দাদরা
অশোক দেব
গোমতী
৫ আষাঢ় ১৪২৭
প্রিয়
তোমার নাম কী? মানে, মানুষে কী নামে ডাকে তোমায়? জানি, সে তোমার জানবার কথা নয়। আমি যে দাদরা বলে ডাকি, সে-ও কি জান তুমি? জান না। বৃক্ষের নাম এমন হয় না। কিন্তু তোমাকে দেখলেই আমার বুকের চামড়া বেজে ওঠে। টের পাই কী এক অনন্ত সারল্য নিয়ে আমি বেজে চলেছি। তাই তোমাকে দাদরা বলে ডাকি।
আজকাল তোমার সঙ্গে দেখা হয় না দাদরা। তোমার কী এক রোগ হল, সবচেয়ে সুন্দর শাখাটি রুগ্ন হয়ে পত্রবিহীন হয়ে গেল। যে সকল পাখি সেদিন দেখেছি, সেই রুগ্ন শুষ্ক ডালে, তারা যে মৃত পরে বুঝেছি। তোমাকে পেরিয়ে আমি ঝিলের কাছে যাই তো, সেখানে একটি কথা-বলা পাখি আমাকে বলল। বলল, বৃক্ষের মৃত্যুর আগে মৃত পাখিরাই শোকসভা করে ফেলে। সেই থেকে যাই না তোমার কাছে। নিষ্ঠুর? বলতে পারো।
কিন্তু, নিয়ত শোকসভা পেরিয়ে আবার একটা পক্ষীসভাতে যেতে ভাল লাগে, বলো? তথাপি একদিন যাব আমি তোমার কাছে। তাই এই চিঠি।
তুমি শোভা গুরতুকে চেন না? ‘রঙ্গি সারি গুলাবি, চুনরিয়া রে…?’ মনে নেই? জানি তোমার ঠিক মনে আছে। আমার নিহিত দাদরা একদিন তাঁর গায়কীর পেছন পেছন হেঁটে চলে যাবে। তখন যাব। দাদরাশূন্য হয়ে তোমার কাছে যাব আমি দাদরা। দেখব, সেখানে তোমার নিষ্প্রাণ শাখা থেকে নেমে একটি একটি পাখি একটা একটা মৃত্যুকে উড়িয়ে দিচ্ছে। সেই সূত্রে পাখিরা আমাদের আত্মীয়, না? আজকাল পায়ে পায়ে কে যেন নিক্কন বেঁধে দিল। পুরুষনিক্কন। হাঁটলেই সে শোনা যায়। আর শটিবন পেরিয়ে, মেঘলা ঘাসফড়িঙের বাসা পেরিয়ে, বেলফুলের ঝোপ পেরিয়ে সব আলোকবতী জোনাকি আসে। পায়ে পায়ে সে আলো খেলা করে দাদরা। সেইসব জোনাকিদের নিয়ে যাব তোমার কাছে? কারা যেন আজকাল কেবল মরে যায়। হাহা করে ওঠে আমার নূপুরবিহীন নিক্কন।
***
দাদরা,
নানা অকারণে আটকে গেলাম। তোমাকে আর লেখা হল না কিছু। এর মধ্যে আমি একটি কবিতা লিখেছি, জান? দাঁড়াও দিচ্ছি।
স্নানান্তে এসেছি দেব
তোমার মন্দিরে।
বাদলভরা আকাশে
আমাকে জ্বালাত বলো
আপন হৃদয়দীপ?
আমি তো এনেছি প্রভু
আমরণ উপাসনা।
উচ্চারিত
প্রতিটি ভ্রমর তুমি
পাঠিও তাহার কাছে,
যে আছে সুবল দূরে।
প্রভু
স্নানান্তে এসেছি দেখ।
এসেছি একাকী আর
আনিনি কিছুই পাপ,
স্বীকার করো এবার।
তাহাকে আলোক দাও,
পাঠিয়ে দাও যতটা
আমার আলো…
আমি ও তো জ্বলি
জ্বলতে জানি
নিজের আকাশে একা
নিদারুণ উপসবিতা।
এরপর আর কিছু ভাল লাগছে না দাদরা। আগামীকাল যাব তোমার কাছে। নিয়ো আমাকে। তোমার রুগ্ন শাখাটির নীচে বসব। এখন আর ফুল-পাখির দরকার নেই। ওসব রেখো না। জানই তো, স্বাদগন্ধের বোধ হারিয়ে ফেলেছি। দাঁড়াতে পারি না সোজা হয়ে। বুকে যে শ্বাস ভরে নেব তার আর জায়গা নেই। চোখে কী হল, কেবল নানাহ অন্ধকার জ্বলে নেভে। এই নিয়েই আসব আগামীকাল। দাদরা, আমাকে নেবে না?
তোমার
অশোক


