পত্রলেখা
কৌশিক সেন

এই কুটিল দ্যূতক্রীড়ার পরও তোমায় চিঠি লিখতে বড় সাধ হয়। ঊষর মরুর ওপর দিয়ে সহস্র বৎসর হেঁটে আসবার পরও তুমি আমার সেই লাবণ্যপ্রভা নদী, যার তরঙ্গে অবগাহন করলে বুকের গভীরে লক্ষ্য নীল খাম ঝাপটা মারে। কলমের নিবে নেমে আসে গভীর শ্রাবণ। গুলঞ্চলতার মতো শরীর জড়িয়ে নেমে আসে অমলিন অক্ষরঝাপি। নিশ্চিত বজ্রপাত মাথায় করে আমি কাগজ কলম নিয়ে বসে পরি তোমায় চিঠি লিখবো বলে…

প্রিয়তমেষু, ঠিক কতগুলি চিঠি লিখবো তোমায়! কতো অক্ষৌহিণী অক্ষরযন্ত্রণার অন্তে একটি চিঠি শেষ হয়, বলতে পারো! একটা একটা করে পাতা ওলটাতে ওলটাতে আমার ডানা থেকে পালক ঝরে পরছে। তোমায় চিঠি লিখতে লিখতে আমি ওড়বার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা গোপন বায়ুথলিতে আকাশ দেখি এখন। দিগন্ত বলতে যাকিছু ছিল, সবই মনে হয় নীলচে অক্ষরের ওপাড়ে যাওয়ার অমলিন আনন্দ…

ডাক পিওনকে বলে রেখেছি, তোমার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে চিঠি। ও অপেক্ষা করছে, কবে লেখা শেষ হবে আমার। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তার খাকি পোশাক সবুজ হয়ে উঠছে। কচি পাতা বেরচ্ছে, বুকপকেটে, বোতামঘরে। ফুল ফুটছে একটা, দুটো। পাখি উড়ছে তিনটে, চারটে। আমি পিওনদাদাকে দেখতে দেখতে লিখে চলেছি দিনবদলের স্বপ্নদৃশ্য। এমন মোহাক্রান্ত হয়েই কি চিঠি লিখতে হয়! জানো তুমি, চিঠি লেখার নিয়মকানুন!

কোন ঠিকানায় পাঠাবো তোমায়, এইসব মোহবিন্যস্ত অক্ষরমালা! প্রাপকের ঠিকানাবিহীন চিঠি পরে থাকে স্বপ্ন আর পরাবাস্তবের মাঝে এক নিস্তব্ধ মিনারের অলিন্দে। সেখানে নীলচে অক্ষররা কালনাগিনী শঙ্খচূড়ের সাথে নিভৃত অভিসারে মেতে ওঠে, মায়াবিনী জ্যোৎস্নায়। তবে কি এই মিলনপিপাসু শব্দরা কোনোদিন পৌছবেনা তাদের কাম্য গন্তব্যে! চিঠি লিখতে লিখতে মেঘ ডাকবে, বিদ্যুৎ চমকাবে, বজ্রাঘাত হবে চিঠির শেষ পৃষ্ঠায়! ইতি’র পর বাকি রয়ে যাবে একটি শব্দমাত্র!!

সবুজপত্র

আবার চিঠি লিখছি তোমায়। এবার সবুজ কালি দিয়ে, সবুজ অক্ষর, অরণ্যগন্ধ। হাতে পেলে নাকের কাছে ধোরো একবার। আমাদের কোনো এক অতীতজন্মের কাকচক্ষু নদির পাশে ঝিরিঝিরি গহন অরণ্যের বুনো গন্ধ পাবে।

তুমি হয়তো ভাব্বে এত ঘনঘন কেন লিখি তোমায়। আমার তো মনে হয় তোমাকেই লিখি শুধু। খিদে পেলে তোমায় চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে, ঘুম পেলেও। রাগ হলেও মনে হয় তোমায় লিখেই মনের ঝাল মেটাই। যন্ত্রণা হলে, কান্না পেলেও। নিরব অভিমানে তোমায় লিখতে ইচ্ছে করে। গভীর যৌনতায়ও! যখন সাড়া শরীরের লেলিহান শিখা শুধু তোমায় খোজে, কাগজ-কলম নিয়ে ঝাঁপ দিই ঘন সবুজ অক্ষরের ঝাপিতে। আজকেরই মতো!

আজ লেখার প্রতিটি অক্ষর যেন ক্লোরোফিল সম্পৃক্ত। রন্ধ্রে রন্ধ্রে নবীন সূর্যালোকের আহ্বান। সংশ্লেষিত আলো শুধু তোমারই অভিমুখে ছুটে যেতে চায়। আমি লাগাম ছেড়ে দিয়েছি কবেই। থাক না! অক্ষরের শিরায়, উপশিরায়, জালিকায় কেবল তোমারই নামগান। এ সুখ আমি রাখি কোথায়!

এইসব সবুজ রঙের অক্ষর একদিন ঝরে পরেছিল চিরহরিৎ অরণ্যের গভীর ছায়ায়। পাগলা ঝোড়ার মতো। আমি কলমের নিব ডুবিয়ে রেখেছিলাম গহন ছায়ায়। নিবিড় শীতলতায় ঘুম থেকে উঠতেই তোমার জন্য লেখা এল কলমে। ফুফফুসে জংলা গন্ধের শ্বাস নিয়েই তোমার জন্য লিখতে বসলাম…

পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা, যেন নরম তৃণপ্রান্তর। ঘাসে ঘাসে শব্দযোজনা করেছি শুধু তোমারই কথা ভেবে। এমন সবুজ গালিচায় বিশ্রাম নিতে এসে ঘুমিয়ে পরে সাদা মেঘের দল। ওদের ডাকিনি আর। যদি এই চিঠি হাতে পাও কোনোদিন, কান পেতো, মেঘের ভেসে যাওয়ার ক্রীড়াধ্বনি শুনতে পাবে অক্ষরের পরতে পরতে…

সমস্ত চিঠি বিলি শেষে পিওনদাদা দাঁড়িয়ে আছে আমার চিঠির জন্যে। ও বোধহয় এখন তোমার ঠিকানা জেনে গেছে। তোমার চিঠি হাতে পেলেই স্বপ্নের খিড়কি খুলে পিওনদাদার সাইকেল উড়ে যায়, ওই দূরে, নীলপাহাড়ের কুয়াশায়…

প্রাপ্তিসংবাদ পাইনা কোন চিঠিরই। এবার অন্তত দিও। পিওনদাদার হাত দিয়ে সবুজ কলমটা পাঠালাম তোমার জন্য। চিঠি লিখো, ঘন সবুজ বর্ণমালায়…

জলপত্র

আজ বিকেলে নৈঋতে মেঘ দেখা দিয়েছে। কিচ্ছু ইচ্ছে করছে না। মন চাইছে শুধু চিঠি লিখি। হ্যাঁগো, তোমায় চিঠি লিখছি ফের। বিকেলের চিঠি, মেঘ করবার। ঘন কাল হয়ে মেঘ করবার অক্ষররাশি। যদি বৃষ্টিধারায় ধুয়ে যায় নীল হরফগুলি, তবুও পোড়ো, ভেজা কাগজে ধুয়ে যাওয়া অক্ষরগুলি।

আজ সবুজ রঙের পর্দা লাগিয়েছি জানলায়। স্যাপ গ্রিন। গভীর অরণ্য ছাপিয়ে এনেছি পর্দার রেশমি সুতোয়। বর্ডার দিয়ে ছুটে গেছে বালিকা রঙের নদীটি। এইসব সবুজ পর্দার জানলার পাশে মেঘ ঘনবদ্ধ হয়ে আসছে, আর আমি তোমায় চিঠি লিখতে বসেছি। জলের চিঠি। জলের ধারায় কলম ধুয়ে যাচ্ছে। আর আমিও স্নান সারছি অবেলায়।

এমন করে তোমায় লিখতে বসলে বাষ্পরাও উষ্ণতা পায়। জল হয়ে গড়িয়ে পরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। বিনিসুতোয় গেঁথে চলে অকারণ অক্ষরমালা। আমি সেই লাবণ্যতাড়িত হয়ে কাগজের ওপর কলমের আঁক কেটে চলি। যেন গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে গলে গলে পরছে গ্লেসিয়ার। উপচে পরছে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অববাহিকার সবুজ বুক।

আমিও ভেসে যেতে চেয়েছি ভাষার গমকে, অক্ষরের তরঙ্গে। জলের তোরে ভাসতে ভাসতে পৌঁছতে চেয়েছি তোমারই মোহনায়। নদীবন্দরের নাব্যতা তাই কোনোদিন ছুটে পারেনি আমায়!

পিওনদাদা আজ সাইকেল নিয়ে আসেনি। ওর নৌকা বেঁধে রেখে এসেছে কোনো এক নির্জন নদীর ঘাটে। অপেক্ষা করছে, এই জলের চিঠি কবে শেষ হবে। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় নৌকা ভরে পিওনদাদা পাল তুলবে দূর মোহনায়। তোমারই উদ্দেশ্যে!

তুমি এই চিঠি আঁজলা ভরে রেখো। তৃষ্ণায় পান কোরো, দাবদাহে স্নান কোরো। তারপর বাষ্পীভূত করে দিও শ্যামলা মেঘের দলে। অক্ষরবর্ষণে ভিজে যাক পিপাসার্ত জনপদ। সভ্যতা সমৃদ্ধ হোক, সভ্যতা সম্পৃক্ত হোক…

হাওয়ার চিঠি

আজকাল তোমাকে চিঠি লিখতে বসলেই বড় হাওয়া দেয়। বুকের ভেতর একটা হাওয়াকল প্রচন্ড জোড়ে ঘুরতে থাকে। গলার কাছে জমা হয় শুকনো পাকুড়পাতারা।

ভাবছি, এই আমার শেষ চিঠি। তোমায় লিখবো না আর। এত হাওয়া দিলে লেখা যায়, বলো! সব পৃষ্ঠা উড়ে যায়। বুকের ভেতর থেকে জগদ্দল পাথর খোদাই করে পেপারওয়েট বানিয়েছিলাম। আর কতো কতো পৃষ্ঠা পেপারওয়েট চাপা দেবো, বলো!

আমি দেখছি, কিছু কিছু পৃষ্ঠা ডানা মেলে বকের মতো সারি সারি উড়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। আটকাতে পারিনি ওদের। ওদের পালকে পালকে আমারই অক্ষর, আমারই শব্দ, আমারই ভাষা। আচ্ছা, ওইসব বকেদের হৃৎপিণ্ডে কি তোমার বাসার পথনির্দেশিকা নিমিলিত আছে!

তবে আর পিওন দাদার কি প্রয়োজন! ও পিওনদাদা, তুমি চলে যাও, চলে যাও। আর এসো না, এই দুঃখ, জরা, মৃত্যুর নশ্বর পৃথিবীতে। আর এসো না গো, এই একঘেয়ে অন্ত্যমিল পদ্যর অযথা অনর্থক ঝড় সামলাতে। চলে যাও তুমিও, সবুজ তৃণভূমি পাড় হয়ে, যেখানে দীঘল অরণ্যের গভীর আদরছায়া তোমার পথ চেয়ে বসে আছে। দুথালা ভাত ঢাকা দিয়ে বসে আছে পদ্মা বৌদি। চলে যাও। এক বুক আশা নিয়ে শুকনো মুখে কবে থেকে দিন গুনছে বৌদি, তোমার সাইকেলের ঘন্টা শুনবে বলে!

এ চিঠি হাওয়ার চিঠি। লিখতে বসলেই যখন হাওয়াকল পাগল হয়ে উঠবে, খুব জোড়ে হাওয়া দেবে, আঁচড়কাটা পৃষ্ঠা গুলোকে পেপারওয়েট দিয়ে চেপে রাখবো না আর! ওরা সারি সারি উড়ে যাবে মেঘের পর্দা কেটে, আপন গন্তব্যে…

ভরদুপুরে, ইচ্ছে হল

লিখবো না লিখবো না করে আবারও লিখতে বসলাম তোমায়। নিঝুম দুপুরে যখন কোনো কাজ থাকে না, বাঁশগাছের পাতারা ঝিরিঝিরি করে সাড়া দেয়, খিড়কিপুকুর থেকে মাথা তোলে বেলা দুটোর পানকৌড়ি, তোমাকে চিঠি না লিখে পারি না।

বেশ কয়েকমাস চিঠি লিখিনি তোমায়। ধীরে ধীরে দেখলাম শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আমার। ডাক্তার দেখালাম। উনি বললেন আমার হৃদয়ে নাকি প্রাণবায়ুর সরবরাহ কমে যাচ্ছে। বাতাস বইছেনা, ফুস্ফুস ঝিল্লিতে। ওকে চিঠি লিখুন, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।

আমিতো তোমাকে সবসময় চিঠি লিখতে চাইই। লিখিও, মনে মনে, আবছা অন্ধকার স্লেটের ওপর খড়ি ঘষে চলি। দেখতে পাও, শুনতে পাও, তুমি! লিখতে লিখতে যখন ভোর হয়ে আসে, বড় শীতল বোধ করি তখন। কেউ এগিয়ে আসেনা আমার কুঁকড়ে যাওয়া শরীরে একটা চাদর ঢাকা দিতে!

তুমি তো কোনোদিন জানাওনি চিঠি পাও কিনা! পড়ো কিনা! তুমি না পড়লেও ঠিক চিঠি পাঠিয়ে যায় আমি। তোমার ছায়াকে চিঠি লিখবো, দেখো! ওর সাথে সুখ দুঃখের কথা বলবো, ঘরকন্যার কথাও। মাসকাবারি মুদিখানার হিসেব, ব্যাঙ্ক-পোস্ট অফিসের জমা খরচের কথা বলবো, তোমারই ছায়ার সাথে।

পিওনদাদা আর ফিরে আসেনি তারপর। দূর সবুজ মাঠে সাইকেলের ঘন্টি বাজাতে বাজাতে মিলিয়ে গিয়েছিলো একদিন। বৌদিই আর আসতে দেয়নি বোধহয়। এই ভরা বর্ষার ঝড় জল, দুর্যোগের পৃথিবীতে কেউকি ছাড়তে পারে তার প্রাণের পুরুষকে! আঁচলের গিটে শক্ত করে আটকে থাকে পুরুষমন।

এখন তোমার নামে উড়িয়ে দিই খোলা এইসব চিঠি। কোনো ডাকঘরের ছোঁয়া লাগেনা চিঠির গায়ে। অক্ষরে অক্ষরে নির্ভেজাল আকাশ ভর করে। পাতায় পাতায় তোমার স্পর্শ পাওয়ার উন্মুখতা। আমার কলমের ভাষা তোমার ঠিকানা জেনে গেছে কবেই। তুমিই শুধু প্রেষকের ঠিকানা হারিয়ে ফেলো, বারবার!

শীতের অরিগ্যামি

এক অনন্ত কুয়াশায় তোমায় চিঠি লিখতে বসেছি আজ। গভীর অস্পষ্টতায় ঢেকে গেছে চারিপাশ। চারিদিকে অবোধ্য উষ্ণতার হাতছানি। ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছে সাড়া শরীর। তবুও দুর্ভেদ্য হিমশৈল স্থাপন করেছি শীতল হিমবাহের সম্মুখে। কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠির পাতায় লিখে রাখছি বরফকঠিন বর্ণমালা।

জানো, তোমায় লিখতে বসলে শীত লাগেনা আর। কাগজের ওপর বস্ত্রহীন অনুভুতি থেকে উঠে আসে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। সাড়া শরীর সেঁকে নিই শব্দের হোমে, অক্ষরের আহুতিতে। তবে সেতো নিছকই চিঠি নয়, বলো, সেতো মহাযজ্ঞের পবিত্র বহ্নিযন্ত্রণা!

এখন গভীর শীত। কাচভাঙা দিঘীতে চড়ুইভাতি করবার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে পরিযায়ী পাখিরা। তাদের গোলাপি ডানায় এখনও লেগে রয়েছে বাসি আলপনার কারুকাজ। আমি অক্ষরে অক্ষরে সেইসব কারুবাসনা পাঠাচ্ছি তোমায়। তুমি স্পর্শ কোরো ওদের!

আমার শেষ চিঠিতে তোমার জন্যে অভিমান লিখেছিলাম, জানি। তুমি নিশ্চয় চিঠিটা পড়ে মনে মনে খুব হেসেছিলে। কুচি কুচি ছেড়া চিঠির টুকরো তোমার হাসির সাথে ছড়িয়ে পরেছিল সুদূর চন্দ্রভাগা নদীর ঘাটে ঘাটে। তাইতো এবার তুষারপাত হল খুব। ডিসেম্বরের গোঁড়া থেকেই নরম আদরের টুপি পরেছে পাইনরঙের ভালোবাসারা…

আগামি বসন্তে তোমার ঠোঁটের ওপরের লাল আঁচিল থেকে একথোকা আকাশ গুছিয়ে দিও আমায়। যে আকাশ কয়েক শ্রাবণ শতাব্দী দূর, সে আকাশ আর যে কারো হোক, আমার নয়। সে আকাশ থাক। আমি বরং তোমার আকাশেই সুখের কপোত ওড়াবো! লাল দিগন্ত থেকে মায়াবী ভোর এনে ছিটিয়ে দেবো তোমার সারারাতের আদুরে পালঙ্কে!

আমি এখন দুই হাত ঘষে বসন্তের দিন গুনছি। পলাশ লাল অক্ষরে সেদিন কয়েক হাজার পৃষ্ঠা চিঠি লিখবো তোমায়। বীতশোক অরিগ্যামির সুনিপুণ ভাঁজে তোমায় উড়িয়ে দেবো আমার অভিমান ভোলা পত্রখানি। এখন সমস্ত শীত অপেক্ষা করো আমার নির্বোধ অভিমানের উত্তাপে!

দিনমানের চিঠি

অনেকদিন পর ফের লিখছি তোমায়। জামভাঙা বেগুনী ভোরের স্বপ্নে দেখলাম, তুমি দাঁড়িয়ে আছো মালতীকুঞ্জে, দুচোখে অপেক্ষা। পিওনদাদা এসে ঘন্টি বাজাবে কখন! ঘুম ভাঙতেই সেইযে লিখতে বসলাম তোমায়, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল, লেখা শেষ হল কই!

তোমায় লিখতে বসলে নাওয়া খাওয়ায় মন বসে না মোটেই। সবুজ পানসির ভেলায় কখন যে বেলা বয়ে যায়, খেয়ালই থাকে না। ভোরের ফিঙে কখন যে বামুনবাড়ির আঙিনা থেকে ধান খুঁটে ফিরে আসে নরম গৃহসুখে, জানতেই পারি না তখন। তোমায় লিখতে বসলে গাঢ় বাদামী থেকে খয়েরী হয়ে যায় দুরের তালগাছের সারি, তার হুশ থাকে না আর!

এখন শীত এখানে। সোনালী ফ্রকের মেয়েরা এক্কা দোক্কা খেলা শেষ করবে কিছুক্ষণ পরেই। শেষ দান খেলতে ব্যস্ত লাল ফিতের রাঙা মেয়েটা। জানলা দিয়ে দেখছি, কেমন বেনুনি দোলাতে দোলাতে একপায়ে এগিয়ে চলেছে নিকানো উঠোনের ওপাড়ে। ওরা ফিরে গেলেও লেখা কি শেষ হবে আমার!

চাদরে ঢেকে গেছে দূরের মাঠ, গৃহস্থালির গাঁ ঘর। কেরোসিন কুপি জ্বালিয়ে রেখেছি লেখার টেবিলে। উসকে দিলাম। ঘরের ভেতরটা স্পষ্ট হল আবার। লেখার কোণে কোণে আঁধার নেই আর। পিওনদাদা আর আসবেনা জানি। তাই বলে চিঠি লিখবোনা তোমায়, বলো!

নিশুতি রাত নেমে আসছে জানলার শারশি গলে। কেরোসিন ফুরিয়ে আসে বাতির আলোয়। তোমায় লিখতে বসলে কেন যে তাড়াতাড়ি বাতি নিভে যায়, বুঝতে পারি না! আধজ্বলা শিখায় লিখে রাখি না-লেখা শব্দগুলির মন্ত্রগুপ্তি। ভাঁজ করে রাখি গভীর নিশীথে…

মান পত্র

না, বড় অভিমান হয়েছে আমার। আর চিঠি লিখবনা তোমায়। কথা বলবনা আড়ালে, আবডালে, লতায়-পাতায়, আলয়-অন্ধকারে, স্বপ্নে-জাগরনে। তোমায় ছেড়ে চলে যাব ভুল পরীদের মিথ্যে রূপকথার দেশে। যেখানে কোনো কাগজ-কলম নেই তোমায় চিঠি লিখবার।

বৃষ্টির পূর্বের আকাশ আর বৃষ্টির পরবর্তী নির্ভার প্রকৃতির ভেতর যে বিস্তর পার্থক্য, তোমার আমার ভেতর তেমনই কোনো ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ তফাৎ আছে, বুঝি। বুঝি, আমার চিঠি পড়তে তোমার বয়েই গেছে। তার চেয়ে তুমি বাগান থেকে ফুল তুলে কাঁঠালিচাঁপার মালা গাঁথবে সারা দুপুর। বিকেল হলেই দীপ জ্বেলে দেবে অলস কুলুঙ্গিতে। আমার চিঠির জবাব দিতে ভুলেই যাবে তুমি!

শীতের রাতে বালুচর থেকে তুলে আনা একমুঠো কুয়াশা আর তোমার মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই গো! কাছে আনতেই অদৃশ্য হয়ে যায়, অথচ অনুভব করি শ্বাসে, প্রশ্বাসে। একটা তীব্র যন্ত্রণা নিজের উপস্থিতি জানান দিতে দিতে নেমে যায় ফুসফুসে। তাকে মানা করবার জো নেই আমার!

খুব ইচ্ছে করে তোমার চিঠি পেতে। অনেক গন্ধ, স্পর্শ দিয়ে লেখা। চিঠি লিখতে বসলে যেন তোমার বেদনার কলসের অদৃশ্য ছিদ্রপথ দিয়ে গড়িয়ে যায় সবটাই। যেটুকু লেগে থাকবে কলসের আনাচে কানাচে, তাও উপুড় করে দেবে সাদা কাগজের আঙিনায়।

আচ্ছা, পড়েছিলে তুমি, যে চিঠিগুলি লিখেছিলাম? জানি, মস্তিষ্কপ্রসূত কিছুই ছিলনা তাতে। সবটাই দগ্ধ হৃদয়ের গলিত তরল। গভীরতা নেই, হয়তো! তুমি নামলে হাঁটুও ডুববেনা সেই প্রবাহে। তবু গতি তো ছিল, বলো! বলো, নদীগন্ধে ভরপুর ছিলতো সে লেখনী!

তবুও তো লিখছি তোমায়, ফের! মাঘ কুয়াশার জমাট অন্ধকার বয়ে এনে বসন্ত লিখছি এই বিষণ্ণ চৈত্র দুপুরে। শুধু তোমারই জন্যে। এই মন্বন্তরের দেশ থেকে পাথর খোদাই করে তাতে অমৃত লিখছি শুধু তোমার কথা ভেবেই। তুমি কি পড়বে না কখনও, বলো, পড়বে না তুমি!

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

1 Comment

  • বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের

    Reply June 27, 2021 |

    অনবদ্য রচনা

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...