৯ নম্বর, কেয়াতলা লেন
বৈশালী চট্টোপাধ্যায়


ভেতো বাঙালির রোববার।

কর্তাগিন্নি দ্বিপ্রাহরিক ভোজন সেরে শয্যা নিয়েছি। ইরা মৌরি চিবোতে চিবোতে চৈত্রের দুপুরের কর্মব্যস্ত সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে বলল, “ঠিকানাটা কিন্তু খুব সুন্দর।”

বইটা বুকের উপর উল্টে রেখে ওর দিকে তাকালাম।

“না তুমি ভাব, চিঠি এল, ওপরে লেখা মাধবীকুঞ্জ, ৯ নম্বর, কেয়াতলা লেন। কী রোম্যান্টিক শোনাচ্ছে না? বেশ একটা প্রেমের উপন্যাসের মত ফ্লেভার!”
“তা বটে। গোবরডাঙ্গা বা হাড়ভাঙার থেকে তো নিঃসন্দেহে ভাল।”
“ইশ! দিলে আমেজটার বারো বাজিয়ে!” ইরা রাগ করে। 
আমি হেসে বলি, “আচ্ছা বেশ, সে না হয় হল। কিন্তু আজকাল তো চিঠি লেখার চল উঠেই গেছে। চিঠিটা কে দেবে শুনি?”
“সেই। তবু খুব ইচ্ছে করে চিঠি পেতে। অথচ দ্যাখো এত বছর প্রেম করলাম একটা চিঠি তো দূর অস্ত চিরকূট পর্যন্ত তোমার থেকে পাইনি।”

সেসময়ে চিঠি! বিয়ে না হতেই ইরার গোঁড়া ব্রাহ্মণ বাবার জামাই-আদরের ক্ষতচিহ্ন ঠাঁই পেয়েছে আমার কপালে। বিপদ বুঝে ‘শতং বদ মা লিখ’ মেনে চলছি তখন। ভাড়াটে গুন্ডার লাঠির বাড়ির ঝক্কি থেকে একটা ভাড়াবাড়ি পাওয়ার ঝঞ্ঝাট, কোনোটাই কম পোয়াতে হয়নি! এ প্রেমের পরিণতি নিয়েই রীতিমত চিন্তায় ছিলাম। ইরার অনমনীয় জেদই শেষ পর্যন্ত ভিন্ন ধর্মের বিয়ের যাবতীয় অনাদর, অপমান, অত্যাচার ঝড়ের মুখের শুকনো পাতার মত উড়িয়ে এক পরিচ্ছন্ন দাম্পত্য গড়ে তুলেছে।

“লোকে কেমন প্রেমপত্র চন্দনকাঠের কারুকাজ করা বাক্সে রেশমী রুমালে জড়িয়ে জমিয়ে রাখে। বহুদিন পরে যখন চুলে রুপোলি সুতো আর পায়ে বাতের ব্যথা দেখা দেবে তখন কোনো নির্জন দুপুরে মেহগিনি কাঠের আলমারি খুলে ভাঁজ করা শাড়ির তলা থেকে বাক্সটা বের করবে। তারপর সেসব চিঠি খাটে বিছিয়ে একবার এটা একবার ওটা পড়বে আর নিজের মনে হাসবে।” আপনমনে বলে যাচ্ছিল ইরা।ওর কানের লতিতে একটা আলতো চুমু দিয়ে বলি, “তাহলে এখন থেকে সপ্তাহে একখানা করে চিঠি দিয়ে পুরনো প্রেম ঝালিয়ে নিই?”
“রক্ষে করো! যে সময়ের যা। এখন চিঠি লিখলে তাতে হাউসবিল্ডিং লোনের সুদের হিসেব, অর্থমন্ত্রীর বাজেট অধিবেশনের ফলাফল, ইউনিভার্সিটির এবারের রুলস এন্ড রেগুলেশন্স, দেশের রাজনৈতিক ডামাডোল– এসবই থাকবে। বিন্দুমাত্র রস কষ থাকবে না।”

অদ্ভুত ব্যাপার! চিঠি কিন্তু এল। কয়েক দিন পরেই ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে চায়ের কাপের সাথে একটা খাম টেবিলে রাখল ইরা।

 “কী এটা?”

“চিঠি।”

“কার?”

“পড়ে দ্যাখো।”

একটু অবাকই হলাম। চিঠি দেওয়ার মত লোক আমার বা ইরার কারোরই নেই। খামটা তুলে দেখি ওপরে লেখা–
মাধবীলতা ঘোষাল
মাধবীকুঞ্জ ৯ নম্বর,
কেয়াতলা লেন

প্রেরকের নাম নেই। আশ্চর্য! আর মাধবীলতা কে? এ বাড়ি শুনেছি রত্নেশ্বর ঘোষালের। একসময় এলাকার দাপুটে রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। বছর পঁচিশ পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে থাকার পর অদ্ভুত ভাবে স্বামী-স্ত্রী একই দিনে মারা যান বা আত্মহত্যা করেন।

বাড়িটা তারপর বহুদিন পড়েই ছিল। সম্ভবত ওই আত্মহত্যার কারণেই বিক্রি করা যায়নি। আমিও একটু ইতস্তত করেছিলাম। ইরা ঝড়ঝাপ্টা কাটানো শক্ত ধাতের মেয়ে। শুনেই বলেছিল, “ইতস্ততর কী? ভূত বলে কিচ্ছু নেই। আর যদি থাকতও আমার ধারণা তারা মানুষের থেকে নিরাপদ হত।”

তাছাড়া একটা বাসস্থানের জন্য গত দু’বছরে যা অভিজ্ঞতা আর হয়রানি হয়েছে! আমাদের কাছে এ বাড়ি পাওয়া আর হাতে চাঁদ পাওয়া সমান। কাশীপুরে তো ফ্ল্যাটটার কথা প্রায় পাকাপাকি হয়ে যাবার পরও হাউসিং কমিটির প্রেসিডেন্ট জানালেন, “সম্ভব নয় অনিরুদ্ধবাবু। কমিটির অন্যান্যদের অবলিগেশন রয়েছে। শুধুমাত্র বাঙালিরাই এখানে ফ্ল্যাট-ওনার হতে পারবেন।”অবাক হয়ে বলেছিলাম, “আমি বাঙালি নই বলছেন?”

“দেখুন বাংলায় কথা বললেই কী আর… এখানে দুর্গাপুজো, সরস্বতীপুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, বসন্ত উৎসব পালন করা হবে। আপনি একা পড়ে যাবেন। আর অন্যরাও চাইছেন না বসু, মজুমদার, লাহিড়ী, মুখার্জিদের মধ্যে একজন ইসলামকে ঢোকাতে। আফটার অল সব একই কালচারের মানুষ সোসাইটিতে থাকুক, এইটাই…।”
এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক কিছুই বলা যেত। আমার প্রবৃত্তি হয়নি। পরে অবশ্য ওঁরা আবার যোগাযোগ করেছিলেন। ক্ষমাও চেয়েছিলেন। তার কারণ অন্য। 

“আপনার এটা আগেই বলা উচিত ছিল। বিজ্ঞানী মনিরুল ইসলামের ছেলে আমাদের ওখানে থাকবেন, এ তো বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার! আপনারা স্বামী-স্ত্রীও শুনলাম অধ্যাপনার লাইনে…”

“এসব জানার পর আপনাদের উৎসব পালনে একা পড়ে যাব না বলছেন?”

“আরে ইয়ে না না। একটা বিরাট ভুল হয়ে গেছে। সে সব ছেড়ে দিন। আপনি আসুন। আমাদের কারোর কোনো আপত্তি নেই। আফটার অল উনি ছিলেন আমাদের গর্ব!”

“বলছেন? তা মশাই আমার তো আপত্তি আছে।  আফটার অল আপনাদের মত মানসিকতার লোকজনের সাথে বসবাসটা আমার কাছে মোটেই গর্বের হবে না, বুঝলেন?” বলে ফোন রেখে দিই। তখন কেয়াতলার বাড়িতে আসার তোড়জোড় চলছে। 

ছোটবেলায় আমাকে দেখে অনেকেই বলত মাতৃমুখী পুত্র সুখী হয়। সুখ অতই সস্তা! সাত পেরিয়ে আটে পড়তেই মাতৃহারা। তাছাড়া আমার এযাবৎ জীবনে সুখ সম্মান কেউ প্লেটে সাজিয়ে এমনি এমনি পরিবেশন করেনি। সেসবের জন্যে অনেক লড়াই করতে হয়। আর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্মান ভাঙিয়ে খাওয়ার রুচি আমার নেই। 

কিন্তু এ চিঠি ইরার কাছে কী করে? জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই ইরা বলল, “পেলাম। লেটারবক্সটায়। বিকেলে বাড়ি ফিরে কী মনে হল খুলেছিলাম, দেখি এটা পড়ে। কবে এসেছে কে জানে!”

বারান্দার গ্রিলে লাগানো লেটারবক্সটা ঢোকার মুখেই চোখে পড়ে। সেটার রংচটা চেহারা দেখলে বোঝা যায় বয়েস ভালোই। ইরা বলেছিল, “চিঠি আসুক ছাই না আসুক যেমন আছে থাক ওটা। বেশ লাগে দেখতে। পরে গ্রিল রং করার সময় ওটাতেও এক পোঁচ দিয়ে নিলেই হবে।” 

মোটে সপ্তাহ দুই হল আমরা এখানে এসেছি।  ইউনিভার্সিটি যাতায়াতের ফাঁকে দুজনে মিলে এরই মধ্যে যতটা সম্ভব ঘরদোর দুরস্ত করে তুলেছি। খালি বাড়ির নামটুকু সার্থক করতে ইরা একটা মাধবীলতার চারা খুঁজছে। 

বাড়িটা বেশ সস্তায়ই পেয়ে গেলাম।কেনার সময় তদারকির দায়িত্বে থাকা বৃদ্ধ যোগেনবাবু বলেছিলেন এবাড়ি নিয়ে রত্নেশ্বর ঘোষালের বংশধরদের কোনো দাবি নেই। তারা সব বিদেশে। সম্পত্তি বিক্রির টাকা কোন এক অনাথ আশ্রমে দান করা হবে।

ইরা তো প্রথমটায় বিশ্বাসই করতে চায়নি। এতবড় একটা বাড়ি, ছোটবড় মিলিয়ে চারখানা ঘর। সামনের গ্রিলঘেরা ছড়ানো বারান্দা পেরিয়ে প্রায় এক কাঠা জমি। তাতে বেশ কয়েক রকম গাছ। সত্যি বলতে কি আমাদের অল্প কয়েকটা আসবাবে বাড়িটার বেশিরভাগ ফাঁকা পড়ে রইল। কিন্তু ছটফটে কিশোরীর মত ইরার অকারণ এঘর ওঘর ঘোরাঘুরির দেখতে দেখতে একটা অদ্ভুত ভালোলাগা আগের ইতস্তত ভাবটা কাটিয়ে দিল। 

খামটা খোলা। দেখে বলি, “তুমি পড়েছ? কিন্তু অন্যের চিঠি পড়াটা…” 

কী একটা ভাবছিল ইরা। চমকে উঠে বলল, “চিঠিটা পেয়ে যোগেনবাবুকে ফোন করেছিলাম। উনিই খুলে দেখতে বললেন। তারপর শুনে বললেন, ‘ও আর কী হবে? চাইলে রাখুন, নইলে ছিঁড়ে ফেলে দিন।’

ভদ্রলোক খুবই  বুদ্ধিমান আর বিচক্ষণ। যতই জানুন বুঝুন, যেটুকু প্রকাশ করার সেটুকুই করেছেন।” 

শুনে আমার কৌতূহল আরো বেড়ে গেল। চিঠিটা খুলে দেখি, “এ তো প্রায় ছাব্বিশ বছর আগের চিঠি!”

“হ্যাঁ। হবে পোস্টাল সার্ভিসের গণ্ডগোলে… বোধহয় আমাদের অপেক্ষাতেই…নইলে তো…”

নইলে কী সেটা না বলেই ইরা চুপ করে গেল।আমিও আর কথা না বাড়িয়ে পড়তে শুরু করলাম। চিঠিটা এইরকম–

মা,
      কতদিন পর তোমার সাথে কথা! তা হোক সে চিঠিতে। শুনেছ নিশ্চই, কাল হঠাৎ যোগেন দাদার সঙ্গে দেখা। তারপরই খুব ইচ্ছে হল তোমায় লিখি। 
হ্যাঁ, আমি দেশে ফিরেছি। শুনলাম ও বাড়িতে এখনো আমার নাম মুখে আনা বারণ! কী আশ্চর্য! গালমন্দ করতেও তো নাম নিতে হয় নাকি?
অথচ দ্যাখো, একটা সময় এই রাজুই ছিল তোমাদের নয়নের মনি। সে-ই হয়ে গেল সবচেয়ে বড় শত্রু! যাক সে কথা। খবর পেলাম বড়দি, ছোড়দি তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। কেন? এখন তো আমি আর ও বাড়ির কেউ নই। তবে?
জানি ওদের বহু পুরনো রাগ আমার ওপর। আমার ভালো স্কুল, দামি জামা, বড় মাছের টুকরো, দুধের সর, খুঁজেপেতে ধরে আনা মাস্টারমশাই; আমাকে সবেতে তুখোড় করে তোলার চেষ্টা, না চাইতেই সবকিছু। মাঝে পড়ে ঘোষালবাড়িতে আমি কীরকম একলা হয়ে গেলাম। 
জ্ঞান হওয়া থেকে শুনে এসেছি রত্নেশ্বর ঘোষাল  হারতে শেখেনি। বরাবর ক্ষমতার দম্ভে অনায়াসে দিনকে রাত করে দিত। সেইজন্যে ছেলে ছেলে করে দুই মেয়ের পর আমাকে পেয়ে ভাবল এবারেও তাই-ই করবে। শিক্ষাদীক্ষা, চালচলন, চুলের ছাঁট, জামাকাপড়ের কাট থেকে শুরু করে সবেতেই কঞ্চি আর কাঁচি হাতে আমায় ইচ্ছেমত গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু হিসেবের কী ভুল!
বড়দি, ছোড়দি তোমার মতন। চোখা চোখা নাকমুখ, পাতলা ঠোঁট, নিচু গলায় কথা, সবেতেই মানিয়ে নেয়া। কিন্তু আমার কোঁকড়া চুল, কটা চোখ, পুরন্ত ঠোঁট, উঁচু গলায় তিড়বিড়িয়ে কথা- পুরোটাই নাকি আমার দাদামশাইয়ের মত। তুমি বলতে জেদটুকুও।
সব্বাই বলত বাবা আমাকে বেশি ভালোবাসে। কিন্ত বাবাকে আমি ভয় পেতাম। একবার সেই মনি আর আমি খেলনাবাটি খেলতে বর-বউ সেজেছিলাম! বাবা জানতে পেরে রেগে টেনে নিয়ে গিয়ে ছাতের ঘরে আটকে রেখেছিল। মনে আছে তোমার? আমি তখন সবে ক্লাস টু। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে কাঁদছিলাম। তবু বাবা দরজা খোলেনি। সন্ধে গড়িয়ে গেছিল। ও ঘরে আলো ছিল না। জানলার পাশে ঝাঁকড়া নিমগাছটা হাওয়ায় দুলছিল, যেন জটিবুড়ির চুল। আমি দরজায় পিঠ দিয়ে সারাক্ষণ ওদিকে তাকিয়ে বসেছিলাম। অনেক রাতে শিকল খুলে যোগেন দাদা আমায় কোলে করে নামিয়ে এনেছিল। 
কবে থেকে যেন ভয়টা আস্তে আস্তে রাগে পাল্টে যাচ্ছিল, জানো। ছোটবেলায় বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসত। আমি তাই বাড়িতেই…। শুধু মনি, হ্যাঁ ও-ই শুধু আমার সাথে খেলত। আমগাছে টাঙানো দোলনায় দুলতাম আমরা। সবাই যখন বিকেলে লুকোচুরি, কিত্ কিত্, ডাংগুলি, গোল্লাছুট খেলছে, আমরা একেকদিন সাইকেলে কালীতলা ছাড়িয়ে সেই বড়পুকুর অব্দি চলে যেতাম। কল্পনায় তার চেয়েও বহুদূর। বড্ড মিল ছিল আমাদের।
মনি ঘোষালবাড়িতে অনেকটা সময় কাটাত।কিছুটা আমার বন্ধু হিসেবে। বাকিটা তোমার ছায়ায়। তোমাকে মামনি বলত ও। কে শিখিয়েছিল কে জানে! ছুটির দিনে যখন বারান্দায় বসে আমরা ক্যারাম বা দাবা খেলতাম, রান্নার ফাঁকে তুমি মাছ ভাজা, লেবুর শরবত, কাসুন্দি লেবুপাতা দিয়ে আম মেখে দিতে। মামারবাড়িতে আলগা আলগা ভাবে মানুষ হওয়া মনি আসলে একটা পরিবারের নরম ভালোবাসা খুঁজত। তুমিও তো ভালোবাসতে ওকে। বাসতে না?
অথচ দ্যাখো সেই মনিই যখন আমাকে, আমাদের আরো আপন ভাবতে চাইল ছবিটা পুরোপুরি পাল্টে গেল। মানুষ হিসেবে মনি তো কোনোদিক দিয়েই খারাপ ছিল না! তবু কথায় কথায় মার্ক্স এঙ্গেলস লেনিন আওড়ানো সেকুলার রাজনীতিবিদ রত্নেশ্বর ঘোষাল বেঁকে বসল!
মা তুমিও তো তখন…? যার ঘরে জ্বলজ্বল করছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের ছবি; গীতবিতান, সঞ্চয়িতা, সঞ্চিতা যার মুখস্ত, সেও নিশ্চুপ থেকে বুঝিয়ে দিল, ‘ভুলে যা।’কেন? আমি শিক্ষিত প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারব না? 
জানতাম রত্নেশ্বর ঘোষালকে খবর দেবার লোক প্রচুর তবু মনি আর আমি দেখা করতাম।কখন কী করে বসি ভেবে ভয় ছিল মনে। তাই উল্টে আমাদেরই ভয় দেখাতে চাইল। তার এ রূপ তো আমার চেনা! সেই জন্যেই মনির মাথা ফাটা আর ওর মামার পেপার মিলের চাকরিটা চলে যাওয়ার পেছনে কার হাত আমি নিশ্চিত ছিলাম। তোমরাও বোধহয় আমার থম মেরে থাকা দেখে ঝড়ের পূর্বাভাস টের পেয়েছিলে। তবু শেষ রক্ষা হল কি? ওই যে কথায় আছে বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো!
রত্নেশ্বর ঘোষালের ডানহাত লাল্টু ঘোষ নাকি প্রথম গিয়ে খবর দেয়, ‘রাজু মোছলমান হয়ে গেছে।’ শুনেছিলাম নাগালের বাইরে চলে গেছি বুঝে রাগে অন্ধ রত্নেশ্বর ঘোষাল টান মেরে আমার সমস্ত জামাকাপড় বইপত্র উঠোনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। চিরজীবন জিতে আসা মানুষটা নিজের সন্তানের কাছে হেরে গিয়ে সেরিব্রাল স্ট্রোকে শেষে পঙ্গুই হয়ে গেল! 
একদিন এমনি করেই আমার সমস্ত সত্ত্বা, স্বাধীন চিন্তা, ভালোবাসাকে মেরে পঙ্গু করে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। 
মাধবীলতা গাছটা যেমন নিজের মত ডালপালা মেলতে চাইলেই ছেঁটে ফেলা হত, তবু প্রতিবার অজস্র কচি কচি পাতাসমেত ডাল বেরিয়ে বর্ষায় থোকা থোকা ফুল ফোটাত, গোটা বাড়ি মাতিয়ে রাখত গন্ধে! তেমনি আমার ইচ্ছেগুলো হয়ত এই বেঁচে থাকা টিকে থাকা দেখে কিছুতেই মরত না।
মাধবীলতা গাছটা কেমন আছে মা? গাছেদের কী কষ্ট বলো! ওরা পালাতে পারে না। প্রতিবাদ করতে পারে না। মানুষের কত সুবিধে! তবু কত মানুষ গাছ হয়ে যায়। সব সয়ে যায় আজীবন। 
আচ্ছা সেই বেলগাছটা? এখনো আছে? বেল হয় আগের মত? তুমি টকদই দিয়ে পাকা বেলের পানা বানাতে। কী ভালো খেতে!  একবার ফাল্গুনমাসে ন্যাড়া বেলগাছটায় সবে কচি কচি পাতা গজিয়েছে। চক্রবর্তী কাকিমা এসে পট পট করে পাতাগুলো ছিঁড়ছিল। আমি পড়তে বসে জানলা দিয়ে দেখে দৌড়ে গিয়ে বলেছিলাম, ‘ছিঁড়ছো কেন? সবে কচি পাতা বেরিয়েছে গাছটায়। মরে যাবে তো!’
কাকিমা বলেছিল, ‘শিবরাত্রি। তাই কটা বেলপাতা নিচ্ছি। বাব্বা এর রকম দ্যাখো!বেলগাছ তো শিবপুজোর জন্যেই বাড়িতে বসায়।’
আমি চেঁচিয়ে বলেছিলাম, ‘মোটেও না। ওই পাথরের পুজোর জন্যে গাছটার কচি কচি পাতা ছিঁড়লে আরো পাপ হবে তোমার।’
বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে সপাটে একটা চড় মেরেছিল আমার গালে। বলেছিল, ‘বাচাল কোথাকার! ঠাকুর দেবতা নিয়ে ফাজলামি?’
কী কান্ড দ্যাখো! সেই কবেকার কথা। হুড়মুড়িয়ে কেমন মনে পড়ে যাচ্ছে! কোনো মানে হয়! 

মা, খুব মনে পড়ে তোমাকে। অসুখ করলে মনে পড়ে একটা ঠান্ডা নরম হাত কেমন কপাল ছুঁয়ে যেত বারবার। যোগেন দাদা কিন্তু এখনো আমায় বড্ড ভালোবাসে। বলছিল তুমি নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার জন্যে কাঁদো? বলল, তোমার সঙ্গে যেন একবার চুপি চুপি দেখা করি। কেঁদো না মা। যার জন্য কান্নাও অপরাধ সে ও বাড়ি গেলে মহা অধর্ম হবে যে! 
তবু লিখলাম এ চিঠি। লিখলাম মনে যা আসে।বাবা আমাকে ভালোবাসে মা। কিন্তু সে ভালোবাসা তীব্র শাসন আর অধিকারবোধের। তোমার মত শীতল মায়াময় নয়। আমি তা সহ্য করতে পারিনি। জানো, একটু বড় হবার পর  মাঝেমাঝে মনে হত মনিই ভালো আছে। ও মুক্ত। ওর পায়ে আপনজনের বেড়ি নেই। 
এখন অনেক রাত।রাত বাড়লে পৃথিবী কেমন শান্ত শীতল হয়ে আসে। অথচ বয়েস বাড়লেও মানুষ সেই উগ্র অনমনীয় থেকে যায়। কী লাভ এতে?যাক! বাবা ভালো থাকুক। ভালো থাকো তোমরা সবাই। 
আমি ভালো আছি।একটা ছবি পাঠালাম, দেখো।

মুসলমান আমি হইনি মা। হিন্দুও আমি নই। তাই মনির মামারবাড়িতে যাইনি। ৯ নম্বর, কেয়াতলা লেনেও আর কখনো যাব না।                                                                                                           
রাজু                                                         

অজান্তে কখন আমার হাত চলে গেছিল কপাল থেকে ভুরুতে নেমে আসা কাটা দাগটার ওপর। বিড়বিড় করে বললাম, “আশ্চর্য! অদ্ভুত মিল! আর ছবি? সেটা কোথায়?”                                              

দক্ষিণের জানলাটার কাছে বাইরের ঘন অন্ধকারের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরা। আমার কথায় মুখ ফিরিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল একটু। যেন কোনো গভীর অতল চিন্তার থেকে ভেসে উঠতে সময় নিল কিছুটা। তারপর জানলার ধার ছেড়ে এসে বাড়িয়ে দিল বিবর্ণ বাদামি হয়ে আসা একটা সাদাকালো ছবি। 

ছবিটা হাতে নিয়ে স্বপ্নাবিষ্টের মত বসে রইলাম। এর হুবহু এনলার্জড বাঁধানো কপি ওই তো সামনের বুকসেলফটার ওপর রাখা! আমার আশৈশব চেনা একটা ছবি — সোফায় বসে এক অল্পবয়সী দম্পতি মনিরুল আর রাজেশ্বরী, মাঝে বছর চারেকের আমি। 

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...