কোন এক দুঃখিনী রাজকন্যার পত্র
অদিতি ঘোষদস্তিদার


মাননীয় ডিজনী মুভি ‘পোকাহনটার’ পরিচালকদ্বয়,
আপনাদের এই চিঠি লিখতে বসেছে আপনাদের সিনেমারই নায়িকা, পোকাহনটা, যার নামে আপনাদের ছবিটি তৈরি করা। যদি বলেন কেন, তাহলে বলব – উদ্দেশ্য আপনাদের চোখের ঠুলিটা একটানে খুলে ছিঁড়ে ফেলা। ভাবছেন ব্যাপারটা কী তাই না? চারশো বছর আগে যে মেয়েটা ফৌত হয়ে গেছে – লোকে ভুলে গেছিল যাকে -তাকে তুলে এনে ছবি বানিয়ে সারা পৃথিবীর ঘরে ঘরে পৌঁছে দিলাম আমরা – তার এসব কথা কি সাজে?
সত্যিই তো! কে জানত বলুন আমার নাম? শুধু আমি কেন আমাদের গোটা দেশটার কথাই বা কে জানত? সাদা চামড়ার মানুষরা নাম না জানা এক জায়গা আবিষ্কার করল যেখানে শুধু বাস করে অসভ্য মানুষের দল। বসাল নতুন পৃথিবী -আপনাদের ভাষায় নিউ ওয়ার্ল্ড! ভুল করলেন ইন্ডিয়া বলে! আর আমাদের তামাটে রঙের মানুষদের নাম দিল অসভ্য রেড ইন্ডিয়ান বলে – তাই না?
আহা কী গল্পই না আপনাদের সিনেমার! সেই নতুন দেশের অসভ্য মানুষের দলের একটি মেয়ে, যে আবার খোদ রাজকন্যা, রেড ইন্ডিয়ান দলপতির মেয়ে, সে কী না প্রেমে পড়ল এক সাদা মানুষের -জন স্মিথের! সে কী গভীর প্রণয়!আর সেই অমর প্রেমের জন্যেই ঘটল এক যুগোত্তীর্ণ ঘটনা! স্বর্গ মর্ত্য পাতাল এক করে সেই মেয়ে ভাব করিয়ে দিল ইংল্যান্ড আর নেটিভ আমেরিকানদের!
আহা! দেখেও সুখ!
কিন্তু মশাইরা, আমার একটা প্রশ্নের উত্তর কি আছে আপনাদের কাছে? আর সব ডিজনি রূপকথার মত এই গল্পের শেষে প্রেমিক প্রেমিকার মিলন ঘটালেন না কেন বলুন তো? ওই যাকে বলে হ্যাপি এন্ডিং! দেন দে লিভ হ্যাপিলি এভার আফটার!
পারেননি তাই না? মিথ্যে গল্প ফাঁদলেও অতটা মিথ্যে বোধহয় আপনাদেরও ধর্মে সইত না!
যাকগে! আচ্ছা বলুন তো মশাই, সত্যিটা কি আপনাদের একেবারেই অজানা ছিল?
অবশ্য জানলেও আপনারা কি আর আমায় সে কথা বলবেন? তাহলেই তো ব্যবসা লাটে। কোটি কোটি ডলারের সিনেমার ব্যবসা বলে কথা, তার ওপর তার সঙ্গে লেজুড় আনুষঙ্গিক। পোকাহনটার পুতুল ঘরে ঘরে।
আপনার বাচ্চা মেয়েটা বোধহয় রাতে ঘুমোয় আমাকে জড়িয়ে -তাই না ? এরকম আরো কত কত দেশবিদেশের বাচ্চা মেয়েরা!
আমারও ওই রকম একটা ছোটবেলা ছিল জানেন! বড্ড আদরের ছোটবেলা! যা কেটেছিল আপনাদের এখনকার ভার্জিনিয়া স্টেটে। আমাদের ভাষা ছিল অ্যালগনকুইন। নামটা খুব চেনা তাই না? এই নামের হোটেল, মল আরো কত কিছু যে বানিয়েছেন আপনারা! অথচ সে ভাষাভাষী মানুষদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাটুকু কোনদিন করেননি। যাক সে কথা!
আমার আসল নাম কিন্তু পোকাহনটা নয়, বাবা মা আদর করে নাম দিয়েছিলেন আমন্যুতে। কিন্তু জানেন কেন আমাকে লোকে পোকাহনটা বলত? ওই যে আপনারা যেমন বিনুনি দোলান লাফানি ঝাঁপানি করা মেয়েটাকে আদর করে দুষ্টু বুড়ি বলেন – ঠিক তেমনি। পোকাহনটা মানে আমাদের ভাষায় প্রাণচঞ্চল। সত্যিই আদরের কমতি ছিল না আমার। হবে নাই বা কেন বলুন? যার বাবা তিরিশটারও বেশি উপজাতি দলের মাথা, পঁচিশ হাজারেরও বেশি লোকের নেতা – তার মেয়ের কদর হবে না?
জীবন ছিল পালকের মত হালকা! কিন্তু হায়! ভবিষ্যৎ কি কেউ দেখতে পায় বলুন? কতটা ভয়ঙ্কর যে সেটা হতে পারে তার বিন্দুমাত্র ধারণাও সেই চঞ্চলা বাচ্চা মেয়েটির তখন ছিল না! আচ্ছা, এখন থাক সে কথা! পরে আসছি একে একে!
কী যেন বলছিলাম, ও হ্যাঁ, আমার ছোটবেলার কথা। সেই সাত আট বছর বয়েসেই তো প্রথম জন স্মিথকে দেখলাম!কী ভয়ঙ্কর সেই রাত! আজও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়!
আচ্ছা, সিনেমার গল্প আপনারা যেমন ইচ্ছে ফাঁদুন ক্ষতি নেই, তবে ইতিহাস নিয়ে ছবি করলে একটু তো বুঝেশুনে করবেন নাকি? অবশ্য আপনাদের ইতিহাস তো সাদা মানুষের লেখা -আমাদের কথা তো সুবিধেমত পালটে নিলেই হয় -তাই না? তাই সাত বছরের খুকি আমিকে হাবুডুবু খাইয়ে দিলেন ৩০ বছরের বুড়ো হাবড়া জন স্মিথের প্রেমে! একটুও বাধল না আপনাদের?
পেলেন কোথায় এ অসম্ভব কাহিনী? স্মিথের বইতে? স্মিথ তো অনেককিছুই আবোলতাবোল লিখে গেছে ওর বইতে। সে ও লিখতেই পারে গল্প। কিন্তু দাবি করেছে সেগুলো সত্যি বলে – এটাই আমার আপত্তির কারণ।।
কেন বলছি স্মিথ গল্পের গরু গাছে তুলেছিল, একটা নমুনা দিচ্ছি দাঁড়ান, তারপর আসল কথায় আসছি।
স্মিথ ওর বইতে লিখেছে ও নাকি মৎস্যকন্যা বা মারমেইড দেখেছে! কি করে আপনাদের সভ্য আধুনিক দুনিয়া একথা বিশ্বাস করল? আসলে ও কী দেখেছিলো জানেন, মানাতে (manatee), বা সমুদ্রগাভী! দেখেছেন তাদের কখনও? হয়ত নয়। ওদের তো আপনারা মেরে মেরে শেষ করেই দিয়েছেন!
অমন অবান্তর গপ্পো যে ফাঁদতে পারে, সে নিজেকে হিরো বানাবে তার নিজের লেখা বইতে -এ আর বিচিত্র কী বলুন?
জন রাতের অন্ধকারে আমাদের সবার ঘরে ঘরে গিয়ে উঁকি মারত- হাতে আধুনিক অস্ত্র। আগুন ছোটে নল দিয়ে। তাই নিয়ে ও ঘরে ঘরে ঢুকে গোপনে মারত আমাদের, ধরা পড়ে গেল একদিন। সেই দিনটায় কী ভয়ই না পেয়েছিলাম বন্দুক হাতে জনকে দেখে!
আপনারা দেখিয়েছেন জনের জীবন আমি বাবার হাতে পায়ে পড়ে রক্ষা করেছিলাম। একেবারেই বাজে কথা! আমার কেন, বাবা সিদ্ধান্ত নিলে কারুরই ক্ষমতা ছিল না তার অন্যথা ঘটানর।
জন কেন বেঁচে গেল জানেন? স্পেনের লোকেরাও তখন আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, আঘাতে আঘাতে আমরা জর্জর। জন ছিল ব্রিটিশ, স্প্যানিশরা ওদেরও শত্রু। তাই বাবা আর শত্রু বাড়াতে চাননি. তবে জনকে কিছুদিন আটকে রাখা হয়েছিল। দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল আমার। এই ভাবেই আমরা দুজন দুজনের ভাষা শিখতে শুরু করি।
মন্দ লাগত না আমার। বেশ মনে আছে, সে বছর গাছের পাতাগুলো যখন রঙিন হয়ে আসছে, শীত প্রায় আসি আসি, ওই যে সময়টাকে আপনারা এখন ফল সিজন বলেন, আমি একটা করে ইংরেজি বাক্য বলছি, জন বলছে আমাদের ভাষায়।
এর কিছুদিন পর আমার বাবা দলপতি অহানসনেকা জনকে সাদা মানুষদের নেতা হিসেবে ঘোষণা করলেন। শান্তি স্থাপিত হল দুদলে।
ইংরেজরা ঘাঁটি গাড়ল ভার্জিনিয়ার জেমসটাউনে। আমাদের বাড়ি ঠিক প্রায় ১২ মাইল দূরে। মাঝে বিরাট নদী। জন লিখেছে আমি নাকি রোজ ওদের খাবার দিয়ে আসতাম, একটা বাচ্চা মেয়ে রোজ বারো বারো চব্বিশ মাইল যাতায়াত করছে আবার নিজে নৌকো বেয়ে-এ কথা বিশ্বাস হয় কী করে আপনাদের বলুন তো? কেন বললাম এ কথা! যাতে আপনারা বোঝেন কত কত মিথ্যা দিয়ে সাজান হয়েছে আমার জীবনটাকে!
এরপরে যে কথাগুলো বলব সেগুলো শুনতে আপনাদের ভাল লাগবে না! এগুলোর কিছুই তো আপনাদের রূপকথার সিনেমায় নেই!
আমার জীবনে প্রেম সত্যি এসেছিল জানেন! বিয়ে করেছিলাম ভালোবেসে, কুকোমকে – আপনারা যাকে ভিলেন দেখিয়েছেন ছবিতে, সেই ছিল আসলে আমার ভালোবাসার মানুষ। মেয়ে হল আমাদের একটি। শান্তির জীবন। কত আশা, স্বপ্ন মনে সেই গাঁয়ের বধূটির।
আমার বিয়ে হয়েছিল জেমসটাউনের কাছাকাছি। তাই সাদা মানুষদের অত্যাচারী নৃশংস চরিত্রটা আমার কাছে ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছিল।
গরমকালে আমরা স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াতাম-এটাই রীতি ছিল। প্রকৃতির সন্তান আমরা। খোলা আকাশের মত আমরাও ছিলাম উন্মুক্ত । কিন্তু সভ্য সাদা মানুষরা আমাদের নগ্ন দেখেই হয়ে গেল কাম পিশাচ। শুরু হল ব্যভিচার, অগুনতি ধর্ষণ।
আপনাদের কাছে আমরা অসভ্য, কিন্তু আমাদের সমাজে কিন্তু মেয়েদের সম্মান ছিল খুব বড়ো। মেয়েদের অসম্মান করা ছিল অমার্জনীয় অপরাধ। আর ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যু!
আমরা মরিয়া হয়ে উঠলাম। বাবা আমাকে সব রকম শিক্ষা দিয়েছিলেন, আমি অস্ত্র শিক্ষায় ছিলাম নিপুন। সাদা লোকেদের ধর্ষণের শাস্তি পেতেই হবে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি নিজেই নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম। যুদ্ধ প্রায় বাধে বাধে।
এই সময় ওরা আমাকে অপহরণ করল। আমার কোলে ছোট্ট মেয়ে। ভয় দেখাল ওকে মেরে ফেলবে। আমি গ্রামের লোকেদের কাছে মেয়েকে ফেরত দিয়ে বললাম কিছুদিনের মধ্যেই আমি ফিরে আসব। জানতাম, ওরা আমাকে সহজে ছাড়বে না , কিন্তু আমার সেই মুহূর্তে কিচ্ছু করার ছিল না, ভেবেছিলাম বাবা পরে এসে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবেন। জানেন কি আপনারা, আমি আর কোনদিন আমার মেয়েটাকে দেখতে পাইনি!
সাদা লোকেরা আমার আত্মীয়দের কী বুঝিয়েছিল ঠিক জানি না।
পরে জেনেছি ওদের বোঝান হয়েছিল কিছুদিনের মধ্যে আমাকে ফেরত দিয়ে দেওয়া হবে। সরল মন আমার আপনজনেদের, লোকের মুখের কথা যে মিথ্যে হয় সেটা ওদের তখনও জানা ছিল না। তাই কেউ ব্রিটিশদের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারেনি।
সাদা লোকেরা ওদের জাহাজে আমাকে বন্দি করে রাখল। শুরু হল আমার বিষময় জীবন। রোজ রাতে ধর্ষণ। সে যে কী অমানুষিক ব্যাপার তা আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না!
এর মধ্যেই ওরা আমাকে ধর্মান্তরিত করে দিল। আমার নতুন নাম হল রেবেকা!
এই বার আমি সভ্য মানুষের উপযুক্ত হলাম – ওদের মতে!
বাবা বা অন্যরা কী ভেবেছিলেন জানি না, শুধু একটা লোক মেনে নিতে পারেনি আমার এই অপহরণ। কে জানেন? আপনাদের ছবির যে ভিলেন! হ্যাঁ আপনারা দেখিয়েছেন তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। ভিলেনের তো মৃত্যু হতেই হবে-তাই না? কিন্তু ও ছিল আমার প্রিয়তম, আমার স্বামী! আমার চোখের সামনেই ওরা তাকে নৃশংস ভাবে মেরে ফেলল।
একটু কি কষ্ট হচ্ছে, না কি ভাবছেন কী হবে এই অসভ্য মেয়ের ঘ্যানর ঘ্যানর শুনে।!আপনারা যখন খুশি
ফেলেও দিতে পারেন এ চিঠি ডাস্টবিনে, কিন্তু আমি আমার কথা শেষ করবই।
কুকোমের মৃত্যুর পর আমি অন্নজল ত্যাগ করলাম। মরে যেতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু সাদা লোকগুলোর মনে ছিল অন্য অভিসন্ধি। তাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা ওরা চালাল। খবর দিল আমার বোনকে। যদি আমাকে বোঝাতে পারে।
বোন আসল। সব জানল। আমার অভিমান আছড়ে পড়ল। জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা কি আমাকে একেবারেই ভুলে গেছেন?” জানলাম, অনেক কথাই বাবার কানে ঠিকঠাক পৌঁছায়নি।
তখন তো এমন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ নয় মশাই। বুঝলাম আমি সব… সাদা মানুষরাই বুঝিয়েছে আমি নিজের ইচ্ছেয় ভালোবেসে আছি এখানে, যা আপনি ছবিতে দেখিয়েছেন, আমার প্রেম!
মজার কথা কী জানেন? জন স্মিথ তখন ত্রিসীমানায় নেই, আর আমি শয্যাসঙ্গিনী বিভিন্ন ব্রিটিশ ক্যাপ্টেনের।
বোনের কাছে খবর পেয়ে বাবা এলেন দলবল নিয়ে আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে। ভীষণ যুদ্ধ শুরু হল। বলাই বাহুল্য আমার আপনজনেরাই মারা গেল বেশি। বন্দুক আর কামানের কাছে তীরধনুক আর কত যুঝবে?
বাধ্য হয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করে আমি বললাম ফিরে যেতে, এই রক্তনদী আমি আর দেখতে পারছিলাম না।
আমি তখন মা হতে চলেছি। তবে সে সন্তান কার আমি জানি না। বাবাকে আমি বোঝালাম আমি নিজেই থাকতে চাই এখানে, ইংল্যান্ডে যেতে চাই আমার সন্তানের সুখ সুবিধে পাবার জন্যে।
বাবা ধিক্কার দিয়ে ফিরে গেলেন। আমার শেষ আশাটা নিজের হাতে গলা টিপে মেরে ফেললাম। এ ছাড়া আর কিচ্ছু করার ছিল না যে আমার।
এইবার টের পেলাম আসল পরিকল্পনার। জেমসটাউন তখন বড় বাণিজ্যকেন্দ্র। ইউরোপে যাতায়াত চলছে বাণিজ্য জাহাজের। তামাকের ব্যবসা। রমরমা অবস্থা। এবার রাজদরবারে দেখাতে হবে স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে কী অপরিসীম দক্ষতায় কাজ হচ্ছে জেমসটাউনে!
তাই ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হল আমাকে। ও হ্যাঁ তার আগে আমাকে বিয়ে দেওয়া হল জন র‍্যালফের সঙ্গে। হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক ই পড়ছেন, জন র‍্যালফ, স্মিথ নয়। সে কে জানেন? সে হচ্ছে আমাকে নিয়ে রাতের পর রাত যারা ফুর্তি করত তাদেরই একজন। র‍্যালফের গলায় লটকে দিল আমায় বাকিরা। একটা বিয়ে না দেখালে মহান রাজপরিবারে কী করে মুখ দেখাবে বলুন? রক্ষিতা বলা কি চলে?
বাবার কাছে খবর গেল বিয়ের। বাবা মুখ দেখেননি আমার। কিন্তু পাঠিয়েছিলেন বড় বড় মুক্তো দিয়ে তৈরি করা একটা মালা । সেটা বুকে ধরে খুব কেঁদেছিলাম জানেন তো! আমার সেই প্রথম বিয়ের কথা বড্ড মনে পড়ে যাচ্ছিল!
আমি পৌঁছলাম ইংল্যান্ডে। লোকে কাতারে কাতারে দেখতে এল। গ্রামের মেয়ে ভালোবেসে নিজের ধর্ম বদলে সুদূর ইউরোপে এসেছে পতিব্রতা হয়ে, কম কথা? চারদিকে জানান হল আমিও এক রাজকুমারী। ভালবেসে সব ছেড়েছি। আমার প্রেম গাথা দিকে দিকে ছড়িয়ে গেল। কেমন সুন্দর গল্প না? আর একটা ছবি করতে পারেন কিন্তু –বাজারে কাটবে ভালো।
বিরক্ত হয়ে যাচ্ছেন তো -ভাবছেন শেষ কোথায় এই চিঠির?
আর বেশি বাকি নেই। আমার জীবনই তো ফুরিয়ে এল। দীর্ঘ দিনের অনিয়মে শরীর ভেঙে এসেছিল। বছর পাঁচেক কাটল এইভাবে। শান্তি তখন জেমসটাউনে। সুসম্পর্ক না কী আমাদের সঙ্গে ব্রিটিশদের। এইসব কথা কানে আসে আমার। আমি চাইলাম ফিরে যেতে আমার নিজের গ্রামে, ভার্জিনিয়ায়। রাজি হল সবাই- বড় একটা পার্টি দিল. কিন্তু সেই ভোজে খাবার পরই পেটে অসহ্য যন্ত্রনা। শেষ হল আমার জীবন। মৃত্যু শিয়রে যখন, আমি বুঝলাম আসলে ওরা কিছুতেই আমাকে ফিরে যেতে দিত না , সত্যিটা বেরিয়ে যাবে বলে!
আমার বাড়ির লোক চেয়েছিল আমার সমাধি ভার্জিনিয়ায় থাক। কিন্তু তাও হল না! আমার সমাধি হল ইংল্যান্ডেই। কেন্টের গ্রেভসেন্ডে। হবে না! নয়ত লোককে জানাবে কী করে বলুন, আমার অমর প্রেমের কাহিনী! সেই জায়গা হয়ে গেলো টুরিস্ট স্পট! বানাল আমার ব্রোঞ্জের স্ট্যাচু! আর এখন আপনাদের সিনেমা বেরোবার পর হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমাচ্ছে সেখানে পোকাহনটাকে দেখতে!
আপনারা কি কোনদিন গেছেন সেই সমাধির কাছে? এক গ্রামের আদুরে মেয়ে পোকাহন্টার আশা স্বপনের সমাধি হয়েছে যেখানে? কে জানে আপনারা হয়ত আমার জীবনের বাকি অংশের কোনদিন খোঁজই নেননি! আপনাদের পোকাহনটা তো সিনেমায় জনের বিরহিনী হয়ে ভার্জিনিয়াতেই রয়ে গেল! হায় রে! কী বিকৃতি ইতিহাসের!
ভাবছেন এত কথা আপনাদের বলে কী লাভ আমার তাই না? তা ঠিক। কিন্তু সত্যি বলতে কী একটু কৃতজ্ঞতা যে আপনাদের কাছে আমার নেই তা নয়।
একথা ঠিক আপনাদের জন্যেই সারা পৃথিবীর মানুষ পোকাহনটা বলে যে একটা মেয়ে ছিল – সে কথা জানল। আমার নিজেদের লোকেরা আমাকে কোনদিন ভুলে যায়নি। লেখা ইতিহাস তো নেই- কিন্তু বংশানুক্রমে তারা আমার জীবনের কথা, আমার দুঃখগাথা গেয়ে যায়. চোখের জল ফেলে আমার কষ্টকর জীবনের কথা ভেবে। কিন্তু তারা আর কজন বলুন? আপনারা সভ্য মানুষরা কি তাদের বাঁচতে দিয়েছেন? আস্তে আস্তে তারা অবলুপ্তির পথে। তবে, আপনার এই মিথ্যে ইতিহাসের ছবি কিন্তু অনেক মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছে – জানিয়েছে আমার কথা। নতুন যুগের অনেক ছেলে মেয়ের মনে প্রশ্ন উঠেছে-সত্যি কে ছিল এই পোকাহনটা! তারা খোঁজ নিচ্ছে আমার আপনজনদের উত্তরপুরুষের কাছে – তুলে আনছে আসল ইতিহাস। চলছে গবেষণা। আমার স্থির বিশ্বাস একদিন আপনাদের মানে সাদা মানুষের লেখা এই ইতিহাস মিথ্যে বলে প্রমাণ হবে- মানুষ সত্যিটা জানবে আর ঘেন্না করবে সেই অত্যাচারীদের। এই মিথ্যা ঘটনায় সাজান ছবি বাননোর জন্যে সেদিন আপনারাও কি রেহাই পাবেন গণরোষের হাত থেকে?
ভেবে দেখবেন। সাবধান বাণী জানিয়ে রাখলাম।
ইতি
এক লুপ্তপ্রায় উপজাতির রাজকন্যা পোকাহনটা।

লেখিকার মন্তব্যঃ ১৯৯৫ সালে ডিজনি মুভি ‘পোকাহনটা’ মুক্তি পায়। মুক্তি পাবার সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি প্রবলভাবে বিতর্কিত হয়। শুরু হয় নানা ধরনের গবেষণা, সত্য ইতিহাস অনুসন্ধানে। তারই ভিত্তিতে এই চিঠি লেখা।

2 Comments

  • Srabani Akilla

    Reply June 28, 2021 |

    khub bhalo laglo pore..sotyi e sundor chithi ..

  • PRABIR GANGULY

    Reply June 28, 2021 |

    অসাধারণ, সেই সুদূরের অচেনা রাজকন্যার কাহানি।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...