বসে আছি হে পথ পানে চেয়ে…
মানসী কবিরাজ


“আজ বিকালের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম/ রঙিন খামে যত্নে লেখা আমার নাম”
না আজও সেই চিঠি পাওয়া হয়নি আমার। একটা মায়াবী রঙের খামে সবুজ কালিতে লেখা আমার নাম। চৈত্রের শূন্য দ্বিপ্রহরে যখন সাবেকি শ্যাওলা ভরা উঠোনের বিরহী জলের কল হইতে এক ফোঁটা এক ফোঁটা করিয়া জল পড়িতেছে টুপটাপ যেন তুলসী মঞ্চের উপরে বাঁধা বসুধারা। যখন ঘুঘুর ডাকে ভাঙিয়া যাইতেছে পৈঠার ধাপ। বাতাসে ভাসিতেছে বন্ধ দরাজার গুমোট আর ঠিক সেই সময়ে বহু প্রতীক্ষিত শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির ন্যায় পোষ্টম্যানের সাইকেলের মধুর ক্রিং ক্রিং। আহা! আলুলায়িত চুলে তৃষিত চাতকের মতো ফটিক জলের আশায় দরজা খুলিয়া আকুল নয়নে হাত বাড়িয়ে দেওয়া যেন ডাকবাবু তাহার খাকি-ঝোলা মন্থন করিয়া আমার হাতে দেবে সেই অমৃতভাণ্ডখানি।
না সে চিঠি আমি পাইনি আজও। আমার দেশে পোষ্টঅফিস রহিয়াছে ঠিকই কিন্তু পিন কোড গিয়াছে হারায়ে।
তথাপি আশায় বাঁচে চাষা বলিয়াই জীবন এখনও এত মোহময়। না হইলে কে না জানে ‘সব পেলে নষ্ট জীবন’। কবে প্রথম আমি নিজে চিঠি লিখিয়াছিলাম বা কাহাকে লিখিয়াছিলাম সেটা স্পষ্ট করিয়া স্মরণে নাই ঠিকই তবে তাহা যে প্রেমপত্র ছিল না সেটা বিলক্ষণ জানি।
পুরো কয়েকটি বাক্য নিজে থেকে লিখিবার (বানান ভুল সহ) পরীক্ষায় পাস করিবার পর আমার পিতৃদেব দয়া পরবশ হইয়া ইনল্যান্ড লেটারের স্বল্প পরিসর বরাদ্দ করিতেন পত্র মারফৎ গুরুজনদের নববর্ষ কিংবা বিজয়ার প্রণাম জানাইবার জন্য। তাহাতেই এমন আত্মবিশ্বাস বাড়িয়া গিয়াছিল যে সাদা কাগজ পাইলেই চিঠির মকশো করিতাম।
তাহার পর প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম মানিয়াই আমার কিশোরী শরীর ও মনেও প্রেমের সমীরণ। কিন্তু অবস্থা, অবাক জলপান সদৃশ। পিপাসায় ছাতি ফাটিয়া যাইতেছে কিন্তু জল থুড়ি প্রেমিক পাই কোথা? অগত্যা এক সহপাঠিনীকেই লিখিয়াছিলাম আমার প্রথম (এবং এখন অবধি শেষও ) প্রেমপত্রখানি। ভাগ্যিস তখন অন্তত সমকামী শব্দবন্ধ লইয়া এতো তুমুল তুলকালাম ছিল না, নহিলে কেস খাওয়া ছিল একরূপ অনিবার্য। যদিও আমার সেই সহপাঠিনীর অভিভাবকেরা আমার নামাঙ্কিত প্রেমপত্রখানি আসলে তাহারই ছদ্মবেশী প্রেমিক লিখিত এই অনুমানে তাহাকে বেশ উত্তম মধ্যম দিয়াছিলেন এবং যথারীতি পরিণতিতে অবশ্যম্ভাবী বন্ধু বিচ্ছেদ।
তাহার পর মহানন্দা নদী দিয়া অনেক জল গড়াইলে আস্ত একখানা চিঠি লিখিবার অবকাশ হয় স্নাতকের পাঠ লইবার জন্য বাড়ি হইতে বেশ অনেকটা দূরে হোস্টেলে থাকাকালীন সময়ে। কেমন আছ, কেমন চলিতেছে সংসার, ইত্যাদি গোছের সেই সব চিঠি ছিল নেহাতই কর্তব্যের খাতিরে দায়সারা লেখা এবং অতি অবশ্যই কম মর্যাদার হরিদ্রা বর্ণের পোস্টকার্ড বাহিত। শুধু যখন মাসিক বরাদ্দ হইতে কিঞ্চিৎ বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়িত তখন অভিভাবককে লিখিতাম অভিজাত নীল ইনল্যান্ডে, সেক্ষেত্রে প্রথমেই অনেক ইনিয়ে বিনিয়ে শিবের গীত গাহিবার পর থাকিত আসল ধান ভানিবার কথা।
আমাদের হস্টেল ছিল পুরো দস্তুর প্রমিলাকুল চালিত এবং বয়স্ক অবিবাহিতা মেট্রনের আজব শাসন জারিত। আবাসিকের কাহারও নামে পোস্টকার্ড ব্যাতিরেকে মুখবন্ধ অবস্থায় কোনও পত্র আসিলেই তিনি মানে আমাদের মহামান্য মেট্রন সাহিবা ফরফর করিয়া সেই ইনল্যান্ড কিংবা লেফাফা খুলিয়া মার্জারীর ন্যায় ঘ্রাণ লইতেন পাছে তাহার শ্যেন চক্ষু এড়াইয়া কোনও আমিষ পত্র আবাসিকদের হস্তগত না হইয়া পড়ে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে ওই হস্টেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ সমস্ত কলেজের ছাত্রীরাই থাকিত (সকাল এবং দিবাভাগ কালীন কলেজ) ফলে হস্টেলের মূল দ্বার সকাল ছটা হইতে সন্ধ্যা ছয় ঘটিকা অবধি খোলা থাকিত। যদি আমিষ ঘ্রাণ লইবার কাহারও (আবাসিক) একান্তই ইচ্ছা হয় তবে ওই দীর্ঘ বারো ঘণ্টা সময় যে যথেষ্ট ইহা আমরা বুঝিলেও কী অজ্ঞাত কারণে মেট্রন বুঝিতেন না তাহা আমার স্বল্প বুদ্ধিতে বোধগম্য হইত না। অতএব একদিন বেশ রণচণ্ডী মেজাজে (এই বিষয়ে অধমের সামান্য সুনাম ছিল ) মেট্রনের সহিত সম্মুখ সমর। জানিনা আমার মেজাজ কিংবা আমার প্রতি তাহার বিশেষ (কারণ অজ্ঞাত ) স্নেহের দরুন বরাবর দেখিয়াছি তিনি আমার কথার কিঞ্চিৎ মুল্য দিতেন। এই লেফাফা খুলিয়া পত্রাদি পড়িবার ব্যাপারে তাহার কাছে খাপ খুলিতেই তিনি মুচকি হাস্যে বলিলেন আজ অবধি আমার প্রেমপত্রের কোনও হাল হকিকত তিনি জানিতে পারেন নাই এবং অদূর ভবিষ্যতেও এমন ঘটিবার সম্ভাবনা আছে বলিয়া তিনি বিশ্বাস করেন না (এতই অভাগা এই অধম ) সুতরাং আমার এই খর্ব নাসাটি এই পত্র জনিত বিষয়ে না গলাইলেও চলিবে। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। অনন্তর এই অধমের (নেপথ্যে থাকিয়া) সুপরিকল্পিত চক্রান্তে জটলা পাকাইয়া বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু এবং অবশেষে পত্রপাঠ পূর্বক সবার হাঁড়ির খবর জানিবার বিজাতীয় আনন্দ হইতে নিজেকে বঞ্চিত করিতে মেট্রন মহোদয়া বাধ্য হইয়াছিলেন বলাই বাহুল্য।
না আজও সেই চিঠি পাইনি আমি। একটা মায়াবী রঙের খামে সবুজ কালিতে লেখা আমার নাম… শুধু আমার কেমেস্ট্রি খাতার ভাঁজে জনৈক কোচিং সহপাঠী (নাম লিখিলাম না সঙ্গত কারণে) আমার অজ্ঞাতসারে রাখিয়া দিয়াছিল । যথারীতি রাত্রিতে হস্টেলে অধ্যয়ন কালে সেই কেমেস্ট্রি খাতা খুলিয়া আমি অবাক বিস্ময়ে অভিভূত এবং গদগদ আতা ক্যালানে দশাগ্রস্ত। আহা আমিও তো পাইলাম অবশেষে, নাই বা আসিল মায়াবী রঙের খামের মোড়কে চৈত্র দুপুরে ক্রিং ক্রিং সাইকেল বাহিত হইয়া। নাইবা থাকিল সবুজ কালিতে লেখা আমার নাম প্রেমপত্র বই তো নয়। বিদ্যুৎ নিন্দিত গতিতে চলিয়া গেলাম চিঠির শেষ পঙক্তিতে এবং পত্রবাহকের নাম দেখিয়াই তৎক্ষণাৎ বক্ষে বিঁধিল সুতীক্ষ্ণ শেল। হে ঈশ্বর আমার কাছেই সেই প্রেমিকের চিঠি, যে কিনা প্রায় সব মেয়েকেই (ওই কোচিং ক্লাসের) প্রেমপত্র লিখিত কিছুটা আমগাছে ঢিলাইবার ন্যায় যদি টুস করিয়া কোনও পাকা আম বোঁটা হইতে খসিয়া তাহার ঝুলিতে গিয়া পড়ে এই আশায়! তাহার নাম দেখিবা মাত্র পত্র বাহিত সেই প্রেমপ্রস্তাব নাকচ করিলেও একটা চরম নিষ্ঠুরতা করিয়াছিলাম (বয়সকালের উষ্ণ অহং বশত), তাহার সমস্ত ভুল বানানের নীচে আন্ডার লাইন করিয়া কোচিং ক্লাসে সবার সম্মুখে সেই চিঠি তাহাকে ফিরাইয়া দিয়া বলিয়াছিলাম ‘আগে বানান বিধি আয়ত্ত করো তারপর নাহয় প্রেমপত্র লিখো’। লজ্জায় সে কোচিং ক্লাস বদলাইয়াছিল।
অতঃপর আমার অবস্থাও অভিশপ্ত শবরীর ন্যায়। প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে সূর্য ডোবে রক্তপাতে যে চিঠিটি আসার কথা আসে নাই…
একটা মায়াবী রঙের খামে সবুজ কালিতে লেখা আমার নাম…

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...