মা’কে লেখা চিঠি
অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

অন্য কোনো য়ুনিভার্সে বসেছ কফির কাপ নিয়ে।
অপোগণ্ড ছেলেগুলি ঘুমোচ্ছে, বাৎসল্যরসে
মুখগুলি দেখে নিলে, ঘুমোচ্ছে ঘুমোক নয়, আহা।
আজ তো তোমারও ছুটি, বেরোতে হবে না আটটা দশে।

অন্য কোনো য়ুনিভার্সে ক্লাসে পড়া হচ্ছে টেনিসন।
থার্ড বেঞ্চে মেয়েটির চোখ খালি জানালার দিকে
ভাবছো বকবে কি না, তারপর ফিক করে হাসো।
সবে মাত্র তেরো হল, জানো তো নিজের বড়টি’কে।

উচাটন মনগুলি জীবনের অমৃত-গরলে
অভিষিক্ত হল, খড়কুটো দিয়ে বোনা বাসাখানা
ছেড়ে তারা বহুদূর উড়ে গেল দিগন্তের দিকে।
বেজেছিল বুকে? না তো! এ-ই হয়, তোমারও তো জানা!

শরীরে বিষাদযোগ বেজে ওঠে মাঝেমাঝে তবু
বড় কষ্টে গড়া সেই বাসাই আপন য়ুনিভার্স
ফি বছর রং করাও, পর্দার কাপড় পাল্টাও
বইপত্র রোদে দাও, পোকায় কেটেছে “জীর্ণবাস”।

অবশেষে আমাদের দুটি বিশ্ব এক হল ফের
এবার বিশ্রাম শুধু, এবার সঙ্গী সঞ্চয়িতা।
নিবিড় পঠন নয়, স্মরণ-মননে ছুঁয়ে দেখো,
কী ভেবে শিয়রে রাখো বিবর্ণ প্রচ্ছদ সেই গীতা।

তারপর একদিন, যেমন পড়িয়ে দিতে ক্লাসে
জীর্ণ বইখানি থেকে তুলনীয় উদ্ধৃতি দিয়ে-
সফেন উচ্ছ্বাসহীন শান্ত জোয়ারে ভেসে গেলে।
দেখেছিলে তাঁর মুখ মৃত্তিকার প্রদীপ নিভিয়ে?

অন্য য়ুনিভার্সে তুমি ক্লাসে কী পড়াচ্ছো এখন?
পড়ুয়ারা বুঝতে পারছে ক্রসিং দ্য বার? টেনিসন?

এই তো ফিরেছি আমি, টিফিন করছি, হাতরুটি
আলুভাজা দিয়ে, তুমি বলছ, ওটা কি? কালোজিরে
চিবুকে লেগেছে বাবু, মুছে ফেল। ওই চোখ দুটি
দুই হাত হয়ে যেন রেখেছিল আমাদের ঘিরে।

ফিরেছি একটু আগে, আজকে ট্রাফিক ছিল খুব
রাস্তায় জল জমে গাড়ি বন্ধ, অনেকটা হেঁটে
দু পায়ে দারুণ ব্যথা, ঘুমিয়ে পড়েছি ডিভানেই,
মনে পড়ে মার্চেই দিয়েছিলে পিঠে বিলি কেটে।

বেলা একটায় রোজ দই, রুটি, সালাডের ডিবে
খুলে, লাঞ্চ ব্রেকে বসে অনিবার্য মনে হয়, কই!
আমি তো নোংরা করে খাচ্ছি, তুমি কেন বলছো না-
“বাবু, মুছে ফেল, তোর জামার কলারে লেগে দই।”

এখনো পিঠের’পরে তোমার ঈষৎ রুক্ষ হাত
মনে পড়ে, শাসনের, আদরের বাদী-সমবাদী
সরগম মুখস্থ, কেন মনে হয় অকস্মাৎ
তুমি কি আসবে আজ, ঘুমের মধ্যে যদি কাঁদি?

ইচ্ছে হয় সময়ের রেজগী ডুব দিয়ে তুলে আনি-
হাতে দিতে আমাদের দু-একটা, ছোট পার্স খুলে-
ক্লাস টু, নৈহাটি যেতে, মনে পড়ে? পুরনো দোয়ানি?
এমন মুহূর্ত কত বিসর্জিত, তুমি গেছ ভুলে।

না’হলে কী করি আমি বলে দাও, নিজেই মা হই?
রোজ সাতটায় ডেকে তুলব নিজেকে,” বাবু ওঠ!
আটটায় বেরতে হবে, রোদ উঠেছে, রেডি হলি কই?”
তারপর হাল ছেড়ে, বলব, “আচ্ছা, আরেকটু শো?”

তখনো ব্যস্ততা ছিল, অথচ ফুসফুস ভরা ছুটি।
ছিল প্রতি সন্ধ্যায় মা-ব্যাটায় বাংলা ছবি দেখা
সোশ্যাল মিডিয়া ছিল, বিশ্বজুড়ে ছিল খুনসুটি।
বসুধা বন্ধুতাময়, কখনোই ছিলাম না একা।

কালকে আপিস আছে, সপ্তরথী, চক্রব্যূহ, সব।
রাত দুটো-আড়াইটে, চোখে ঘুম নেই একেবারে।
ডেকে ডেকে হতাশ্বাস, ফিরে গেছে বন্ধু-বান্ধব,
উল্কাপিণ্ড,জ্বলে উঠে ঝরেছি বিপুল অন্ধকারে।

2 Comments

  • T Kar

    Reply August 21, 2021 |

    দারুণ লাগল। মনের গভীর থেকে মনের গভীরে! 🙏😊

  • Kalyan Pal Choudhury

    Reply August 21, 2021 |

    Ki bolbo balar Bhasha nei.
    Shomoyer shange shob shoye jabe, loke bale. Shotti ki?

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...