‘লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’
মিলন চট্টোপাধ্যায়



বালিকাবধু গিয়েছেন বাপের বাড়ি। পড়ন্ত সকাল থেকে সারাটা দুপুর- সময় কাটতে চায় না। উল্টোরথ পত্রিকার পাতা উল্টে উত্তমকুমারকে দেখে দেখেও তার মন ভার! দোতলার বারান্দার জাফরি দিয়ে ছককাটা মেঝেতে এসে পড়ছে মনকেমন রোদ্দুর। ব্যাকব্রাশ করা চুল, মোটা ফ্রেমের চশমার এক যুবকের কথা তার থেকে থেকেই মনে পড়ে। এমন সময় শোনা গেল সাইকেলের ঘণ্টির পরিচিত আওয়াজ। নিচ থেকে ভেসে এল বহু প্রতীক্ষিত একটি বাক্য -‘চিঠি আছে।’ মেয়েটি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখতে পেল তার বাবার হাতে দুটি চিঠি। একটি পোস্টকার্ড অন্যটি খামে ভরা। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল এক সদ্য কিশোরীর ঢলঢলে মুখ।

খুব বেশিদিন নয়, আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও এমন ঘটনা স্বাভাবিক ছিল। তখন না ছিল মোবাইল, না ভিডিও কলিং, না হোয়াটস্‌অ্যাপের টুংটাং। চাকরি থেকে প্রেম, বিয়ে থেকে অন্নপ্রাশন সবেতেই চিঠিই ছিল একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। যার প্রচলন বহুদিনের। বাইবেলের কয়েকটি পরিচ্ছেদ পর্যন্ত চিঠির আকারে লেখা। ইলিয়াডেও চিঠির উল্লেখ আছে। প্রাচীন ভারত, মিশর, রোম, সুমের, চিনে চিঠি ছিল গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাজা সলোমনের প্রিয় হুদহুদ পাখির কাজই ছিল বার্তা বহন করা। সলোমন পক্ষীভাষা জানতেন। প্রসঙ্গক্রমে জানাই, সাহিত্যিক বনফুল এই পাখির নাম দেন মোহনচূড়া। পুরাণ থেকে ইতিহাস, চিঠি জড়িয়ে রয়েছে সবকিছুতেই।

আমাদের ছোটবেলায় ল্যান্ডফোন তার ভারিক্কি মেজাজ নিয়ে রাখা থাকত পাড়ার দু-একটি বাড়িতে। সেই ফোন কল আসা কিংবা কল করলে সঠিক জায়গায় পৌঁছানো ছিল ঝকমারি। ক্রশ কানেকশন ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। এছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়েই ল্যান্ডফোনটি দেহ রাখতেন। ফলে খুব জরুরী ক্ষেত্রে ‘তার’ করা ছাড়া সকলেই নির্ভর করতেন চিঠির ওপর। চাকরির ইন্টারভিউর তারিখ চলে যাওয়ার পরে ইন্টারভিউর চিঠি আসা ছিল ডালভাতের মতই।

শৈশবে বেশিরভাগ সময়েই আসতে দেখেছি পোস্টকার্ড। নববর্ষ, দোল-দুর্গোৎসব সবেতেই প্রণাম জানিয়ে চিঠি পাঠানো এবং চিঠি প্রাপ্তি হত। বিজয়ার সময় আমাদের নিয়ম ছিল তালের পাতায় কাঠের কলমে / খাগের কলমে ১০৮ বার ‘শ্রী শ্রী দুর্গামাতা সহায়’ লেখা এবং সিদ্ধির শরবত বানানো। এই কাজটি করতে হত ঠাকুমার সামনে বসে। এরপর গুচ্ছের পোস্টকার্ড নিয়ে আত্মীয়স্বজনদের বিজয়ার প্রণাম অথবা স্নেহাশিস জানিয়ে চিঠি লিখতেন পরিবারের মানুষরা। চিঠি নিয়ে আসতেন ‘চিঠিকাকা’ আর আমি দৌড়ে যেতাম পোস্টকার্ড আনতে। প্রায় সব চিঠিই লেখা হত নীল কালির ফাউন্টেন পেনে। ওপরে নানারকম সম্ভাষণ। সেই চিঠির গায়ে লেগে থাকত বহুদূরে থাকা আত্মীয়দের ভালবাসা। আসত সুদৃশ্য খামে মোড়া চিঠিও। প্রবাস থেকে। এছাড়াও কাকা-পিসিদের হাতে লেখা কত চিঠি যে দেখেছি। তাতে কেউ কেউ লাগিয়ে রাখত সুগন্ধিও। পত্রবাহক হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে লোভে পড়ে।

কৈশোর এমনই এক সময় যখন সকলেরই চোখে লাগানো থাকে মায়াঅঞ্জন। পড়া বাদে সব ব্যাপারেই অপার কৌতূহল ছিল আমার। আমার কৈশোর শুরু নব্বুইয়ের প্রথমদিকে। তখনও মোবাইল নামক আপদের আবির্ভাব হয়নি। রাস্তায় ছিল না এত বাইকের দাপাদাপি। মফস্বলের রাস্তা ছিল অনেকাংশে মেঠো, ইটপাতা অথবা খোয়াওঠা। নির্জন রাস্তার দুধারে বাগান, মাঠ, আগাছার জঙ্গল থেকে ভেসে আসত বুনোফুলের মন অবশ করা সুঘ্রাণ। হেঁটে নইলে সাইকেলে পড়তে যেতাম। ইস্কুলে যাওয়ার পথেই পড়ত মেয়েদের ইস্কুল। লালপাড় সাদাশাড়ি ইস্কুল ইউনিফর্মে সব মেয়েকেই মনে হত পরী। সাইকেলে বেল দিতে দিতে যাওয়ার সময় পরিচিতা বা অপরিচিতা মেয়েটি তাকালেই বুকের মধ্যে কেমন কেমন করত! সেই প্রথম এক অপূর্ব রোমাঞ্চ টের পেতে শুরু করলাম। আমার এক দাদা আমাকে সেইসময় ডেকে পাঠাত। তার কাছে ছিল বুদ্ধদেব গুহ, সমরেশ বসুর বইয়ের সম্ভার। সেই বই পড়তে দেবে এই কড়ারে লিখে দিতে হত চিঠি! হাতের লেখা ভাল থাকায় এই বিষম সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। নানারকম কবিতার, গদ্যের লাইন দিতে হত সেইসব প্রেমপত্রে। সেজন্য পকেট বইও পাওয়া যেত। বুদ্ধদেব গুহ’র বই থেকেই প্রথম কোট করি শায়েরি। আজও মনে আছে তেমনই কিছু লাইন। একটি উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না –

‘অ্যায় বারিষ তু ইতনা না বরস কে ওহ আ না সাকে
ওহ আ যায়ে তো ইতনা বরস কে ওহ যা না সাকে’ – মির্জা গালিব

নানা নামে ডাকা দাদার সেই প্রেমিকাদের অনেকেই আমার অত্যন্ত পরিচিতা। প্রথম দিকে দাদা ডিক্টেশন দিলেও পরে নিজের মতই লিখে দিতাম প্রেমপত্র। ওরা জানতেই পারেনি একদা যে প্রেমপত্র বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরেছে তার লিখিয়ে আমি!

‘ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।’ – মহাদেব সাহা

সে অর্থে নিজের জন্য খুব একটা লিখিনি, পেয়েছি কিছু। অপটু হাতে লেখা অজস্র বানান ভুলের সেইসব চিঠিই আসলে আবেগের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ছিল যা মেসেঞ্জার, মোবাইল কিংবা হোয়াটস্‌অ্যাপের তাৎক্ষণিক রোমান্সের চেয়ে বহুগুণে সুন্দর, পেলব, মায়াময়। পড়ার ব্যাচে কাঁপাকাঁপা হাতে গুঁজে দেওয়া চিঠি অথবা বইয়ের ভেতর রাখা চিঠি আমাদের সময়ের বহু প্রেমকে স্থায়িত্ব দিয়েছে। সম্পর্ক ভেঙেছেও। ঢিল মেরে চিঠি দেওয়া এবং তা বাপ-দাদার হাতে পড়ার ঘটনা মাঝেমাঝেই ঘটত। পাড়ার দাদারাও ছিলেন একেকজন স্বরূপ দত্ত। ছেনো মাস্তান। কান ধরে উঠবস, থাপ্পড় এসব জোটেনি এমন ছেলে পাওয়া তখন দুস্কর ছিল! এত কিছুর পরে যখন সাফল্য আসত, দূতের হাতে আসত প্রতীক্ষিত কাগজখানি তখন পৃথিবীকে মনে হত স্বর্গ। বাবার বকুনিকে মনে হত ফিরাখ গোরখপুরীর শায়েরি! আজ এতদিন বাদে মনে হয়, ভুল বানানই সই, অপটু হাতের লেখায় যদি কোনো কিশোরীর চিঠি আসে প্রেমের ঠিকানায় তবে দিয়ে দিতে পারি তামাম মসনদ!

কৈশোরে সমরেশ বসু, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ ছাড়াও অত্যন্ত প্রিয় সাহিত্যিক ছিলেন বুদ্ধদেব গুহ। কাঁচা বয়সে অমন রোম্যান্টিক লেখা, অমন জঙ্গুলে লেখক আমাকে তো গ্রাস করবেনই। তাঁর বইগুলি মাথার কাছে নিয়ে শুতাম। একদিন এক তীব্র দহনদিনে কী মনে হল, লিখে ফেললাম চিঠি। ভুলেই গেছি সে চিঠি লিখে, হঠাৎ একদিন শেষ দুপুরে পোস্টম্যান হাতে দিল অসামান্য সুন্দর একটি খাম। ওপরে লেখা আমার নাম আর প্রেরকের জায়গায় লেখা – বুদ্ধদেব গুহ! মুহূর্তে চারদিক ছেয়ে গেল কমলা রোদ্দুরে। ভেজা ভেজা মেঘ আর ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করল! সেই প্রথম বুঝতে পারলাম একটি চিঠি কীভাবে পাল্টে দেয় আবহ। খাম থেকে বের করে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। অসাধারণ একটি কাগজ, ওপরের দিকে জঙ্গলের ছবি আঁকা আর হাতের লেখাটি! আহা! অমন লেখা আগে দেখিনি! সই করেছিলেন ওপর থেকে নিচে। পরে কত মকশো করেছি সে লেখা! এরপর চিঠি বলতে চাকরির চিঠি। আর আজকাল তো চিঠি মানেই ‘ইলেকশন আর্জেন্ট’! ঠিক যেন গোদের ওপর বিষফোঁড়া।

আমাদের ছোটবেলায় পত্রমিতালী ব্যাপারটা জনপ্রিয় ছিল। আকাশবাণী কলকাতার নানা অনুষ্ঠানে ঠিকানা পেয়ে চিঠি লেখা হত অচেনা বন্ধুকে। আমিও পেয়েছি তেমনই চিঠি। দু-একবার লেখালিখির পরে সেই বন্ধুত্ব ফিকে হয়ে আসত। তবে মানস বলে একটি ছেলের সঙ্গে আমার বহুদিন যোগাযোগ ছিল। বাঁকুড়ার ছাতনায় তার বাড়ি। সে কেমন আছে আজ আর জানা নেই। ক্লাস টেনে শুনি অঞ্জন দত্ত-নিমা রহমানের ‘প্রিয়বন্ধু’। চিঠি দেওয়া থেকেই সূত্রপাত এই শ্রুতিনাটকের। পুরোটাই চিঠির আকারে পড়া এই অ্যালবাম আমাকে শিহরিত করেছিল। আর্চিস গ্যালারি থেকে গিটার বাজিয়ে গান। কৈশোরে এই অসামান্য শ্রুতিনাটক শুনে কেটেছে কত নিঝুম দুপুর, বিনিদ্র রাত। মনে মনে ভেবেছি জয়িতার মত একটি বান্ধবী যদি আমাকেও লিখত কষ্টমাখা চিঠি! আমিও কী ফিরিয়ে দিতাম না পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার!

চিঠি লিখতে শেখাও ছিল তখনকার পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরীক্ষাতে চিঠি লেখা আসা অবশ্যম্ভাবী ছিল। চিঠি প্রধানত দুরকমে লেখা হত। এক – ব্যক্তিগত ও পারিবারিক, দুই – ব্যবহারিক বা বৈষয়িক। আরও নানা ভাগ ছিল। আবেদনপত্র, অভিযোগপত্র, নিমন্ত্রণপত্র ইত্যাদি। আমাদের যদিও প্রধান শিক্ষকের কাছে লেখা চিঠিতেই দক্ষতা ছিল। মাঝেমধ্যেই কামাই করে ইস্কুলে এমন চিঠি লিখতাম। সম্ভাষণও ছিল কত্ত রকমের! তবে এখনও পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ সম্ভাষণটি পড়েছি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের চিঠিতে – ‘সবুরে মেওয়াফলদাতাসু’! কী সাংঘাতিক রসবোধ থাকলে এমন সম্ভাষণ জানানো যায়!

সাহিত্যেও চিঠি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। পত্রসাহিত্য তো আলাদা এক জগত। মহাভারতে নল-দময়ন্তী আখ্যানে দময়ন্তী হাঁসের পায়ে বেঁধে চিঠি পাঠিয়েছিলেন রাজা নলকে। কিটস্‌, বার্নাড শ, লর্ড টেনিসনের চিঠিগুলি বিদেশী সাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ। বিবেকানন্দের পত্রাবলী, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বিলাতের পত্র’, নবীনচন্দ্র সেনের ‘প্রবাসের পত্র’ ছাড়াও রবি ঠাকুরের সমস্ত চিঠিই বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যের সোনারখনি। এছাড়াও মাইকেল মধুসূদন দত্তের বীরাঙ্গনা কাব্য, বনফুলের কষ্টিপাথর, নিমাই ভট্টাচার্যের মেমসাহেব, বুদ্ধদেব গুহ’র সবিনয় নিবেদন, মহুয়ার চিঠি – এমন কত যে মণিমাণিক্য ছড়িয়ে আছে!
চিঠি নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য কবিতা। কালজয়ী হয়ে আছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, রুদ্র মোহম্মদ শহীদুল্লাহ, জয় গোস্বামী, মহাদেব সাহা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হেলাল হাফিজ। নাজিম হিকমতের লেখা ‘জেলখানার চিঠি’ প্রথম যেদিন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে পড়ি তখন কেঁদে ফেলেছিলাম। ‘একাত্তরের চিঠি’ নামক মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠির একটি সংকলন প্রকাশ পায় ২০০৯ সালে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি জ্বলন্ত দলিল এই চিঠিগুলি। ৮২টি চিঠি আছে এই সংকলনে। পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। চিঠিগুলির বেশিরভাগই মাকে উদ্দেশ্য করে লেখা। একটি চিঠিতে নৌসেনা শহীদ জিন্নাত আলী খান তাঁ র মা শুকুরুননেছাকে লেখেন – ‘বিদায় নিচ্ছি মা। ক্ষুদিরামের মতো বিদায় দাও। যাবার বেলায় ছালাম।’ আজ বাংলাভাষার অপমানে, বাঙালির অপমানে স্বাধীনতাসংগ্রামী আর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা মনে পড়ে। তাঁরা কী এমনটাই চেয়েছিলেন!

চিঠি প্রসঙ্গে ১৫৫৫ সালে অহমরাজকে লেখা কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের চিঠির কথা বলতে হয়। এ চিঠি লেখা হয়েছিল কেঁচোর রসে। কিছুটা অংশ দেওয়া যাক – ‘… লেখনং কার্যঞ। এথা আমার কুশল। তোমার কুশল নিরন্তরে বাঞ্চা করি। অখন তোমার আমার সন্তোষ সম্পাদক পত্রাপত্রি গতায়াত হইলে উভয়ানুকুল প্রীতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে। তোমার আমার কর্তব্যে সে বর্দ্ধিতাক পাই পুষ্পিত ফলিত হইবেক। আমরা সেই উদ্যোগতে আছি তোমারো এ গোট কর্ত্তব্য উচিত হয় না কর তাক আপন জন। অধিক কি লেখিম।…’ পাঠক লক্ষ্য করুন ভাষার চলনটি। তখন এমন ভাষার গাঁথুনি পড়লে অবাক হতে হয়! ৪৬৬ বছর আগের এই চিঠিই বাংলাভাষার এখনও পর্যন্ত পাওয়া প্রথম ও সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত গদ্যের প্রামাণ্য নথি।

‘বোমার ফর্মুলা ‘

সরস্বতীকে দেখতে এসেছে ‘ভাগলপুরের ভাগ্যবান’রা। পরীক্ষায় চিরকাল ফেল করা কেদার তাঁদের নিয়ে এসেছে। সেই কেদার যাকে মজায় মজায় চূড়ান্ত অপমানের সামনে ফেলে দিয়েছে ভোম্বলদা! একটি বোকা ছেলে আবেগের গলা টিপে মেরে সেই মেয়েটিকেই দেখাতে নিয়ে এসেছে পাত্রপক্ষকে যে মেয়েটিকে সে ভালবেসে ফেলেছে। পাত্রের জুতো পর্যন্ত পালিশ করিয়ে নিয়ে এসেছে যাতে পাত্র ধোপদুরস্ত হয়ে পাত্রী দেখতে পারে! সবটাই দেখেছে সেই ভোম্বলদা আর তারপরই সরস্বতীকে লিখছে আসল চিঠি। সবাই যখন জানতে চাইছে – ‘কী লিখছ?’ তখনই এই অবিস্মরণীয় উত্তর দেয় ভোম্ভলদা।

অপুর সংসারেও আছে এক চমৎকার দৃশ্য। যখন অপু সকালে ঘুম ভেঙে উঠে সিগারেটের প্যাকেট খুলে দেখছে অপর্ণা লিখে রেখেছে—‘খাবার পরে একটা করে—কথা দিয়েছ।’ অপু তাকায় অপর্ণার দিকে। দেখে সে উনুন ধরাতে ব্যস্ত। মুচকি হেসে অপু সিগারেটের প্যাকেটটি বালিশের নিচে রেখে দেয়। বাংলা সিনেমায় চিঠি নিয়ে বহু দুর্দান্ত কাজ আছে। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ এবং তরুণ মজুমদারের ‘দাদার কীর্তি’র মত চিঠি নিয়ে এমন অবস্মরণীয় ফ্রেম আর একটিও নেই।

‘চিঠ্‌ঠি না কোয়ি সন্দেশ
জানে ওহ কওনসা দেশ যাহা তুম চলে গ্যায়ে’

ক্লাস নাইন। ইস্কুল ছুটি। শীতকালের শেষ সকালে কুলগাছের ডালে বানিয়ে রাখা মই দিয়ে উঠেছি রান্নাঘরের চালে। প্রচুর কুল পেকেছে। পকেটে কারেন্ট নুন আর লংকার গুঁড়ো। কুল খেতে খেতেই দুপুর। শুনতে পাচ্ছি ছোটমেসোর গলা। একটু বাদেই মায়ের কান্নার আওয়াজ আছড়ে পড়ল কানে। ধড়মড় করে নিচে নামতেই দেখি মা অজ্ঞান হয়ে গেছেন! বাবা মা’য়ের মুখেচোখে জল দিচ্ছেন। জানতে পারলাম আমার সবথেকে ভাল বন্ধু, তিনমাস বয়সে মাতৃহারা ছোটমামা যে মায়ের কাছেই মানুষ – আর নেই! ‘নেই’ এই একটি শব্দের অভিঘাত কতটা কষ্টের সেই বোধ আমার প্রথম। খবরটা শুনে উঠে গেলাম ছাদে, ছাতার মত কুলগাছের ছায়ায়। বসে থাকলাম বোকার মত! গতকালও যে আমাকে ক্যাসেট দিয়ে গেছে, এনে দিয়েছে কারেন্ট নুন সেই আঠাশ বছরের যুবকটি ভোরবেলায় একগাছি দড়িকে অবলম্বন করে চলে গেছে এমন এক দেশে যেখান থেকে আর কেউ, কোনোদিন, কোনভাবেই ফেরে না। একটি চিঠিও সে দিয়ে গেল না। জানিয়ে গেল না কী সেই যন্ত্রণা যা পিতৃ-মাতৃহীন ছেলেটি সঙ্গে নিয়ে চলে গেল অন্যভূবনে।

এখন অপরাহ্ণের আলোয় মরচে ধরেছে। বিষণ্ণ এক হেমন্তজাতক একলা, খুব একলা হয়ে বসে আছি আর একটিমাত্র চিঠির অপেক্ষায়। সেই চিঠি এলেই চলে যাব। ফেলে রেখে যাব তোমাদের এইসব বন্ধুত্ব, শত্রুতা, প্রিয় গাছগুলি, উঠোনের তুলসীমঞ্চ, প্রিয় যত মুখ। ঝুপ করে নেমে আসবে চাদরের মত গাঢ় অন্ধকার।
                          নাহ্‌ কোনও চিঠি লিখে যাব না।

( মহারাজ নরনারায়ণের চিঠিটি দিয়ে কবি, উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে বেঁধেছেন।)

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...