গুচ্ছ কবিতা
চন্দ্রনাথ শেঠ

কাঁদেন চৈতন্য
[ “শূকর চড়ায় ডোম সেও কৃষ্ণ গায়” ]

কীভয় করেছে সারারাত : ‘কোথায় কেমন তোরা
রহিম-ফতেমা ?’ কেন ছাই হারাই হারাই এতদূর
এসে… কুরে খায় মনের আঙুল…গুজরাট
স্মৃতি-দাঙ্গা..মন্দিরের-রাম–জল গড়ায় গড়িয়ে
যাচ্ছে জলকামান…কোথা থেকে কোথা

হুসেনশাহি হাওয়া বয় স্বপ্নসম্ভব। ওমনি উঠেছে
দুলে গুয়া গাছ–বিশাল বাগান

সন ১৪৮০-র আকাশ : মালাধর বসু আজ উপাধি
পেলেন…
কালেন্ডার দুলে ওঠে হাততালি-হাওয়ায় –সাল ও
তারিখ : ‘চতুর্দশ দুই শকে হৈল সমাপন’

কৃষ্ণ-রহিম.. প্রাণনাথ নন্দের নন্দন…

ঘরের দেওয়াল ছেড়ে কুঞ্জে শত রাধা..ফতেমা
কি রাধা নয় ? বাজেন পায়ের বেড়ি শ্রীরাধা স্বয়ং
ঘরেঘরে কানকথা..শ্রীকৃষ্ণ বিজয়
কত শত কিৎ কিৎ ইকো হয় খেলা। মসজিদ

মিনারে ঠেকে—মেঘ-উত্তর উড়ে যায়

ছায়ামন্ডপ
[‘তোমারই নামের গুণে আগুন হয়ে যায় পানি’ ]

একটি মুখের চঞ্চলহুঁশিয়ারি–মেঘ ওল্টায়
মেঘকে ভাসায় ফের…

মেঘও তখন নীরবে ঢেকেছে মুখ ;
–কালোভুরুজোড়া…রুপোলি পাড়ের ঠোঁট…

ছায়ামন্ডপ। ‘ক-পা হাঁটা হল–গুনেছে পুরুত ঢের’

চোখ টসটসে : ‘আমি তবে আজ আসি…’ মেঘের
নিম্নে উতলা সে মেঘ ; — ভিজে
. বলে , ‘ভালোবাসি…’

‘পারু’-র সরোদ
[ “দেবদা, নদীতে কত জল। অত জলেও কি
আমার কলঙ্ক চাপা পড়বে না ?” ]

আর নীলাকাশ ? :
ঝোলে ব্যাবিলন ছাদ
. ‘—হাতে ডানা কেন কাটো, ওপরেই ?’
এখন শকুনও জানে পৃথিবীর কথা সব ‘তাকে
যত খুশি ডাকো ধরিত্রী..’ কলরবে

‘কী নীল কী নীল ছিল কিশোরীর ফিতে!’ শকুন
পাখায় ছাদ
সবাই ফিরছে কূলে–
. সমুদ্রের ওপারের ঢেউও…
কাশজ্যোৎস্নার চোখে জল। মধুসন্ত্রাসে ভিজে
যায় অপরাধ

. ‘কে, কাকে রেয়াত করে? রাষ্ট্র ! অন্য কেউ ? ‘
শরৎ-নভেল থেকে ঝিকিয়ে ওঠে দু-একটি ম্লান
রোদ

আমেরমুকুলগন্ধে আবারও বেজে ওঠে ‘পারু’-র
সরোদ…

থিয়েটার থেকে
চুটিয়ে খেলা।ধুলোও।জুলস্ ভার্ন।সুকুমার।তোলা
পাড়া। ফুলে ফুলে। সাদা-কালো। কানা থিয়েটার।

পাশাপাশি। কোলেতোলা। মুগ্ধবোধ অন্ধব্যাকরণ
‘লোচ্চা , ইতর’। তর্ক লোফালুফি। ঝড় ওঠে । সে
চরমক্ষণ এসে পড়েছে এবার।স্টেজে বাজ কালো
হয়ে যায় নায়িকা শরীর…

পানের বরোজ স্টেজে–শক্ত দেখানো। বাস্তবে
আদৌ। শান্ত নিরিবিলি। কে–ডিপফ্রিজ থেকে
জন্ম নিয়ে,–কার টিপে ধরছে গলাটি ? ঝুলে
পড়ে পানপাতা।
ফোঁটা দুই আলতার টিপ

এখানেই অন্তিম দৃশ্য ? দেখো যেন—
জানকীহরণ

গুঞ্জাফলে গাঁথা

ভয় আর হাহাকার হাত ধরে জাগে সারারাত। যেন
তারা এইমাত্র ফিরে এল নালন্দা থেকে। জাতিস্মর
হাওয়া বয় : গাত্রলিপি খসে পড়ে—পালিভাষা
আদ্যক্ষর। ফালাফালা করে দেয় ফসিল শরীর

খসে পড়া খোলা ঘোমটা। বৌদ্ধ-হাওয়ায় লালটিপ
হিউয়েং সাঙের পায়ে গড়াগড়ি খায়। তিনি খুঁজে

দেন বৌদ্ধজাতক। লাইব্রেরি থেকে সেরিবান-ফেরি
ওলা হেঁকে যায় : টিপপাতা..গুঞ্জা-নাকছাবি..
কানপাশা..মাথার কাঁকুই..। তখনও কী পাঠ্যক্রম:
‘কুঞ্জভঙ্গ’-কীর্তনের
পালা

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

11 Comments

  • Mausumi Chaudhuri

    Reply June 29, 2021 |

    খুব ভালোলাগল কবিতাটি…. ফালাফালা করে দেয় চিন্তার গভীর স্তর। 🙏

  • Antara Banerjee

    Reply July 1, 2021 |

    প্রতিধ্বনিত হয়ে চলুক এইসব লেখারা…

  • অর্পণ কর্মকার

    Reply July 1, 2021 |

    karmakararpan81@gmail.comখুব ভালো কবিতা,কবিকে ধন্যবাদ

    • অঞ্জন বর্মন

      Reply July 2, 2021 |

      প্রতিটি কবিতা মুগ্ধ করল। এক অনন্য কবিতাভাষার অধিকারী এই কবি ইতিহাস, দর্শন, যাপন, সংরাগের মিশেলে নির্মাণ করেছেন অনবদ্য কিছু কবিতা।

  • Utsab Sarka

    Reply July 1, 2021 |

    পাঁচটি হীরক-খন্ড!
    সমকাল, দেশ-দুর্দশা, ধর্মীয় হানাহানি ; আবার : প্রেম-প্রণয় আর আশার ঝলকানি।

  • Chandranath Seth

    Reply July 1, 2021 |

    প্রাণিত হলাম।
    ভালোবাসা।

  • Rakhi sardar

    Reply July 2, 2021 |

    এত নতুনত্ব কবিতা গুলো যে কি বলবো।কবি আদি কাব‍্যসাহিত‍্যের চালচিত্রে অনবদ্য আধুনিক কবিতা সৃষ্টি করেছেন।

  • Bibhas Saha

    Reply July 2, 2021 |

    চন্দ্রনাথ শেঠের কবিতা একই সঙ্গে অন্তর্মুখী ও হাহাকারময়। বহু অব্যক্ত বেদনা ভাষা পায়। কবি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যান অতীতে , আবার বর্তমানের ঘূর্ণিপাকে ফিরিয়ে আনেন মায়া ও মরমী বন্ধনে। তাঁর লেখার শৈলী একক ও অভিনব । অসাধারণ পাঁচটি কবিতা পড়লাম এখানে।

    • ভাস্কর হালদার

      Reply July 3, 2021 |

      দারুণ!কবি চন্দ্রনাথ শেঠের প্রতিটি কবিতা অসাধারণ।কবিতাগুলি পড়তে পড়তে আমিও মেদুর-বৃষ্টি ভেজা মেঘ..

  • Swapnakamal Sarkar

    Reply July 2, 2021 |

    প্রথাপ্রকরণ আর ভাবনা দুইই অভিনব। ভাল লাগল কবিতাগুচ্ছটি। শুভেচ্ছা!

  • Ranjusri Mandal

    Reply July 18, 2021 |

    অসাধারণ পাচঁটি কবিতা পড়লাম।প্রীতিটি
    কবিতা অভিনব ভাবনায় লেখা যা অন্তর
    ছুঁয়ে যায়।।
    শ্রদ্ধা ও একরাশ ভালোবাসা রইলো দাদাভাই।।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...