কবুতরের পায়ে বাঁধা এক টুকরো আশমান
তুষ্টি ভট্টাচার্য



   ‘কবুতর যা, যা, যা…কবুতর যা, যা, যা’, চিঠি বললেই অবধারিত ভাবে মনে পড়ে আমাদের সময়ের হিন্দী সিনেমার জনপ্রিয় গানের এই লাইনটি। আর মনে হয়, কল্পনার দেশের কোন বাদশা তাঁর গোপন কেল্লা থেকে পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে উড়িয়ে দিচ্ছেন। সেই পায়রাও রাস্তা চিনে চিনে চিঠি পৌঁছে দিয়ে আসছে নির্দিষ্ট ঠিকানায়। আজকাল এই রকম একটা ফ্যান্টাসির দেশেই বোধহয় বাসস্থান হয়েছে সবধরণের ব্যক্তিগত চিঠির। যদিও আমাদের ছোটবেলাতেও আত্মীয়স্বজনের চিঠি আসত বাড়িতে। ভুল বানানে প্রেম পত্র লেখেনি এমন প্রেমিক/প্রেমিকা খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। আজকের ছোটরা বা বড়রাও কি আর সেভাবে চিঠি লিখে ডাকে পাঠায়? মেসেজ বা হোয়াটস অ্যাপেই আপামর বিশ্ববাসী অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বড় লেখা লিখতে মেল করে অনেকে। চিঠি বলতে বেঁচে আছে বিভিন্ন দপ্তরের কাগুজে ফরমানগুলি। আজকাল সেসবও মেল চালাচালি করে মিটে যায় অনেকাংশে। চিঠি এখন স্মৃতিতে বাস করে।

        
    অথচ প্রাচীন কাল থেকেই যে, চিঠির ব্যবহার ছিল ইলিয়াডে তার উল্লেখ আছে। হিরোডোটাস ও থুসিডাইডিসের রচনাবলীতেও আমরা সে কথা পাই। ঐতিহাসিকভাবে, চিঠির প্রচলন ছিল প্রাচীন ভারত, প্রাচীন মিশর, সুমের, প্রাচীন রোম, এবং চীনে। সতের ও আঠারো শতকে চিঠি লেখা হতো স্ব-শিক্ষার জন্য। বাইবেলের বেশ কিছু পরিচ্ছদ চিঠিতে লেখা। ব্যক্তিগত, বাণিজ্যিক বা কূটনৈতিক চিঠির পাশাপাশি চিঠির শিল্পগত ভাবে সাহিত্যপদবাচ্য হয়ে ওঠার নজির আমরা অনেক দেখেছি।  শুধু তো ওই সিনেমার মতো প্রেম পত্র নয়, সুশিক্ষিত কবুতরের ব্যবহার প্রচলিত ছিল ব্যক্তিগত মেসেঞ্জার বা দূত হিসেবে। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতির কাছে পর্যন্ত কবুতরের পায়ে বেঁধে পৌঁছে দেওয়া হত গুপ্ত সংবাদের চিঠি।

  তবে চিঠির কথা উঠলেই সব থেকে আগ্রহোদ্দীপক মনে হয় গোপন, নিবিড়, ভালোবাসা-জারিত, কামনা-ব্যাকুল, অভিমানী, মিলনোন্মুখ এবং বিরহমথিত সব প্রেমপত্র। আর সেসব যদি হয় কোনো বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা শিল্পী, কবি/সাহিত্যিক, সিনেমা স্টার, খেলোয়াড় অথবা সাধারণের মধ্যে থাকা অসাধারণ কোনো ব্যক্তির তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের কৌতূহলের মাত্রা বেড়ে যায় আরও বেশি করে। আজ দেশ-কাল-ভাষা নির্বিশেষে তেমনই কিছু ভালোবাসার চিঠির নমুনায় চোখ বোলানো যাক।  

   প্রথমেই দেখে নিই, চার্লি ইয়ামসের লেখা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ বিয়ের প্রস্তাব সম্বলিত চিরকুটটি।
‘আমি এখন চৌত্রিশের কোঠায় দাঁড়ানো তোমার মায়াময় রূপের বাঁধনে বুক ভাঙা এক পাগল যুবক। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। এতটাই উন্মত্ত আমার এ ভালোবাসা যা এখন চূড়ান্ত পরিণতির প্রহর গুনছে ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে। আমার এ দরিদ্র ভালোবাসা হয়তো তোমাকে রাজপ্রাসাদের সুখ গড়ে দিতে পারবে না, তবুও আমৃত্যু চেষ্টা করে যাবে তোমার মুখের হাসি অম্লান, অক্ষত রাখতে। হে প্রেয়সী, দেবে কি আমাকে সে সুযোগ, তোমার অনামিকায় আমার দেওয়া আংটি পরাতে? তোমার অনামিকার আংটির মাপই আমার স্বপ্নের উত্তর।
উত্তরের প্রত্যাশী।তোমারই অনেক অনেক ভালোবাসার চার্লস।’

   ফ্যানি ব্রনকে দেওয়া জন কিটসের ভালবাসাময় অপেক্ষার প্রেমপত্রে তরুণ প্রেমিকের কী নিবিড় আর্তি।
‘আমার মিষ্টি ভালোবাসা,আগামীকাল তোমার মোহনীয় মুখখানা দেখার পূর্ব মুহূর্তের প্রতিটি সেকেন্ড ছিল এক একটি যুগের অপেক্ষার মতোই ধৈর্য্য পরীক্ষা।তোমার সৌন্দর্যের আবছায়া যেন আমার অনুভবেই গড়া। তোমার ভালবাসার আবেশ যেন আমার সমস্ত হৃদয়কেই চুরি করা।
আমার প্রিয় ফ্যানি, ভালোবাসা রইলো। তোমারই, জে. কে.’

  ১৮১৯ সালের আগস্ট মাসে তেরেসাকে দেওয়া কবি লর্ড বায়রনের প্রেমপত্রে আমরা পাই কাব্যিক চিত্রকল্প।
‘প্রেমময়ী,
আমি তোমার মনের বাগানে ঘুরে ঘুরে তোমারই অনুভূতির ডানায় চড়ে বেড়িয়েছি। কারণ আমি তোমায় ভালোবাসি, আমি বুঝে নিয়েছি তোমার বাগানকোণে আমার প্রতি জমানো তোমার ভালোবাসা। শুধু মুখের আগল খুলে একবার বল, আমায় ভালোবাসো! সে কথা শোনার অপেক্ষার প্রহর গুনছি।
তোমারই প্রিয়।’

   থেরেসাকে লেখা বায়রনের আরেকটি অসাধারণ চিঠি — ‘প্রিয় থেরেসা, তোমার আবেগকে যে ভালোবাসবে তাকে তুমি চিনবে। তুমি ঐশ্বরিক হবে এই ভেবে যে, সে কেবলই তোমারই চিন্তা করে। যে শব্দটি সব ভাষায় সুন্দর ‘আমর মিও’(ভালোবাসি), তোমাকে ভালোবাসি এবং তুমিও আমায় ভালোবাসো। তবে আমি তোমার চেয়ে বেশি ভালোবাসি, তুমি এ ভালোবাসা বন্ধ করতে পারবে না। আল্পস ও সমুদ্র বিভক্ত ঠিকই, কিন্তু তারাও চাইবে না যদি তুমি না চাও।’


  ভেলেরিয়া আরসেনাভকে দেওয়া লিও টলস্টয়ের প্রেমপত্রে পাই আনুগত্যের অঙ্গীকার।
‘প্রিয়ন্তি,
আমি তোমার সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত, বিমোহিত। আমার এ ভালোবাসা অপার্থিব। পৃথিবীর কোনো কিছুই টলাতে পারবে না আমার এ ভালোবাসাকে। পৃথিবীর কোনো কিছুই সহজলভ্য নয়। সেরূপ তোমার প্রতি আমার প্রেম বন্দনা ও আমার সাধনা।
তোমারই লিও’

  পৃথিবীর  শ্রেষ্ঠ সুরস্রষ্টাদের একজন বেথোভেন। ১৮১২ সালের জুলাই মাসে তিনি ‘ইম্‌মরটাল বিলাভেড’ সম্বোধনে নামহীন একজনকে প্রেমপত্র লেখেন। ধারণা করা হয়, এই ‘অমর প্রিয়তমা’ হলেন তৎকালীন এক কূটনীতিকের মেয়ে। বেথোভেনের মৃত্যুর পর চিঠিটি উদ্ধার করা হয়। ‘…
হে অমর প্রিয়তমা আমার,

তোমাকে নিয়ে আমার যত ভাবনা, আমার হৃদয়ের আকুলতা, সব আনন্দ এবং সব মনোবেদনা, আমি সেই সৌভাগ্যের অপেক্ষায় আছি যে কি-না আমাদের কথা শুনবে। আমাকে হয়তো তোমার সঙ্গে কিংবা একাই বাঁচতে হবে কিংবা এর কোনোটাই নয়। হ্যাঁ, আমি শুধু তোমার কথা ভেবেই ওই দূরদূরান্তে একাকী ঘুরে বেড়িয়েছি, যতক্ষণ না আমি তোমার বাহুডোরে আশ্রয় পাচ্ছি, ঘরের শান্তি পাচ্ছি। আমার অনুশোচনা হচ্ছে। হ্যাঁ, আমার সেটা হওয়াই উচিত, আমি কেন আমার আত্মাকে খামবন্দি করে তোমার কাছে, যেখানে প্রাণের রাজত্ব, সেখানে পাঠাতে পারছি না। আমার হৃদয় তোমার প্রতি অনুগত, এই বিশ্বস্ততা সম্পর্কে খুব শিগগির তুমি জানতে পারবে যে, তুমি ছাড়া আর কেউ কখনোই আমার হৃদয়ে স্থান পাবে না, কখনোই না, কখনোই না। হে ঈশ্বর, কেউ যখন কাউকে এত ভালোবাসে, সে তখন কীভাবে তার কাছ থেকে এত দূরে থাকতে পারে! এই পৃথিবীতে আমার জীবন এখন যেন দুর্দশায় পীড়িত। তোমার ভালোবাসা একই সঙ্গে আমাকে সবচেয়ে সুখী এবং সবচেয়ে দুঃখী করে তোলে। আমার জীবনে প্রয়োজন একাগ্রতা, ধারাবাহিকতা- কিন্তু আমাদের এই অবস্থার ভেতর তা কি আছে? হে আমার পরী, প্রতিদিন ডাকবাক্স খোলা হয়, আবার বন্ধ হয়ে যায়- আমার চিঠিটি তুমি যে কোনো সময় পেয়ে যাবে, আমাকে ভালোবেস আজ-গতকাল।

তোমার জন্যই আমার চোখের অশ্রু- তুমি, শুধুই তুমি। হে জীবন আমার- আমার সব ইচ্ছাও তুমি। আমাকে ভালোবেসে যাও- কখনও আমার ভালোবাসায় সন্দেহ করো না, হে আমার ভালোবাসা।

ভালোবাসা সবকিছুরই দাবীদার। সে দাবীর দোহাই রেখেই বলছি- আমি শুধুই তোমার, আর তুমিও কেবলই আমার।
তোমারই
বেটোফেন’



 মেক্সিকোর জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো। সৃজনশীল জগতের এক বিস্ময়। জীবন ও সৃষ্টিকর্মকে এনেছেন অনন্য যোগসূত্রে। রঙ-তুলির এই কারিগর জীবনে নানা সমস্যায় পড়েন। ছেলেবেলার দুঃসহ দুর্ঘটনার স্মৃতি, মা হতে না-পারার অতৃপ্তি, জন্ম-মৃত্যুর ভাবনা এবং প্রিয়তম শিল্পী দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের নানা দ্বন্দ্বমুখর সম্পর্কের বেড়াজালে জীবন কাটিয়েছেন। অসাধারণ এই চিত্রকর ফ্রিদা কাহলোর দিয়েগোকে লেখা চিঠি পড়া যাক।
‘দিয়েগো, 



  তোমার চোখের সবুজ-সোনালি আভার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না, তোমার হাতের মতো হাতও আর নেই। দিন দিন তুমি পূর্ণ হচ্ছো আমার শরীরে। তুমি রাতের আয়না। তুমি বজ্রপাতের তীব্র চমক। তুমি পৃথিবীর আর্দ্রতা। তোমার দুই বাহুর মধ্যখান আমার আশ্রয়। আমার আঙুল যেন স্পর্শ করে তোমার রক্ত। তোমার বসন্তের ফুলের ফোয়ারা আমার স্নায়ু পরিপূর্ণ করে রাখে, যা আমার জীবনের আনন্দ, আমরা পথ চলার পাথেয়, এসব শুধুই তোমার।
  দিয়েগো, সত্য এত মহান যে, আমি কথা বলতে, শুনতে এবং ঘুমোতে তোমায় ভালোবাসতে চাই না। না পাওয়ার যন্ত্রণা আমার হৃদয়ের মারাত্মক ফাঁদ মনে হয়। হয়তো তুমি বলবে এসব নিছক পাগলামি। তবে আমি জানি, তোমার নীরবতা আমার জন্য কেবল বিভ্রান্তিই হবে। আমি তোমাকে আঁকতে চাই। কিন্তু এমন কোনো রঙ আছে কী! কারণ এটা আমার ভালোবাসার বাস্তব রূপ।


তোমার ফ্রিদা।’


   বিখ্যাত আমেরিকান কাউন্ট্রি সঙ্গীতশিল্পী জনি ক্যাশ প্রেমে পড়েন আরেক বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী, লেখক, অভিনয়শিল্পী জুন কার্টারের। কয়েক বছর মন দেওয়া-নেওয়ার পর তারা বিয়ে করেন ১৯৬৮ সালে। জনি এই চিঠিটি লেখেন জুন মাসের ২৩ তারিখ জুন কার্টারের কোনো এক জন্মদিনে। ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি মেইলের জরিপে পাঠকের ভোটে সর্বকালের সেরা প্রেমের চিঠি হিসেবে এটি মনোনীত হয়।

‘শুভ জন্মদিন রাজকুমারী,



   আমরা দিন দিন যেমন বুড়ো হচ্ছি, তেমনি একে অন্যের প্রতি অভ্যস্তও হয়ে উঠছি। আমরা একই রকমভাবে চিন্তা করি। আমরা একে অপরের মনের কথাও পড়ি। অন্য সবাই কী চায়, সেটা আমরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বুঝতে পারি। অল্প হলেও মাঝে মাঝে আমরা বোধহয় একজন আরেকজনকে বিরক্তও করি। কখনও কখনও হয়তো আমরা মেনেও নেই সেসব। যখন আমি তোমার কথা ভাবি, নিমগ্ন চিত্তে আজ যেমন ভাবছি, তখন উপলব্ধি হয়, সত্যিই আমি কতই না ভাগ্যবান, তোমার মতো মহৎ হৃদয়ের একজনের সঙ্গে আমি আমার জীবন ভাগ করে নিতে পারছি। তুমি সব সময়ই আমাকে অনুপ্রাণিত করো, আমাকে মুগ্ধ করো। তুমি আমাকে ভালোর দিকে প্রভাবিত করো। এই পৃথিবীতে আমার অস্তিত্বের একমাত্র কারণ তুমি, তুমি আমার কামনার একমাত্র লক্ষ্যবস্তু। আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি। হে রাজকুমারী, তোমাকে আবারও জন্মদিনের শুভেচ্ছ জানাই।



        জনি…’


   নেপোলিয়নের মতো তুখোড় যোদ্ধা কী করে একজন অসাধারণ প্রেমিক হতে পারেন সেটা তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে লেখা চিঠি না পড়লে বোঝা অসম্ভব! তিনি প্রায় ৭৫ হাজার চিঠি লিখেছেন যার বেশির ভাগ ছিল যুদ্ধের ময়দান থেকেই জোসেফিনকে(পরবর্তীতে তার স্ত্রী)দেওয়া। একজন যোদ্ধার মনেও যে কী পরিমাণ প্রেম থাকতে পারে তার প্রতীক বহন করে এই চিঠিগুলো।
‘জোসেফিন, আমার জোসেফিন,
গতকাল সারাটি বিকেল কাটিয়েছি তোমার পোট্রেটের দিকে চেয়ে থেকেই। কী করে পারো তুমি বলতো এই কঠোর মনের যোদ্ধার চোখেও জল আনতে? আমার হৃদয় যদি একটি পাত্র হয়, তবে সেই পাত্রে ধারণ করা পানীয়ের নাম দুঃখ। তুমি কি তা বোঝো জোসেফিন? আবার কবে তোমার আমার দেখা হবে? সে অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতেই চায় না! সে অপেক্ষায়…
তোমারই
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট’


   স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে বিয়ের পর প্রেম নাকি উবে যায়। এই কথার অসত্যতার প্রমাণ মেলে মূলত স্ত্রী ক্লেমিকে লেখা উইনস্টন  চার্চিলের এক প্রেমপত্রের ছত্রে ছত্রে।
‘আমার প্রিয় ক্লেমি,
আমার মন পড়ে রয়েছে মাদ্রাজের ছোট্ট এক টেবিলে, যেখানে বসে বসে তুমি গত পত্রখানায় লিখেছো যে, আমি নাকি তোমার জীবনকে আলোকিত করেছি। চিঠিখানা পড়ে নির্বাক আমি বসে রইলাম কিছুক্ষণ। একমাত্র আমিই জানি, তোমার কাছে আমি কতটা ঋণী। আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, তার সবটাই তো তোমারই দান। কত ঝড় এলো জীবনে। কিন্তু তুমিই আমার শিখিয়েছো কী করে ঝড়ের রাতেও রত্ন কুড়োতে হয়। সব ঝড়ের রাতে কুড়নো রত্ন জমিয়ে রেখেছি ক্লেমি তোমায় দেবো বলে। কবে আবার দেখা হবে আমাদের? তোমার স্মৃতি আর ভালবাসা নিয়েই আমার বেঁচে থাকার প্রতিটি নিঃশ্বাস পড়ে। কখনও বদলে যেওনা যেন।
একান্তই তোমার, 
        চার্চিল।’
রুশ কবি মায়াকোভস্কি। এক পাগল প্রেমিকও। মঞ্চ ও চলচ্চিত্রও কাঁপান মায়া। জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে লিখেছেন কবিতা ও গল্প। লিলিয়া ব্রিককে মায়া প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। অধ্যায়টা শুরু হয়েছিল কিশোরকাল থেকেই। কিন্তু লিলিয়া আরেক কবি ওসিপ ব্রিককে বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে মায়া লিলিয়ার ছোট বোন এলসাকে বিয়ে করেন ঠিকই; কিন্তু লিলিয়াকে ভুলতে পারেননি। বিখ্যাত কবিতা ‘ব্যাকবোন ফ্লুট’, কবি মায়া তার প্রেমিকা লিলিয়াকে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন। কবিতাটিতে প্রেম বেদনার কোনো সীমা নেই। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কবি মায়া নিজেকে অত্যন্ত অসহায় বোধ করতেন এবং এক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। মৃত্যুর পর তার মৃতদেহের পাশে একটি চিরকুট মেলে। চিরকুটে লেখা ছিল ‘লিলি আমাকে একটু ভালোবেসো’। তাতে ফুটে উঠেছিল ভালোবাসার ব্যাকুলতা। 



  আর প্রাচ্যে বা এদেশের বিখ্যাতদের কথা এলেই রবীন্দ্রনাথের নাম আসবেই অবধারিত ভাবে। ওঁর প্রকাশিত চিঠির সংখ্যা বোধহয় সর্বকালের সেরা। রবীন্দ্রনাথের চিঠি জনপ্রিয়, বহুপঠিত। আমি তাই আর এখানে ওঁর চিঠির উল্লেখ করলাম না। বরং নজরুলের লেখা একটি চিঠির কথা বলি।

   কবি নজরুলের প্রথম প্রেম তাঁর স্ত্রী নার্গিস আসার খানম। দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। পরে ভুল বুঝতে পেরে নার্গিস নজরুলকে একটি চিঠি লেখেন। তার উত্তরে নজরুল নার্গিসকে উদ্দেশ্য করে প্রথম ও শেষ একটি চিঠিই লিখেছিলেন।




নার্গিসকে লেখা নজরুলের শেষ চিঠি :




‘কল্যানীয়াসু,
   তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নব বর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাত। মেঘ মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি এক বারি ধারায় প্লাবন নেমেছিল– তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নবমেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে, মালবিকার দেশে, তার প্রিয়ার কাছে। এই মেঘ পুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চার। এই আষাঢ় আমায় কল্পনার স্বর্গ লোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে। যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দেই। তুমি বিশ্বাস করো, আমি যা লিখছি তা সত্য। লোকের মুখে শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাকো, তাহলে আমায় ভুল বুঝবে- আর তা মিথ্যা।
 তোমার উপর আমি কোনো ‘জিঘাংসা’ পোষণ করিনা –এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি—তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না—আমি ধুমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণী রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। …আজকের তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ; তাই তাকে পেতে চাইনে। জানিনে হয়ত সে রূপ দেখে বঞ্চিত হব, অধিকতর বেদনা পাব,–তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি। দেখা? না-ই হ’ল এ ধূলির ধরায়। প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস আমাকে চাও ওখান থেকেই আমাকে পাবে।. ..যাক আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষ রশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করো না। তোমাকে লেখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি বিশ্বাস করো আমার অক্ষয় আশীর্বাদ কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখি হও, শান্তি পাও— এই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি তত মন্দ নই –এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ।                        ইতি—নিত্য শুভার্থী—নজরুল ইসলাম।’
এবারে বলি, পৃথিবীর সবথেকে বড় প্রেমপত্রের কথা। বিখ্যাত বই ‘হুইস্পারিং’ এর লেখিকা ইতিহাসবিদ অরল্যান্ডো ফাইজিস ২০০৭ সাল নাগাদ একদিন আবিষ্কার করেন এক বড় ট্রাঙ্ক ভর্তি চিঠির। যার ভেতরে ছিল বিশ্বের সবথেকে বড় প্রেমপত্র। তাড়া তাড়া চিঠি, সংখ্যায় প্রায় দু’হাজার এবং সব মিলিয়ে ৩৭ কেজি ওজন। প্রেরক ও প্রাপক দু’জন।লেভ মিশচেঙ্কো আর স্বেতলানা ইভানোভা সাইবেরিয়ার গুলাগ ক্যাম্পে আট বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে লেভ আর স্বেতলানা পরস্পরকে দু’টো করে চিঠি লিখত। প্রথম চিঠি স্বেতলানার। জুলাই, ১৯৪৬। মস্কোয় বসে লিখছে, “এই যে আমি আছি, কিন্তু কী লেখা উচিত, জানি না— তোমার কথা মনে পড়ে। সে তো তুমি জানোই। আমি যেন সময় ছাড়িয়ে বাস করছি, জীবন কখন শুরু হবে তার অপেক্ষা, যেন একটা বিরতি চলছে।” লেভের জবাব, “তুমি এক বার জানতে চেয়েছিলে, আশা নিয়ে বাঁচা বেশি সহজ, না কি আশা ছাড়া। আমি কোনও আশা দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু সেটা ছাড়াও আমি শান্ত বোধ করছি।”শেষ চিঠিও লেভের। তারিখ ছিল জুলাই ১৯৫৪। আশ্চর্য এক প্রেমকাহিনির বিস্তার ছিল চিঠিপত্র জুড়ে।

   এখানে বলে রাখি, গুলাগের কঠিন আইন ভেঙে চিঠিপত্র পাঠানো সহজ ছিল না। স্টালিনের আমলে সোভিয়েট রাষ্ট্রের এই জেলে বন্দিরা মাসে এক বার চিঠি গ্রহণ-প্রেরণের অনুমতি পেত, সেই চিঠিও আবার সেন্সর করা। আগে পুলিশ পড়ত। ব্যক্তিগত কথা লেখা কঠিন ছিল। কিন্তু ক্যাম্পের কর্মীরা লেভকে ভালবাসত, চোরাচালানের কাজটা তাদের হাত দিয়েই হত। লেভ আর স্বেতলানা নিয়ম ভেঙে সপ্তাহে অন্তত দু’বার চিঠি চালাচালি করত। দেখাও করত। ভালবাসার নমুনা হিসেবে সমস্ত চিঠি তারা জমিয়ে রেখেছিল। চিঠিগুলোই ছিল তাদের অবলম্বন।

   অরল্যান্ডো লিখছেন, অজস্র সাঙ্কেতিক শব্দে ভরা এত চিঠির প্রতিলিপি করতে বছর দুয়েক সময় লেগেছিল তাঁর। শেষে তৈরি হয়ে ওঠে এমন এক নথি, যা ইতিহাসের আকরও বটে। প্রাক্তন বন্দিদের বয়ানে গুলাগের ছবি পাওয়া যায়, তবে এমন দৈনন্দিন খুঁটিনাটি কোথাও উঠে আসেনি।
বছর সাতেক আগে প্রকাশিত হয় অরল্যান্ডোর বই: ‘জাস্ট সেন্ড মি ওয়ার্ড’।
দুজনেই পুরুষ। একজন লেখক অ্যালেন গিন্সবার্গ, অন্যজন কবি পিটার ওরলভস্কি। পিটারের অনুপ্রেরণাতেই অ্যালেন গিন্সবার্গ আজ পৃথিবীর বুকে একজন সাহিত্যিক। তাদের বন্ধুত্বের জুটি ছিল কয়েক দশকের সমালোচকদের শরীরে জ্বালা ধরানোর অন্যতম কারণ। গিন্সবার্গ তার বন্ধুকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তাই তো চিঠিতে লেখেন, ‘প্রিয় পিট, আমার ভালোবাসা, কীভাবে যেন সব বদলে যাচ্ছে! আপনি ভয় পাবেন না, কোনো ভয়ঙ্কর সুন্দর কিছু ঘটেনি। ঠিক কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। এতটুকু বলতে পারি, আপনাকে ছাড়া আমার জীবন খালি খালি মনে হয়। আত্মার কাছাকাছি হয় না।’ চিঠির উত্তরে পিটার লেখেন, ‘অ্যালেন চিন্তা করবেন না। আমরা আমাদের বিশ্বকে বদলাব। এমনকি আমরা মরে গেলে পরকালে রঙধনু হব।’

  এরও অনেক আগে শুদ্ধতার বাই তোলা অস্কার ওয়াইল্ডও ছিলেন সমকামী। নীতি-চাদরের আড়ালে একাধিক পুরুষের সঙ্গে শরীর-মনের চাহিদা মেটাতেন তিনি। সমকামিতার অভিযোগে জেলও খাটেন এই সাহিত্যিক। ওয়াইল্ডের এই ঘটনা এত দূর গড়িয়েছিল যে, দীর্ঘদিন পর্যন্ত লোকে তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতেও দ্বিধা বোধ করত। ওয়াইল্ডের পুরুষসঙ্গী অল্পবয়সী আলফ্রেড ডগলাস। ওয়াইল্ডের প্রকাশিত চিঠিতে এই তরুণের প্রতি তার অনুরাগ ফুটে উঠেছিল স্পষ্ট। চিঠিতে লেখা ছিল— ‘আপনার গীতি কবিতা অসম্ভব সুন্দর। দারুণ ছিল সেই বাচনভঙ্গী। আপনার লাল-গোলাপি ঠোঁট চুম্বনের উন্মাদনা জাগায়।’ এ ছাড়াও ওয়াইল্ড তার আরেক বন্ধুর উদ্দেশে লিখেন— ‘সেখানে শুধু আমরাই থাকব, আর থাকবে এক ফ্লাস্ক ইতালীয় মদ।’ ভিক্টোরীয় যুগের এই সাহিত্যিক সমকামিতাকে কখনো অপরাধ হিসেবে দেখতেন না।


   ইলিয়ানা-হিকক। দুই নারী।  খুবই গভীর বন্ধুত্ব তাদের। পরিচয় কোনো এক সাক্ষাৎকারে। একজন ফার্স্ট লেডি ইলিয়ানা রুজভেল্ট এবং অন্যজন সাংবাদিক লরেনা হিকক। ইলিয়ানা-লরেনা সম্পর্কের গসিপ ছিল তৎকালীন হট টপিক। ‘এম্পটি উইথআউট ইউ’ বইয়ের লেখক রজার স্ট্রেটমেটার তুলে ধরেন তাদের ভালোবাসার গল্প। বইটি ইলিয়ানা- হিকক লরেনের প্রেমের অন্যতম সাক্ষী। বইটিতে রয়েছে কিছু চিঠি, অন্তরঙ্গ মুহূর্ত এবং ভ্রমণের গল্পকথা। এমনকি স্বামী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টও বলেছেন তাদের মধুর সম্পর্কের কথা। ইলিয়ানা হিকককে চিঠি লিখেন— ‘প্রিয় হিক, তোমার কণ্ঠ কত ভালো লাগছিল! সত্যি বলতে সেই অনুভূতি বোঝানো সম্ভব নয়। তবে, মজার ব্যাপারটি হলো, আমি ট্রেইম ও টিডোরকে কখনই বলতে পারিনি তোমার-আমার সম্পর্কের কথা। তবে, মনে রেখ, তোমার কথা ভাবতে ভাবতে আমি প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়ি।’
 
   প্রেম না মানে লিঙ্গ না কোনো বয়স। ইংরেজ কবি ভিটা সেকভিলই তার দারুণ দৃষ্টান্ত। সেকভিল লেখক ভার্জিনিয়া উলফকে ভীষণ পছন্দ করতেন। কিন্তু ভার্জিনিয়া ছিল তার চেয়ে ১০ বছরের বড়। অসম এই প্রেম ছিল উপন্যাসের চরিত্রের মতোই। আবেগ, অন্তরঙ্গ ও বন্ধুত্বের অনন্য নজির ছিলেন এ দুই লেখিকা। একবার সেকভিল ভার্জিনিয়ার উদ্দেশে চিঠি লেখেন। তাতে লেখা ছিল— ‘আমি অন্ধকারের দুঃস্বপ্নে একটি চিঠি লিখলাম। সম্ভবত আপনি আমার অস্পষ্ট অক্ষরগুলো অনুভব করতে পারবেন না। তবে এটা সত্য যে, আপনাকে আমার ভীষণ মনে পড়ে। চিঠিটা তো শুধু বলার মাধ্যম। আপনি বিনয়ী, আপনাকে আমি নিজের মতো ভালোবাসি না। হে প্রিয়, আমি আপনার সামনে দাঁড়াতে পারি না। সম্ভবত, আমি আপনাকে অনেক বেশি ভালোবাসি। আপনি বাঁধ ভেঙেছেন, তবে আমি প্রতিবাদ করব না।’

  আমি, আমরা বা আমাদের মতো সাধারণ  মেয়েরাও  যে অন্য মেয়ে বন্ধুকে চিঠি লেখে না, তাও নয়।  আমার ছোট বোনের মতো, ফ্রেন্ড, ফিলজফার অ্যান্ড গাইডও বটে, এমন এক মেয়ের সঙ্গে আমার মেল-চিঠি আদান প্রদান হয় নিয়মিত।  যদিও তাতে সমকাম নেই, আছে নিখাদ ভালোবাসা এবং প্রকৃতির প্রতি সমকাতরতা।  তার লেখা চিঠির কয়েক টুকরো দিলাম শেষ পাতে।জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়ার পর সে আমাকে লিখেছে-
“দি, 
টানা ২ দিন নেটওয়র্ক ছিল না। 
জঙ্গলে গেছিলাম। কোর এরিয়াতে নয় ততটা। তবে রিজার্ভ এরিয়ার ভেতরে। ট্রান্সমিশন একদম জ্যাম করে দেয়। 
তবে এটা কিছুটা হোটেলওয়ালার বদমাইশিও। যাতে রুমের মধ্যে কেউ ওদের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে খরচ না করে দেয়। 

আহা, এরকম বিকেলবেলায় জঙ্গলের ভেতর ঘুমিয়ে থাকতে খুব আরাম। 
রোদে পুড়তে থাকা মাটি আর ধোঁয়াচ্ছন্ন সাদা বালিপাথরের পথ। কালো আগুন বেরচ্ছে প্রকৃতি থেকে। 
আর লাল মেঝের ঠাণ্ডায় ঘুমিয়ে আছি। 
বাড়ি থেকে ২ ঘন্টা মতো রাস্তায় এই জঙ্গল। তামিলনাড়ু আর কর্ণাটকের সীমানায়। 
এখন পুলিশের প্রবল চেকিং ভোটের জন্য। কেউ গাড়িতে করে টাকা নিয়ে যাচ্ছে কিনা, অস্ত্র নিয়ে যাচ্ছে কিনা। 
হাতিগুলো রাস্তার দিকে পিছন ফিরে এই কাঁটাঝোপে দাঁড়িয়ে এই গরমে কী রাজকার্য করছিল কে জানে ! 
হরিণগুলি বেশ মিশুকে।   
২০,০০০ একরের মতো এলাকার গাছপালা পুড়ে গেছে এবছর গরমে আগুন লেগে। তবু, তুমুল রোদে রূপসী কৃষ্ণচূড়ার গা থেকে ঝলসে ওঠে আগুন”। 

পাহাড় আমাদের দুজনেরই প্রিয় অবসেশন। সেই পাহাড়ে যাওয়া নিয়ে আমি লিখেছিলাম একবার ওকে-
“কয়েক বছর অপেক্ষা কর আরও। পাহাড়ের ওপর মেঘ আর কুয়াশা ঘেরা একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি বানাবো। কিম্বা ঘন জঙ্গলের ভিতরে।  সেখানে কেবল আমি একাই থাকব। নো পদা, ফদা! আর শুধু মেয়েরা আসতে পারবে ওখানে।  তারপর তোরা দুতিনজন করে আসবি। বড় গ্রুপ ওখানে অ্যালাউ করব না। এটা একদম পাক্কা প্ল্যান কিন্তু! এজীবনে এই ইচ্ছেটা আমি পূরণ করেই ছাড়ব।
আর মাইসোরের ভাষাটা শিখে নে। স্থানীয় মানুষদের কবিতা সরাসরি অনুবাদ করতে পারবি। ওই কফি বীন শুকোতে দেওয়া বাড়িটাও খুব পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু ৮৮বছরের রেকর্ড গরম আমাকে এখান থেকেই চোখ রাঙাচ্ছে। অতএব বাদ!    
   আমি কত পরিশ্রম  আর করব, বলতে পারিস? সেই জগদ্দল ঐতিহাসিক উপন্যাসটা তো শেষ করেছি। কিন্তু ছাপা নিয়ে চিন্তায়। *** বই করবে বলেছে। কিন্তু আমি চাইছি ধারাবাহিক ভাবে কোথাও বেরোক এটা। একদম নতুন বিষয় আর আঙ্গিক, এটা বলতে পারি। আফ্রিকান সিদ্দিরা ভারতে এসে কিভাবে রাজ করে গেছে, মায় বাংলার নবাব পর্যন্ত হয়েছিল ওরা। এই নিয়ে চারটে পর্বে লিখেছি চার সিদ্দির কাহিনি। ওখানেই আমি আধমরা হয়ে গেছি। এরপর কবিতার পিছনে ছুটতে গিয়ে ***কে আবিষ্কার করে ফেললাম। এই অনুবাদের খবরটা অনেক দূর পর্যন্ত গ্যাছে। ক্রমে জানতে পারবি। এরপরেই আবার ***র কবিতা পড়তে গিয়ে আরেক পাগলা কবিতার সিরিজ আমাকে জেঁকে ধরেছে। এটা নিয়েও নাস্তানাবুদ হয়ে আছি আপাতত। এরপর এখনই আর অনুবাদের বই নিয়ে আমার মাথা খারাপ করিস না! তারপর আবার হতচ্ছাড়া পদাকে নিয়েও বই করতে বলছে কেউ। তাও তো এখন ফরমায়েসী লেখা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। 
যাই হোক না কেন, ওই পাহাড় বা জঙ্গলের বাড়িটার প্ল্যান কিন্তু পাক্কা। কতরকম সমস্যাই তো আসে জীবনে আমাদের, কেটেও যায়। নির্লিপ্তি বোধহয় সমাধান। সেই চেষ্টাই করি। লিখিস মাঝেমাঝে। সবকথা কী আর বলা যায়! কিছু তো বুঝে নেওয়াও যায়। শরীরের যত্ন নিস। আর দশ বছর পরে মনে হবে, আরেকটু নিজের খেয়াল রাখলে বোধহয় শরীর সুস্থ থাকত! আগে থেকে সতর্ক করলাম। দূর থেকেই আদর…”  

   দূর থেকেই তো চিঠি লেখা যায়। স্বজন, প্রিয়জন কাছে থাকলে চিঠির প্রয়োজন ফুরতো আমাদের। শুধু কথা দিয়ে কি সবটা বোঝানো যায়? যতটা লিখিত আকারে প্রকাশিত হতে পারে, ততটা কথায় হয় না। আবার কথায় যতটা প্রকাশ করা যায়, লিখেও তা হয় না। ফলে মোবাইলে কথা বলা, ছোট মেসেজের প্রচলন বেড়েছে স্বাভাবিক ভাবে। মননের খোরাক দিতে/নিতে চাইলে কেউ কেউ এখনও চিঠি লিখে ফেলে আমাদের মতোই। চিঠি ফুরোবে না, সে হয়ত অন্য আকারে থাকবে। কবুতরের পায়ে আশমান বাঁধা থাক, থাক রানারের প্রত্ন ঘণ্টা। আর ডাকঘরে বেঁচে থাক রবিঠাকুর।    

2 Comments

  • সুশান্ত বাবু।

    Reply June 28, 2021 |

    বেশ বেশ সুন্দর।

    • Amal

      Reply June 28, 2021 |

      জব্বর। লা-জবাব।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...