রিচার্ড পি ফেইনম্যানের চিঠিপত্র
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচে ইউরোপ জ্বলছে। জাপানের পার্ল হারবার অ্যাটাক আমেরিকাকে বাধ্য করল বিশ্বযুদ্ধে সামিল হতে। জার্মানিতে হিটলার যদি আগেভাগে অ্যাটম বোম বানিয়ে ফেলে মিত্রশক্তির ভয়ানক সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমেরিকা ওপেনহেইমারের তত্ত্বাবধানে ম্যানহাটন প্রোজেক্টের কাজ শুরু করে দিল। চরম গোপনীয়তার মধ্যে ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ আলাদা করার কাজ শুরু হয়ে গেল। রিচার্ড পি ফেইনম্যান প্রিন্সটন থেকে সদ্য-সদ্য পিএইচডি শেষ করে তখন লস অ্যালামসে। ওপেনহাইমার ফেইনম্যানের যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত স্ত্রী আর্লিনের জন্য কাছাকাছি আলবুকার্কে স্যানেটোরিয়াম খুঁজে দিয়েছেন। ফেইনম্যান বেথের থিওরেটিক্যাল (T) ডিভিশনে কাজ শুরু করলেন। নোবেল-লরিয়েট এই বিজ্ঞানীর ক্ষুরধার বুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক প্রতিভা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। বরং তাঁর চিঠি নিয়ে দু’-চার কথা বলার জন্য এবং সেই সূত্রে তাঁর সরস মনের হদিশ পাওয়ার চেষ্টায় এই লেখার অবতারণা।

সে সময় লস অ্যালামসে কর্মরত বিজ্ঞানীদের বলা হল তারা যে সব ব্যক্তিগত চিঠিপত্র পাঠাবে সেগুলো যেন খোলা খামে ভরে সিকিউরিটিকে দেয়। সিকিউরিটি আপত্তিজনক কিছু না পেলে সেগুলো সিল করে সঠিক ঠিকানায় পোস্ট করে দেবে। এবং তারা আত্মীয় পরিজনদের থেকে আসা চিঠি খুলে দেখবে। সেন্সরশিপ ব্যাপারটা আমেরিকায় আইন-বিরুদ্ধ। তাই বলা হল জোরজুলুম নেই, বিজ্ঞানীরা যেন স্বেচ্ছায় এই নিয়ম মেনে নেন। স্বভাবতই ফেইনম্যানের ব্যাপারটা বিশেষ পছন্দ হল না। শুরু হল সিকিউরিটিকে নাস্তানাবুদ করার খেলা। ফেইনম্যানের বাবার কাছ থেকে চিঠি এল। তাতে লাইনের নিচে ওপরে ডট সাজানো নানান বিন্যাসে। ফেইনম্যানের স্ত্রী আর্লিনের কাছ থেকে আসা চিঠি পড়ে সিকিউরিটির মাথায় হাত। চিঠিতে লেখা TJXYWZTTJXYWZTW1X3W1X3।

ফেইনম্যানকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, চিঠিতে এটা কী লেখা?

ফেইনম্যান বললেন, ওটা একটা কোড।

সিকিউরিটি বলল, এই কোডের মানে কী?

ফেইনম্যান বললেন, মানে আমি জানি না।

কী মুশকিল! জানেন না মানে? কোড হলে তো সেটা ভাঙার জন্য একটা key থাকবে।

ফেইনম্যান একগাল হেসে বললেন, key তো আমার বৌ পাঠাবে না। ওটাই তো খেলা। ও কোড বানিয়ে চ্যালেঞ্জ দেবে, key আমাকে উদ্ধার করতে হবে।

নাছোড়বান্দা সিকিউরিটি বলল, না স্যর, কোডের সঙ্গে key-ও পাঠাতে বলুন আপনার স্ত্রীকে।

ফেইনম্যান বললেন, সে key পাঠাবে কোন দুঃখে? আমি তো key দেখব না।

সিকিউরিটি বলল, আপনার দেখার দরকার নেই। আমরা না-হয় খাম থেকে key বার করে নিয়ে আপনার হাতে চিঠি দেব।

সেন্সরশিপের নিয়মানুযায়ী সিকিউরিটি সাধারণ চিঠিতে হাত দিতে পারে না। পরের দিন আর্লিনের কাছ থেকে আর একখানা চিঠি এল। তাতে লেখা – তোমাকে চিঠি লেখা এক ঝকমারি, যখনই লিখি মনে হয় ……… ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখছে। নামের জায়গাটা ink eradicator দিয়ে কেউ ধেবড়ে মুছে দিয়েছে। ফেইনম্যান চিঠিটা ব্যুরোতে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে বললেন, এটা কী ধরনের ভদ্রতা। আপনাদের চিঠির বয়ান পছন্দ না হলেই চিঠি নষ্ট করে দেবেন?

সিকিউরিটি বলল, আপনার কি মনে হয় সেন্সর ink eradicator দিয়ে চিঠি খারাপ করে দেবে? সেরকম হলে সেন্সর কাঁচি দিয়ে কেটে নিত।

ফেইনম্যান আর্লিনকে লিখলেন, তুমি কি চিঠিতে ink eradicator ব্যবহার করেছিলে।

আর্লিনের জবাব এল – না তো, আমি ink eradicator ব্যবহার করিনি। এটা নিশ্চয়ই ……… কাজ।

এবার নামের জায়গাটা গোল করে কাটা। ফেইনম্যান সিকিউরিটি ইন-চার্জ মেজরের কাছে গিয়ে অনুযোগ করলেন, এই ভাবে আমার চিঠি নষ্ট করা কি ঠিক হচ্ছে। মেজর চিঠিটা দেখে আশ্চর্য হয়ে বলল, স্যর, অনেক সেন্সর দেখেছি, কিন্তু এত নিখুঁত ভাবে কাটা আগে দেখিনি।

সিকিউরিটি কী বুঝেছিল কে জানে, এর পরে মিসেস ফেইনম্যানের চিঠিগুলো অক্ষত এবং যথাযথ অবস্থাতেই পৌঁছত। খালি একবার চিঠির সঙ্গে আসা একখানা বাজারের ফর্দ উধাও হয়ে যায়। ফেইনম্যান স্ত্রীর সঙ্গে আলবুকার্কে দেখা করতে গেলে আর্লিন জিজ্ঞেস করেন, যে জিনিসগুলো আনতে বলেছিলাম সেগুলো কোথায়? তোমায় ফর্দ পাঠিয়েছিলাম যে!

ফেইনম্যান বলেন, দাঁড়াও, দাঁড়াও… ফর্দ মানে? কী আনতে বলেছিলে?

আর্লিন বলেন, গ্লিসারিন, লন্ড্রি আরও দু-একটা সাধারণ জিনিস।

ফেইনম্যান বলেন, দেখেছ কাণ্ড, ব্যাটারা সেই ফর্দটাকেও মনে হয় কোড ভেবে গায়েব করে দিয়েছে।

বৌয়ের সঙ্গে ষড় করলেন আমার সইয়ের পরে ডট দেখলে বুঝবে আবার ঝামেলা হয়েছে। নতুন কোনও উপায়ে চিঠি পাঠাবে। অসুস্থ আর্লিন সারাদিন বসে বসে ফন্দি আঁটতেন কী করে সিকিউরিটিকে হয়রান করা যায়। একবার চিঠি লিখে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে পাঠিয়ে দিলেন। সিকিউরিটি হতাশ হয়ে বলল, আমাদের কি জিগস পাজল সমাধান করার সময় আছে না সে বয়স আছে? আপনার স্ত্রী কি সাধারণ চিঠি লিখতে পারেন না।

১৯৪৬ সালে আর্লিন মারা গেলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ফেইনম্যান কর্নেলে পড়াতে চলে গেলেন। সেখান থেকে ১৯৫১ তে গেলেন ক্যালটেক। কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সে তাঁর অবদানের জন্য এই অসাধারণ প্রতিভাধর বিজ্ঞানী নোবেল প্রাইজ পান ১৯৬৫তে। ফেইনম্যানের বাবা মা দু’জনেই ইহুদি ছিলেন, কিন্তু খুব যে ধার্মিক ছিলেন তা নয়। ফেইনম্যান ছোট থেকেই নাস্তিক। বহু বছর পরে টিনা লেভিটান যখন ইহুদি নোবেল লরিয়েটদের নিয়ে বই লিখছেন, ফেইনম্যানের কাছে তাঁর নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে বিশদে জানতে চান। ফেইনম্যান সরাসরি মানা করে দেন। টিনা লেভিটানকে তিনি চিঠি লিখছেন, ইহুদি বংশপরম্পরা থেকে যেসব অদ্ভুত ধ্যানধারণা তৈরি হয় সেগুলি অনুমোদন করার মানে হল জাতিগত বৈষম্যকে দরজা খুলে ডেকে আনা। তেরো বছর বয়সে আমি যে শুধু অন্যান্য ধর্মের মতাদর্শগুলি জেনেছিলাম তাই নয়, ইহুদিরা যে ঈশ্বরের নির্বাচিত জাতি সেটা বিশ্বাস করাও বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

১৯৫৪ সালে এনরিকো ফার্মি মারা যাবার পরে শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে তাঁর জায়গা নেবার জন্য ফেইনম্যানকে অনুরোধ করা হয়। সেও এক গল্প। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’জন সোজা ফেইনম্যানের বাড়িতে চলে এলেন। তাঁরা অনেক করে বোঝাতে লাগলেন কেন ফেইনম্যানের ক্যালটেক ছেড়ে শিকাগো যাওয়া উচিত। শিকাগো গেলে মাইনেপত্র কত হবে এই কথাটা ফেইনম্যান একবারের জন্যেও জিজ্ঞেস করলেন না। তাঁরা ইঙ্গিত-টিঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে মাইনের ব্যাপারটা নিয়ে কথাবার্তা হোক। কিন্তু ফেইনম্যান কিছুতেই ফাঁদে পা দিচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তাদের একজন জিজ্ঞেসই করে বসলেন – ফেইনম্যান কি জানতে চান না শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় কত মাইনে দেবে। ফেইনম্যান বললেন, একদম না, তিনি ঠিক করেই রেখেছেন কোনওদিন ক্যালটেক ছেড়ে যাবেন না। তাছাড়া পাশের ঘরে তাঁর স্ত্রী মেরি ল্যু আছে। সে যদি মাইনে কত শুনে ফেলে ফালতু তর্কাতর্কি শুরু হয়ে যাবে। সে সব ঝামেলায় কী দরকার?

মাস খানেক পরে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের লিওনা মার্শাল ক্যালটেকে এলেন। ফেইনম্যানের সঙ্গে দেখা করে বললেন, আমরা খুব হতাশ হয়েছি আপনি শিকাগো আসেননি বলে। বুঝতেই পারছি না আপনি এত ভাল প্রস্তাব কী করে ছেড়ে দিলেন।

ফেইনম্যান বললেন, ব্যাপারটা খুব সহজ, আমি ওদের বলতেই দিইনি অফারটা কী।

সপ্তাহ খানেক পরে ফেইনম্যান শিকাগো থেকে একটা চিঠি পেলেন। সেটা খুলতেই দেখলেন প্রথমেই লেখা, শিকাগো এলে আপনার মাইনে হবে ……। সাংঘাতিক বেশি একটা টাকা, ক্যালটেকে যা মাইনে পেতেন তার তিন চারগুণ। লিওনা মার্শাল আরও লিখেছেন – প্রথমেই আপনাকে অফারটা জানিয়ে দিলাম। ফার্মির চেয়ারটা এখনও আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনি আর একবার ভেবে দেখুন।

সেই চিঠির জবাবে ফেইনম্যান একখানা ঐতিহাসিক চিঠি লিখেছিলেন। তার বয়ানটা অনেকটা এই রকমঃ

আপনার চিঠি পড়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আপনাদের অফারটা ফিরিয়ে দেওয়া আমার অবশ্য কর্তব্য। তার কারণ আপনারা যে টাকা দেবেন জানিয়েছেন সেই দিয়ে আমি সারা জীবন যা যা করতে চেয়েছি করতে পারব – সুন্দরী রক্ষিতা রাখতে পারব, তাকে আলাদা বাসায় তুলতে পারব, দামী দামী জিনিস কিনে দিতে পারব… এবং তারপর আমার কী হাল হবে আমি তা বুঝতে পারছি। আমি সারাদিন তার কথা চিন্তা করব, সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে বৌয়ের সঙ্গে ঝগড়া করব… এই সব ঝামেলায় আমার মন ভাল থাকবে না আর আমি ফিজিক্স মানে নিজের কাজটাই করতে পারব না। মোদ্দা কথা হল আমি সারাজীবন যা যা করতে চেয়েছি সেসব করা আমার পোষাবে না। তাই দুঃখিত, আমি আপনাদের অফারটা নিতে পারছি না।

(কথোপকথন ও চিঠিগুলি বাংলায় লেখার সময় আমি সর্বত্র আক্ষরিক অনুবাদ করিনি, মূল থেকে অর্থ বিচ্যুতি না করে অল্পস্বল্প বাক-স্বাধীনতা নিয়েছি, তাই কোথাও উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করিনি)

তথ্যসূত্রঃ Richard P. Feynman, “Surely You’re Joking, Mr Feynman!” Adventures of a Curious Character as told to Ralph Leighton

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...