উপাসনা
অর্ণব সাহা

আজ এতোদিন বাদে তোকে এই চিঠি লিখছি এটা জেনেই যে এই চিঠি তোর কাছে আদৌ কোনওদিন পৌঁছবে না। এইমুহূর্তে সেই বৃষ্টিভেজা একঘেয়ে কলকাতার এই গলির দোতলার ঘরে শুয়ে মোবাইলে লিখছি এইসব হাবিজাবি। আমি বিগত ৬ বছর বহুবার তোকে প্রবল ঘেন্নায় দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছি। কিন্তু কোনোওবারই সেটা পারিনি। ব্যাঙ্গালোর আইবিএমের অফিসটা কীরকম দেখতে আমি জানি না। তোর ফেসবুক প্রোফাইল, ইনস্টাগ্রাম দুটোই লকড। ফলত তোর জীবন কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত আমি জানতেও পারি না। যদিও আন্দাজ করতে পারি। একটা সদ্য আঠারো বছরের চঞ্চল কিশোরীর মন কি আর কারও থাকে পঁচিশ বছরে পৌঁছে? এই ২০২১ সালে তো একেবারেই থাকে না। ওগুলো আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া, হেরে যাওয়া , অন্ধকার মানুষের জীবন ছাড়া এই উজ্জ্বল নতুন ভারতবর্ষের কোত্থাও আর অবশিষ্ট নেই। আমি জানি। তবু একটা নির্বোধ বালখিল্য মাঝবয়সী পুরুষ যার খানিকটা পরিচিতি ও সামান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠা রয়েছে, অথচ যার সামাজিক জ্ঞানগম্যি এক্কেবারে নেই তার মতো একটা অকিঞ্চিৎকর মানুষের জন্য কোনও পিছুটান তোর নেই, আমি জানি।

গতমাসে ফের আর একটা ২০ জুন চলে গেল। ঠিক ৬ বছর তুই আমার জীবন থেকে নিজেকে ছিঁড়ে নিয়ে চলে গেছিস। একটা শ্লথ পাখির অন্তিম ডানা ছিঁড়ে নিয়ে চলে যাবার মতো কাজ, তুই সেদিন হাসতে হাসতে করেছিলি। যেন একটা নতুন মজা, একটা নতুন সিনেমার ক্ল্যাইম্যাক্স শটে অভিনয় করার জন্য তোকে অফার করা হয়েছে আর তুই অনায়াসে ওই ছোট্ট রোলটুকু করে ক্যামেরার ফ্রেম থেকে বিদায় নিয়েছিস। আজ আর কষ্টও হয় না। কারণ তার চেয়েও ঢের বেশি যন্ত্রণার অসহায় সম্পর্কে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিতে দিতে আমি আজ নিঃস্ব।

আমি এই দাম্পত্যের ভিক্টিম। অস্বাভাবিক অপত্যস্নেহের কারণেই বোধহয় এতদিন এই নষ্ট দাম্পত্যের ঘর ছেড়ে যাইনি আমি। বিগত ২৫ বছর ধরে একটা মানসিকভাবে অসুস্থ মহিলার সঙ্গে নরকভোগ করছি আমি। যে আমাকে নিংড়ে নিয়েছে। ছিবড়ে করে দিয়েছে। কিন্তু আজ জল মাথার উপর দিয়ে বইছে। এইবার নতুন করে শেষ জীবনটুকু কাটিয়ে দেবার উপক্রম করতেই হবে আমায়। নইলে এটুকু জীবনও বাঁচব না আমি। প্রত্যেকটা দিন বিষাক্ত আমার। প্রত্যেকটা মুহূর্ত নরক আমার। আমি কীভাবে বেঁচে আছি, কেবল আমিই জানি।

প্রশ্ন হল এই কথাগুলো কেন তোকে বলছি আমি! আমার শৈশব কেটেছে একদা নকশাল-অধ্যুষিত দমদমের কলোনি পাড়ায়। প্রবল প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনন নিয়ে আমি বড় হয়েছি। ওটাই আমার ব্ল্যাকহোল। আমি কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারিনি। দাম্পত্য একটা প্রতিষ্ঠান। প্রেমও একধরণের প্রতিষ্ঠান। আমি ক্ষমতাকে ঘেন্না করেছি। ক্ষমতার প্রয়োগকে ঘেন্না করেছি। যেকোনও দাম্পত্য আসলে কুৎসিত দেওয়া নেওয়া আর ক্ষমতার বীভৎস খেলা বলে মনে করি আমি। আর এই অসহ্য কষ্টের মুহূর্তগুলোয় তোর কথাই মনে পড়ে আমার। কেন আরও কিছুদিন অপেক্ষা করলি না তুই? কেন থাকলি না আমার সঙ্গে? কেন হাতটা ছেড়ে গেলি দ্বিগুণের বেশি বয়সী একটা লোকের?

তোকে ব্লেম করছি না। বেশি বয়সের এই এক দোষ। বাড়তি কথা বলে ফেলি। কিন্তু এই ৪৫ পেরিয়ে একটা সম্পূর্ণ নতুন জার্নি শুরু করতে দম লাগে। সেই দম আমার আছে কি না জানি না। কিন্তু আমার এখনও মনে পড়ে গড়িয়াহাট মোড়ে তোর সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজা। সাউথ সিটি মলে তোর সঙ্গে আইনক্সের অন্ধকারে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে একটানা চুমু খাবার মুহূর্ত।

আমি আজও তোকে ভালোবাসি। তোকে কোনওদিন ভুলতে পারব না। জীবনের শেষ মুহূর্তে যেন তোকে পাশে পাই, এটুকু ঈশ্বর আমায় কৃপা করুন।

তুই তোর নতুন বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ভালো থাকিস। কখনও ব্যাঙ্গালোর গেলে যদি সম্ভব হয় তোর সঙ্গে দেখা করব। মিট করবি তো?

ইতি, তোর ‘বুড়ো’ স্যার।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...