আহিরীটোলার কথা
শুভদীপ নায়ক

বছর দশেক আগের কলকাতার কথা লিখছি । সেসময় লেখালিখির মধ্যে দিয়েই দিন কাটছে আমার । মাঝেমধ্যে একটু আধটু ছবি আঁকছি । আঁকার খাতাপত্র, পেন্সিল ইত্যাদি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছি কলকাতার চারপাশে । কোনও কোনও দিন দু-এক পশলা বৃষ্টির জন্য তেমনভাবে ঘুরতে পারি না । কোনও একটা চায়ের দোকানে ছাউনির নীচে বসে চা খাই আর সিগারেট ধরিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি । কলকাতার পথঘাট তখন ভিজছে সদ্য সম্পর্কে পা দেওয়া তরুণীর মতো । বৃষ্টি হচ্ছে গঙ্গার বুকেও । ডাকপিওন ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ি বাড়ি চিঠি দিয়ে বেড়াচ্ছে । এমন দৃশ্যের কাছে আমার আর অাঁকার কথা মনে থাকে না । বাড়িঘর, সংসার, প্রিয়জনদের সঙ্গে তখন চিরদূরত্বে সময় কাটছে । সমস্ত আমিটাই তখন বড় হচ্ছি বইপত্রের সঙ্গে । সেইসব বৃষ্টির দিনে বাড়ি ফিরতাম দুপুর তিনটে নাগাদ । ফিরে এসে অবেলার স্নান, টেবিলে গুছিয়ে রাখা নিঃসঙ্গ খাবার, এবং আমার পড়ার ঘরের একটা টানা বারান্দা আমাকে সন্ধে পর্যন্ত সঙ্গ দিত । ঘরের টেবিলে হয়ত দীর্ঘ কবিতার কয়েকটা স্তবক লিখে ফেলে রেখেছি, কিংবা একটা উপন্যাস পড়তে পড়তে উঠে এসেছি বারান্দায়, দেখলাম ‘কাঁচা সুড়ঙ্গের গন্ধ ভেসে আসছে চাঁদের মতন’ ।

‘এসব লেখার কিছু নয়, দূরে মেধাবী সন্ধ্যার ব্যাকরণ’, তবু সেই সন্ধ্যাকে ঘিরে কলকাতার পথে জমে উঠত মধ্যবিত্ত বাঙালির কাহিনি, সম্পর্কের সাহিত্য, জীবনের কিছু থেমে থাকা ভাবনাকে ঘিরে কবিতা । নব্বই দশকের সময়কালে আমরা যারা কলকাতাতে ঘুরে বেড়িয়েছি, তারা শূন্য দশকের শেষার্ধ থেকে নিজেদের রুজিরুটির প্রয়োজনে স্বার্থপর হয়ে উঠলাম । কেউ অন্যত্র যাত্রা করলাম, সেখানেই গড়ে তুললাম নতুন জীবন । কেউবা আমরা রয়ে গেলাম এই কলকাতা শহরেই । বাড়িঘর, জমিজমার দ্বন্দ্ব, আগে থাকতে চালু থাকা পূর্বপুরুষের ব্যবসা ও ছোটছোট প্রয়োজনগুলোর স্বার্থে আমরা দু-একজন থেকে গেলাম শ্যাওলা ধরা পলেস্তার খসা কলকাতায় । আমাদের কাছে তখনও ধারণা ছিল, কলকাতা হল বাঁচার শহর । এখানে শহরের দিনযাপন আছে, বনেদিয়ানা আছে, কিন্তু নেই আধুনিকতার আধিপত্য ।

তবু সেই দিনগুলোয় আধুনিকতা ও পণ্যসভ্যতা গ্রাস করতে লাগল আমাদের । আমরা বাঙালিরা বিজ্ঞানচর্চা থেকে বিশ্বসাহিত্যের চর্চাতেও পিছিয়ে ছিলাম না । প্রতি সপ্তাহে, প্রতিটি দিনের কাগজে আমাদের বাঙালি লেখকদের কিছু না কিছু লেখা বেরতই । সেসব লেখা আমারা দিনের একফাঁকে ঠিক পড়ে ফেলতাম । ভয় পেয়ে বাঁচার শিক্ষা আমরা তখনও পাইনি । বনেদিবাড়ির নতুন বৌকে দেখেছি দুপুরবেলার বারান্দায় অভিমান করে দাঁড়িয়ে থাকতে, আর সেই অভিমানী মুখের ওপর সিগারেট ধরিয়ে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দেওর । হয়ত এ সম্পর্কের কোনও শেষ নেই, হয়ত অপেক্ষা করে আছে অনেক অপমান, অনেক গ্লানি, তবু সম্পর্কটিতে সাহস করে পা দিয়েছে দুজনে, নতুন বৌয়ের হাতে অন্যের শাখা ও কপালে অন্যের দেওয়া সিঁদুর থাকা সত্ত্বেও । শিক্ষক হয়েও যে মেয়েটিকে বিগত ছয় বছর ধরে ঘষে ঘষেও অঙ্ক শেখাতে পারিনি, তার প্রতি বিরক্তি আসার বদলে এসেছে ভালোবাসা, জানালে ছোট হব বলে পিছিয়ে গিয়েছি । সাহস করে বাঙালি যুবতীও তার শিক্ষককে মনের কথা বলেনি এই ভেবে মাস্টারমশাইয়ের তো স্ত্রী আছে । একটা সময়কাল পর্যন্ত সমাজে আমরা এসব সম্পর্ককে খারাপ নজরে নিয়েছি, কিন্তু সেই খারাপ লাগা সম্পর্কগুলোর মধ্যেই খুঁজে বেড়িয়েছি জীবনের মানে । মদ্যপ, বেপরোয়া, অত্যন্ত খারাপ একটি পুরুষকে শুধুমাত্র ভালোমানুষে পরিণত করবে বলে কত মেয়ে হাতছাড়া করেছে বড় ঘরের সম্বন্ধ, অত্যাচারিত হয়েছে, তবু এক উনুনে চেপেছে তাদের সম্পর্কের হাঁড়ি, ফুটেছে ভালোবাসার ভাত । আবার এই কলকাতার বুকেই ভাঙা পড়েছে বাড়ি, পরিবার, সম্পর্ক । মৃত বাবার রেখে যাওয়া বাড়ি, কুয়োতলা, উঠোন একনিমেষে বদলে গেছে মাল্টিস্টরেড বিল্ডিংয়ে । যে গলিতে ইট সাজিয়ে ক্রিকেট খেলা হত, চটি পেতে রেখে তৈরি হত ফুটবলের গোলপোস্ট, সেইসব গলি ছেয়ে গেছে অবাঞ্ছিত গাড়ি, অপ্রয়োজনীয় মোটরবাইক ও স্কুটারে । তবু এইসব স্মৃতি এখনও ঘুমের মধ্যে এসে হানা দেয়, যখন মাথার কাছে একগুচ্ছ কবিতার বই নিয়ে পড়তে পড়তে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ি । সকালে উঠে টের পাই, আমি এতকাল বেঁচে ছিলাম আমার হারিয়ে ফেলা অতীতে, খুঁজছিলাম আমার সেইসব ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলোকে ।

আমাদের পুরনো বাড়ি ভাঙা পড়েছে বহুদিন হল । আজ এই জমিতে উঠেছে একটা মস্ত ফ্ল্যাটবাড়ি । আমার সেই টানা বারান্দা আর নেই, তা ঢুকিয়ে আনা হয়েছে ঘরের মধ্যে । প্রশস্ত ঘরে এতকাল ছড়িয়ে থাকত বইপত্র, আজ সেইসব বই পাশাপাশি বুকসেল্ফে এসে জায়গা নিয়েছে । অন্ধকার ঘরে টেবিলের ওপর একটা আলোকবৃত্তই হল আমার বর্তমান লেখার জায়গা, আমার ব্যক্তিগত পরিসর, যার নীচে আমি রাখতে পারি আমার যোগাযোগহীন লেখার জীবনকে ।

অন্নচিন্তার জন্য যেটুকু সময় কর্মস্থলে ব্যয় করি, তার বাইরে আমি এখনও সাধারণ মধ্যবিত্তেরই জীবন যাপন করি । বিত্তের প্রতি যেমন আকর্ষণ অনুভব করি না, তেমনই ভুলে থাকতে পারি আমার বাধ্যবাধকতার যাপনকে । হয়ত ছুটির দিনে সকালের বৃষ্টিটা থেমে গেছে, বেরিয়ে পড়েছে রোদ, ভিজে রাস্তাও নিজেকে শুকিয়ে নিচ্ছে সেই সুযোগে । আমি একটা সাধারণ পোশাকে ঝোলাব্যাগে ছাতাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম । আগে থাকতেই সেই ব্যাগে রাখা আছে কিছু কবিতার বই, লেখার খাতা, ঝর্নাকলম, ও একটা সিগারেটের প্যাকেট । বড়রাস্তার মোড়ে এসে সুবীরের বাড়িতে খানিকক্ষণের জন্য পা বাড়ালাম । সুবীর আলিপুর কোর্টে ওকালতি করে । ওর মায়ের পোস্টগ্ল্যাণ্ডের ক্যানসার এই নিয়ে দেড়বছরে পড়ল । ওদের বাড়ির একতলাটা ভাড়া দেওয়া, সেখানে একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস । স্বামী-স্ত্রী আর ওদের একটা সাতবছরের ছেলে । একতলার পাশের সিড়ি দিয়ে উঠে এসে দেখি ঘরে সুবীরের মা বসে চা খাচ্ছে । সুবীর রান্না চাপিয়েছে পাশের ঘরে । সেখান থেকেই গলা বাড়িয়ে বলল, ‘বোস মায়ের কাছে, চা খাবি তো ?’

–অত ব্যস্ত হতে হবে না তোকে । ঘরে আয় কথা আছে ।

এই বলে গিয়ে বসলাম কাকিমার কাছে । কাকিমা বলল, ‘তোমার বন্ধুকে এবার রাজি করাও বাবা । আমি কবে আছি কবে নেই, মেয়েটাকে এবার ঘরে আনুক । আচ্ছা, বলো তো– ওর মাথার ওপরে তো কেউ নেই । এই বিধবা মা যদি চোখ বোজে, ওকে দেখবে কে ?’

সুবীর চা এনে দিল । বলল, ‘তুমি থামবে মা ?’

বললাম, ‘কাকিমা তো অন্যায় কিছু বলছে না সুবীর ! রুবিনাকে বিয়ে করতে চাইছিস না কেন, মুসলমান বলে ? না কি ভালোবাসিস না ?

সুবীর কোনও কথার উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে । রুবিনা সুবীরের কাছেই তিনবছর হল ল প্র্যাকটিস করেছে । পিআইএল ফাইল করতে পারত না মেয়েটা, সুবীরই সব হাতে ধরে শিখিয়েছে । আইনের কাজ শিখতে শিখতে আত্মীয়তা গড়িয়েছে সম্পর্ক পর্যন্ত । কিন্তু অপমান ও নীরবতা সহ্য করতে করতে রুবিনা এখন নিজেকে সংযত করতে শিখেছে ।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাকিমা, রুবিনা মুসলমান বলে তোমার আপত্তি আছে বুঝি ?’

সুবীরের মা বালিশ টেনে আধশোয়া হয়ে বলল, ‘আমার ওসবে আপত্তি নেই বাপু, এ বংশে মুসলমানের সঙ্গে বিয়ে নতুন নয় । তবে, আমার নিজের ছেলেরই মত নেই বিয়েতে ।’

এই ঘটনার দুদিন পর এক দুপুরে সুবীরের বাড়ির সদর দরজা খুলে ভিতরে এসে দোতলায় যাওয়ার জন্য সবেমাত্র সিঁড়িতে পা দিয়েছি, দেখি সিঁড়ির কোণে সুবীর এক সধবা যুবতীর গলায় মুখ গুঁজে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে । যুবতীর শাঁখা পরা হাত সুবীরের পিঠে অত্যন্ত কোমলভাবে জড়িয়ে রয়েছে । লাল চেকরঙা আটপৌরে সেই সধবা যুবতীটি ওদের একতলার ভাড়াটে রায়বাবুর স্ত্রী । চোখবন্ধ করে সুখের সাগরে ডুবে ছিল দুজনে, আমাকে দেখতে পেয়ে যুবতীটি চিৎকার করে ওঠে । সেই থেকে সুবীরের বাড়ির পথ আমাকে ভুলতে হয়েছে ।

ঐ ঘটনাটা বয়ে বেড়িয়েছিলাম সেদিনের সারাটা সন্ধে! কলেজস্ট্রিটের রাস্তাঘাট ঘুরে কিছু বইপত্র সংগ্রহ করে গিয়ে বসেছিলাম আহিরীটোলার লঞ্চঘাটে । কী বই কিনেছি, কতটা পথ পায়ে হেঁটেছি, সেসব কিছুই মনে ছিল না সেদিন । শান্ত লঞ্চঘাটে সাইরেন দিয়ে স্টিমার ছেড়ে যাচ্ছিল, আর আমি সিগারেট ধরিয়ে তাকিয়ে ছিলাম গঙ্গার দিকে । কেবলই মনে পড়ছিল সুবীরের সঙ্গে ঘনিষ্ট অবস্থায় থাকা সেই সধবা যুবতীটির মুখ । খোলা চুল, সিঁথিতে অস্পষ্ট সিঁদুরের ছাপ, সুবীরের অবাধ্যতায় তার বুকের আঁচলটি যেন খসে পড়েছে, আলগা হয়েছে ব্লাউজের একটি দুটি হুক । কিন্তু কেমন করে সে লজ্জা পেল তাদের ঘনিষ্ট দৃশ্যে আমার চোখ পড়াতে ! মনে হতেই ব্যাগের মধ্যে থেকে সদ্য কেনা একটি বই বের করে পড়েছিলাম সেদিন! সেও ছিল কবি অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি বই । আজ সেই অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরই আরেকটি বই খুলে বসে আছি সারা সন্ধে ধরে ! আজ ২০২১ সাল, মানব সভ্যতা লড়ছে বিশ্বব্যাপী অতিমারীর সঙ্গে । মানুষের যা কিছু দারিদ্র, দুঃখ, কষ্ট, প্রেম ও বলতে না পারা সমস্ত কথা আজ ফিরে ফিরে আসছে । আমি যেন বসে আছি সেই আহিরীটোলার লঞ্চঘাটে, সন্ধের স্তব্ধ আলোয় ফের একবার পড়ে ফেলছি ‘আহিরীটোলা’-কে, যেভাবে মানুষ শত শত লাঞ্ছনা সহ্য করেও ধরা দেয়ে প্রেমে, জড়িয়ে পড়ে সম্পর্কে, মনের অনেক দ্বিধা সত্ত্বেও ।

যে পুরুষের কথার ঘূর্ণি ও লেখার আভায় জড়িয়ে পড়ে অনেক নারীমন, সে পুরুষ শেষ পর্যন্ত কাউকেই ভালোবেসে উঠতে পারে না । কারণ, সেই পুরুষ আসলে সর্বদা চেয়েছে ক্লান্ত সন্ধেয় তার জন্য যেন কেউ অপেক্ষা না করে থাকে ! কবি অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আহিরীটোলা’ বইটি নিভৃতে বহন করছে এমন পুরুষেরই বিদগ্ধ যাপন । বইটির ২১ নং পৃষ্ঠা থেকে একটা সনেট তুলে দিলাম :

তুমি চাও থেমে যেতে; যেখানে সন্ধ্যায়

শিকে গাঁথা মাংস পোড়ে গিরগিটির মতো

মর্গের দু’পাশে— আর আমিও অন্তত

কার মাংস, যেতে চাই না এই জিজ্ঞাসায় ।

আমরা রাতের খাওয়া শেষ করে শুধু

ফিরে যাব, রাস্তা থেকে জলের গেলাসে

চেয়ে নেব হয়তো বা—প্রভু আর দাস–

বলব সিনেমার কথা, কৃষ্ণাণ, আদুর…

চোখের ভিতর দিয়ে তারপর আর

কোথাও যায় না যাওয়া, ঘুম নেমে আসে

রাত্রির নিয়ম তাই, তোমাকে দেখার

আগে থেমে যেতে হবে রাতের আকাশে

তারার আভার মতো ঘুমন্ত ঘাসে ।

অন্ধকার মাংস, সেই রাতের খাবার ।

সম্পূর্ণ কবিতাটি লেখা হয়েছে ফরাসি সনেটের গঠনে, যার অষ্টক বা প্রথম আটলাইনকে ভাঙা হয়েছে চার লাইনের দুটি স্তবকে এবং শেষ ছটি লাইন, অর্থাৎ ষটককে ভাঙা হয়েছে দুটি তিন লাইনের স্তবকে । প্রতিটি লাইন ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে সাজানো । বুদ্ধদেব বসু এই লেখা দেখলে মাত্র দুটি জায়গায় সংশোধন করতে চাইতেন, তা হল– দ্বিতীয় স্তবকের প্রথম লাইনে দুই মাত্রার ‘আমরা’ শব্দটি, যা কবি এখানে তিনমাত্রা হিসাবে ব্যবহার করেছেন এবং শেষ স্তবকের দ্বিতীয় লাইনটিতে তিনমাত্রার ‘ঘুমন্ত’ শব্দটি যা কবি এখনে চারমাত্রা রূপে ব্যবহার করেছেন । বুদ্ধদেব বসুর নিজের লেখার স্বভাবে যেহেতু এত দ্বন্দ্ব ও দ্বিধার সংমিশ্রণ, সেহেতু তিনি হয়তো এই দুই জায়গায় সংশোধন নাও চাইতে পারেন । ‘আমরা’ শব্দটি যদি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উচ্চারণ করা যায়, তবে তাতে বাড়তি একমাত্রার সন্ধান কি আমরা পেতে পারি ? কিংবা ‘ঘুমন্ত’ শব্দটিকে দীর্ঘ উচ্চারণেও আমরা অনুসন্ধান করতে পারি বাড়তি ঐ একমাত্রার! ভেবে দেখলাম, সত্যিই ব্যতিক্রমী দুটি লাইন, যদি আমরা কবিতাটির পথ অনুসরণ করে এক তীব্র অস্থিরতাকে সামনে রেখে লেখাটা পড়ি, তাহলে সম্পূর্ণ সনেটে ঐ বাড়তি দু-মাত্রার ঋণ কিন্তু শোধ হয়ে যায় । কবিতাটির নাম ‘নৈশাহার’ । বইটির ২৭ নং পৃষ্ঠায় আছে একটি এক লাইনের একটি কবিতা :

সন্ধ্যায় কুণ্ঠিত হয়ে ভেড়ার রূপালি মেরু পাইনের বনে ঝরে যায়

আশ্চর্য এই কবিতাটির নাম ‘তারপর’ । এই বইয়ের ৩৫ নং পৃষ্ঠার কবিতাটি ভীষণ গভীর । তেমন গভীরতায় সত্যিই কি কোনও মেয়ের মন ফুটে উঠবে ? শরীর বা অঙ্গের বিভূতি জাগতে চাইবে ? তেমন কোনও মেয়েকে অন্ধকারে লেখা যাবে এই ‘চিঠি’ ?

নিজে থেকে জন্ম নেয় ঝরা পাতা, অন্ধকার নিয়ে ।

চাঁদের মতন কেউ নয়

অজান্তে নিষ্পাপ, যে তোমার নীলাভ আঙুলে

পৌঁছে দেয় চিঠি

যেন অন্ধকার থেকে সে একা ছুঁয়েছে তোমায় !

মাত্র ৩৯ পৃষ্ঠার এই কবিতার বই ‘আহিরীটোলা’ পড়তে পড়তে কেন টেনে আনলাম সুবীরদের বাড়ির ঐ প্রসঙ্গ ? প্রবন্ধের মধ্যে কেন লিখলাম গল্পের একটি সামান্য টুকরো ? কারণ, পরে অনেক ভেবেছি সুবীর কি সত্যিই কোনও অন্যায় করেছে রায়বাবুর স্ত্রীকে ভালোবেসে ? রুবিনার সমস্ত বিশ্বাস জিতেও যদি তার সঙ্গে গড়ে না ওঠে আত্মার সম্পর্ক, তা হলে তাকে বিয়ে করা কি সুবীরের পক্ষে কখনও উচিত হত ? আর সেই রায়বাবুর স্ত্রী, যিনি চমকে উঠেছিলেন আমাকে দেখে, যিনি সকালসন্ধে দুবেলা সুবীরের অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করতেন, হঠাৎ যদি প্রকাশ পেয়ে যায় তার অন্তরের দুর্বলতম জায়গাটি, তার ঘনিষ্ট অভাবটি, তা হলে সেটা কি খুব বেশি অন্যায় হবে ? সুবীরকে ঐ সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিতেই কি তার অসুস্থ মা চাইতেন রুবিনার সঙ্গে সুবীরের বিয়েটা কোনওমতে হয়ে যাক ? এসবের বিচার মনের মধ্যে শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিতই থেকে যায় । আজকের সভ্যতায় সাহিত্য লিখতে গিয়ে বুঝি, ভালোবাসা আজ বেঁচে নেই পারস্পরিকতায়, ভালোবাসা আজ কোনওমতে টিকে আছে একাকীত্ব ও প্রতিটি লেখার যন্ত্রণায় । ‘একটি কবিতা’ দিয়েই এ কথাটার প্রমাণ রেখে দিলাম :

যত দূর শিউলির ফুল ঝরে পড়ে, যেন ভুলেছি তোমায় ।

একদিন যেন আমি কোথায় পাতার ফাঁক দিয়ে

তাকিয়ে থেকেছি শুধু; তারপর ঘুমের ভেতর,

অন্ধকার শালবনে একা হেঁটে যেতে যেতে তুমি

কখন পড়েছে মনে, খোলা চুল, মৃত কোনো ঝর্নার মতো ।

কাব্যগ্রন্থ: অহিরীটোলা

কবি: অনিবার্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়

ভাষালিপি প্রকাশন

৮০.০০

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...