আলোর রঙ
উদ্দালক ভরদ্বাজ


অনেক জমানো তৃষ্ণা ছিল, আমাদের দুজনেরই। 
শৃঙ্খলিত শব্দ যত, দুরন্ত স্বপ্নেই মুক্তি, আগলহীন কথার উৎসার, মুক্তির ঝর্না । 
আর ঝর্নার পরিসরে, আমায় ঘিরে, তোমার শরীরের সবুজ, 
আমার আকাঙ্ক্ষার মত গাঢ়, পেলব, মসৃণ, 
সতেজ উদগ্র বনজমি । 

তোমার শরীর কোষের বৃন্তে, বৃষ্টির ফুলের মত কোমল চাবুক, 
আমার নরম আঙুলের চাপে জেগে ওঠ তুমি 
ভলকে ভলকে স্রোত, চাপা গুমরানি তার 
শুনতে পাই আমি । 

তোমার ঠোঁটের লালায়, আমি সব ফলের গন্ধ পাই, জানো, 
বেদানার রক্তিম ঘ্রাণ, চিকুর মাংসল পেলব, চঞ্চল আনারস… 
চেপে ধরে রেখেছি তোমাকে, আমার বুকের বোঁটায় 
আর তোমার শরীরী যৌতুক আমাকে প্রথিত করেছে
রক্তের সংজ্ঞায়, কোমল আঙুল গলে, অনায়াস প্রজ্ঞায়। 
ওকের আতর গন্ধ, স্মৃতির আখরোট, পিপুলের সবুজ অবয়ব 
আদিগন্ত ছড়ানো শরীর, উঁচু-নিচু সমস্ত প্রান্তর আমি 
ছুঁয়ে গেছি অঝোর চুম্বনে 

দুজনের, বুজে আসা, নিঃসীম সুখের চোখ, পিপাসার- 
নিশ্চুপ শব্দের পাহাড়, সেই শুধু জানে তার ভাষা, 
দু চোখের কোন কথা, জমা হয় কোন খানে গিয়ে। 
তুমি আছ, এখানে, আমার পৃথিবী হয়ে, চরাচরময় সুখে আমি 
এঁকে যাই তোমার সৌষ্ঠব, আমার অক্লান্ত হাতে, 
এই ঘরে, হাতের মুঠোয় আমার। 

তোমার না-থাকা তাই, কাঁপিয়ে দেয় সময়ের ঘড়ির টিকটিক 
অথচ, অলৌকিক আলোর স্রোতে আসো যখন, 
তোমার নিশ্বাসের তাপ, ছায়া ফেলে আমার আয়নায়, 
আমার হাতের নাগালে তুমি, তোমাকে আদর করে 
আমার ছায়াছন্ন দেহ। 
মুহূর্তে তোমায় থাকি, মুহূর্তে আমাতে, 
ঘুরে ফিরি সময়ের ঘেরে। 


তীব্র রক্তের স্রোত, ছুটে যায় বায়বীয় অলীক শিরায় 
আমার হৃৎপিণ্ড থেকে তোমার ধমনীতে । 
আমার শরীরের সবুজ প্রস্তাবে, অটুট নিসর্গ হয় তোমারও শরীর। 
সেই সত্য ভেদ করে আমি চলি, আমার আঙুলে ছুঁই, প্রত্যেক মন্দির চুড়া 
পাহাড়ে খাঁজে খাঁজে, খুঁজে নিই অটুট ছায়ার প্রবাহে লীন গাঢ় উপত্যকা। 
আমার মসৃণ হাত, তোমার নিবিড়ে ঘুরে, 
আত্মস্থ করতে চায় সবটুকু পেলব গাঢ়তা। 
খুঁজে পায় চঞ্চল ঘাসের স্রোতে, নিবিড় হাওয়ার ঘ্রাণ; 
সমুদ্র বাতাসের মত, ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় আমার সিক্ত হাত, 
নরম আঙুল। 

এ যেন ধরিত্রী যোনি, সসাগরা, ফুল্লর প্রফুল্লতায়, 
মাটির কামনায় আমার হাতের মুঠোয় পাই আমি। 
ঝরা পাতা উড়ে উড়ে যায়, মাটির নরম উষ্ণতায় ডুবে যাই আমি 
শরীর ত্রিভঙ্গে ওড়ে স্বপ্নের প্রজাপতি, 
ঘাসবন, উড়ে পড়ে পাতা; আবার, আবার, আবার। 
শিশির স্বেদের ঘ্রাণ, যেন চির উন্মন যুবক প্রেমিক 
সহজ দৃঢ়তায় জড়ানো কৈশোর কাঁধ। 
আমাকে ভরিয়ে দেয়, 
প্রেমে নয়, স্নেহে নয়, নম্রতায়ও নয়, জীবনই এসেছে যেন; 
জীবন্ত জীবন, দুহাতে জড়িয়ে থাকে সর্বাঙ্গ আমার। 
তোমার নিপুণ হাতে, দৃপ্ত সিক্ত ঠোঁট, কর্কশ বুকের আঘাতে 
সনির্বন্ধ নগ্নতায়, সঞ্জীবনী প্রেমে। 

আমার জিভে তখন আখরোটের গন্ধ; তোমার লালার থেকে শুষে নিই আমি। 
আমাদের সত্ত্বার অঙ্গরাজ্য, কখনো যায় নি দেশান্তরে; 
উত্তুঙ্গ পাহাড়ই চেনে পড়শি পাহাড়ের প্রাণ, 
কোমল কোরক, কোথায় নির্জনে জাগে… 
সেই গভীরতায় নেমে চিনেছি আমরা, নিজেদের। 

তোমার অস্তিত্ব শুধু দু এক মুহূর্ত ভাসে 
যেন এক স্বচ্ছন্দ চাদরে ঢাকে 
ভোরের ঠাণ্ডা বাতাস থেকে বাঁচাবে বলে। 
সকালের প্রতীক্ষায়, হয়ত আশঙ্কায় কিছুটা, 
উদ্বেগে দাঁড়ায় আমার স্নায়ুর পাশে- 
সলাজ যৌতুকে। 
যেমন জবাকুসুম 
প্রথম আলোর তাপে আমাকে ডুবিয়ে রাখে তীব্র কমলা রঙে, 
রাগের আকাশে। 

ভোরের হয়ে ওঠা দেখি আমরা; 
কোমরে জড়ানো হাত, সর্পিল বেষ্টনী তাপে, নিলাজ কৌতুকে। 
ভোর হয়, 
আমাদের ভালবাসার আঁচে নিকিয়ে নেয় আকাশ উঠোন, 
প্রথম সূর্যের রাগে, তন্বী কামনায়। 

অনুবাদ: উদ্দালক ভরদ্বাজ



Auxochrome, Chromophore

It was the thirst of many years restrained in our body. Chained words which we could not say except on the lips of dreams. Everything was surrounded by the green miracle of the landscape of your body. 

Upon your form, the lashes of the flowers responded to my touch, 
the murmur of streams. There was all manner of fruits in the juice of your lips, the blood of the pomegranate, the horizon of the mammee and the purified pineapple. 

I pressed you against my breast and the prodigy of your form penetrated all my blood through the tips of my fingers. Smell of oak essence, memories of walnut, green breath of ash tree. Horizon and landscapes = I traced them with a kiss. 

Oblivion of words will form the exact language for understanding the glances of our closed eyes. = You are here, intangible and you are all the universe which I shape into the space of my room. 

Your absence springs trembling in the ticking of the clock, in the pulse of light; you breathe through the mirror. From you to my hands, I caress your entire body, and I am with you for a minute and I am with myself for a moment. 

And my blood is the miracle which runs in the vessels of the air from my heart to yours. The green miracle of the landscape of my body becomes in your the whole of nature. I fly through it to caress the rounded hills with my fingertips, my hands sink into the shadowy valleys in an urge to possess and I’m enveloped in the embrace of gentle branches, green and cool. I penetrate the sex of the whole earth, her heat chars me and my entire body is rubbed by the freshness of the tender leaves. Their dew is the sweat of an ever-new lover.

It’s not love, or tenderness, or affection, it’s life itself, my life, that I found what I saw it in your hands, in your month and in your breasts. I have the taste of almonds from your lips in my mouth. Our worlds have never gone outside. Only one mountain can know the core of another mountain.

Your presence floats for a moment or two as if wrapping my whole being in an anxious wait for the morning. I notice that I’m with you. At that instant still full of sensations, my hands are sunk in oranges, and my body feels surrounded by your arms.

এটি কিন্তু চিঠি, কবিতা নয়। ভালবাসার চিঠি। কিন্তু বড় বিরল সৌন্দর্য ছড়ানো এই চিঠির ছত্রে ছত্রে। ভাবের আতিশয্যকে, কামনার অকুণ্ঠ উদ্বেলতাকে এভাবে শব্দে বাঁধতে খুব একটা দেখা যায় না। হয়ত একজন শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব জীবনের রঙ এ ভাবে অক্ষরের সাদায় কালোয় ধরে ফেলা। প্রত্যেক শব্দ যেন জড়িয়ে ধরে আছে অন্য শব্দকে। এই অলীক শব্দ-বন্ধের মায়ার ম্যাজিকের ছত্রে ছত্রে ধরা একটি স্বপ্নের রূপ। একটি মানবীর মনে প্রাণের পুরুষকে নিয়ে তার ভালবাসার সব টুকু রঙ। প্রেমের এই আশ্চর্য বাঙময় বর্ণনা পড়ে মনে হয় এ যেন সম্পূর্ণ একটি কবিতাই। স্পষ্ট, সুন্দর, নির্ভীক, আনন্দময়।

মেক্সিকান শিল্পী ফ্রিডা কাহলোর (জুলাই ৬, ১৯০৭ – জুলাই ১৩, ১৯৫৪), তাঁর প্রেমিক এবং পরবর্তীকালে বিবাহিত জীবনসঙ্গী ডিয়েগো রিভেরা কে লেখা অনেকগুলি চিঠির একটি চিঠি। সম্প্রতি “The Diary of Frida Kahlo: An Intimate Self-Portrait” নামে প্রকাশিত হয়েছে এই চিঠিগুলি। সঙ্গে রয়েছে আরও অসংখ্য ছবি, কবিতা ও নানান টুকরো লেখা, সবই ফ্রিডার ডায়েরী থেকে।

সেই বই থেকেই এই চিঠিটিকে বাংলায় অনুবাদ করার স্বাধীনতা নিলাম। ডায়েরীতে একটি আট পাতার অংশ জুড়ে রয়েছে দিয়েগোকে লেখা এই চিঠিগুলি। সেই চিঠির চারটি পাতা জুড়ে আছে অনূদিত অংশটি। কিছুই করতে হয় নি, শুধু চিঠির শব্দগুলিকে কবিতার আকৃতিতে সাজিয়ে দিয়েছি মাত্র। মূল মেক্সিকান থেকে ইংরেজিতে তর্জমা করেছেন বারবারা ক্রো ডি টলেডো (Barbara Crow De Toledo) এবং রিকারডো পোহলেঞ্জ (Ricardo Pohlenz).

ফ্রিডা চিঠিটির শীর্ষক রেখেছেন Auxochrome, Chromophore, কিন্তু এ দুটি শব্দের বাংলা অনুবাদ না করে একটা ভাবানুবাদ মত করে আলোর রঙ রাখলাম চিঠিটির (নাকি কবিতাটির) নাম। শেষের স্তবক দুটিতেও একটু ভাবনুবাদ করার স্বাধীনতা নিয়েছি।জানি নাকতটুকু ধরতে পারলাম শিল্পীর মনের ভাবটুকু, সে বিচার করবেন পাঠকেরা।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...