সুলতানার চিঠি
অপর্ণা গাঙ্গুলী

পৌর্ণমাসী  কোটাল পড়লে, রাতেভিতে, মাঝে মাঝে দেজা ভ্যু হয় l কোন অচিনকালের জন্মান্তরের কোন দয়িতের জন্য মন কেঁদে ওঠে l তখন সেইসব দিনকালে ফিরে যাই, সেখানেই বসবাস করি, সেই নিয়ে একটুআধটু লেখালেখি করি l তবে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায় l এমনই এক মানসিক অবস্থার বহিঃপ্রকাশ এই সুলতানার চিঠি …

                                                        সুলতানার চিঠি  ১

১৫৩০, ইস্তাম্বুল

জানেমন সুলতান,

মুহিব্বি, প্রিয় কবি আমার,

তোমার নামটা জিভের ডগাতে এলেই মনে হয় সুস্বাদু লকুম পরতে পরতে খুলে যাচ্ছে l তার স্বাদে, গন্ধে আমার তনুমন পুলকিত হচ্ছে l যেন ওই সামনের ঝিলটার জলে কমল দল মেলে জেগে উঠছে চাঁদের সোহাগ পাবে বলে l বুদার যুদ্ধজয়ের শেষে আমার কাছে ফিরে আসছো, আজ l ওই দেখো পৌর্ণমাসী চাঁদ ভেসেছে আকাশে l ওহ হো, তোমাকে বলাই হয়নি l তোমার দেওয়া খাঁচায় রাখা ওই ইশ্ক এর পঞ্চীদের আমি কাল নিজের হাতে মুক্তি দিয়েছি l যাক উড়ে ওরা l ওদের চিক চিক আমাকে আজ আর ঘুম থেকে ডেকে তোলেনি l তা হোক, ভালোবাসা আজাদ হোক, মুক্তি পাক l জেনেছি ওকে বেঁধে রাখা যায় না l একটাই ইচ্ছে আমার, এর পর থেকে তোমার কবিতায় রোজ রোজ যেন জেগে উঠি l

দুঃস্বপ্ন দেখেছি প্রিয়তম এই ক’দিন l যে দিনগুলিতে তুমি যুদ্ধে ছিলে l তোমার বুকের পাশ দিয়ে যে শত্রুর তীর একটুকুর জন্যে বেরিয়ে গেছে, তা হয়তো আমার প্রার্থনার জন্যেই l তোমাকে না দেখে আমার শান্তি নেই l তোমার ওই চোখদুটিতে আমি জন্নত দেখতে পাই l আমার স্বপ্ন, আমার জীবন মৃত্যু, আমার ইচ্ছে অনিচ্ছে, ভালো খারাপ, ঠিক বেঠিক, শুধু তোমাকেই ঘিরে শাহেনশা l তবু কেন ভালোবাসাকে মুক্তি দিলাম বলতে পারো? জানি, ফিরে আসার হলে, আবার ওই ভালোবাসা আমার বুকে ফিরে আসবে l অন্তত সত্যিকারের প্রেমের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে যুগ যুগ ধরে l

তুমি গতবার আমাকে যে ঘোড়াটি উপহার দিয়েছিলে, আদর করে তার নাম রেখেছিলাম মুহব্বত l ভালোবাসা l ভালোবাসা !! তোমার সাথে আমার প্রেমের প্রতীক l এতে সবাই ঠোঁট উল্টেছে, হেসেছে, বিদ্রুপ করেছে l মেহ্জাবীন, হাফিজা সুলতানা, গুলফম বেগমরা l এতেও কিছু বলার ছিল না জানম, যদি না কেউ কাল ওই ভালোবাসার চিহ্নটিকে ছুরির আঘাতে হত্যা করতো l ওরা আসলে খুব বোকা জানো l হা হা হা হা হা হা হা … ভাবে রোজ ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে, কান ভরিয়ে এই ভালোবাসাকে, ওই তুরঙ্গ মুহাব্বতের মতোই মেরে ফেলবে ওরা l হা হা কিছুতেই পারবে না দেখো l যতদিন এই সৌরমণ্ডল থাকবে, আমাদের ভালোবাসার আলোক চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে, উজ্জীবিত করবে সবাইকে l আমার কিছু করার নেই জানেমন সুলতান l তোমার চোখ দিয়েই আমি যেখানে চোখ মেলেছি, যেখানেই আমার চোখ পড়েছে, ভালোবাসাকে দেখতে শিখেছি, ভালোবাসার কদর করতে শিখেছি আর ক্রমে ক্রমে  নিজেই কবে যেন “ভালোবাসা” হয়ে উঠেছি, মনে নেই l

মনে পড়ে আমার ঔদ্ধত্য, যেদিন খোলা তরবারী তোমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলাম, আমার প্রতি একাত্ম না থাকতে পারলে, হত্যা করো আমাকে? তুমি পারোনি l আমি যা ইচ্ছা করেছিলাম তাই শুনেছিলে, দিয়েছিলে আমাকে … আমার সাহসকে সাবাসী দিয়েছিলে তুমি l আজ ভারী লজ্জা হয় l এতো ঠুনকো ভালোবাসা নয় ! পৃথিবীর সমস্ত নারী তোমার স্পর্শ পেলেও, শুধু একজনের জন্যেই তোমার মন পুড়বে সুলতান l শুধু একজন! একজনের চিন্তায় তুমি ভরে থাকবে, শুধু এই একজন, তোমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না কোনোদিন l

যাক, অনেক হলো … এ সব ভুল, ফুল হয়ে উঠুক নিরন্তর l ভুল থেকেই শিখেছি আজীবন l তুমি শিখিয়ে নিয়েছো হাতে ধরে l

তোমার রূহএর সাথে একাত্ম আমি l এ সমর্পণে আমার অবমাননা নেই l নারীত্বের জোর ফলিয়ে আমি সেই ভালোবাসার অপমান করতে চাই না জানম l শুধু, আমার শেষের সেই দিন তোমার ভালোবাসার দৃষ্টি যেন আমার উপর থাকে, এইটুকুই প্রার্থনা l আর সেদিন যে শায়রী তুমি আমার জন্যে বেঁধেছিলে সেই শায়রীখানি বলতে থেকো l

‘আমার জীবন, আমার যাপন, আমার আজীবনকাল, আমার যৌবনের মদিরা, আমার জন্নত l

আমার বাহার, আমার আনন্দ, আমার দিবা, আমার জানে-জাহান, আমার সুখী সুখী গোলাপটি ll’

তোমার ওই শায়রী কানে মধুবর্ষণ করবে আর আমি আমি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবো l

মাটির পৃথিবীতে …

মাটির থেকে মাটিতে …

ইতি তোমার প্রিয়তমা সুলতানা

সুলতানার চিঠি  ২

১৫৫৮, আদির্ন প্রাসাদ

জান এ জাহান,

প্রথম বারিষ আসার দিনটিতে এই নাও উড়িয়ে দিলাম তোমার উদ্দেশ্যে নীল লেফাফা l আজ নিকষ কালো জলধরটি ওই চিঠি বয়ে নিয়ে যাবে তোমার কাছে, কথা দিয়েছে l শুধু মকতুব তো নয়, ওর মধ্যে ভরা আছে আমার আদিগন্ত ব্যথা l তোমার সুলতানাকে তুমি নির্বাসন দিয়েছো জানম, শুধু তোমার মহল থেকেই নয়, তোমার জীবন থেকেও l তবে, মন থেকে কিনা বলতে পারিনা l আদির্নার এই জঙ্গলাকীর্ণ প্রাসাদে আমার মন মানে না l কেবল ছুটে যেতে চায় ওই বৃষ্টি মেঘের মতো তোমার দরজায় l আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, তোমার আমাকে ডেকে নেওয়ার অপেক্ষায় l তুমি কবুল করলেই যাবো l সালাম জানাবো তোমাকে, তোমার ওই আচরণচুম্বিত কাফতান চুম্বন করবো পায়ের কাছে বসে l আর তুমি দুই হাত ধরে তুলে নেবে আমাকে তোমার বুকের কাছে l

মনে পড়ে, সেই রাতের কথা? সেই দীপবর্তিকা আলোকিত আধো অন্ধকারে, নতুন কাফতান পরা তুমি, তোমার দীর্ঘ চুল, তোমার মুখে কী নিশ্চিন্ত শান্তি l মহাকালের মতো তুমি দুই হাত বাড়িয়ে রয়েছো আমার দিকে আর আমি মৃত্যুন্মুখ ভয়ার্ত কবুতরের মতো এক লহমায় তোমার বুকের মাঝখানটিতে ঝটপট করছি কেবল l তুমি ইচ্ছে করলেই আমার বুকের ধুকপুক শুনতে পাও l তাই বুঝি তোমার ঠোঁটে ওই আফরীন হাসিটুকু লেগে থাকে ! সেই সব রাত হারিয়ে গেছে জান l আমরা কে কোথায় এখন l আমি আদির্নার প্রাসাদে আর তুমি তোমার মহলে l হয়তো কোনো কানিজের বাহুলগ্না এখন l ওহ না না… আমি ভাবিও না ঐসব কথা l শুধু বলি, তুমি ভালো থাকো, ভালোবাসাতে থাকো তুমি l

জানেমন সুলতান, আমার বেঁচে থাকা তোমাকে ঘিরেই l আজ এই নির্বাসনের জীবনের থেকে মরে যাওয়াই কি শ্রেয় নয়? তোমার প্রহরীদের বলে দাও, আমাকে বন্দী করুক l তোমার খলিফাদের হুকুম করে দিও আমাকে মারণ বিষ দিক না হয় খাবারের সাথে l অথবা, একটি বিষাক্ত কাফতান তৌফা হিসেবে পাঠিও তোমার প্রিয়তমা সুলতানাকে l

যাক সে সব কথা l জানো, আজ প্রথম বৃষ্টি এসেছে এখানে l সমস্ত গাছের পাতাগুলো বর্ষাসিক্ত সজীব হয়ে উঠেছে আবার l জঙ্গলে জঙ্গলে উৎসব জেগেছে যেন বৃষ্টির প্রথম চুম্বনে l বৃষ্টির আশায় যে অনন্ত প্রতীক্ষার দিন ওরা কাটিয়েছে, বুঝি বা শেষ হলো এইবার l তবু আমার ঠোঁটদুটি আর্দ্র হলো না l আমি তিয়াসী রয়ে গেলাম l জানি না তোমার রাগ অভিমান কবে ভাঙবে l হয়তো ততদিনে আমার হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে যাবে l

তুমি হৃদয় ভাঙার শব্দ শুনেছ মুহিব্বি ? আমি শুনি l আজকাল l প্রতিক্ষণ l কিছু শব্দ তার থেকে নিয়ে গোলাপের অনুরাগ মিশিয়ে তোমাকে পাঠালাম l যদি এই লেফাফা তোমার হাতে পৌঁছয়, তবে পড়ে নিও l তোমার দেওয়া সব লাল গোলাপেরা এখন অভিমান হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আমার সকল বেঁচে থাকায় l আমার মরে যাওয়াতেও l কুড়িয়েও শেষ হয় না l আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি … গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠি l স্বপ্নে তোমার সাথে আমার রু বা রু হতেই থাকে, জানম, তবে তোমার ওই চোখদুটি আমাকে আর কাছে ডাকে না l সবাইকে হারিয়ে তোমাকে পেয়েছিলাম, তোমাকে হারিয়ে আমিও হারিয়ে গেছি … ধীরে ধীরে ইন্তেকালএর পথে এগিয়ে চলেছি আমি l তবু, আমার রুহ তোমার নীল খামের প্রতীক্ষায় থাকবে জন্মজন্মান্তর l

প্রিয় মুহিব্বি, প্রিয়তম কবি আমার, আমার স্মরণে না হয় আরো একটা শায়রী লিখলে সেদিন l আমার সাথে দাফন করো ওই কবিতাটি l শুধু তাতে সোহাগ ঢেলে দিও অনেক l

আমাদের এই লাজিজ ভালোবাসার নজরানা সব প্রেমিকদের যেন আবারও ভালোবাসতে প্রাণিত করে l

ইতি

তোমার প্রিয়তমা হুররম

**(চিঠিদু’টি কল্পিত, তবে ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর l

সুলতান সুলেইমানকে লেখা তাঁর প্রিয়তমা পত্নী হুররম সুলতানার প্রেমের নজরানা l)

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...