রুটি এবং চিঠি
তৃষ্ণা বসাক
চিঠির এত অসাধারণ ব্যবহার সাম্প্রতিক কালে চোখে পড়েনি। চিঠি মানে হাতে লেখা চিঠির কথা বলছি। ইলেক্ট্রনিক মেল বা ই-মেলের ব্যপক চালাচালির কল্যাণে এর একটা ডাক নামও জুটেছে। স্নেল-মেল বা শামুক-ডাক। নামটার মধ্যে চিঠির প্রবাদপ্রতিম মন্থরতার প্রতি বিলক্ষণ কটাক্ষ আছে। লোক মারা যাবার পর তার চাকরির নিয়োগপত্র এসে পৌঁছেছে, এমন ঘটনা অন্তত এ দেশে খুব বিরল নয়। অবশ্য সরকারি দফতরের অসাধারণ কর্মপটুতায় বিশ মাঝে মাঝেই চারশ বিশ হয়ে যায়। উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে পড়ে আর সেই ফাঁক দিয়ে দুর্ঘটনায় ‘মৃত’ ব্যক্তি হামেশাই নিজের শ্রাদ্ধবাসরে এসে হাজির হয়। দুটো উদাহরণই একটু চরম হয়ে গেলেও আমাদের প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থার হাল এ থেকে খানিকটা আঁচ করা যায়।তাই এই ভুবনগ্রামে সবাই যখন সব্বাইয়ের কাছে খুব দ্রুত পৌঁছতে চাইছে, তখন ই-মেলের চাপে যে চিঠি কোণঠাসা হয়ে পড়বে তাতে আর সন্দেহ কি? ‘চিঠি লিখে যাই, চিঠি তো হয় না শেষ’-র দিন শেষ। চিঠি লেখার অভ্যেসকে কী করে ফিরিয়ে আনা যায়, তাই নিয়ে অনেকেরই মাথা ঘামছে। কলকাতায় একবার চিঠি নিয়ে একটা প্রদর্শনীও হয়েছিল।
কিন্তু চিঠির এমন অভিনব উপযোগিতা কারোরই মাথায় আসেনি, যা করে দেখিয়েছেন পটনার অরবিন্দ যাদব। মুরগির মাংস খাবার সাধ হয়েছিল। জ্বালানির অভাবে তিনি আর এম এস-র বস্তা থেকে তাড়াতাড়া চিঠি বার করে জ্বালিয়ে দেন। দুবাই, রামগড় এবং হোসিয়ারপুরের সেনাছাউনি থেকে পাঠানো বহু গুরুত্বপূর্ণ চিঠি ছিল তার মধ্যে। কীভাবে অরবিন্দ ওই বস্তার নাগাল পেলেন, কখন পুলিশ এসে হানা দিল তাঁর রন্ধনপর্বের মাঝখানে, এত সাধের মাংস শেষ পর্যন্ত অরবিন্দ খেতে পেলেন কিনা- এসব ধূসর বাস্তবতায় আমাদের কোনও দরকার নেই। আসল কথা হল, কৌতূককর হলেও অরবিন্দ কিছু চিন্তাভাবনা উশকে দিয়েছেন।
পুরনো বাতিল হয়ে যাওয়া প্রযুক্তিও কখনো কখনো আশ্চর্যজনক ভাবে বেঁচে থাকে, যদি সে তার প্রয়োগের নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে নিতে পারে। এইভাবে বেঁচে আছে ঘোড়ার গাড়ি, আবশ্যিক পরিবহন থেকে প্রমোদভ্রমণে নিজেকে বদলে নিয়ে। বেঁচে আছে লেটারপ্রেস, বৈদ্যুতিন হরফের (বিশেষ করে আঞ্চলিক ভাষাগুলোর) প্রায়শই অসম্পূর্ণ ও কদর্য দৃশ্যমানতার পাশাপাশি নিজের সুস্পষ্ট নান্দনিক রূপকে স্বতন্ত্র রেখে, এমনকি মেটাল গ্যালির বদলে নাইলোপ্লেট ব্যবহার করে সে নিজেকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। টিভির চাপে হারিয়ে যেতে যেতে প্রবলভাবে ফিরে এসেছে রেডিও। এক তো ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশনের (এফ এম) কল্যাণে তার সম্প্রচারের কম্পাংক, মান অনেক বেশি, দ্বিতীয়ত রেডিও, টিভির মতো এমন সর্বগ্রাসী মনোযোগ দাবী করে না, নিজের কাজের ক্ষতি না করেই মানুষ পেতে পারেন ব্যক্তিগত শ্রবণ সুখ, আবার ফোন-ইনের মাধ্যমে পেতে পারেন সখ্যের উষ্ণতা। মুদ্রণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর যেসব হস্তলিপিকার বা ক্যালিগ্রাফারারা হারিয়ে গেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্ম কি তাঁদেরও পুনরাবিস্কার করেনি? শংসাপত্র কি ব্যক্তিগত কোন সংগ্রহের অলংকরণে?
উদ্ভাবনী প্রয়োগ ক্ষমতা দিয়ে এমন অনেক বাতিল প্রযুক্তি বা অভ্যাসকেই আমরা পুনর্নবীকৃত করতে পারি।চিঠির ক্ষেত্রেই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন? এই ই-মেলের যুগেও চিঠি লেখেন, চিঠি পেতে ভালবাসেন- এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। চিঠি প্রীতির পেছনে যে শুধু হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখার মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা ও মানবিক আবেগ কাজ করে তা নয়, সুরক্ষা এবং স্থায়িত্বের প্রশ্নেও চিঠি অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। ইমেলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেতে মন ঠিক সায় দ্যায় না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তা এলেও। ডিজিটাল জলছাপ এবং আরও অজস্র অত্যাধুনিক অ্যান্টি কাউন্টার ফেটিং পদ্ধতি দিয়েও ইন্টারনেট নকল ঠেকানো যায়নি। গোপনীয়তার সমস্ত ব্যূহ চুরমার করে হ্যাকাররা ঢুকে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের অন্দরমহলে।
তাই চিঠির ব্যবহার কমে এলেও গুরুত্ব হারায়নি। চিঠির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডাকটিকিট, ই-মেলের এমন ভ্যালু অ্যাডিশন কোথায়? তার ওপর প্রতিদিন মেলবক্স খুলে রাশি রাশি জাংক মেল সাফ করা একটা বিরক্তিকর কাজ। মনে আছে একসময় ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষরে বিশেষ কোন দেবদেবীর নামে পঞ্চাশ থেকে একশোটি ওই একই বয়ানে চিঠি পাঠাবার হুমকি দিয়ে পোস্টকার্ড আসত। সেটাকে বলা যায় হাতে লেখা চিঠির দুনিয়ায় জাংক মেল। অবশ্য সে উপদ্রব কখনোই ই-মেলের মতো ব্যপক হয়নি। তবে বিদেশে লোকে তাড়া তাড়া কাগজের জাংক মেল পায়। প্রচুর কোম্পানি ডাকযোগে সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে তাদের পণ্যের ক্যাটালগ, মরশুমি সেলের অফার পাঠায়। সেসব ফেলে দেওয়া মেল পরে রিসাইক্লিইং করে কাজে লাগানো হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক কালে অরবিন্দ চিঠির যে উপযোগিতা দেখালেন তা এককথায় অনবদ্য। জঠরাগ্নি নিবৃত্ত করার চেয়ে মহত্তর প্রয়োগ আর কীই বা হতে পারে? রুটি সেঁকতে যদি চিঠি কাজে লাগে তবে মন্দ কি? বলা যায় না, অরবিন্দের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অনেকেই বাড়িতে জমা রাশি রাশি চিঠি এভাবে কাজে লাগাতে চাইবেন। এই মহান কাজে ব্রতী হতে চেয়ে নতুন করে চিঠি লেখা শুরু করবেন কেউ কেউ। কেউ তৃপ্তি পাবেন এই ভেবে যে অন্তত একটা ব্যাপারে ইমেলকে টেক্কা দেওয়া গেছে। আর যাই হোক, লক্ষ ই-মেল পোড়ালেও এক চামচ জলও গরম হবে না ! মনে হয় জ্বালানি হিসেবে প্রেমের চিঠি গুলোই বেশি উপযোগী হবে। প্রেমের মতো দাহিকাশক্তি আর কীসে?


