পুনশ্চ তোমায়
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

কৃষ্ণ বৃন্দাবন থেকে মথুরা যাবার সময় বাঁশিটি ছেড়ে গেলেন রাধার কাছে। বললেন, রাধে, মথুরায় তুমি থাকবে না, কার জন্য আর বাজাব, বলো? তোমার কাছেই থাক। রাধা বাঁশি লুকিয়ে রাখলেন কুলুঙ্গিতে, পাছে কেউ দেখে ফেলে, নিন্দেমন্দ করে। এমনিতেই কৃষ্ণকে নিয়ে সংসারে অশান্তির শেষ নেই। কিন্তু ঝোড়ো হাওয়া উঠলে সেই বিশ্বাসঘাতক বাঁশি বেজে ওঠে সুরে। বন্ধুত্বও অনেকটা সেই কৃষ্ণর বাঁশির মত। প্রায় সব বন্ধুত্বরই নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। বন্ধু চলে যায় কাজেকর্মে। যোগাযোগ কমে আসে। চিঠি লেখা হয়ে ওঠে না। শুধু যখন ঝোড়ো হাওয়া দেয় তখনই কেবল মন উচাটন পুনশ্চ বেজে ওঠে।  

বয়ঃসন্ধির অনেক আগের এক অনাবিল সময়ে পাড়ার একটি মেয়ে আমায় প্রথম ম্যাজিক রিয়ালিজমের গল্প শুনিয়েছিল। সে আমার থেকে বয়সে বেশ কিছুটা বড় ছিল। যখন কলেজে পড়ি তখন সে বিয়ে হয়ে চলে গেল অন্য শহরে। তার অনেক আগে, এক মায়াবী বিকেলে জল-কুমীর খেলা হয়ে গেলে সে ঘাসের ওপর বসে বলেছিল, জানিস, আমার মামার বাড়ি কত্ত উঁচু? আমি বললাম, কত? আকাশের মত? সে বলল, শোন না, একবার কী হয়েছে! সিঁড়ি ভেঙে উঠছি তো উঠছিই, শেষ আর হয় না। সিঁড়ি চড়তে চড়তে সবার খিদে পেয়ে গেল। তখন মা সিঁড়ির চাতালে স্টোভ ধরিয়ে রান্না চড়াল। আমরা ঝিঙের ঝোল আর ভাত খেয়ে, একটু ঘুমিয়ে নিয়ে আবার উঠতে শুরু করলাম।

আমি সেই গল্প একটুও অবিশ্বাস করিনি।  কারণ ছোটবেলায় আমরা যখন কোথাও বেড়াতে যেতাম আমার মাও সঙ্গে করে স্টোভ নিয়ে যেত। আমরা যেখানেই যেতাম অনেকদিন থাকতাম। বেনারস গেলে থাকতাম মধুকাকুর বাড়িতে। রাজগীরে তৃপ্তি হোটেল। দার্জিলিং গিয়ে উঠতাম ব্যাঙ্কের হলিডে হোমে। দার্জিলিং পাহাড়ে এদিক-ওদিক বেড়িয়ে ফেরার সময় বাবা বাজার করে আনত… শাকসবজি, মাছ। মা তড়িঘড়ি  কেটেকুটে রান্না চড়িয়ে দিত। জানলার বাইরে অন্ধকার, শীত। আমরা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঢুলতে-ঢুলতে ফোড়নের গন্ধ নিতাম। ডেকচিতে ভাত ফোটার ওম নিতাম। তখন বুঝিনি, সেইসব ছুটিগুলো সম্বৎসর হেঁসেল-ঠেলা মা, জুট্ মিলের লেবার ঠেঙানো বাবার মধ্যবিত্ত জীবনে পুনশ্চ হয়ে আসত।    

এখন যখন কোনও গল্পে জাদু লিখি, পাড়ার সেই মেয়েটির কথা মাথার মধ্যে কদাচিৎ ফিরে আসে। মেয়েটিও কি সেসময় অনবধানে ঠোঁট কামড়ে ফেলে? হয়তো সে মিথ্যে কথাই বলতে চেয়েছিল। জাহির করতে চেয়েছিল। কী আসে যায়? আমি তার কাছে প্রথম শিখেছিলাম কী করে পেনরোজের সিঁড়ি ভেঙে এক বাস্তব থেকে অন্য বাস্তবে চলে যাওয়া যায়। মানুষ যখন ব্যবহারিক জীবনে সীঁড়ি ভেঙে ওঠে তখন কি সে বুঝতে পারে বাস্তবিক সে সিঁড়ি ভেঙে নামছে? কৃষ্ণও কি রাধাকে প্রবোধ দিয়ে বলেননি, ক’দিনের তো মামলা, ফিরে আসব ঠিক। অথচ তিনি তো কোনোদিন ফিরে আসেননি, আবার এক মুহূর্তের জন্যও রাধাকে ছেড়ে যাননি।  

আসলে আমরা নিজেদের মত করে পৃথিবীটাকে ভেঙেচুরে দেখি। যে যত মাত্রার মানুষ সে তেমন দেখে। যেমন ত্রিমাত্রিক গোলককে দ্বিমত্রিক কাগজে প্রক্ষেপ করলে হয়ে যায় বৃত্ত। আমাদের দেখা সর্বদাই নিজস্ব মাত্রার মধ্যে সীমিত থাকে। আমার বিশ্বাস অবাস্তব বলে কিছু হয় না। মিথ্যে বলে কিছু হয় না। আমাদের দেখার দোষে আমরা অহেতুক সন্দেহ প্রকাশ করি। যে মাত্রা ছাড়ানোর জাদু জানে সে সত্যিটার খোঁজ পায়। মাত্রা ছাড়াতে-ছাড়াতে কোনও না কোনও মাত্রায় মিথ্যেটা নিছক সত্যি হয়ে যায়। তখন আমরা লিখি, পুনশ্চঃ লিখিও উহা ফিরত চাহ কিনা।

বন্ধুরা চলে যায়, বন্ধুরা ফিরে আসে। জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার-/ তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার! তখন তার চুলের মধ্যে নুন-মরিচ, চোখের কোণে মাকড়সার জাল। জিজ্ঞেস করি, চিনতে পার? নিষ্প্রভ চাহনি তুলে বলে, কে? আমিও তো প্রথমে তাকে চিনতে পারিনি। তারপর তার সঙ্গের তরুণীটিকে দেখে চমকে উঠেছি। সময় কি থমকে গেল? বাল্যকালের সখী পুকুরঘাটে বসে দেখাচ্ছে, দেখ দেখ, তেচোখা মাছ। আমি দেখছি পুকুরের জলে তার টলটলে মুখ। মেয়েটির মুখে তার মুখ কেটে বসানো। যেটুকু পার্থক্য সেটুকু ওই জলের আন্দোলনের কারণে। চোখ ফিরিয়ে পাশের জনকে ভাল করে দেখলাম আবার। ঠোঁটের ওপর ভাঁজ পড়েছে, ঝুল-বারান্দার মত তার কিনার ঝুঁকে পড়েছে চিবুকে। মনে করিয়ে দিতে গিয়ে থেমে গেলাম। বললাম, মাপ করবেন, আমারই ভুল। আপনাকে আমি চিনি না।      

আমি কোনওদিন তাকে কোনও চিঠি দিইনি। চিঠি দেওয়ার প্রশ্নই ছিল না। কারণ আমি তখনও চিঠি লিখতে শিখিনি। তারপর হাতে লেখা চিঠির যুগ এল, শেষ হয়ে গেল। এখন সব চিঠিই ডিজিট্যাল। হয় শূন্য না-হয় এক। হয় সাদা, না-হয় কালো। মাঝখানে গ্রে-শেডগুলো কোথায় হারিয়ে গেছে। যতবার ইচ্ছা ডিজিট্যাল চিঠির বয়ান বদলানো যায়। অবান্তর কথা শুধরে নেওয়া যায়। এখন আর ভালবাসি লিখে কেউ ঘুচিমুচি করে কেটে দেয় না। এখন আর চিঠিতে কেউ বানান ভুল করে না। একসময় চিঠি ছিল গোপনীয়তার সংকেত। মানুষ লুকিয়ে রাখত বইয়ের ভাঁজে, গয়নার কৌটোয়। এখন সবই খোলামেলা, কাজের কথা। এখন আর কেউ চিঠিতে পুনশ্চ লেখে না। লেখে না পুঃ- মেনি তিনটে বাচ্চা দিয়েছে। তুমি কবে ফিরবে?  

যখন চিঠি লিখতাম তখন ইচ্ছে করে সবচেয়ে জরুরি কথাটা তুলে রাখতাম পুনশ্চতে লিখব বলে। লিখতাম, আমার আগে তোমায় কি কেউ বলেছে, হাসলে তোমার গজদাঁত দেখা যায়? লিখতাম, আমার আগে তোমায় কি কেউ বলেছে, ভালবাসি? বললেও আমায় বোলো না। সহ্য হবে না। 

2 Comments

  • ঝর্না বিশ্বাস

    Reply August 21, 2021 |

    দূর্দান্ত…এ লেখা জমিয়ে জমিয়ে পড়ার মতন… বারবার পড়ার মতন, যেখানে ভালো লাগা কখনও ফুরোয় না…
    ভীষণ ভালোলাগল সিদ্ধার্থদা…

  • নূপুর গোস্বামী

    Reply September 25, 2021 |

    পাঠ তৃপ্তি একেই বলে!! অপূর্ব অপূর্ব!!

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...