সুচরিতাসু
সুজিত দাস

সুচরিতাসু,

মাসাধিককাল অতিক্রান্ত হইল তোমার কোনও টেক্সট কিংবা হোয়াটস অ্যাপ মেসেজের উত্তর দিতে পারি নাই। এই বঙ্গের ভোটরঙ্গ এবং অতিমারি জনিত কারণেই এই বিলম্ব। আশাকরি মার্জনা করিবে। নানান কারণে মন খুব এলোমেলো হইয়া আছে। তিন্তিড়ী বৃক্ষের ওপর বসিয়া থাকা একাকী কোকিলের ন্যায় অবসাদে ভুগিতেছি। দেশের বাটী থেকে ছবি আসিয়াছে, আম্রবাগিচায় গোপালভোগের রং ভলান্টিয়ার্সদিগের পোস্টারের মতই রক্তিমাভা ধারণ করিয়াছে। পাকা গোপালভোগ দেখিলেই সুবোধ বালকের ন্যায় হাত-পা ছড়াইয়া আমচুষকি খাইতে মন করে। গোপালভোগ খানিকটা কাশীর প্রসাদের সমতুল, হাজার চুষিলেও শেষ হয় না, অমৃতের ভান্ড যেন।
সুশীতল গ্রাম্য পরিবেশ থেকে বহু দূরে এই নিয়ন আলো সজ্জিত নিউটাউনে বসিয়া কেন তোমাকে চিঠি লিখিতেছি, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগ। প্রসঙ্গত জানাই, গতকাল হেলাল হাফিজ পাঠ করিতেছিলাম। ইমিনেন্ট স্পার্ক হিসেবে কয়েকটি পঙ্‌ক্তি চেতনের গভীরে হন্ট করিতেছে, ‘কোন কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে/ কোন স্মৃতিটা উস্কানি দেয়/ ভাসতে বলে প্রেমের বানে/ পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো৷’ নিশ্চয়ই অবগত আছো ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এখন কাকলি ফার্নিচার এবং সাবানের প্রাদুর্ভাব। এমত আবহে, হেলাল হাফিজ আর সুমিত পতির কবিতা পাঠে ব্যাপ্ত ছিলাম। ফ্রম ফায়ার টু ফ্রায়িং প্যান। আমচু্ষকির ন্যায় মন রসে টইটম্বুর। গুরুচণ্ডালী ক্ষমার্হ। চিঠিও।
মাঝে একদিন একটি সাহিত্য আলোচনায় ডাক পাইয়াছিলাম। পতঙ্গ যেভাবে অগ্নিবলয়ে ঝাঁপ দেয়, ঠিক সেইভাবে লিঙ্কে ক্লিক করিয়া জুম সভায় প্রবিষ্ট হওয়ার অব্যবহিত পরই ‘চিরপ্রণম্য অগ্নি’র আঁচ টের পাইলাম, বিজ্ঞজনেরা কত জানেন! মূর্খ আমি, চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া শুনিলাম সেই অমোঘ কথোপকথন। বিষয় ছিল, ‘বাংলা কবিতার অবাধ্য আঁচল’। শুনিলে অবাক হইবে, আঁচলের কী অপার মহিমা। নিৎসের নিহিলিজম থেকে ফ্রয়েডের চেতন-অবচেতন, দেরিদার বিনির্মাণ হইতে মার্ক্সের শ্রেনী সংগ্রাম… সর্বত্রই আঁচল একটি অলৌকিক ধ্রুবক। শিফন যেন বিভ্রমের রক্ততিলক। ফাঁকা ফ্ল্যাট থেকে করোনিল, আঁচল সর্বত্রগামী। বেশিরভাগ আলোচকই অধ্যাপক। হংস মধ্যে বক যথা এই আমি একাকী ট্যাক্স আপিসের কনিষ্ঠ করণিক! তাও এমন ‘বেঁকাপারা’ মুখ। তবু ডাক পাইয়াছি কোনোরূপ সুপারিশ ছাড়াই, ভাবিতে পারো? নিজেকে অমন শূন্য স্থানাঙ্কে এর আগে কখনও আবিষ্কার করি নাই। জিরো কোঅর্ডিনেট।
এই অসময়ে টিভিই ভরোসা। অহোরাত্র ওই চতুষ্কোণ যন্ত্রটির দিকে তাকাইয়া থাকি। সংবাদপাঠিকা কী নিরাসক্ত মুখে মৃত্যুর খবর পরিবেশন করেন! সন্ধ্যা নামিলেই আমার অসুস্থ মাতা নিজঘরে ধূপ জ্বালান। ধূপ-সুগন্ধময় এই সন্ধ্যাগুলিতে টিভির ভিতর সকলে মিলে কোন্দলে জড়াইয়া পড়ে। কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ কবি, কেউবা সমাজসেবী। কেউ নুনগোলমরিচ দাড়ি রাখিয়াছেন, কেউবা স্বাগতালক্ষী ধরণে কপালে বৃহৎ একটি টিপ (ঈষৎ ধ্যাবড়ানো)। কেউ ফ্যাব ইন্ডিয়ার পাঞ্জাবি, কেউ স্লিভলেস ব্রা-উজ। এমত দৃষ্টিনন্দন আবহে কলহ বড়ই অনভিপ্রেত। অথচ সকলেই নিখুঁত মডিউলেশনে ঝগড়া করিতে পারেন। শুনিয়া বড়ই আশ্চর্য হইবে এইসকল বক্তারা হেন বিষয় নাই, জানেন না। হেমসেলাই হইতে সাইটোকাইন স্টর্ম, আয়রন ডোম থেকে টি এম টি বার…এই অদ্ভুত পল্লবগ্রাহিতা আমাকে মুগ্ধ করে। তোমার ওখানেও এই চতুষ্কোণ বস্তুটিতে সকলে সমস্বরে/অসমস্বরে কলহ করে? জানিতে ইচ্ছা করে, পত্র দিয়ো। মেসেঞ্জারে অত কথা টাইপ করিতে অসুবিধা হয়।
প্রত্যূষে একটি অশৈলী ব্যাপার লক্ষ করিয়াছি। গতকল্য, মধ্যযামে একটি ক্ষুদ্র পক্ষীর আলোকচিত্র ফেসবুকে জ্ঞাপন করিয়াছিলাম। দেখি, উহাতে প্রায় দুই শতাধিক লাইক! দুউউউই শত, ভাবা যায়? শ্রাবণের ধারার মতো লাইক ঝরিতেছে। সাধারণত আউশভিৎস, ক্ষুধা, ভাত, ধর্ষণ…ইত্যকার বিষয়ে কবিতা লিখিলে এমত লাইক চোখে পড়ে। অথচ সামান্য পাখির ছবিতে এত! এই লজ্জা হইতে নিষ্ক্রমণের কোনও উপায় থাকিলে অবশ্যই জানাইবে। চিঠিতে। বাহ্য পর্যন্ত কষিয়া গিয়াছে এই অভাবনীয় ব্যাপারে। ‘লাইক’ কাউকে পশ্চাৎধাবন করিলে এই ঘটনা ঘটে। পুনরায় কপালভাতি শুরু করিতে হইবে (এমনিতে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসাই করাই, তবে ইরা এবং পিঙ্গলাকেও অস্বীকার করি না)। যাইহোক, কমোডে বসিয়া নিজেকে আধা-সেলিব্রিটি মনে হইতেছিল। ভাবো। কী অশৈলী ব্যাপার! নিজেকে নিজেই এই বলিয়া শান্ত করিতেছি, ‘তু ‘লাইকে’ মত্‌ যাইও, মত্‌ যাইও মেরি জান।‘
বন্ধুদের সহিত বহুকাল দেখাসাক্ষাৎ নাই। এই লকডাউনে কাহারও বাটীতে যাইবার উপায় নাই। এতটা বন্ধুর পথ আজকাল আর উজাইতে পারি না। চিঠি লেখা আবার অভ্যাস করিতেছি। বন্ধু-বান্ধবীদেরকে আকাশি নীল হাওয়াই খামের ভিতর ঈষৎ অফ হোয়াইট কাগজে লিখিবার তৃপ্তিই অন্যরকম। বান্ধবী শব্দটিকে আবার অন্য কনোটেশনে নিও না। সব চিঠির উত্তর পাবো, এমত আশা রাখি না। তবু ডাকটিকিটে জিভ ঠেকাইতে বড়ই আনন্দ পাই। কোন আঠা যে কোথায় লুকাইয়া থাকে!

এই যে এখন কাঁঠাল কাঠের টেবিলে বসিয়া তোমাকে লিখিতেছি, এখনই এই প্রায়-কলিকাতায় যুগপৎ বৃষ্টি এবং রোদ। শৈশবে জানিতাম রোদ আর বৃষ্টির যুগলবন্দীতে শৃগালের বিবাহ হয়। এতদঞ্চলে শৃগাল আর নাই বলিলেই চলে। লবণহ্রদের শেষ শৃগাল বাহিনী জ্যোতিবাবুর নিদ্রাভঙ্গ করিয়াছিল বলিয়া আনন্দবাজারে সংবাদ পড়িয়াছি এককালে। যাইহোক শৃগালের বিবাহ উপলক্ষে বাইরে রামধনু, (মতান্তরে রংধনু) উঠিয়াছে। মেঘের সিঁথি চিরে দেওয়া এক বিষণ্ণ রংধনু।

                      আজ এখানেই শেষ করি। পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো।

প্রীতি। ইতি,

সুজিত।

11 Comments

  • সুব্রত মণ্ডল

    Reply June 27, 2021 |

    খুব ভালো লাগলো

  • sumit pati

    Reply June 27, 2021 |

    পত্রখানি অতীব সুখপাঠ্য হইয়াছে….

  • Pratap Mukherjee

    Reply June 27, 2021 |

    বাহ্।

    অপূর্ব। আবহ টা অনুভবে এলো।

  • Dip Ghosh

    Reply June 27, 2021 |

    বাহ্ দারুণ লাগলো… ❤❤❤

  • অজয়

    Reply June 27, 2021 |

    প্রিয় সুজিত দা,
    আরো লেখ ,অনেক অনেক লেখ।পদ্য গদ্য কবিতা চিঠি চাপাটি ভাঙানি, গুলাটি কালোয়াটি, যা পারো লেখ। শুধু লিখে যাও।শুধু থেম না।তোমার লেখা পড়লে মনে হয় হ্যা এবার বর্ষা এসেছে, এবার তিস্তা রায়ডাক কালজানি তে।
    বাই দা ওয়ে, কবে রিটায়ার করছো??? তাড়াতাড়ি অবসর নিয়ে শুধুই লিখে যাও। তোমার লেখা আর আজকের রোবিবাসরীয় ইলিশ ভাঁপা দুটোই হাভাতের মত গিলছি। ভালো থেকো।

  • Tanima Hazra

    Reply June 27, 2021 |

    বোধকরি কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর সুচরিতাকে পত্র লিখিলে এমনটাই লিখিতেন।

  • নবকুমার দাস

    Reply June 27, 2021 |

    চমৎকার লাগিল । এমত পত্র লিখন দৌড়াইতে থাকুক ।

  • সূর্য মণ্ডল

    Reply June 27, 2021 |

    আহা কী দারুণ লিখলেন দাদা।

  • লোপামুদ্রা রায়চৌধুরী

    Reply June 27, 2021 |

    অতীব সুস্বাদু

  • Sujit

    Reply June 27, 2021 |

    Sobai ke Onek Dhonyobaad ❤️

  • অর্ণব

    Reply June 29, 2021 |

    অনবদ্য

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...