অন্ধ পোস্টম্যান
সৈকত মুখোপাধ্যায়


মাঝে-মাঝে একটা পুরনো একতলা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কেউ আমাকে বলে দেয়নি, তবু আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই যে, অনেকদিন আগে ওই বাড়িটাতেই আমি থাকতাম। এইজন্মেই কখনো।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি কিছুক্ষণ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে পড়ে, বাড়িটা ছেড়ে যাবার সময় একজন, মাত্র একজনকেই আমার নতুন বাড়ির ঠিকানা না জানিয়ে চলে গেছি। সে জানে না যে, আমি বহু বছর যাবৎ এখানে থাকি না। পরম-বিশ্বাসে সে এখনো এই ঠিকানায় আমাকে চিঠি লিখে চলেছে।
এত বড় অন্যায়টা আমি কেন করেছিলাম? সেকি আমার শত্রু ছিল? মনে তো হয় না। শত্রুই যদি হবে, তাহলে এখনো এত অপরাধবোধে ভুগি কেন? কেন, প্রতিদিন একবার করে মনে হয় তার সামনে নতজানু হয়ে বসি। চোখের জলে তার পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিই।
কিন্তু কার কাছে ক্ষমা চাইব? সে কে? কিছুই মনে পড়ে না।
মরচে-পড়া ছোট গ্রিলের-গেটটা ঠেলে আমি ভেতরের জমিটায় ঢুকি। কেন যেন মনে হয়, এককালে আমি নিজের হাতে এখানে বাগান করেছিলাম। মনে হয়, একদিন সে যেন আমার গাছের ডালিয়ার প্রশংসা করে গিয়েছিল… চুপিচুপি। এখন সবটাই পোড়ো জমি। আমার পায়ের শব্দে শুকনো-পাতার ভেতর দিয়ে সড়সড় শব্দ করে গিরগিটি পালায়।
পায়ের নীচে পাতা মাড়িয়ে আমি বাড়িটার কাছে পৌঁছই। দেখি দেয়ালে শ্যাওলার দাগ; ভাঙা রেন-পাইপের খাঁজে বট-অশথের চারা। সদর দরজা তালাবন্ধ, তাই আমি বারান্দার গ্রিলের ভেতর দিয়ে বারান্দায় উঁকিঝুঁকি মারি। আশ্চর্য! কবেকার নাইলনের দড়ি, আমারই হাতে টাঙানো, এখনো রয়েছে। যাবার সময় দুটো কাপড়ের ক্লিপ খুলে নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। সে-দুটোও! তাদের পাশে একটা লাল ফড়িং বসে-বসে ডানা কাঁপাচ্ছে।
আমারও বুক কাঁপে। আমি গ্রিলের ফাঁকে মুখ গুঁজে দিয়ে দেখি, বারান্দার লাল সিমেন্টের মেঝে চিঠির স্তূপে ঢাকা পড়ে গেছে। গ্রিলের গা থেকে আমার দুই-গালে ধুলোর আড়াআড়ি দাগ লেগে যায়। যাক, পরে মুছে নেবো।
কতদিন ধরে জমেছে চিঠিগুলো? কতবছর ধরে? কত যুগ ধরে একটা একটা করে চিঠি জমলে বারো-বাই-চারের একটা বারান্দা এভাবে দু-হাত পুরু চিঠির স্তূপে ঢেকে যেতে পারে?
আবারও মনে-মনে বলি, ক্ষমা করো। ঠিকানা জানিয়ে যাইনি, তাই আজও বড় কষ্ট পাচ্ছ। ক্ষমা করো।
কাকে বলি? জানি না।
চশমার কাচের গা থেকে ভাপ মুছে নিয়ে ফের চোখে পরি। দেখি, বারান্দায় পড়ে থেকে-থেকে চিঠিগুলো রোদে পুড়েছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে। আবছা হয়ে গেছে তাদের গায়ে-লেখা নাম ঠিকানা। প্রাপকের জায়গায় কোনোরকমে আমার নামটুকু দেখতে পাই ঠিকই, কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও প্রেরকের নাম-ঠিকানা বুঝতে পারি না।
ওদিকে বেলা পড়ে আসছে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে কাঁঠাল-পাতার আড়ালে বসে শেষবারের মতন ঝগড়া করে নিচ্ছে শালিখ পাখিরা। অস্তসূর্যের আলো তেরছা হয়ে যেখানে এসে পড়ল, দেখলাম সেখানে চিঠির স্তূপের ওপরে পড়ে আছে একটা সাপের খোলস আর ঘুলঘুলি থেকে খসে পড়া দুটো চড়াইয়ের ডিমের খোলা। ফিকে নীল ইনল্যান্ড-লেটারের গায়ে শুকনো কুসুমের হলুদ দাগ।
হঠাৎই আমার মন কেঁদে উঠল। মন বলল, সময় নেই… আর সময় নেই। অন্ধকার নেমে আসছে। চিঠিগুলো কে লিখছে, কে পাঠাচ্ছে, সে তোমাকে কী উত্তর দিতে চাইছে— কিছুই না জেনে চলে যাবে?
আমি পাগলের মতন গ্রিলের সবচেয়ে নীচের নক্সার ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে একটা, যে-কোনো একটা চিঠি তুলে আনার চেষ্টা করি। আমার সাদা-জামায় ঝুল-কালি লেগে যায়, কাঁধ টনটন করে। লোহার গ্রিলের সঙ্গে ঘষা লেগে আমার চশমার কাচে আঁচড় পড়ে। তবু আমি একটাও চিঠির নাগাল পাই না। মরিয়ার মতন গ্রিলে ধাক্কা মারি। ভাঙে না। তালা-দেওয়া দরজায় লাথি মারি। খোলে না। বাগান থেকে একটা শুকনো ডাল কুড়িয়ে এনে প্রানপণে চেষ্টা করি, অন্তত একটা চিঠিকে কাছে টেনে আনতে। তার ফলে স্তূপ ভেঙে চিঠিগুলো আরো দূরে-দূরে ছড়িয়ে পড়ে।
সন্ধে নেমে আসে। আকাশ দিয়ে কাটা ঘুড়ির মতন লাট খেতে-খেতে ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুড় উড়ে যায়। ব্যর্থ আমি, বিষণ্ণ আমি, আবার গেট খুলে জনহীন মফস্বলের রাস্তায় বেরিয়ে আসি। সে-শহরের নাম জানি না, কিন্তু ভীষনভাবে চিনি। চিনি তার টাইপ-স্কুল, জানলা দিয়ে ভেসে আসা সন্ধের শাঁখের শব্দ আর বালিকাদের সারেগামা। চিনি তার রোগা ল্যাম্পপোস্টের গায়ে ঋতুবন্ধের বিজ্ঞাপন, তার বন্ধ-কারখানার দেয়ালের গায়ে চিনের চেয়ারম্যানের ছবি আর তার রেললাইনের ধারে চোলাইয়ের ঠেক। কিন্তু মনে-মনে এও জানি, নিজের ইচ্ছেয় আর কোনোদিন আমি এই শহরে ফিরতে পারব না।
আমার ওই তালা-দেওয়া বাড়িটা আগামী হাজার-বছর ওইভাবেই পড়ে থাকবে। শুধু প্রতিদিন একজন কেউ আমাকে কোনো এক ভীষণ জরুরি কথা জানিয়ে একটা করে চিঠি পাঠাবে, যে চিঠির নাগাল আমি পাব না।
হঠাৎই পেছন থেকে লোহার গেট খোলার টুংটাং শব্দ পাই। তারপরেই পুরনো সাইকেলের খড়খড়াং আওয়াজ। চমকে উঠি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, জ্যোৎস্নার মধ্যে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে পোস্টম্যান আসছে। আমি দুদিকে দুই হাত ছড়িয়ে তার রাস্তা আটকাই। বলি, একি! আপনি কখন ওই বাড়িতে চিঠি দিতে ঢুকেছিলেন? আমি তো একটু আগে অবধি ওখানে ছিলাম। আপনাকে দেখতে পেলাম না তো।
পোস্টম্যানের খাকি উর্দি জ্যোৎস্নায় সবুজ দেখাচ্ছিল। তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, মাটিতে একটা পা ঠেকিয়ে, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। বললাম, আজকেও কি বারান্দায় চিঠি ফেলে এলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
ক্রুদ্ধস্বরে বললাম, কিন্তু এত রাতে কেন? রাতে কেউ চিঠি বিলি করে? আপনার নামে আমি নালিশ জানাব।
তিনি একইভাবে মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। উত্তর দিলেন না।
অগত্যা সুর নরম করে বললাম, আমাকে একটু দয়া করুন। বলুন, কে আজও আমার নামে চিঠি পাঠিয়ে চলেছে। আমার জানা খুব প্রয়োজন।
পোস্টম্যান বললেন, বলতে পারব না।
কেন? কেন পারবেন না? কী মনে করেন আপনি নিজেকে? জানেন আপনার নামে আমি…
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি মুখ তুলে সামনের রাস্তার দিকে তাকালেন। দেখলাম, তাঁর দুটো চোখই নষ্ট লিচুর মতন সাদা। মণি নেই। সত্যিই তো, একজন অন্ধ পোস্টম্যান কেমন করে জানবেন প্রেরকের ঠিকানা। আমার পাশ কাটিয়ে তিনি শহরের অন্যান্য শূন্য বাড়িতে চিঠি বিলি করতে চলে গেলেন।

# # #

এইভাবেই আমি মাঝেমাঝে আমার ছেড়ে-আসা বাড়িতে যাই। আবার সেখান থেকে এখনকার ঠিকানায় ফিরে আসি। নির্জনতায়, নিঃসঙ্গতায়, অচরিতার্থে, ক্লান্ত-পায়ে ফিরে আসি। বুঝতে পারি, বহুবছর আগে কাউকে আমি খুব জরুরি একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলাম। প্রশ্নটার উত্তর জানতে পারলে, আমার জীবনটা হয়তো অন্যরকম হত। সে জানাচ্ছেও। প্রতিদিনই চিঠি লিখে আমাকে জানাচ্ছে। কিন্তু আমি জানতে পারছি না।
নতুন বাড়িতে পৌঁছবার আগে প্রতিদিনই আমাকে একটা পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে আসতে হয়। পার্কের রেলিং-এর গায়ে একটা ডাকবাক্স ঝোলানো আছে। কেউ সেটার যত্ন নেয় না। রং তো জ্বলে গেছেই, মেঝের টিনের পাতটা অবধি গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ভেঙে পড়েছে।
প্রতিদিনই আমি ফেরার পথে দেখি, সন্ধের মুখে একটি কিশোরী মেয়ে সেই ডাকবাক্সে একটা মুখ আঁটা চিঠি ফেলে দিয়ে চলে যায়। ভাঙা ডাকবাক্সের মেঝে গলে সেই চিঠিটা রাস্তায় পড়ে যায়। পড়ে থাকে। কিছুক্ষণ ধুলো মেখে ওড়াউড়ি করে। আমি বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ফিরিয়ে দেখি, সেই অন্ধ পোস্টম্যান পার্কের রেলিং-এর গায়ে তাঁর সাইকেলটাকে হেলান দিয়ে রেখে, হাতড়ে-হাতড়ে রাস্তায় পড়ে-থাকা চিঠিটাকে খুঁজছেন। খুঁজে পানও তিনি ঠিক। তারপর পরম মমতায় সেটাকে আঁজলায় তুলে নিজের পিওন-ব্যাগে ভরে নেন।
একেকবার ভাবি কাছে গিয়ে বলি, ওটা আমার চিঠি। আমাকে দিন। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারি, চাইলেও উনি দেবেন না। উনি চিঠিটাকে আবার সেই নামহীন মফস্বলের বারান্দাতেই ফেলে দিয়ে আসবেন। কারণ, চিঠির গায়ে ঠিকানা তো সেই ছেলেটিরই, যে একদিন জানতে চেয়েছিল্, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো। তারপর উত্তরের অপেক্ষায় বসে থেকে-থেকে, বসে থেকে-থেকে, একদিন মেয়েটাকে তার নতুন ঠিকানা না জানিয়েই যে চলে এসেছিল।


3 Comments

  • সুব্রত মণ্ডল

    Reply August 19, 2021 |

    মুগ্ধতা রেখে গেলাম

  • ঝর্না বিশ্বাস

    Reply August 20, 2021 |

    ভীষণ ভালো লাগলো। একটা ঘোর লেগে আছে এখনও। যেন স্পষ্ট দেখছি সেই বাড়িটা, চিঠির স্তুপ আর লিচুর মত সাদা চোখের পিয়নবাবু।
    অসাধারণ লেখা।

    • রঞ্জন দাশগুপ্ত

      Reply August 21, 2021 |

      জীবন জোড়া অপ্রাপ্তি হাহাকার করে ওঠে এই লেখা পড়ে।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...