চাই আমি।

একটার পর একটা চিঠি। একটার পর একটা দিন। একটার পর একটা পরীক্ষা। ক্লাস ইলেভেন। ক্লাস টুয়েলভ। একদিন হঠাৎ মায়ের হাতে পড়ে গেল। ব্যাস। আর যায় কোথায়। স্বপ্ন দিয়ে লেখা, জোৎস্না আর শিশির ফোঁটা, আর কাগজিফুলের রঙ দিয়ে লেখা, সেই সব চিঠি, তখন লজ্জা। ভয়। কান্না। লেটারবক্স লুঠ হয়ে গেল।
চিঠি একদিন পুড়ে গেল। হৃদয় অগ্নিকান্ড। দাউদাউ শিখা। সমস্ত অক্ষর ছাই। ছেলেটি আরবসাগর তীরে দিল পাড়ি। মেয়েটি ছাদে এসে দাঁড়ায়। রাত নয়। দুপুর। তবু “দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া”। বুকের মধ্যে উথাল পাথাল। সমুদ্রের মতোই। চোখ যে তার লেটারবক্স, আর কখনো বলবে কেউ?

বড় পিসি থাকেন কানাডা। আর সোনাপিসি থাকেন বোম্বাই। সুনীলকাকা বিদেশ গেলে বাবাকে পাঠাবেই চিঠি। বাবার কাছে কত যে চিঠি আসে। খামে। ইংল্যান্ড লেটারে। তাতে কত দেশের স্ট্যাম্প। একদিন একটা চিঠি এল। সিরিয়া দেশটার নাম। ওই দেশে চাকরি নিয়ে গিয়েছেন অহীন পিসেমশাই। উনিই পাঠিয়েছেন চিঠি। সোনালি হলুদ স্ট্যাম্প। সবুজ ঘাসের, রোদের, এক পাল সাদা ভেড়ার ছবি। সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে সেই দেশে উড়ে যাই। সিরিয়া, কানাডা, বোম্বাই, কলকাতা, হালিশহর। হালিশহর থেকে আবার জাপান। দেরাদুন। অশোককাকু গেট দিয়ে ঢুকে বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে চিঠি ছুঁড়ে দিয়ে যেত। সব চিঠি বাবার। একদিন এল আমার নামে লেখা একটা খাম। খামের ভিতর বিস্ময়।

আপনার কবিতাটি মনোনীত হয়েছে। আরে! আমি তো লিখতে চেয়েছি চিঠি। লাল আলোর পড়ার টেবিলে বসে। ভালো লাগা, কষ্ট, সুখ আর শিরশিরানি ভাগ করতে চেয়ে। কিনতু ঠিকানা ছিল না জানা। আর কাকেই বা লিখব। কেউ তো বলেনি আর, তোমার চোখ হচ্ছে লেটারবক্স। তাই আমার চিঠিরা কবিতা হয়ে গেছে নাকি! আদৌ হয়েছে কি কিছু? কে জানে! পাঠিয়ে পরীক্ষা করেছিলাম পত্রিকা দপ্তরে। এল তারই উত্তর। চিঠি কবিতায় গিয়ে মিশল। নদী মিশে গেল সমুদ্দুরে। সেই চিঠি লেখার অভ্যেস থেকেই যে লেখার শুরু হল আর তা থামানো গেল না।

যখন খুব মনে পড়ে, লিখি। ব্যথা আমাকে লেখায়। অসহায়তা আমাকে লেখায়। নিঃসঙ্গতাও তো আমাকে শ্বাসরোধ করে এনে ফেলে কবিতার পায়ের কাছে। আমি মুক্তি চাই। চাই ডানা মেলে দিতে। পায়রার পায়ে বাঁধা রুপোর কৌটো। কবুতর যা যা… কারো কবিতা পড়েও খুব লিখতে ইচ্ছে করে। হয়ত গদ্য। তবু তাও চিঠি। প্রেমের কারণ। অকারণ। জানি খুব আজব আর খাপছাড়া আমি।

থাকি একটা ভুতের গল্প আর ডাকাতের গল্পের ঠিক মাঝখানে। তো কথা থাকবেই। আরবসাগরও আমার শত্রুই হয়ে যাবে। ডেকে নিয়ে যাবে ঠিক ওকে। বাবা চলে যাবে। শিরীষ গাছটাও থাকবে না আর। বয়ে যাবে সময়। তবু বদলাব না আমি। বদলাবে না আমার চিঠি লিখবার অভ্যেস। চিঠিরা ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম ছুটে আসবে বুকের ভিতরে। নীললোহিতকে একদিন লিখব। বড়দিনে। বছরের শুরুতে। লিখব, আমি আপনার লেখা পড়তে খুব ভালবাসি। নীরা কে? তার চশমার রঙ কী? সোনালি নাকি কালো? লিখব। পাঠানো হবে না তবু। আমি কোনো ঠিকানা জানি না। দিকশূন্যপুর কোন জেলা ঠিক মনে পড়ে না। কোন মহকুমা। গ্রাম। শহর। দেশ। মহাদেশ। সত্যিই আজও কোনো ঠিকানাই আমার নেই। চিঠিতে ঠিকানা লিখতেই হয় অবশ্যই। তাই কোনো চিঠি আমি কোনোদিন কাউকেই পাঠাতে পারিনি।

একবার গরমের ছুটিতে সুমনা লিখেছিল। হ্যাঁ , আমার নামেই চিঠি এসেছিল সেবার। হলুদ পোস্টকার্ড। তাতে অনেক বন্ধুতা। কিশোরীবেলার কত রঙ। মজা। নিষ্পাপ গন্ধ। সেই চিঠি রেখে দিয়েছিলাম। আজও আছে। সুমনা নেই। সময়ের সময় তাকে মুছে দিতে চেয়েছে। আমার ছোট বেলাকার কালো রঙের ডেক্স মায়ের কাছ থেকে চেয়ে এনেছিলাম। চেয়ে এনেছিলাম ডেক্স ভরা আমার ইতিহাস। কয়েকটা বই। ডায়েরি। কলম। চিঠিপত্র। স্ট্যাম্প জমানোর খাতাটাও থেকে গিয়েছিল। আর সুমনার চলে যাওয়ার বেশ ক’বছর পর হাতে এসে পড়ল কবেকার সেই চিঠি। গরমের ছুটিতে লেখা। স্কুল বেলাকার। সঙ্গে সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমার সঙ্গে আমার সত্যি একদিন ছিল যখন রোদের রঙ ছিল পোস্টকার্ডএর মত। আমার চোখ ছিল লেটারবক্স।

অতীত থেকে চিঠি আসে এমন করেই। আচমকা। তালা খুলে যায় দমকা বাতাসে।

2 Comments

  • Dr. Rajatkanti Sinhachowdhury

    Reply June 30, 2021 |

    খুব সুন্দর লেখা।

  • কুন্তল মুখোপাধ্যায়

    Reply June 30, 2021 |

    ভারি সুন্দর লেখা । সুখপাঠ্য ।

Leave a Reply to Dr. Rajatkanti Sinhachowdhury Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...