হারানো দিনের প্রেমের চিঠি
অমিত গোস্বামী

প্রেমের চিঠি ছিল সেকালেঃ

হাই। হোয়াটস আপ? দূর-প্রবাস থেকে মোবাইলে সংক্ষিপ্ত বার্তা রূপসারির। রূপসারি আমার প্রথম প্রেমিকা। আমার মত নিকম্মা বেকার শব্দপাগলের হাত থেকে উদ্ধার করে তার বাপ-মা তাকে বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছিল। এখন সে দূরপ্রবাসেই থিতু হয়েছে। ওর বার্তার অর্থই বুঝিনি প্রথমে। অথচ ওর প্রথম চিঠি পেয়েছিলাম তেত্রিশ বছর আগে নীল ইনল্যান্ডে। লেখা ছিল – তুমি তা জান না কিছু, না জানিলে, / আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে! পোস্ট অফিসের ব্যস্ত পিওন রাস্তায় হাতে গুঁজে দিয়ে দৌড়েছিল। পড়ে ভাল লেগেছিল। জীবনানন্দ দাশ। তুমুল উৎসাহে উত্তর দিয়েছিলাম। সেই রবীন্দ্রনাথ, সুনীল, শক্তি ছাড়া গতি নেই… ভালোবাসা পিঁড়ি পেতে রেখেছিলো উঠোনের কোণে।/ ছায়া ছিলো, মায়া ছিলো, মুথা ঘাস ছিলো/ ছাঁচতলায় আর ছিলো বৃষ্টিক্ষতগুলি../ কিন্তু সে পিঁড়িতে এসে এখনো বসেনি কেউ / গভীর গভীরতর রাত শেষ হলো/ কেউ সে পিঁড়িতে এসে এখনো বসেনি। তারপরে চিঠি চালাচালি। পোস্টম্যানকে বন্ধু বানাতে হল। পাড়ার মোড়ে চা আর বাপুজী কেক। চারমিনারে তীব্র টান। চিঠির স্তুপে ভবিষ্যতের স্বপ্নের হাতছানি। উত্তরে লিখলাম – স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি আমি একলা কোনো নদীর ধারে, / বৃষ্টিরোদের রঙধনু মেঘ লালরঙা এক আলোর হারে  / আসল নেমে জলের পাশে / বলল এসো আমার কাছে / উড়িয়ে তোমায় নিয়ে যাব ভালবাসার সুরবাহারে,/ যাবে, যাবে আমার সাথে তালের দেশে ওই ওপারে ? তখন আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সদ্য চামচে হয়েছি। নিতান্তই তরুন অর্বাচীন। অতি স্পর্ধায় একদিন স্বাতীদিকে জিজ্ঞাসা করে বসলাম, আচ্ছা, স্বাতীদি, সুনীলদা আপনাকে প্রেম করার সময় চিঠি দিতেন? তখন স্বাতীদি তন্বী, দারুণ উজ্জ্বল, সুনীলদার সাথে মেড ফর ইচ আদার – ম্যাড ফর ইচ আদার। হেসে উত্তর দিলেন, এ গল্প পরে কখনও বলব। নাহ, আর সাহস করিনি। সুনীলদা চলে যাওয়ার প্রায় তিন বছর বাদে একটা সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আবার প্রশ্নটা করলাম। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমায় সেভাবে প্রেমের চিঠি দেয় নি সুনীল, যা দিত সব কবিতা, তখন বুঝি নি, এখন বুঝি। আমাদের বিয়ে নিয়ে যখন বেশ গোলমাল চলছে তখন কিছু কাজের চিঠি দিয়েছিল। সেগুলোয় আবেগ-টাবেগ বিশেষ ছিল না। তবে সুনীলদা তার বিদেশিনী প্রেমিকাকে চিঠি লিখেছিলেন কি না সে প্রশ্ন করতে সাহস পাই নি।

তোমার হৃদয়ে আমার ঘরঃ

বিখ্যাত ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন তার হবু স্ত্রীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘প্রিয় লিভি, তুমি সুন্দর … তোমার বিশাল হৃদয়ে আমাকে ছোট্ট একটি ঘর দাও… যদি আমি তা পেতে ব্যর্থ হই তবে সারা জীবন ঘরছাড়া যাযাবর হয়ে থেকে যাব।’ প্রেমপত্রের ইতিহাস বলে নেপোলিয়ন, স্যার উইনস্টন চার্চিল, বিটোফেন, মোৎসার্ট, জন কিটস, অস্কার ওয়াইল্ড, কাফকাসহ এমনি আরো সব বিখ্যাত মানুষদের প্রেমপত্রের গল্প এখনো আলোচনার টেবিলে গরম গরম পরিবেশিত হয়। কিন্তু সেই আলোচনায় নেই বিখ্যাত নারীদের প্রেমপত্র। বিজ্ঞানী মেরী কুরির জীবনে প্রেমপত্র তৈরি করেছিলো জটিলতা। পৃথিবীবিখ্যাত এই নারী-বিজ্ঞানী স্বামী পেরির মৃত্যুর পর জড়িয়ে পড়েছিলেন তরুণ বিজ্ঞানী পল ল্যাংভিনের সঙ্গে। মেরী কুরির মতো বিজ্ঞানীর প্রেম মানেই তো সংবাদের বিষয়। মেরী কুরি সেই তরুণ প্রেমিককে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। কিন্তু পল ল্যংভিন ছিলো বিবাহিত। তার স্ত্রী জেনে ফেলে এক পেশাদার চোরকে টাকা দিয়ে চুরি করায় পল ল্যাংভিনকে লেখা কুরির ভালোবাসার চিঠি। ল্যাংভিনের স্ত্রী রেগে গিয়ে কুরির লেখা সব চিঠি প্রকাশ করে দেয় একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকায়। সমালোচনার ঝড় ওঠে কুরিকে নিয়ে। তখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছিলো যে, সে বছর সুইডিশ একাডেমী দ্বিতীয়বার কুরিকে নোবেল পুরস্কার নিতে আসতে প্রায় নিষেধ করেই দিচ্ছিলো। মেরী কুরিও সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন পুরস্কার গ্রহণের ব্যাপারে। পরে আইনস্টাইনের পরামর্শে তিনি পুরস্কার নিতে হাজির হন। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে সেখানকার ৭৭ শতাংশ নারী প্রেমপত্র পেতে পছন্দ করেন। তারা সেসব চিঠির উত্তর দিতেও ভালোবাসেন। কিন্তু শেষ পর্য্ন্ত ই-মেইল আর মেসেঞ্জারের যুগে তাদের চিঠি পাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। মিতালি করতে হয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যাযের ‘সাদা পৃষ্ঠা তোমার সঙ্গে’। নারীবাদী বৃটিশ নারী গ্রেমিয়ান গ্রি ১৯৭৬ সালে তার প্রেমিকের উদ্দেশ্যে লিখেছেন ৩০ হাজার শব্দের প্রেমপত্র। কিন্তু সে চিঠি কোনোদিন ডাকবাক্সের আনুকূল্যই পায়নি। পোস্টই তো করেননি তিনি চিঠিটা। কারণ প্রেমিক ঔপন্যাসিক মার্টিন এমিস তখন আরেক লেখিকা জুলি কাভাংয়ের প্রেমে মত্ত। অতিসম্প্রতি সেই চিঠিটির কিছু অংশ ইংল্যান্ডের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

কবিদের ভালবাসার চিঠিঃ 

আমাদের দেশে কবিদের ভালবাসার কবিতা নিয়ে প্রেমপত্র লিখেছেন হাজারো প্রেমিক। প্রেমিকার কাছে মেলে ধরেছেন নিজেকে অপার মমতায় –  ভালোবাসা মানে দুজনের পাগলামি, পরস্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা; ভালোবাসা মানে জীবনের ঝুঁকি নেয়া, বিরহ-বালুতে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি; ভালোবাসা মানে একে অপরের প্রতি খুব করে ঝুঁকে থাকা; ভালোবাসা মানে ব্যাপক বৃষ্টি, বৃষ্টির একটানা ভিতরে-বাহিরে দুজনের হেঁটে যাওয়া; ভালোবাসা মানে ঠান্ডা কফির পেয়ালা সামনে রেখে অবিরল কথা বলা; ভালোবাসা মানে শেষ হয়ে-যাওয়া কথার পরেও মুখোমুখি বসে থাকা (‘ভালোবাসার সংজ্ঞা: কবি রফিক আজাদ)। কিন্তু কবিদের জীবনে প্রেম এসেছে। কিন্তু সেই প্রেমপত্র কিন্তু আমরা কখনও পুস্তকাকারে পাই নি। কিন্তু পাই নি কেন? উত্তরটা একবার আড্ডার মধ্যে বলেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘আসলে চালচুলোহীন কবিরা যখন প্রেম করেছে তাদের প্রেমিকারা তাদের চিঠির মধ্যে সেই পোটেনশিয়ালিটি দেখেন নি, যা সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতে লাভ হতে পারে। ফলে ফেলে দিয়েছে।‘ তবে জন কিটস আর ফ্যানি ব্রনের প্রেমের কথা কিন্তু জানা যায় তাঁর মৃত্যুর ৫৭ বছর পর। ফ্যানিকে লেখা কিট্‌সের প্রেমপত্রগুলি ১৮৭৮ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। তত দিনে কিটস কবি হিসেবে বিখ্যাত। বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে হইহই পড়ে যায় ইংল্যান্ড ও আমেরিকায়। অকালপ্রয়াত কবির অজানা প্রেমকাহিনি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। ফ্যানি ১৮৬৫-তে মারা গিয়েছিলেন। সমালোচনা হল, তিনি কিট্‌সের যোগ্য ছিলেন না। কিন্তু এই ফ্যানির প্রেমে পড়ে কিটস লিখলেন তাঁর কালজয়ী কবিতাগুলি, বিখ্যাত ‘ওড’গুলি যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে ইংরেজিতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক কবিদের অন্যতম হিসেবে স্থান দিয়েছে। একটি চিঠিতে কিটস লিখছেন, ‘… মানুষ ধর্মের জন্য মরতে পারে ভেবে আমি অবাক হয়ে গেছি… কেঁপে উঠেছি। এখন আমি আর কেঁপে উঠি না। আমিও মরতে পারি আমার ধর্মের জন্য। প্রেম আমার ধর্ম, আমি তার জন্য মরতে পারি। আমি তোমার জন্য মরতে পারি। এই ভালবাসার বিহনে আমি শ্বাস নিতেও পারি না।’ কবির শেষ প্রহরগুলি কেটেছিল গভীরতম বিষাদে। যক্ষাক্রান্ত কবিকে ডাক্তার পরামর্শ  দিলেন রোমে যাওয়ার। স্বাস্থ্যোন্নতির আশায় কিটস রোমে গেলেন। বুকে বিচ্ছেদের দুঃসহ বেদনা। ১৮২১-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি সব শেষ। থেকে গেল প্রেমপত্রগুলি।  ১৮৮৫ সালে বিখ্যাত সংস্থা সদবি-র নিলামে উঠল চিঠিগুলো। ক্ষুব্ধ অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর এক কবিতায় এই নিলামকে এক কবির অন্তরের স্ফটিকপাত্র ভেঙে ফেলার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তবে ভবিষ্যতে গবেষকদের কাছে চিঠিগুলো আলাদা গুরুত্ব পায়।   

প্রেমের বার্তা বর্তমানেঃ

শব্দ কি প্রেম বাড়ায়? নাকি শব্দচর্চা সুন্দর না হলে বন্ধনও আলগা দেখায়? কে জানে। তবে প্রেমপত্র লেখার চল এখন লুপ্তপ্রায়। তবু সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষেত্রে শব্দের ভূমিকা অনেক। প্রেমের শব্দ, ভালবাসার ভাষার উপরে কত কী নির্ভর করে, সে অভিজ্ঞতা এক-এক বয়েসের মানুষের এক-এক রকম। তবে জীবনের সবক্ষেত্রে বিবর্তণ একমাত্র স্ট্যাটিক। তাই ভালবাসার ভাষা পালটে গেছে। তাই বোধহয় এখনকার তরুন-তরুনীরা ‘ভালো আছি, ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ পদ্ধতিতেই বেশি বিশ্বাসী। তবে বেসিকটা একই আছে। বারবার বলার চেষ্টা ‘আমার ভিতরে বাহিরে আন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে’। তবে এদের কান্ডজ্ঞান কম। টিন-ছেলেমেয়েগুলোর কবজির কাছাকাছি গুচ্ছের কাটা-চেরার দাগ। কাঁদতে কাঁদতে শিরা কাটতে গিয়েছিল। অনেকে প্রেমের প্রাথমিক গদগদ স্টেজেই দিগ্বিদিক কাণ্ডজ্ঞানশূন্য হয়ে প্রিয় নাম দিয়ে পার্মানেন্ট ট্যাটু করিয়ে ফেলে। আত্মীয়ঘন পরিবেশে বেমক্কা মোবাইলে ওর ডাক এলে বেইজ্জতির ভয়, দুম করে কেটে দিলে ওর রাগের ভয়, প্রেমের কথা বাড়িতে চেপে রাখতে ভয়, উগরে দিলে তুমুল অশান্তির ভয়। তেইশের আগেই ব্লাডপ্রেশার, ইস্কিমিক হার্ট, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম। ধ্যাত্তেরি। সোশাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাসের রকমফের। প্রথমে – ইন এ রিলেশনশিপ, তারপরে – এনগেজড, এরপরে – কমিটেড অর্থাৎ প্রেম জমে ক্ষীর। তারপরেই ক্যাচাল-কীর্তণের সূত্রপাত। স্টাটাস – কমপ্লিকেটেড, তারপরে – ব্রেক আপ। কারোর বিরুদ্ধে কারোর অভিযোগ নেই। অবশেষে পুনর্মূষিকভবঃ – ওপেন রিলেশনশিপ। পুরো জিলে লে জিলে লে, আয়ো আয়ো জিলে লে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভাই তোমরা প্রেমপত্র লেখো না ? অবশ্যই লিখি হোয়াটস অ্যাপে। দেখানো যাবে? আমি প্রেমপত্রের বিবর্তণ নিয়ে কাজ করছি, অবশ্যই আরে দেখুন না আঙ্কেল। ‘হাই জানু, ফার্স্ট থিং আমি একটা জিনিষ বলি আমি ট্রু’লি তোকে ভালবাসি। বাট তোর বাড়ির কথা ভাবলেই মাথাটা ক্রাউডেড হয়ে যায়। এনি ওয়ে কে কী ভাববে ফরগেট ইট। আমি বেসিক্যালি তোকে নিয়ে ওয়েতে যেতে চাই না। হোয়াই টু বি ফিজিক্যাল সো মেনি টাইমস? … নাহ। আর পড়ি নি। বেশ ধাক্কা খেয়ে কিছু সময়ের জন্যে কুপোকাৎ হলাম। আঙ্কেল, আর ইউ ফীলিং আনইজি ? না, না, আমি উঠি।  ঠিক চলে যেতে পারব। ফেসবুক। চ্যাট। হোয়াটসঅ্যাপ। ইনস্টাগ্রাম। সেলফি। হুক্কাবার। ক্যাফে কফি ডে। ডেটিং..আজকের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রেমের প্রকাশ নাকি এ সবেই। তাঁরা নাকি প্রেমের গভীরতাটাই বোঝে না। আর ‘কমিটমেন্ট’? সেটাও নাকি তাদের কাছে ডায়নোসরের মতোই প্রাগৈতিহাসিক! সুদেষ্ণা রায় ও অভিজিত্‌ গুহর ছবি ‘যদি লভ দিলে না প্রাণে’ কিন্তু অন্য কথা বলে। দুই প্রজন্ম। দু’ রকম সময়। দু’রকম জীবনযাত্রার মধ্যে ছবির প্রতিটা দৃশ্য যাতায়াত করে কেবল এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ভালবাসা কি বদলায়? তাতেও কি সময়ের ছাপ পড়ে? আমার এক মনোবিদ বব্ধু বললেন, আজকালকার ছেলেমেয়েরা নিজেদের সম্পর্ক নিয়েই অনেক রকম ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করছে। নানা ধরনের প্রেম। নানা ধরনের বন্ধুত্ব আসছে, যাচ্ছে তাদের নিজেদের জীবনেই। চার পাশে প্রতিদিন দেখছে কত রকম সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, ভাঙছে, আবারও তৈরি হচ্ছে। আর এই সব দেখছে বলেই মা-বাবাদের বা বড়দের জীবনের ‘অন্য’ সম্পর্কগুলোকেও তারা বিচার করছে খোলা মনে। যেটা আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগেও ছিল না। ভুল না ঠিক এ সবের বাইরে গিয়ে কখনও বা মা-বাবার পাশে দাঁড়াচ্ছে তারা বন্ধুর মতোই। আসলে একাকিত্বের এই যুগে কোনও সম্পর্ককেই নতুন প্রজন্ম অস্বীকার করতে চাইছে না। তাই তাদের প্রেমবার্তাও আধুনিক হয়েছে। ছোট কথায়, কাজের কথায়।

পৃথিবীর দীর্ঘসময়ের প্রেমপত্রঃ

তবে সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘদিন লেখা প্রেমপত্র কোন বাঙালির লেখা নয়। সোভিয়েট ভেঙে যাওয়ার পর রুশ আর্কাইভে সন্ধান পাওয়া গেছে এই প্রেমপত্র সম্ভারের।  প্রেরক ও প্রাপক দু’জন- লেভ মিশচেঙ্কো আর স্বেতলানা ইভানোভা। পেচোরা গুলাগ ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা। স্টালিনের আমলে সাইবেরিয়ার গুলাগ ক্যাম্প ছিল এক বন্দী শিবির। লেভের বাবা ছিলেন ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী। গৃহযুদ্ধ বাধলে পরিবারটা চলে গেল সাইবেরিয়ার বেরিয়োজ়োভো শহরে। ১৯১৯-এ সে-শহরও বলশেভিকদের দখলে এল। ‘বুর্জোয়া’ আর বিরোধী পক্ষ ‘হোয়াইটস’দের সাফ করতে উদ্যোগী হল তারা। প্রথমে খুন হলেন লেভের মা, পরে বাবা। লেভ আর্মিতে যোগ দিল। ধরা পড়ল জার্মানদের কাছে। সোভিয়েট-মার্কিন যৌথ বাহিনীর কল্যাণে মুক্ত হল লেভ। তত দিনে যুদ্ধে হেরে গিয়েছে জার্মানেরা। দেশে ফিরতে চাইল লেভ। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে লেভকে দিয়ে সই করিয়ে নিল সোভিয়েট প্রশ্নকর্তারা। তারপরে জার্মান গুপ্তচর সন্দেহে  দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। এ বার ঠিকানা উত্তর মেরুর কাছে, পেচোরা-র গুলাগ-এ। সেটা ১৯৪৬। প্রথম চিঠি স্বেতলানার। জুলাই, ১৯৪৬। মস্কোয় বসে লিখছে, “এই যে আমি আছি, কিন্তু কী লেখা উচিত, জানি না— তোমার কথা মনে পড়ে। সে তো তুমি জানোই। আমি যেন সময় ছাড়িয়ে বাস করছি, জীবন কখন শুরু হবে তার অপেক্ষা, যেন একটা বিরতি চলছে।” লেভের জবাব, “তুমি এক বার জানতে চেয়েছিলে, আশা নিয়ে বাঁচা বেশি সহজ, না কি আশা ছাড়া। আমি কোনও আশা দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু সেটা ছাড়াও আমি শান্ত বোধ করছি।” শেষ চিঠিও লেভের। তারিখ ছিল জুলাই ১৯৫৪। এক বছর চার মাস পর মুক্তি পেল লেভ। তার আগে স্ট্যালিন মারা গেছেন। এর পরে বিবাহিত জীবন শুরু। লেভ-স্বেতলানার জীবনটা শেষ অবধি সুখেরই হয়েছিল। ২০০৮ সালের ১৮ জুলাই লেভ মারা গেল, ২০১০-এর ২ জানুয়ারি স্বেতলানা। মস্কোর গলোভিনস্কয় সিমেট্রিতেও আজও ওরা দু’জন পাশাপাশি শুয়ে। ইতিহাসবিদ অরল্যান্ডো ফাইজিস আবিস্কার করেছিলেন প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের ভারী লোহায় তৈরি, তিনটে তোরঙ্গ। তার মধ্যে পেলেন এই সম্ভার। তার চিঠির প্রতিলিপি করতে বছর দুয়েক সময় লেগেছিল। অজস্র সাঙ্কেতিক শব্দ তাতে। তার পর তাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলা, এলাকাগুলো ঘুরে দেখা। শেষে তৈরি হয়ে ওঠে এমন এক নথি, যা ইতিহাসের আকরও বটে। প্রাক্তন বন্দিদের বয়ানে গুলাগের ছবি পাওয়া যায়, তবে এমন দৈনন্দিন খুঁটিনাটি কোথাও উঠে আসেনি। ২০১৩ সালে  প্রকাশিত হয় অরল্যান্ডোর বই: ‘জাস্ট সেন্ড মি ওয়ার্ড’। দীর্ঘতম সময় জুড়ে লেখা প্রেমপত্র যা থেকে উঠে এসেছে সে সময়ের ইতিহাসের চালচিত্র।

প্রাক্তনীর প্রেমহীন বার্তাঃ

শেষ করা যাক আমার প্রথম প্রেমিকার বার্তার প্রসঙ্গ দিয়ে। পৃথিবীটা আজ ছোট হতে হতে হাতের তালুতে বন্দী। হারিয়ে যাওয়া প্রেমিক খোঁজ পাচ্ছে তার প্রেমিকার। প্রেমিকা প্রেমিকের। কখনও কখনও তারা আবার বন্ধু হচ্ছে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধার প্রেমের স্মৃতিচারণ জমে উঠছে। কেউ আবার আড়ালে ঘুরে আসছে প্রাক্তনের উঠোন থেকে। উপস্থিতির প্রকাশবিহীন পদচারনা। বর্তমানকে তো সামলাতে হবে। অনেকে আবার নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে জানতে চাইছে ‘কী, কেমন আছো’, জানাতে চাইছে দেখো তোমায় বিয়ে না করে আমি এখন কত্তো সুখী। আমি শুধু বুঝলাম যে রূপসারি জানতে চাইল আমি কেমন আছি ? সোজা করে উত্তর দিতেই পারতাম, বেমক্কা পাঠিয়ে দিলাম আমারই একটা কবিতার টুকরো –

হল তো বহুদিন রাখি নি কোন ঋণ দুজনে জীবনের দুই ধারে

রাখি নি যোগাযোগ করি নি কোন শোক পুড়েছে সব গাথা সৎকারে

নিয়েছি আমি তোর মাধবীলতা ভোর রোদের গন্ধটি প্রাণভরে

এই তো বেশ আছি সকলে কাছাকাছি গভীরে হৃদয়ের অন্তরে।

নাহ, আর তার কোন উত্তর পাইনি। 

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...