বৃক্ষমঙ্গল
লোপামুদ্রা রায়চৌধুরী


আমার জন্ম হয়েছিল উত্তরবঙ্গের এক ছোট শহরে। ময়নাগুড়ি। সেই শহরে ছিল ময়না মা মন্দির আর একটা ছটফটে নদী। ভারি মিষ্টি সে নদীর নাম, “জর্দা”। আমার ঠাকুর্দা প্রিয়নাথ রায়চৌধুরী ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত, প্রতাপশালী এবং দরাজদিল মানুষ। ধবধবে ধুতি, খালি গায়ে একখানা উত্তরীয় , পায়ে খড়ম—- এই বেশেই ছোটলাটের সঙ্গে করমর্দন করছেন, এরকম একটা ধূসর হয়ে যাওয়া ছবি এখনও দেশের বাড়ির দেওয়ালে ঝোলানো আছে।  প্রজারা তাঁকে ডাকতো  বাবা বলে। সন্তানস্নেহেই  দশ হাতে আগলে রাখতেন  তাদের।  স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, কন্যা, জামাতা, নাতি- নাতনি, জন-মুনিষ নিয়ে একবেলাতেই দেড়শো পাত পড়তো সেই বাড়িতে, এছাড়া এসো জন বসো জন তো ছিলই। যে কড়াইটায় ডাল রান্না হোতো, তাতে নাকি তিনজন মানুষ বসতে পারতো!  পরবর্তী সময়ে, যখন এহেন জ্বলজ্বলে সংসার প্রায় নিভু-নিভু, তখন কুয়োতলায় পড়ে থাকা সেই কড়াইটা ছিল আমাদের স্নানের চৌবাচ্চা! এসব জাঁকজমক অবশ্য আমার জন্মের অনেক আগের কথা, যার রেশ আমার ছোটবেলাতেও কিছুটা ছিল। 
 ঠাকুমা শ্রীমতী রানীবালা দেবীর পাঁচটি সন্তানের মধ্যে আমার বাবা হিমাংশু শেখর,  ডাকনাম মানু, ছিলেন কনিষ্ঠজন। মানুর চেয়ে দু’বছরের বড় তার দিদি মনা। ভালো নাম ছিল সন্ধ্যা। দুজনের গলায় গলায় ভাব, আর তেমনি ঝগড়া। মনার বিয়ে হয়েছিল পি.ডব্লিউ.ডি-র তরুণ, হ্যান্ডসাম  ওভারশিয়ার অনুকূল চক্রবর্তীর সঙ্গে। অনুকূল তখন ওদলাবাড়িতে পোস্টেড। নবদম্পতির নতুন সংসারে প্রায়ই আড্ডা দিতে আসতো মেমসাহেবের মতো রূপসী, বিদূষী এক কন্যা, যার বাবা অনন্ত চ্যাটার্জি ছিলেন অনুকূল চক্রবর্তীর নিকট-প্রতিবেশী। 
    অনন্ত পেশায় স্কুল মাস্টার। যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় শিক্ষকতায় মর্যাদা ছিল, অর্থ ছিল না। পুত্রহীন ছা-পোষা মাস্টার, কিন্তু চার-চারটি কন্যার জন্য কোন হতাশা ছিল না তাঁর মনে। চারটি মেয়েই ভারি গুণী, তবে মেজটিই রূপে-গুণে  সবার সেরা। নাম লতিকা।    চেল নদীর ধারে তাঁর কাঠের ছোট্ট দোতলা বাড়ি। রুপোর মতো ঝকঝকে টিনের চাল। নীল রঙের জানলায় শাড়ির পাড় জুড়ে জুড়ে পর্দা। আয়নায়, বইয়ের তাকে হাতে বোনা ক্রুশের ঝালর— দেওয়ালে দেওয়ালে রেকর্ডের ফুলদানি—-ফ্রেমে বাঁধানো ক্রশ স্টিচ, বোনেরা মিলে সব একদম টিপটপ করে রাখে।    লতিকা অনার্স পাশ করে  বাবার স্কুলেই বাংলার শিক্ষিকা। কারুর কাছে না শিখেই প্রায় নির্ভুল সুরে অনায়াসে নজরুলগীতি গায়। আঙুরবালা, ইন্দুবালা বা কমলা ঝরিয়ার গান একবার শুনেই অলৌকিক ফুল ফোটাতে পারে। দুটি বোন আর পাড়ার কুচোদের নিয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে মেতে ওঠে। কালমৃগয়ায় তার নাচ আর অভিনয় দেখে গোটা ওদলাবাড়ি গর্বে ফেটে পড়ে। কাঠের বারান্দায় বসে সে যখন বাবার জন্য নস্যি রঙের মাফলার বোনে, দূর থেকে সেবকের পাহাড়গুলোর মুগ্ধ আলো খেলা করে তার আঙুলে।  মোটা মোটা গল্পের বই দুদিনে শেষ করে যখন লাইব্রেরিতে বই পাল্টাতে যায়, কাঠামবাড়ির জংলা রাস্তা ফিসফিসিয়ে ওঠে– আমাদের লতিকা, এই মেয়েটা আমাদের ওদলাবাড়ির!     মাখনের মতো ফর্সা, এক পিঠ কোঁকড়া চুল, আক্ষরিক অর্থেই বাঁশির মতো পাতলা নাক, ঈষৎ পিঙ্গল  চোখের তারার অসামান্যা রূপসী সেই মেয়ে কি একটু অহংকারীও ছিল? ওদলাবাড়ির যুবকরা তো তাই জানতো। স্কুলে যাতায়াতের পথে তার গম্ভীর মুখে দৃপ্ত হেঁটে যাওয়া দেখে কেউ কিছু বলার সাহসই পেতো না, আড়ালে তাকে ডাকা হোতো, ওদলাবাড়ির নূরজাহান!
      দিদির বাড়ি প্রায়ই বেড়াতে আসতো তরুণ হিমাংশু।  সদ্য গ্রাজুয়েট, গ্রুপ থিয়েটারের নিবেদিত অভিনেতা সে। তার লেখা নাটক তখন বিদগ্ধ মহলে একটু একটু সাড়া ফেলতে শুরু করেছে। দুর্দান্ত মাউথ অর্গ্যান বাজায়, তুলির টানে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে অপূর্ব সব ছবি। সুন্দরী, মেধাবিনী, রুচিশীলা, শিল্প ও সাহিত্য অনুরাগিণী, সুরসিকা লতিকার প্রেমে পড়ল সে হুড়মুড়িয়ে। কন্যাটি প্রথমদিকে স্বভাব-গাম্ভীর্যে দূরে থাকার চেষ্টা করেছিল। জমিদার তনয়ের বিপরীতে গরীব স্কুল মাস্টারের মেয়ে যে বেশ বেমানান সেই জ্ঞান তার ছিল বৈকি! কিন্তু প্রেম তো বরাবরই লাস্ট বেঞ্চের বেয়াড়া ছাত্র, ওসব মিল-অমিল সে বোঝে না, তাই প্রেমটা শেষমেশ হল। এই প্রেমে সবচেয়ে খুশি হল সন্ধ্যা আর অনুকূল, আর অনন্ত মাস্টারের কপালে দু’চারটে ভাঁজ পড়ল। 
     খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রিয়নাথ আর রানীবালা চেয়েছিলেন জ্যেষ্ঠ পুত্রের মতো কনিষ্ঠ পুত্রেরও বিয়ে হোক সমান সমান ঘরে। ওদিকে অনন্ত মাস্টারমশাইও সানন্দে রাজি হতে পারছেন কই! তাঁদের ছোটোখাটো বাড়ি, তাঁদের সাদামাটা সংসার, তাঁর এই সুন্দরী আর গুণী মেয়ে, যে কিনা ভারি শান্ত আর অভিমানী, আত্মসম্মানবোধ যার উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন, সে কি পারবে ওই মহাসমুদ্র ধারণ করতে? যদিও প্রধানত সন্ধ্যা আর অনুকূলের দৌত্যেই বিয়ের দিনক্ষণ স্থির হয়ে যায়। তবে, প্রিয়নাথের শর্ত ছিল একটা— লতিকাকে চাকরি ছাড়তে হবে। জমিদার বাড়ির ছোটো বউ চাকরি করবে? কভি নেহি। ভালোবাসার জন্য,  হিমাংশুর জন্য লতিকা তাতেই সম্মত হয়।  অনন্ত মাস্টারমশাই কোনদিন মেয়েদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেননি, সেদিনও মেয়ের মতেই মত দিয়েছিলেন, শুধু মেয়েকে যেদিন স্কুল থেকে ফেয়ারওয়েল দেওয়া হল, সেদিন তিনি স্কুলে যাননি। 
    বিয়ের ঠিক দশদিনের মাথায় যেদিন লতিকা বাইশ কৌটো চালের ভাতের হাঁড়ি উপুড় করতে গিয়ে অনেকটা হাত পুড়িয়ে ফেলল, সেদিন কেন জানি না বাবার জন্য খুব মনকেমন করছিল তার। সন্ধেবেলা শ্বশুর মশাই তাকে দেখতে এলেন, তারপর শাশুড়ি আর বড় জাকে ডেকে বললেন,  ছোটমাকে আর কখনও ভাতের হাঁড়ি উপুড় করতে বলবে না, ওর অভ্যাস নেই, ওকে হালকা কাজ দেবে। কৃতজ্ঞতায় চোখে জল এসে গিয়েছিল লতিকার। পরদিন সকালে স্নানের ঘরে যেতে গিয়ে শুনে ফেলেছিল শাশুড়ি বড় জাকে বলছেন,  আরে, ওর বাবা বেচারি স্কুল মাস্টার, এরকম বোলবোলাও তো নেই। মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন কোনরকমে। ও মেয়ে কী করে পারবে  এতো কাজ! তবে মাস্টারমশাই সজ্জন মানুষ, মেয়েও তাই হয়েছে, এটাই বাঁচোয়া! আবারও চোখে জল এল লতিকার। করুণাটুকু কুড়িয়ে নেবার জন্য, নাকি প্রশংসাটুকু পেল বলে, কে জানে! স্নানের ঘরের জানলা দিয়ে অনেক উঁচুতে এক চিলতে আকাশ আর তাতে ভেসে বেড়াচ্ছে নস্যি রঙের মেঘ—- “বাবা”—- হাতটা হঠাৎই যেন আবার জ্বালা করে ওঠে।
          হিমাংশু তখন কলকাতায়। চাকরি করে। লতিকা আর তাদের তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটার জন্য মনকেমন করে খুব। লতিকা কক্ষণো মুখ ফুটে কিছু বলে না, কিন্তু বাড়ি গেলে হিমাংশু বুঝতে পারে মেয়েটা আগের মতো নেই। কাজের ফাঁকে গুণগুণ করে না আর,  রাতে হিমাংশুর দু’ হাতের মধ্যেও চমকে চমকে ওঠে, ঘুমের মধ্যে দীর্ঘ নিশ্বাস পড়ে।  তাদের মেয়েটাও বড় রুগ্ন আর শান্ত। এমনিতে তো সব ঠিকঠাকই মনে হয়। বাবার সকল কাজেই “ছোটমা” না হলে চলে না। মাও বৌমাকে যথেষ্ট ভালবাসে। দাদা সেতার বাজাতে বসে লতিকাকেই ডেকে পাঠায়, বাগানের ডালিয়া কতো বড় হল দেখায়। বউদি বহুপ্রসবিনী, বেশির ভাগ সময় আঁতুড়ঘরেই থাকে। লতিকা প্রাণ দিয়ে তার ছেলেমেয়েদের যত্ন করে, ওরাও ‘ছোম্মা’ বলতে অজ্ঞান।  তাহলে কোন ছিদ্রপথে ঘুণপোকা ঢুকে ক্ষইয়ে ফেলছে মেয়েটাকে? হিমাংশু গিয়ে ধরলো অগতির গতি তার মনা দিদিকে। আর তখনই জানতে পারল, সব ঠিক নেই। লতিকা শ্বশুরবাড়িতে ভালবাসা পেয়েছে ঢের, তবে তার চেয়েও বেশি পেয়েছে করুণা। “আহারে! বেচারি স্কুল মাস্টার “—- এই অনুকম্পাটুকু অনেক ঘষে ঘষেও ও বাবার গা থেকে তুলতে পারেনি।  একদিন চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে চলে গেছেন তার বাবা। অবশ্য জমিদার বাড়ির অপমান ভারি পরিশীলিত! বাজ পড়া গাছের মতো মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছেন অনন্ত মাস্টারমশাই, এ দৃশ্য লতিকা ভুলতে পারেনি। 
      বাড়ির সবার বিরুদ্ধে গিয়ে বাবা মাকে আর আমাকে নিয়ে চলে এল হাওড়ায়। প্রিয়নাথের ছেলে প্রিয়নাথের মতোই জেদী। জমিদারির একটি পয়সা সে ছোঁবে না। বউ, মেয়ে নিয়ে সে এসে উঠল হাওড়া শহরের এঁদো গলির মধ্যে এক ভাড়া বাড়িতে। চার ভাড়াটের একটিই কলঘর, একটিই পায়খানা, মাঝখানে একফালি সিমেন্টের উঠোন। একটাই ঘর, চুনখসা দেওয়াল, লাগোয়া বারান্দায় রান্নাবান্না।    ক’দিন পরেই পোস্টকার্ড এল অনন্ত মাস্টারমশাইয়ের। সে চিঠি এখনও আছে আমার কাছে।  আমার এক অমূল্য সঞ্চয়! সেই চিঠি পড়তে বসলে আজও আমার চোখের পাতা ভিজে ওঠে।  “হিমাংশু বাবাজীবন যে জমিদারির অর্থ ত্যাগ করিয়া নিজের পায়ে দাঁড়াইবার চেষ্টা করিতেছে, তাহাতে তাহার প্রতি আমার শ্রদ্ধা কয়েক গুণ বাড়িয়া গিয়াছে। তোমার অপমানের প্রতিকার করিয়া সে এতোদিনে যথার্থ স্বামী হইয়া উঠিতে পারিল। আমি জানি, চাকুরি তাহার পোষাইবে না। এও জানি যে সে স্বাধীন ব্যবসা করিতে চায়, কিন্তু পুঁজির অভাবে পারিতেছে না। না, তাহাকে সাহায্য করিবার স্পর্ধা আমার নাই। গরীব স্কুল মাস্টারের সে সামর্থ্যও নাই। আমি পুত্রহীন। যেটুকু অর্থ ছিল, তোমার বাকি তিন বোনের বিবাহ দিতে গিয়া নিঃশেষিত। পেনশনের টাকায় বুড়া-বুড়ির কোনো মতে চলিয়া যায়। মনে আছে, যেইদিন তোমার শ্বশুরবাড়িতে অপমানিত হইয়াছিলাম? জমিদার বাড়ির উপযুক্ত লৌকিকতা করিতে পারি নাই। সেইদিন ঠিক করিয়াছিলাম, এমন কিছু করিব, যাহাতে তোমার বাবা গরীব স্কুল মাস্টার বলিয়া তোমাকে আর ছোট হইতে না হয়। রান্নাঘরের পাশে দুইখানি নারিকেল গাছের কথা তোমার মনে পড়ে? সেইদিন বাড়ি আসিয়া একখানি ছুরি লইয়া একটি গাছের গায়ে “লতিকা” ও অন্য গাছটির গায়ে “হিমাংশু” খোদাই করিয়া লিখিলাম। বৎসরে একবার ওই দুই গাছের নারিকেল পাড়া হয়, তারপর তা বিক্রি করি। বড় মিঠে জল আর শাঁস, ফলনও খুব। এই কয় বৎসরে বেশ কিছু টাকা জমিয়াছে। উহা তোমাদের। ওই টাকা নিলে তোমাদের অসম্মান হইবে না। মানি অর্ডার করিলাম। বুড়ুভাইয়ের জন্মসংবাদ পাইবার পরে তাহার নামেও একখানি নারিকেল গাছ বসাইয়াছি। মামা নাই বলিয়া সে পূজায় মামাবাড়ি হইতে কিছু পাইবে না, তা কি হয়! তবে সেই গাছে ফল ধরিতে এখনও দেরি আছে। আপাতত এই টাকা হইতেই তাহাকে একখানি বাটার জুতা কিনিয়া দিও। আশীর্বাদ সহ — বাবা।”

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...