চিঠি-পত্র
প্রদীপ রায়চৌধুরী

“যাবার বেলায় হাতদুটি ধরে, বলেছিলে চিঠি দিও… বলেছিলে তুমি চিঠি দিও মোরে… আঁখির আড়ালে চলে গেছ তবু, রয়েছ হৃদয় জুড়ে, তুমি আজ কত দূরে।” অর্ধশতাব্দীর‌ও বেশী প্রাচীন এই গানটি মনে আছে? একসময় রেডিওতে যে গান শুনে আপামর বাঙালি শ্রোতারা আর্দ্র হয়ে উঠত? জগন্ময় মিত্রের ‘চিঠি’। শুধু বাংলা গান কেন, কেন‌ই বা অত পুরোনো! এই তো আশির দশকের শেষে সারা দেশের মানুষের আবেগ ছুঁয়ে গিয়েছিল পঙ্কজ উধাসের, ” চিঠি আয়ী হ্যায় বতন সে চিঠি আয়ী হ্যায়…”। এমনকি নব্বই দশকের শেষ দিকে এমন ক’জন দর্শক-শ্রোতা আছে যাদের চোখ ভিজে ওঠেনি একটা চিঠি ঘিরে বর্ডার সিনেমার সেই অবিস্মরণীয় চিত্ররূপে, “সন্দেসে আতী হ্যায়, হামে তড়পাতে হ্যায়, তো চিঠি আতী হ্যায়, উও পুছে জাতী হ্যায়…”? মনে পড়ে কবি সুকান্ত’র রানার কবিতা? “কত চিঠি লেখে লোকে-কত সুখে প্রেমে আবেগে স্মৃতিতে, কত দু:খে ও শোকে…”, সলীল চৌধুরীর সুরে ও হেমন্ত’র অমৃত কণ্ঠে সেই অমর কবিতা কালজয়ী গানে রূপান্তরিত হলো এবং রানারের সেই বিষাদ গাথা বাংলা গানের সম্পদ হয়ে রইল। অথচ এই নতুন মিলেনিয়াম ‘চিঠি’ ঘিরে মানুষের বর্ণালী আবেগকে যেন নির্মম হাতে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে যেভাবে এক খেয়ালি শিশু ইরেজার ঘষে মুছে ফেলতে চায় তার আঁকার খাতার সব অপছন্দের রঙ। আসলে আজকের যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে রানারের স্বরূপ ও চরিত্র। মানুষ বরং নিজেই আরো বেশী ছুটছে তার জীবন ও জীবিকার জন্য। তাই তার চিঠি লেখার সময় কেথায় ? হোয়াটস্ আপ, এস এম এস এখন তার চিঠি লেখার প্রয়োজন ও শখকে ভূলুন্ঠিত করেছে। তার ওপর সোনায় সোহাগা হয়েছে ভিডিও কল। সে যেন সকল দুখের মুশকিল আসান। শেষ কবে পোস্ট অফিস গেছেন জিজ্ঞাসা করলে অনেকেই মাথা চুলকোবেন। কুরিয়র সার্ভিস ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আপনার জরুরী চিঠি, পার্সেল একদিনেই দেশের অন্যপ্রান্তে পরম দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দেয়। তাই ছেলেবেলার বহু প্রচলিত পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড চিঠি বা ছাপমারা এনভেলাপের এখন তো মিউজিয়ামে পৌঁছে যাবার অবস্থা! এখনো মনে পড়ে প্রতি দূর্গাপুজোর পরে , বাবা এক গোছা খালি পোস্টকার্ড হাতে দিয়ে বলতেন, যে সব গুরুজনরা বাইরে আছেন সবাইকে শুভ বিজয়ার প্রণাম জানিয়ে চিঠি লিখতে। একই পোস্ট কার্ড আমি ও আমার ভাই শেয়ার করতাম। ডাকবাক্সে ফেলার আগে বাবা অবশ্যই দেখে নিতেন চিঠির একদম ওপরে আমরা “ শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়” লিখেছি কিনা। এই লম্বা লাইনটা কোন চিঠিতে আমি লিখলে, অবশ্যই পরের চিঠিতে ভাইকে লিখতে হতো। শ্রদ্ধা ও শ্রম আমাদের ভাগ করে নিতেই হতো। যাক সে সব কথা। চিঠি ও পত্র একসাথে লেখা হলেও তাদের চরিত্র কিন্তু আলাদা। ‘চিঠি’ শুনলেই মনে হয় সে যেন এক উজ্জ্বল উচ্ছল তরুণী। যেন ঝর্ণার মত দুরন্ত গতিতে তার মনোভার লাঘব করার জন্য প্রায় ‘দে ছুট ‘! তার অনাবিল আনন্দ, ভালবাসা, কখনো দু:খবোধটি সে যেন প্রকাশ না করে থাকতে পারছে না। আবার ‘পত্র’ কিন্তু ভিন্ন চরিত্র। তার রাশভারী চেহারা, সে সর্বদা গম্ভীর মুখ নিয়ে চলে। তার লেখাও হয় অন্য মেজাজ নিয়ে। সে মূলত লেখে, ধরুন – চাকরীর আবেদন, সম্পাদকের নবীন লেখকের অমনোনীত লেখা ফেরত পাঠানোর পত্র, উকিলের কেস ঠোকার ব্যাপার ইত্যাদি।কখনো নিরুপায় হয়ে দেখি পত্র , চিঠি কে দিয়ে লিখিয়ে নেয় কোন খুশির খবর যেমন Letter Of Appointment বা চাকরীর পদোন্নতির কথা। তাই দেখতে পাই বিধাতার মনে থাকলে চিঠি পত্র দোঁহের মিলন‌ও হয় কখনোসখনো। আমি কয়েকজনকে জানি যারা চাকরী থেকে অবসর নেওয়ার পরে খবরের কাগজে “সম্পাদক সমীপেষু” কলামে লেখা পাঠানোর জন্য বিভোর হয়ে থাকতেন। বিভিন্ন বিষয়ে লেখা এই সব চিঠি নাগরিকদের সমাজ চেতনা, সাহিত্য বোধের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠত।Statesman পত্রিকায় একবার Letters To The Editor কলামে বাংলার দুই স্বনামধন্য চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় ও মৃনাল সেন চলচ্চিত্র বিষয়ে নিজেদের ভিন্ন মত পোষণ করে যেরকম চিঠির লড়াইতে মেতে উঠেছিলেন, তা এখন ইতিহাস । তবে এই দুই বিরাট মাপের মানুষ, আক্ষরিক অর্থেও, নিজেদের এই মতান্তরকে কখনই মনান্তরে পরিণত করেননি। একে অপরের প্রতি আজীবন শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এমনটা আজকের দিনে সত্যি দেখা যায় না। মনে পড়ছে এক সময় দেশ পত্রিকার পূজোবার্ষিকী সংখ্যা সেজে উঠতো প্রথমেই রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত চিঠি দিয়ে। তাঁর রাশিয়ার চিঠি, য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র, জাভা-যাত্রীর পত্র পাঠক সমাদৃত, বহু পঠিত। এই বইয়ের অন্তর্ভূক্ত চিঠি গুলি শুধু কবির বিদগ্ধ মনের পরিচয়ই নয়, সমকালীন দেশ বিদেশের সমাজের দলিল চিত্রও বটে। বলুন তো এখনো অবধি কোন পত্র বিনিময় সংক্ষিপ্ততম বলে অভিহিত করা হয়? শোনা যায় সমারসেট মম তাঁর Moon and The Six Pence উপন্যাস প্রকাশিত হবার পর তাঁর প্রকাশককে বইটির কেমন কাটতি হচ্ছে জানতে চেয়ে চিঠি লেখেন : “?”বিস্মিত হয়েছিলেন রসিক প্রকাশকের কাছ থেকে উত্তরে পাল্টা চিঠি পেয়ে- “!”আমার বিশেষ প্রিয় একটি মজাদার চিঠি, যার লেখক আর কেউ নন স্বয়ং শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি অনেক সময় তাঁর বন্ধুমহলে বিরাগভাজন হতেন অকপট কথাবার্তার জন্য। একদিন সকালে পোস্টঅফিস থেকে একটি পার্সেল এলো তাঁর জন্য। কোন বন্ধুর উপহার বহন করে। শরৎ চন্দ্র বেজায় খুশি মনে সেই বড় প্যাকেট খোলা শুরু করলেন। মোড়ক খোলার পরে দেখলেন ভেতরে আরেকটি বড় পার্সেল আছে। এটিকেও তাহলে খুলতে হয়! তার ভেতরে দেখা গেল আরো একটি বাক্স কাগজে মোড়ানো। শরৎচন্দ্র তখন যুগপৎ বিস্মিত ও বিরক্ত। তাঁর সাথে কেউ মশকরা করছে? আবার ভিতরের ছোট প্যাকেটি খুলে দেখেন তার মধ্যে শুধু খড় ভরা আছে। সেখানে আছে একটি চিরকুট যাতে লেখা, “ভাই শরৎ , তোমার কুশল জানিও। আমি ভাল আছি।” ইতি তোমার,অমুক। বলাবাহুল্য শরৎচন্দ্র এমন চিঠি ও উপহার পেয়ে রাগে ফুটছেন। বিন্দুমাত্র সময়ের অপচয় না করে একটি কাঠের ছোটমত প্যাকিংবাক্স জোগাড় করলেন। তাতে খড় দিয়ে নিচেটা ভরে, তার ওপর বড় দেখে বেশ কটা পাথর ভরলেন। সেই বাক্স সুন্দর ভাবে কাগজে মুড়ে এবং বাক্সে খড়ের নিচে সেই বন্ধুর উদ্দেশে একটা ছোট চিঠি লিখে, পোস্ট অফিসে গিয়ে পোস্টমাস্টারের হাতে জমা করলেন। এটা করে মনে মনে হাসলেন এবং তাঁর ক্রোধের উত্তাপ কিছুটা প্রশমিত হয়েছিল। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন : “প্রিয় অমুক, তোমার কুশল সংবাদ পেয়ে আমার বুকের এই পাষাণ ভার নেমে গেল! ইতি -তোমার শরৎ।” এবার ফিরে আসি চিঠি-পত্র’র কথায়। তাদের প্রণয় স্থায়ী হোক। দুজনে সুখে সংসার করুক। তাদের ফুটফুটে কন্যার নাম হোক পত্রলেখা।বাঙালির চিঠি পত্র লেখার অভ্যাস ফিরে আসুক।

2 Comments

  • দিলীপ চ্যাটার্জী

    Reply July 16, 2021 |

    খুুব সুন্দর ও গুছিয়ে লেখার একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছো ।
    ইতিহাস থেকে শুরু করে হিন্দি সিনেমা হয়ে আমাদের বর্তমান জীবনের ছবিগুলো জীবন্ত করে তুলতে সফল হয়েছে তোমার অনুভবি লেখনী ।
    আমাদের প্রবাসীদের কাছে পরিষ্কার বাংলায় এতো সুন্দর লেখা , খুবই বিরল ও আনন্দ দায়ক ।
    প্রদীপ , জানিনা তুমি প্রেমের বিরহ যন্ত্রনা’র সাথে চিঠি’র সুমধুর সম্পর্কের অনুভুতি কেন এর মধ্যে যোগ করলে না ।
    হয়তো তোমার জীবনে এধরনের অপেক্ষায় ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটানোর অনুভূতি হয়নি বা ছিল না ।

    আমাদের মত প্রবাসীদের তরফ থেকে তোমাকে অনেক প্রীতি , ভালোবাসা এবং অভিনন্দন জানাই ।
    দিলীপ দা

  • Gorachand Chakraborty

    Reply July 17, 2021 |

    খুব ভালো লাগলো।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...