একজন অনুবাদক ও একটি কিশোর
অনুপম মুখোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যে অনেক যোগ্য ও অসামান্য অনুবাদকরা আছেন। আমার প্রিয়তম অনুবাদকের নাম মণীন্দ্র দত্ত। আমার যতদূর ধারণা, উনি ওঁর সব অনুবাদের কাজ ‘তুলি কলম’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করেছেন। এখনও কি উনি সক্রিয় আছেন? আমি জানি না। কিন্তু ওঁর অনুবাদে শার্লক হোমস, এডগার অ্যালান পো, ওয়ার অ্যান্ড পীস পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। পরে অরিজিনাল সংগ্রহ করেছি, বা ইংরেজি অনুবাদেও কিনেছি, কিন্তু তার মধ্যে ডুব দিয়েও একই স্বাদ পেয়েছি।

          শার্লক হোমস আমার প্রিয়তম চরিত্র। বাংলায় শার্লক হোমসের অনেক চমৎকার অনুবাদ হয়েছে। অদ্রীশ বর্ধনের অনুবাদের কথা অনেকের মুখেই শুনি, নিজেও পড়ে দেখেছি, খুব ভাল। কিন্তু যদি হোমসের সমগ্র মেজাজ কেউ তাঁর অনুবাদে এনে থাকেন, তিনি মণীন্দ্র দত্ত। এই অনুবাদ চার খণ্ডে শেষ হয়েছিল।

          মণীন্দ্র দত্তের করা শার্লক হোমসের অনুবাদ আমার হস্তগত হয় নাবালক বয়সে, কিনে দিয়েছিলেন দিদিমা, তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। পুরো সেট হাতে আসতে আসতে ক্লাস এইট হয়ে যায়। সে বয়সেই বেশ অকালপক্ক ছিলাম। হোমসের অনুবাদে কিছু জায়গায় খটকার কথা জানিয়ে অনুবাদককে চিঠি লিখেছিলাম প্রকাশক ‘তুলি কলম’-এর ঠিকানায়। সেই চিঠির উত্তর এল আমার স্কুলের ঠিকানায়, কারণ চিঠিতে আমার কেয়ার অফ ছিল বাবার নামে, এবং আমি যে স্কুলে পড়তাম বাবা ছিলেন সে স্কুলের শিক্ষক। বাবা চিঠিটা স্তাফরুমে পেলেন এবং ক্লাসে আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন একজন শিক্ষাকর্মী মারফত।

সেই প্রথম আমার নামে কারও চিঠি এল। সেটাও আবার সাহিত্যসংক্রান্ত চিঠি।

মণীন্দ্রবাবু খুব যত্নসহকারে পোস্টকার্ডটি লিখেছিলেন। আমার সংশয়গুলোর নিরসন করেছিলেন। মজার কথা, আমি যে বয়সে খুবই ছোট, সেটাও উনি ধরে ফেলেছিলেন। আসলে বিশেষ রকমের একটা গুরুগম্ভীর চাল কেবল বাচ্চা ছেলেমেয়েরাই দ্যাখায়। সেটা হয়ত ধরে ফেলতে শার্লক হোমস হতে হয় না।

চিঠিটা এখনও সযত্নে রাখা আছে আমার কাছে।

এই সেই চিঠি।  এই চিঠিতেই কেউ প্রথম আমাকে অনুপম মুখার্জির বদলে অনুপম মুখোপাধ্যায় সম্বোধন করেছিলেন। বলা বাহুল্য, আজীবন যে জ্বালায় জ্বলতে হবে, তারই একটা নিয়তিনির্দিষ্ট আভাস চিঠির ঠিকানায় ছিল।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...