সুজনেষু…
ঈশিতা ভাদুড়ী

(১)
আমরা যেমন ভাব বিনিময় করেছি অনেক
রুলটানা কাগজ আর কাঠপেন্সিলে
আজকে কিশোর আজকে তরুণ ভাবে না সেসব…
আমাদের তখন স্মার্টফোন ছিল না, হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক, মেসেঞ্জার ছিল না। তখন আমাদের হাতে কাঠপেন্সিল ছিল, ফাউন্টেন পেন ছিল। আমরা একে অন্যের সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমে ভাব-বিনিময় করতাম। শুধুমাত্র ভাব-বিনিময়ের জন্যে নয়, দূরে বসবাসকারী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যেও পত্রের সূত্রপাত হয়েছিল। কবে থেকে শুরু সেটা অবশ্য আমার জানা নেই। তবে পোস্টকার্ডে, ইনল্যান্ড লেটারে বা খামে পত্র-বিনিময় প্রাচীন কাল থেকে নয় বলেই ধারণা। তা যাইহোক পত্রের বিভিন্ন ধরণ হয়, সেই নানারকম চিঠিপত্রের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য রয়েছে, ভাষাগত পার্থক্যও।
একসময় বিভিন্ন প্রখ্যাত মানুষের অটোগ্রাফ নিয়ে অটোগ্রাফ খাতা রাখারও প্রথা ছিল। কবি-লেখকদের চিঠি দেওয়ারও রেওয়াজ ছিল। এবং বলা বাহুল্য অপরিচিত গুণমুগ্ধ পাঠকের চিঠির জবাবও লেখক-কবিরা দিতেন তখন। এখন তো মানুষ কবি-লেখকের কাছে সরাসরি শারীরিক ভাবে পৌঁছেই যায়। কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় আমরা কবি-লেখককে চিঠি দিতাম, উত্তরও পেতাম। উলটো দিকের বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও আমি নবনীতা দেব সেনকেও পোস্টে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। নবনীতা দেব সেন অবশ্য আমার মায়ের বন্ধু ছিলেন, কিন্তু মোটেও সেই সূত্রে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান বা সম্পর্ক গড়ে ওঠে নি।
আমি অবশ্য কবি নবনীতা দেব সেনকে চেনার আগে গদ্যকারকেই চিনেছিলাম। তখন পনেরো বছর বয়স আমার। শারদীয় দেশ অথবা আনন্দবাজার অথবা অমৃত পত্রিকায় তাঁর একটি গদ্য পড়ে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। সেই যে লিখেছিলেন —
… কত্তা গোড়া থেকেই টেবিলের তলা দিয়ে গিন্নির শ্রীচরণে সতর্কতামূলক মৃদু ঠোক্কর দিচ্ছিলেন, এবারে বোধহয় ততটা মৃদু আর রইল না। কেননা গিন্নী ককিয়ে উঠলেন – ‘উহ! ও কী হচ্ছে? লাগে না বুঝি? তোমার পায়ে শু-জুতো আর আমার পায়ে যে চটি?’ অম্লানবদনে কত্তা বললেন ‘ওহো লেগে গেল নাকি? দুঃখিত।’ কিন্তু গিন্নি তাতেই যে থামবেন, তা তো নয়। – ‘আহাহা, তখন থেকে ইচ্ছে করে ধাক্কিয়ে এখন আবার বলছো – লেগে গেল নাকি? বা-রে মজা?’…
এই লেখা পড়ে লেখককে চিঠি না লিখে পারা যায়? পরবর্তীকালে আমাদের একাধিক পত্র-বিনিময় হয়, আমি লিখতে শুরু করি, এবং ক্রমশ বেশির ভাগ সময় ‘ভালোবাসা’-তে কাটতে থাকে আমার। এইভাবে কিভাবে নবনীতা দেব সেন মায়ের নয় আমারই বন্ধু হয়ে গেলেন, এবং মাসি থেকে দিদি। নবনীতাদি ‘ইলাবাসের জ্যাঠামশাই’ নিবন্ধে ২০০৩ সালে লিখেওছিলেন “গত পঁচিশ বছর অবশ্য সুনন্দার বড় মেয়ে ঈশিতাই আমার ‘ইলাবাস’এর বন্ধু”। একনিষ্ঠ পাঠক থেকে বন্ধুত্বের ধাপে উত্তরণ কম কথা নয়। এবং এই সম্পর্কের সূত্রপাত তো পত্রের হাত ধরেই।


শুধুমাত্র নবনীতা দেব সেন নয় বেশিরভাগ কবি-লেখকের সঙ্গেই আমার পত্রের মাধ্যমে প্রথম পরিচয়, সন্তোষকুমার ঘোষ, শংখ ঘোষ, পূর্ণেন্দু পত্রী, কেতকী কুশারী ডাইসন, মৈত্রেয়ী দেবী প্রমুখ কবি-লেখকরা আমাকে পত্রের মাধ্যমেই চিনতেন, আমাকে ইংল্যান্ড থেকে এরোগ্রামে কেতকী কুশারী ডাইসন চিঠি দিতেন, সহস্র কাজের মধ্যে থেকেও। তাঁর ‘নোটন নোটন পায়রা’ পড়ে তাঁকে যতটা চিনেছিলাম, তাঁর চিঠি পড়ে আরও বেশি । তাঁর চিঠি পড়েই আমার ইংল্যান্ডের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা জন্মেছিল। তাঁর বই-এর আলোচনা থেকে আরম্ভ করে অনেক বিষয়েই আমাদের ভাব আদান-প্রদান হতো।


এই পত্রালাপ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিন্নপত্রে লিখেছেন – “পৃথিবীতে অনেক মহামূল্য উপহার আছে, তার মধ্যে সামান্য চিঠিখানি কম জিনিস নয়। চিঠির দ্বারা পৃথিবীতে একটা নূতন আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মানুষকে দেখে যতটা লাভ করি, তার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে যতটা লাভ করি, চিঠিপত্র দ্বারা তার চেয়ে আরো একটা বেশি কিছু পেয়ে থাকি। চিঠিপত্রে যে আমরা কেবল প্রত্যক্ষ আলাপের অভাব দূর করি তা নয়, ওর মধ্যে আরো একটু রস আছে যা প্রত্যক্ষ দেখা-শোনায় নেই। মানুষ মুখের কথায় আপনাকে যতখানি ও যে রকম করে প্রকাশ করে লেখার কথায় ঠিক ততখানি করে না। আবার লেখায় যতখানি করে মুখের কথায় ততখানি করতে পারে না। এই কারণে চিঠিতে মানুষকে দেখবার এবং পাবার জন্য আরো একটা যেন নতুন ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে হয় , যারা চিরকাল অবিচ্ছেদে চব্বিশ ঘন্টা কাছাকাছি আছে, যাদের মধ্যে চিঠি লেখালিখির অবসর ঘটেনি, তারা পরস্পরকে অসম্পূর্ণ করেই জানে…”
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বাড়ি ইলাবাসে আমার অনেক সময় কেটেছে। ইলাবাসে বইয়ের আলমারীতে রবীন্দ্ররচনাবলীর প্রথম সংস্করণ ছিল, যতীন্দ্রমোহনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ, পরবরতীকালে দিদিমার তত্ত্বাবধানে, আজ আমার বইএর আলমারীতে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে আমি রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েছি প্রথম, তারপর পূর্ণেন্দু পত্রী –
…যে টেলিফোন আসার কথা সে টেলিফোন আসে নি
প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে
সূর্য ডোবে রক্তপাতে
সব নিভিয়ে একলা আকাশ নিজের শূন্য বিছানাতে
একান্তে যার হাসির কথা হাসে নি
যে টেলিফোন আসার কথা সে টেলিফোন আসে নি…
— যে কবি এমন সরল সুন্দর ভাষায় মনের রোমান্টিক ভাব ব্যক্ত করেন, তাঁর সঙ্গে আলাপ হওয়াটা খুব জরুরী মনে হয়েছিল সেদিন সেই কিশোরীর কাছে। ইতিমধ্যে বছর ঘুরে গেছে। ততদিনে আমি ‘কচ ও দেবযানী’ পড়ে ফেলেছি, অন্যান্য আরও বই। মন্ত্রমুগ্ধ পাঠক চিঠি না লিখে পারল না। কিন্তু পাঠক চিঠি লিখলেই বা তিনি কেন উত্তর দেবেন! তিনি তো শুধু কবি বা লেখক নন, তিনি শিল্পীও, ছবি আঁকেন, সিনেমা তৈরী করেন। তিনি কত বিখ্যাত মানুষ! তিনি পাঠকের ডাকে সাড়া দেবেনই বা কেন! কিন্তু আমার ভাবনা যথার্থ নয়, সপ্তাহ যেতে না যেতেই চিঠি এল, খামের ওপর সুন্দর হস্তাক্ষরে আমার নাম-ঠিকানা, অন্যদিকে তাঁর নাম। বিষয়টি কিন্তু সেইদিন কিশোরীর কাছে কমলা-হলুদ-সবুজ স্বপ্নের মতন-ই ছিল।


আনন্দ বাগচী লিখেছিলেন “…পূর্ণেন্দু পত্রী অন্য জাতের মানুষ, তাঁকে আমি ঈর্ষা করি, তিনি দুহাতে লিখতে পারেন। আশা করি ভাল আছ এবং ভাল লিখছ।”
ধীরে ধীরে রক্তের মধ্যে কবিতার শিরশিরানি অনুভব করছি। ইতিমধ্যে পাবলো নেরুদা পড়ে ফেলেছি। পড়ে ফেলেছি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শামসুর রাহমান, কবিতা সিংহ, আল মাহমুদ, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, নবনীতা দেব সেন, বুদ্ধদেব বসু, বিজয়া মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে প্রতিভা বসু, রমাপদ চৌধুরী, সন্তোষকুমার ঘোষ, দিব্যেন্দু পালিত, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মৈত্রেয়ী দেবী এবং আরও অনেককে, প্রতিদিনই নতুন নতুন আবিষ্কার। সেসব অনেক কাল আগের কথা।
মৈত্রেয়ী দেবী লিখেছিলেন আমায় “উপন্যাসটা যথার্থ উপন্যাস হয়েছে কিনা সেটাই বিচার্য, উপন্যাসের আড়ালে যে কাহিনী তাকে না খোঁজাই যুক্তিযুক্ত…”
বুদ্ধদেব গুহ লিখেছিলেন “… ঝাড়গ্রামে কোনো নির্জন পরিবেশে বাগান (বড় গাছের ও কাজুবাগানের) ওয়ালা কোনো ছোট বাড়ি বা বাংলো বিক্রী থাকলে জানাবেন…”
স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় প্রশ্ন করেছিলেন – “ ঈশিতা সন্তোষদার সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে? তিনি ঈশিতা নামটা খুব পছন্দ করেন”… সেসব বহুকাল আগের কথা। স্বাতীদির কথার সূত্র ধরেই এবং আমার অটোগ্রাফ খাতার আরেকটি পৃষ্ঠা ভর্তি করতেই সন্তোষকুমার ঘোষকে ভীরু মনে একটি চিঠি লিখেছিলাম এবং মোটেই তাঁর কাছ থেকে জবাব না আশা করেই পোস্ট করেছিলাম। কিন্তু অদ্ভূত অবাক করে সপ্তাহ না ঘুরতেই জবাব যখন এসে গেল হাতের মুঠোয়, তখন আর আমায় দেখে কে! আবার চিঠি, আবার উত্তর। কোনো একবার খামের ওপর আমার বাবার নামের শেষে Esq লেখা, অর্থ-উদ্ধার করতে হিমশিম, একে তো নিজের ভাষাই জানিনা ঠিকমতন, তার ওপর ইংরেজি! শ্রী বা মিস্টার তো বুঝি, কিন্তু নামের লেজে Esq কেন! সেটা বুঝতে অবশ্য আমাকে তাঁরই শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। সাহেবরা নাকি সম্মান প্রদর্শন করতে নামের শেষে Esq ব্যবহার করে! সন্তোষদা বলেছিলেন “… আমি রবীন্দ্রনাথকে দেখেছিলাম, তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি, সেদিক থেকে আমি ভাগ্যবান। রবীন্দ্রনাথকে দেখা মানে তাঁর নাক মুখ চোখ দেখা নয়, তাঁকে দেখা মানে সুইৎজারল্যান্ড বা কাশ্মীর দেখা। তাঁর একটা আলাদা কী যেন ছিল! তাঁর আসাটা অনেকটা আবির্ভাবের মতন। তাঁর একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব ছিল। তুমি ভাবছো আমি রবীন্দ্রনাথে আচ্ছন্ন, তা’ আচ্ছন্ন হওয়ারই কথা…”


(২)
জন্মসূত্রে আমার মা কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর পৌত্রী। আমার মায়ের অটোগ্রাফ খাতার শখ ছিল। সেই খাতায় অনেক বিখ্যাত মানুষের অটোগ্রাফ আছে। শুধু অটোগ্রাফ বা কবিতা নয়, মায়ের ভান্ডারে অনেক প্রখ্যাত লেখকের চিঠিও রয়েছে। সৈয়দ মুজতবা আলী, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, বনফুল, অন্নদাশঙ্কর রায় এবং আরও অনেকের।



সৈয়দ মুজতবা আলী মা-কে লিখেছিলেন – “আমার লেখা পড়ো, বেশী আপত্তি করবো না, কিন্তু পরীক্ষার খাতায় আমার লেখা নকল করো না, নির্ঘাৎ ফেল মারবে!” মুজতবা আলীর লেখা থেকেই আমরা জেনেছি যতীন্দ্রমোহন বাগচী জার্মান কবি হাইনরিশ হাইনের অনেক কবিতা অনুবাদ করেছিলেন, সেই অনুবাদগুলি যদিও পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষেরর সঙ্গে মায়ের যাবতীয় পত্রের আদানপ্রদান সব-ই তাঁর চোদ্দ / পনের বছর বয়সের। আমি যখন চোদ্দ, তখন মনে পড়ে বিভূতিভুষণ মুখোপাধ্যায় দ্বারভাঙ্গা থেকে বই পাঠিয়েছিলেন আমার আর আমার মায়ের জন্যে আলাদা আলাদাভাবে আমাদের নাম লিখে। অর্থাৎ পত্রালাপ শুধুমাত্র পত্রালাপেই আবদ্ধ নয়, সেখান থেকে একটি সম্পর্কেরও তৈরী হয়ে যেতো তখনকার দিনে।
(৩)
বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই
মাগো আমার শোলোক-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুর-ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে, —
ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা, একলা জেগে রই,
মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা-দিদি কই?
— প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেজে চলেছে এই গান, অনেক সময় কবির নাম না জেনেও এই গান আমরা গেয়ে উঠি। দিদিমার বাড়িতে বেড়াতে গেলে ‘ইলাবাস’ দেওয়ালে টাঙানো ‘সপ্তাশ্ব বাহিত সূর্য’ ছবিটি অপার বিস্ময়ে দেখতাম, বিশ্বকবি ছাড়াও সাত-সাতজন কবি-লেখক একসঙ্গে, তাদের মধ্যে একজন আবার আমার মায়ের পিতামহও বটে, এও কী কম আশ্চর্যের ছিল সেই বালিকার কাছে! সেই কিশোরীর কাছে! প্রমাতামহ যতীন্দ্রমোহন বাগচী যে রবীন্দ্রোত্তর যুগের অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন, সেই সত্যটি বুঝতে অবশ্য বেশ কিছু সময় লেগেছিল। অনেকদিন অবধি যতীন্দ্রমোহন আমার কাছে একটি নাম ছিলেন মাত্র, আর, স্কুল-পাঠ্যবইতে পড়া কবিতার রচয়িতা। দিদিমা এবং মায়ের কাছে শোনা গল্পই হোক, অথবা প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই’-ই হোক, অথবা গৌরী ঘোষের কণ্ঠে ‘পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী!/ আস্তে একটু চল না ঠাকুর-ঝি-/ ওমা, এ যে ঝরা-বকুল। নয়?’-ই হোক অথবা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী অথবা তরুণ সান্যালের কণ্ঠে ‘সিংহগড়’ কবিতার আবৃত্তি – ‘সিংহগড়ের সিংহ গিয়াছে – পড়ে আছে শুধু গড় – / তাই লও মাতা , হারায়ে পুত্র-তানাজী মালেশ্বর’ অথবা, ‘ওই যে গাঁটি যাচ্ছে দেখা ‘আইরি’ খেতের আড়ে – / প্রান্তটি যার আঁধার করা সবুজ কেয়াঝাড়ে , / পুবের দিকে আম-কাঁঠালের বাগান দিয়ে ঘেরা’ – কে যে মন্ত্রমুগ্ধের মত টেনে নিয়ে গেল ধীরে ধীরে যতীন্দ্রমোহন আবিষ্কারে!
তাঁর একাধিক পত্র খুঁজে পেয়েছি, অগ্রজের সঙ্গে যেমন, অনুজের সঙ্গেও সেইরকম। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন –”তোমার ‘রেখা’ পড়িয়া মুগ্ধ হইলাম। তোমার কবিতায় চিত্রাঙ্কনী-প্রতিভারও পরিচয় পাওয়া যায় । এক-একটি ছোটোখাটো রেখার টানে গ্রাম্যদৃশ্যগুলিও কেমন ফুটিয়া উঠিয়াছে। তোমার কবিতায় ‘ফড়িং’ ও ‘প্রজাপতি’ আদর পাইয়াছে। তোমার ছন্দোবন্ধ সুমধুর , ভাষা ও ভাবের উপযোগী। কোন কোন কবিতায় সুললিত সংস্কৃত শব্দের প্রাচুর্য, আবার গ্রাম্য-দৃশ্যের বর্ণনায় ভাবব্যঞ্জক চলিত গ্রাম্য-শব্দের নিপুণ প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়…”



রাজশেখর বসু যতীন্দ্রমোহনকে লিখেছিলেন – “আপনি গদ্যে পদ্যে সব্যসাচী সার্বভৌম…”
আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত প্রমুখ অনেকের হাতে-লেখা বেশ কিছু চিঠি খুঁজেও পাইনি আমি। রবীন্দ্রনাথ কোনো এক ৩০শে অক্টোবরে লিখেছিলেন – “তোমার রচিত গানটি আমি যাঁদের শুনাইয়াছি তাঁদের সকলেরই ভালো লাগিয়াছে। তোমার ঐ রচিত গানটি দেখিয়া মনে হয়, তোমার গান রচনা করিবার প্রতিভা আছে। আরও দুই একটি গান লিখিয়া পাঠাইলে সুখী হইব। তুমি কোনও দিন অবসরমত এখানে আসিলে তোমার গানটির সুর গাইয়া শুনাইব।”
দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন – “ এ কি রকম হলো? আপনাকে পত্র লিখিলে আপনি পত্র পান না। আপনার পত্রের উত্তরে আমি পত্র লিখে সটাং ডাকে পাঠালাম। এতখানি লেখা ব্যর্থ হয়ে গেল…”
যতীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন – “…তোমার বইখানির প্রচ্ছদপট ও বাঁধাই অল্পের মধ্যে বেশ সুদৃশ্য হয়েছে। আমার বই-এর কিরকম হবে সেটা প্রেসের লোক যাতে তোমার সঙ্গে পরামর্শ কোরে করে তার ব্যবস্থা আমি করব…” / “অচিন্ত্যর কবিতা পড়ার পর আমার মনে একটা impression থাকে, অন্য হিসাবে প্রায় নিখুঁত কবিতা প’ড়েও আমার তেমন impression থাকে না। রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী কবিদের লেখায় এই impression-এর অভাব আমি খুবই অনুভব করি। অচিন্ত্যর কবিতা বিশ্লেষণ ক’রে দেখেচি – অসামঞ্জস্য ও অক্ষমতাই তার মধ্যে বেশী, তবুও impression থাকে কেন? মেয়েমানুষঘটিত বলে নয়, একথা তুমি অনায়াসে বিশ্বাস করতে পারবে, কারণ কবিতায় আমার চেয়ে অস্ত্রৈণ একজনও নেই। অথচ আমার impression থাকে, তোমাদের থাকেনা, এর কারণ কি?…”


এভাবেই বছরের পর বছর পত্রের মাধ্যমে ভাব-বিনিময় হয়েছে, সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পত্রের মাধ্যমেই কবি-লেখকের সাহিত্য-বোধ এবং রসবোধের সঞ্চারণ ঘটেছে। আর সেইসব পত্রকেই পত্র-সাহিত্য বলা হয়। পত্র শব্দটি একেবারেই প্রয়োজনীয় বিষয় হলেও পত্রসাহিত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষত সাহিত্যের ক্ষেত্রে। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে ভাব ও সংবাদ আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনভিত্তিক এক জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম হলো পত্র বা চিঠি। সে জায়গায় এ পত্রই যখন সাহিত্য হয়ে ওঠে তখন তা ব্যক্তিক আবেদনকে অতিক্রম করে হয়ে ওঠে সার্বজনীন। বাংলা সাহিত্যেও এরকম বেশ কিছু পত্র সাহিত্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। নবীনচন্দ্রের ‘প্রবাসের পত্র’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বিলাতের পত্র’, স্বামী বিবেকানন্দের ‘পত্রাবলী’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে বাংলা পত্র-সাহিত্যের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান সবচেয়ে বেশি।



Shyamali Sengupta
June 28, 2021 |মূল্যবান,সবচেয়ে মূল্যবান।
Ishita Bhaduri
July 4, 2021 |ধন্যবাদ
LIPI SENGUPTA
June 30, 2021 |অসাধারণ! সম্বৃদ্ধ হলাম।
Ishita Bhaduri
August 9, 2021 |ধন্যবাদ
Puja Roy
July 6, 2021 |Eto puro treasure trove!
What an amazing collection. Bhishon bhalo laglo pore.
Ishita Bhaduri
August 9, 2021 |ধন্যবাদ