মনীন্দ্র গুপ্ত ও একটি চিঠি
গৌতম মিত্র

প্রায় অজানা অচেনা ও অখ্যাত একজন তরুণ পাঠককে একজন বর্ষীয়ান প্রতিষ্ঠিত ও বিখ্যাত কবি ধৈর্যসহকারে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এমনটি আজকাল প্রায় আর দেখা যায় না।
সময় ১৯৯০। মণীন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘আবহমান বাংলা কবিতা প্রথম খণ্ড’ পড়ে সম্পাদককে একটি চিঠি লিখেছিলাম। বিতর্কের বিষয় ছিল একটি গান বা কবিতা। খুব বিখ্যাত একটি গান। ‘ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে।’

তখন ১৯০৫-এ প্রকাশিত শ্রীদুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত ‘বাঙালীর গান’ বেশ দুষ্প্রাপ্যই ছিল। জাতীয় গ্রন্থাগারে একটা শতচ্ছিন্ন কপি ছিল। আমার একটি কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই সেখান থেকে কবিতা টুকে আনি।

তো কী ছিল আমার প্রশ্ন! আমার প্রশ্ন ছিল:
‘বাঙালীর গান’-এ শ্রীধর কথকের নামে যে কবিতা গৃহীত হয়েছিল তা কীভাবে ‘আবহমান বাংলা কবিতা’য় রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর কবিতা বলে বিবেচিত হয়?

মণীন্দ্র গুপ্ত আমার প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করতেই পারতেন। কিন্তু তিনি তাঁর স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে এই চিঠি লিখেছিলেন। এবং শেষে স্বীকার করেছেন বিতর্কটি তাঁর বইতে ‘উল্লেখ করা’ উচিত ছিল।

এবার আমাকে লেখা মণীন্দ্র গুপ্তর চিঠিটি:

মণীন্দ্র গুপ্ত
৪৯/১৩ বি হিন্দুস্থান পার্ক
কলকাতা- ২৯
১৮. ১২. ৯০

প্রীতিভাজনেষু,

আপনার চিঠি পেয়েছি। চিঠিটির জন্য ধন্যবাদ।
ঐ গানটি নিয়ে অনেক দিন ধরেই বিতর্ক আছে। দুর্গাদাস লাহিড়ী এবং তাঁর বাঙালীর গান অবশ্যই আমাদের শ্রদ্ধেয়। কিন্তু যে পাঠ শ্রীধরের নামে রয়েছে সে পাঠের সঙ্গে আবহমান বাংলা কবিতার পাঠের প্রচুর তফাত। তা তো আপনিও মিলিয়ে দেখেছেন। প্রথমোক্ত পাঠ নিলে আমি অবশ্যই শ্রীধরের নামে দিতাম। পাঠের তফাতের ধরন দেখে আমার বিশ্বাস হয়েছে যেন দু’টি পাঠ নয়, দু’টি প্রায় আলাদা গান, এবং নিশ্চয়ই দুই আলাদা ব্যক্তির লেখা — অন্তত একজনের উপর আরেকজনের improvement তো বটেই।
আমি এই অন্য পাঠ, যেটি রামনিধি গুপ্তের নামে অন্যত্র পেয়েছি, পছন্দের কারণে সেটিই নিয়েছি। দু’টি গানের expression-এর তফাতে, বিশিষ্টতায় — নিধুবাবুর ধরনের সঙ্গে পাঠের একাত্মতায় —আমার প্রত্যয় হয়েছে, ঐ পাঠটি নিধুবাবুরই। ভুল হতে পারে আমার। তবে আমার উচিত ছিল বিষয়টি প্রসঙ্গ কথায় উল্লেখ করা।
আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানবেন। চিঠি লিখবেন।
মণীন্দ্র গুপ্ত

এবার দেখা যাক দু’টি সঙ্কলন গ্রন্থে পাঠের ভিন্নতা ও মিলের জায়গাটুকু।

প্রথমে ‘বাঙালীর গান’-এ শ্রীধর কথকের নামে প্রচলিত কবিতাটি:

ভালোবাসিবে বলে, ভালোবাসিনে।
আমার যে ভালোবাসা, তোমা বই জানিনে।।
বিধুমুখে মধুর হাসি, দেখিলে সুখেতে ভাসি,
তাই আমি দেখিতে আসি
দেখা দিতে আসিনে।।

এবার ‘আবহমান বাংলা কবিতা’য় রামনিধি গুপ্তের নামে গৃহীত কবিতা:

ভালবাসিব বলে ভালবাসিনে
আমার স্বভাব এই তোমা বই আর জানিনে
বিধুমুখে মধুর হাসি দেখতে বড় ভালবাসি
তাই তোমারে দেখতে আসি দেখা দিতে আসি নে।

মণীন্দ্র গুপ্তর মন্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেই বলছি, সত্যিই কি দু’টি গান ‘আলাদা ব্যক্তির লেখা’? অভিব্যক্তির খুব তফাত? বিশিষ্টতায় খুব আলাদা?

রামনিধি গুপ্তর জন্ম ১৭৪১ হুগলি জেলার চাপতা গ্রামে। আর শ্রীধর কথকের জন্ম তার ৭৫ বছর পর ১৮১৬-তে হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়া গ্রামে।

আজ আমরা লেখা থেকে লেখককে বড়ো বলে ভাবি। লেখকের নাম লেখার ওপরে থাকে। সবসময় কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল না। কিছুদিন আগেও লেখার নীচে লেখকের নাম থাকত। সেখানে লেখক নয় লেখাই প্রধান। এমনও হত লেখা লেখকের নাম ছাড়া প্রকাশিত হচ্ছে, বছর শেষে তা একসাথে চিহ্নিত হচ্ছে।

হোমার কি একজন বা মহাভারত কি একজনের লেখা! ‘বাঙালীর গানে’র প্রস্তাবনায় দুর্গাদাস লাহিড়ী লিখেছেন:

‘অনেকগুলি শ্রীধরের গান, নিধু বাবুর নামে ইদানীং চলিয়াছে। রামনিধি গুপ্ত (নিধু বাবু) টপ্পাসংগীতের রাজা। কালবশে শ্রীধরের নাম বঙ্গের ‘শিক্ষিত-সাহিত্যসমাজে’ একরকম লুপ্তপ্রায় হইয়া আসিয়াছিল। নাম লুপ্তপ্রায় হউক — কিন্তু তাঁহার ভালো গানগুলি লুপ্ত হয় নাই। সংগীতাত্মা যে চিরদিন অবিনশ্বর। অবিনশ্বর বলিয়াই শ্রীধরের গানগুলি বাঙালির কন্ঠে কন্ঠে সদা গীত হইয়া আসিতেছে। কিন্তু এ সজল গান কাহার বিরচিত তাহা লোকে বুঝিতে না পারিয়া, নিধুবাবুকেই এই গানের রচয়িতা বলিয়া ঠিক করিয়া লইয়াছিলেন। অনেকে ভাবিতেন, এমন সুন্দর, সুকবিত্বপূর্ণ, সুমধুর টপ্পা এক নিধু বাবু ভিন্ন অন্য কাহারো হইতে পারে না। তাই অনেকেই স্থির করিয়াছিলেন, ‘ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে।…’ এই গানটি নিধু বাবু কর্তৃক বিরচিত।’

অতঃপর শ্রীলাহিড়ী শ্রীধরের ভ্রাতুষ্পুত্র পণ্ডিত অতুল্যের কাছে রক্ষিত ‘শ্রীধরের স্বহস্তেলিখিত’ গানের খাতার উল্লেখ করেছেন যেখানে উক্ত গানটিও আছে।

আমার এই লেখা কোনও বিতর্ক নিয়ে নয়। আমি শুধু বলতে চাইছি এই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ঔদার্য ও ঐশ্বর্যের কথা।

কী দরকার ছিল মণীন্দ্র গুপ্তর আমার মতো একজন সামান্য তরুণকে এত বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার। সত্যিই কী রামনিধি গুপ্ত বা শ্রীধর কথকের কিছু আসে যায় নামের মহিমায়। আসল কথা হল গানটি বা সৃষ্টিকর্মটি থাকল কিনা!

ভাগ্যিস চিঠি ছিল। মনের চলাচল ছিল। দু’টি ঘাট ছিল। এপারের জল ওপারে পৌঁছাত। বাংলার সেই নিজস্ব নদী ও বহতাকে প্রণাম।

3 Comments

  • Lipika ghosh

    Reply June 27, 2021 |

    অসাধারণ । বিষয় বস্তু ও রচনাশৈলী মিলে প্রামাণ্য দলিল তৈরি হয়েছে

  • Jashim Uddin

    Reply June 27, 2021 |

    খুব ভালো লাগলো পড়ে। আপনার লেখা, নিয়মিতই পড়া হয়, বিশেষত জীবনানন্দ দাশ বিষয়ক। এই লেখাটাও যথারীতি খুব ভালো লেগেছে। এইরকম তুলনামূলক আলোচনা ইদানিং হয়ই না। আরও এইরকম লেখা পেলে ভালো লাগবে।
    মন ভিজে গেল শেষটায়।–“ভাগ্যিস চিঠি ছিল। মনের চলাচল ছিল। দু’টি ঘাট ছিল। এপারের জল ওপারে পৌঁছাত। বাংলার সেই নিজস্ব নদী ও বহতাকে প্রণাম”।
    আজ, এপারের জল ওপারে পৌছানোর ব্যাপারটাই মুছে গেছে জীবন থেকে।
    প্রণাম আপনাকেও।

  • Tanima Hazra

    Reply June 27, 2021 |

    খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করে এই চিঠি। যথারীতি আপনার বিশ্লেষণ এর গুণে সমৃদ্ধ।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...