জোড়া চিঠি
তামিমৌ ত্রমি
এপারাঙ্গনা’র চিঠি
তোমার সহিত আমার মিলিবার পথটি কতই সহজ হইতে পারিত। ঘাসের পার্শ্বে ঘাস যেরূপ দাঁড়াইয়া থাকে; অকপট সাবলীল, অঙ্গাঙ্গী, তাহাদের হরিৎ হিল্লোল, আকাশের দিকে স্পর্ধা ভরিয়া মাথা তুলিয়া দাঁড়িয়া থাকা, বৈকালিক বাতাসে একে অপরের গায়ে ঢলিয়া পড়া, ভ্রমরের ভ্রষ্ট গুঞ্জনে দুইজনের কর্ণরঞ্জিনী বিনোদন, তাহার পর একদিন কাহারও পদভারে একইসঙ্গে পিষ্ট হইয়া মাটিতে মিশিয়া যাওয়া- এই যে তাহাদের একান্ত গোপনীয় নিত্য চিত্ত বিনিময়- এই যে তাহাদের নিত্য চিরন্তন সহাবস্থান, এই ভাগ্য তো বিধাতা আমাদের ললাটেও লিখিতে পারিতেন। কিন্তু এমন অকিঞ্চিৎকর তৃণতুচ্ছ দশা আমাদের হইবে কেন? আমরা অর্ধ অর্ধ হইয়া যে যার কম্প্রবক্ষ ভূমিতে দাঁড়াইয়া থাকিব আর আমাদের মাঝখান দিয়া মহাকালের স্রোত বহিয়া যাইবে। আমরা দূর হইতে কপালে হাত রাখিয়া রৌদ্র আড়াল করিয়া পরস্পরকে দেখিতে থাকিব।ঘোর বর্ষণে ছাতিটি মাথায় ধরিয়া পরস্পরকে দেখিয়া যাইব। নিকটেই ভেক ডাকিবে, তাহাদের কলরব বৃষ্টির কলকলে আমাদের অন্তরের সমস্ত আর্তি মিলিয়া মিশিয়া ঐ জলে বহিয়া যাইবে। তুমি ভাবিবে, আমার স্রোত তোমায় গিয়া ডাকিল, আমি ভাবিব বিপরীত ।
কার্ত্তিকের সন্ধ্যায় আমি একটি লাল শাল গায়ে জড়াইব তুমি একটি খদ্দরের জ্যাকেট পরিবে, আমরা পরস্পরকে দেখিব আর প্রত্যেক শিশির যাহারা আমায় স্নান করাইবে, আমি ভাবিয়া লইব, তাহা তোমার দ্বারা প্রেরিত, আমার প্রেরিত প্রত্যেক শিশির তুমিও মাখিবে তোমার মুখে, বক্ষে অন্তরাত্মায়..
আমাদের মধ্যিখান দিয়া মহাকালের স্রোত বহিয়া যাইবে।হেমন্তের মেঠো ধান্যের গন্ধ আমি এপার হইতে অঞ্জলি দিব, তুমি ওপার হইতে কুড়াইয়া লইবে।
বসন্ত আসিলে পলাশ শিমুল আবীর ফাগ একটি পাতার নৌকায় ভাসাইয়া দিব, তুমি তাহা মাখিয়া লইবে, তোমার ভাসানো ফাগ আমার কপোল রাঙা করিয়া দিবে, বাসন্তী রং খানি আমি আমার বক্ষে মাখিব, পলাশ গুঁজিব খোঁপায়, আবীরের টিপ পরিব ললাটে। কিন্তু কিছুতেই ললাটকে বিশ্বাস করিতে দিব না, আমাদের একটা একটা করিয়া দিন চলিয়া যাইতেছে,কত বৈশাখ থেকে বসন্ত যে গেল, আসিল, যাইবে, আসিবে, আমাদের চর্ম কুঞ্চিত হইবে, কেশদামে দুধের সর জমিবে, তবু…. আমাদের মধ্য দিয়া মহাকালের স্রোত বহিতে থাকিবে।আমরা কেউ কারোকে পাইব না, কেউ কারোকে হারাইব না। আমরা শুধু যে যার স্থানে মৃন্ময় মূর্তির ন্যায় দাঁড়াইয়া থাকিব, আর আমাদের চিন্ময়ী চক্ষুদুটি ঝাপসা হইয়া যাইবে, নয়নলোর উথলিয়া উঠিবার ঠিক আগে আমরা আঁখিঘাটে তাহাকে বাঁধিয়া ফেলিব। মনে মনে গর্ব অনুভব করিব ও পরস্পরকে অনুভব করাইব, আমাদের ভাগ্য তৃণতুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর নহে; তাহারা অত্যন্ত বিশেষ রকমের ; কন্টক কর্দম রক্তপাত দীর্ঘশ্বাস অনন্ত অপেক্ষা চিরন্তন বিচ্ছেদ অন্তহীন নিস্তব্ধ আর্তনাদ দিয়া সাজানো নিকানো গুছানো উঠানের ন্যায় অতি যত্নে নির্মিত। আমাদের এইরূপ নীরব বাগাড়ম্বরতা আর বিশ্রম্ভালাপ আমাদের বিড়ম্বিত মনকে কথঞ্চিৎ শান্ত করবে যখন, আমরা যে যাহার বাড়ির পথ ধরিবার আগে পরস্পরকে একবার দেখিয়া, না না, অবলোকন করিয়া লইব, মৃদু হাসিব….
আর আমাদের মধ্য দিয়া মহাকালের স্রোত বহিয়া যাইবে…
জানালাময়ীর চিঠি
তোমার আর আমার উভয়ের ভাবটি এই চিরন্তন ছবিটির ন্যায় যাহার কোমল দীপ্তি এক্ষণে আমার জানালার অন্তঃকরণ অনির্বচনীয় উপলব্ধিসমূহের স্রোতাধারায় ভাসাইয়া দিতেছে। দেখো, সূর্য এমনিতে কত উত্তপ্ত, গনগনে, সর্বসময়ে জ্বলিয়া জ্বলিয়া মরিতেছে। অথচ যে সূর্য নদীবক্ষে প্রতিবিম্বিত হইতেছে, তাহা কী শীতল! ভঙ্গুর! মায়াময়!
আমাদের সম্পর্কও তীব্র তীক্ষ্ণ প্রখর প্রজ্জলন্ত হইতেই পারিত। পরিবর্তে হইয়া গেল শীতল তিরতিরে ক্ষণভঙ্গুর, রহে কি রহে না.. যত না রহিয়া যায়, বহিয়া যায় তাহার চেয়ে বেশি…দেখো কী অক্লেশে অনায়াসে নিতান্ত স্বতঃস্ফূর্ততায় সূর্য নদীর ক্রোড়ে মাথা এলাইয়া পড়িয়া আছে, তাহার যেন আর কাজ নাই, কোথাও যাইবার নাই, নিজের সব শ্রমটুকু ভুবনকে বিনামূল্যে দান করিয়া সলিলের শীতল নির্ভার অমূল্য প্রেমটুকু কড়ায় গণ্ডায় লুট করিয়া হিসাব মিলাইয়া তবে তাহার শান্তি। কে বলিবে, এই সূর্যই আর কয়েক লহমা পরে ডুবিয়া মরিবে!
এ যেন স্বপ্নের প্রায়। কতবার স্বপ্ন দেখি, তুমি এমনি আমার ক্রোড়ে মাথা রাখিয়া চোখ বুজিয়া শুইয়া আছো, আমি স্রোত-অঙ্গুলিহেলনে বিলি কাটিয়া দিতেছি, তুমি আমার সেই তিরতিরে গোধূলি সোহাগ মাখিয়া লইতেছ অঙ্গে, অন্তরঙ্গে…. এ দৃশ্যের যেন লয় নাই; ক্ষয় নাই, মালিন্য নাই; এ ছবি যেন জগৎ তার দিগন্তব্যাপী দেওয়াল জুড়িয়া ধ্রুব নক্ষত্রের পেরেকে অন্তহীন টাঙাইয়া রাখিবার সঙ্কল্প করিয়াছে ।
কিন্তু হায়! এমন স্বপ্নও ডুবিয়া যায়।
কী থাকে সংসারে? কিছুই কী থাকে?সবই তো ডুবিয়া যায়। এই সূর্য ডুবিবে, এই নদীর প্রতিটি স্রোত মোহনায় পৌঁছিয়া সমুদ্রে ডুবিবে, নদীপারের চরটুকুও ডুবিয়া যাইবে একদিন, তুমি ডুবিবে, আমি ডুবিব, সবকিছুই ডুবিয়া যাইবে।কেবল আমাদের অনুভব, ঐটুকুই থাকিয়া যায়। আমরা আমাদের জীবন দিয়া যাহা অনুভব করিলাম, সেই অনুভবকে পূর্বজদিগের অনুভবের সহিত মিলাইয়া অনুজদিগের অনুভবকে আমরা সার্থকতা দান করিয়া যাইব। তাহারাও এই দৃশ্য দেখিবে, আমাদের পুরাতন অনুভব তাহাদের নূতন চক্ষে চিরন্তন অশ্রুপাত ঘটাইবে, নূতন বক্ষে পুরাতন স্বপ্নঘাত ঘটাইবে।অনুভবের এই পরম্পরার সমুদ্রে এক বিন্দু জল দান করা বা নিজেরাই বিন্দু হইয়া মিশিয়া যাওয়া, এইটুকুই তো লাভ; এইই তো পাওনা। নচেৎ জীবন যেখানে প্রশ্বাস আর নিঃশ্বাসের অপচয়মাত্র, সেখানে সঞ্চয়ের বিলাস – বাহুল্যের অবসর কই?


