পুনশ্চ-কথা
অর্ঘ্য দত্ত

লিখতে বসে, এমনকি ইতি লেখার সময়েও, যেমন প্রায়শই চিঠিতে পুনশ্চ লেখার কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকে না, তেমনি বম্বেDuck-এর ‘চিঠি সংখ্যা’ প্রকাশের সময়েও আমাদের ‘পুনশ্চ সংখ্যা’-র কোনো পরিকল্পনা ছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল যেন কিছু বাকি থেকে গেল। আর সেখান থেকেই ‘পুনশ্চ সংখ্যা’-র ভাবনা। ‘পুনশ্চ’ এই সংখ্যার বিষয় নয়, বরং শীর্ষক। বিষয় কিন্তু সেই ‘চিঠি’-ই।

আচ্ছা চিঠি লেখা সবিস্তারে শেষ করার পরেও কেন থাকত এই পুনশ্চ লেখার ঝোঁক? আমাদের ঘর-ব্যবহারের কেজো চিঠিপত্র, যা সাহিত্যপদবাচ্য ছিল না বলে ছিল না সংরক্ষণযোগ্যতাও, মনে আছে সেই সব হলুদ পোস্টকার্ড এবং ঘন আকাশি ইনল্যান্ড লেটার জুড়ে খুদে খুদে অক্ষরে লেখা চিঠির শেষেও হামেশাই থাকতো, ‘পুঃ-‘, অর্থাৎ পুনশ্চ। প্রেরকের যেমন চিঠি শেষ করার পরেও  মনে হতো সবটুকু বলা হলো না, হয়তো  হঠাৎ মনে পড়ে যেত এটা-সেটা, প্রাপকের কাছেও সেই অতিরিক্ত এক-আধটা বাক্য নিয়ে আসত এক অতিরিক্ত প্রাপ্তির আনন্দ। তৃপ্তি। ঠিক যেমন একালের শ্যাম্পুর কোনো কোনো বোতলের সঙ্গে মাঝে মাঝে পাওয়া যায় মুফত স্যাশ। ফাউ। পুনশ্চ যেন তেমনি। সত্যিই কি শুধুই তেমনি!

তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চিঠিপত্রেই শুধু নয়, বিখ্যাত মানুষদের ব্যক্তিগত চিঠিপত্র ঘাটলেও পাওয়া যায় এই পুনশ্চ-প্রবণতা। তবে ‘পুনশ্চ’ নামে গোটা একটি কাব্যগ্রন্থ যিনি লিখেছেন সেই রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রের শেষে  কিন্তু পুনশ্চ লেখার বিশেষ বাতিক ছিল না।  ছিন্ন পত্রাবলী, ভানুসিংহের পত্র, য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র, রাশিয়ার চিঠি, এমনি আরো কত, কিন্তু সেসবের কোথাও কোনো পুনশ্চ খুঁজে পেলাম না। হয়তো কী লিখবেন স্থির করেই তিনি  চিঠি লিখতে বসতেন। শুধু এক পত্রিকায় ক’বছর আগে প্রকাশিত তাঁর একটি চিঠিতে পেলাম, “বিনয়পূর্ব্বক নিবেদন এই যে যৌতুকদানের প্রথা আমার অনভিপ্রেত।”  চিঠিটি তাঁর দৌহিত্রী নন্দিতার বিবাহের আমন্ত্রণ জানিয়ে লেখা।  বিয়ের  নিমন্ত্রণপত্রের নিচে আজও অনেকেই এমন লেখেন। কিন্তু প্রায় পঁচাশি বছর আগে এমনটি লেখা নিশ্চিত ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত ছিল।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রেঙ্গুন থেকে ‘ভারতী’ পত্রিকার লেখক শ্রী মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়কে সাহিত্য সমালোচনা বিষয়ে এক অতি দীর্ঘ চিঠির শেষে লেখেন, “পুঃ- আপনার ভাষায় দু-একটা অতি তুচ্ছ খুঁত লইয়া প্রায়ই লোকজনকে হৈ চৈ করিতে দেখি। …আপনি জানিয়া শুনিয়াই ঐ ভাষা এবং বানান লিখিতেছেন–বেশ করিতেছেন। যাহা ভাল বলিয়া বুঝিয়াছেন–শুধু পরের কথায় ছাড়িবেন না।”  একশো সাত বছর আগে লেখা এই পুনশ্চটুকু পড়লে কি মনে হয় না যেন আজকের প্রজন্মের ফেসবুকে নিয়মিত লিখতে অভ্যস্ত লেখকদের উদ্দেশেই তিনি কথাগুলো লিখে গেছেন?

কাশীর সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তীকে ‘উত্তরা’ পত্রিকা বিষয়ে লেখা অতুলপ্রসাদ সেনের চিঠির শেষে পাই, “পুঃ- কাগজটা যদি আমার নিজের হইত, সম্মীলনীর মুখপত্র না হইত তবে নিজের দায়িত্বেই সব কাজ করিতাম।”  বারোয়ারি সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর মমত্ব টের পেলাম এই একটি পুনশ্চে লেখা বাক্যের মধ্যে দিয়েই।

চিঠির শেষে পুনশ্চ লেখা একটি অভ্যাস। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সত্যজিৎ রায়ের লেখা বেশ কিছু চিঠির নিচে পাই পুনশ্চ। ‘পুঃ-‘ করে লিখলেও সে সব কথা যে খুব গুরুত্বহীন কিছু তা কিন্তু নয়, বরং উল্টোটাই। যেমন বিদেশের এক বন্ধুকে  চিঠির নিচে লিখছেন, “পুঃ- সন্দীপের বিয়ে হয়েছে সম্প্রতি… আমাদের সকলেরই মনের মতো বৌমা হয়েছে।” অন্য আরেকটি চিঠির নিচে পাই, “পুঃ- বম্বেতে শ্যাম বেনেগালের Junoon দেখলাম। Technically চমৎকার ছবি, অস্ত্রশস্ত্রও দেখলাম বম্বে থেকে জোগাড় করেছে বেশ ভালোভাবেই; তবে কামান দাগাটা convincing লাগছে না; আর গল্পে কোথায় যেন একটা গলদ রয়েছে তার ফলে মাঝপথে এসে ছবি ঝুলে যায়।”

ভাগ্যিস উনি চিঠির শেষে পুনশ্চ লিখতেন, আমরা ব্যক্তি সত্যজিত রায়ের সঙ্গে আরো একটু বিস্তৃতভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাই।

চিঠির শেষে পুনশ্চে কোনো একটি বিশেষ বিষয়ের উল্লেখ, সে আমরা কমবেশি সবাই দেখেছি। কিন্তু একই চিঠির শেষে একাধিক পুনশ্চ? সেই বিরল দৃষ্টান্তও খুঁজে পেলাম ইনল্যান্ড লেটারে কবি ঈশিতা ভাদুড়িকে লেখা সন্তোষ কুমার ঘোষের একটি চিঠিতে। মূল চিঠির শেষে দেখতে পাচ্ছি পুঃ-১, পুঃ-২, পুঃ-৩। (ঈশিতা ভাদুড়ীর লেখার সঙ্গে আছে সেই চিঠির ফটোকপি।) ইনটারেস্টিং, তাই না?

কিন্তু এই যে এখন, চিঠিপত্র লেখার প্রয়োজন, রীতি, অভ্যাস কিছুই যখন প্রায় নেই, তখন আর পুনশ্চ কেই বা কোথায় লিখবে! এই সম্পাদকীয় লিখতে লিখতে যখন একথাটা ভাবছি,  চোখে পড়ল কবি সৌভিক বন্দোপাধ্যায়ের  ফেসবুকে লেখা একটা স্টেটাস। আর চমকে উঠলাম, সেই স্টেটাসের নিচে পুনশ্চ দেখে।  সৌভিক তার মূল বক্তব্যর নিচে লিখেছেন,”পুনশ্চ: বাঁধন-কে আগে দেখিনি। আজ দেখে বাঁধনে আটকে পড়তে সাধ জাগে আবার। কিন্তু, সে ক্ষেত্রে মৃত্যু অনিবার্য, জানি…।”    যে ফেসবুকে যতবার ইচ্ছা স্টেটাস এডিট করা যায়, কোনো কথা পোস্ট করে দেওয়ার পরে কিছু মনে পড়ে গেলেও এডিট করে মুহূর্তে মূল লেখাতেই যুক্ত করে দেওয়া যায়, সেখানেও পুনশ্চ কেন?

আসলে ‘পুনশ্চ’-রও আছে একটি নিজস্ব চরিত্র। আছে এক অনন্য আবেদন। পুনশ্চ কখনো কখনো চিঠির মূল টেক্সটের চেয়েও হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয়।

বম্বেDuck-এর এই ‘পুনশ্চ সংখ্যা’-ও তেমনটিই হলে বেশ হয়।

2 Comments

  • Ishita Bhaduri

    Reply August 19, 2021 |

    সম্পাদকীয় খুবই উচ্চমানের। লেখাগুলিও এক নিঃশ্বাসে যা পড়লাম, বেশ হয়েছে।

  • ঝর্না বিশ্বাস

    Reply August 20, 2021 |

    খুব সুন্দর সম্পাদকীয়। আগ্রহ প্রচুর এই সংখ্যা পড়ার। শুরুও করে ফেললাম।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...