অপ্রাপ্তবয়স্ক কঠোরদের জন্য কাব্য-
অমিতাভ প্রহরাজ


গা করতে এলাম তোমার কাছে। বুঝলে হে, ফ্যানটা বাড়াও আর কুঁজোর জল দাও দিকিনি এক গ্লাস, কাঁসার গ্লাসে দিও।

কতোদিন হয়ে গেল পৃথিবী চালানো হয় না, পড়ে আছে। আজ সকালেই হুলুস্থুলু, দেখি পূর্ণিমা শব্দের ধুতি খুলে গেছে, আর হাসতে হাসতে অভিধান পেট খুলে পড়ে আছে। পূরণমাসী পূর্বরাগ পূর্ণ পুস্তক সহ পূর্বদিক লুটোপুটি খাচ্ছে মেঝেতে, মায় আমার দু পায়ের মাঝ থেকে সেই শেষ কবে শোনা আদর পুরোনো, লাজুকলাল যেন, উঁকি মেরে দেখছে আর ফিকফিক ফিকফিক হেসেই চলেছে। পূর্ণিমা ন্যাংটো নিয়ে এমন লজ্জা দেখে কেই না হাসবে বলো? সেই তো সন্ধ্যে হলে ড্যাং ড্যাং করে আকাশে দাঁড়াবে, তায় কি পরা? না সবদেখানি সাদা আলোর ধুতি। তার আবার…

এইখানে এসে বুঝলে, কি না কি হয়ে গেল, গিলি গিলি গিলি গিলি গে হোকাস পোকাস আগডুম বাগডুম টিক টাক ঠাঁই ঠাঁই বলে। বুড়ো খিটখিটে রোদ তার লম্বা লাঠিটা ত্যারচা ভাবে জানলা দিয়ে ঢুকিয়ে রেখেছে… মেঝেতে তো হাসতে হাসতে পড়ে যাওয়া অভিধান সহ হট্টমেলা…ভোররাত থেকে দেখছি ফোঁটা ফোঁটা আলো বাড়ছে আর আয়না একটা একটা করে ঘরের আসবাব ঢুকিয়ে নিচ্ছে তার পেটে আর এখন মোটামুটি নিজের পেছন বাদ দিয়ে ঘরের প্রতটি কোন তার উদরস্থ… সারারাত লাফালাফি নাচানাচি করে বাকিদের সাথে ফিরতে পারেনি একটা নির্জন পোকা, অতিশয় সুচিন্তিত যেন, মন নীচু করে ছড়ানো ছিটোনো শব্দদের কাটিয়ে কাটিয়ে পেরোচ্ছেন এই খাঁখাঁ ঘরের মরুটিকে কোনাকুনি… আর কোথাও কিচ্ছু নেই, মাথার কাছে পাতাবন্ধ ল্যাপটপের শোঁ শোঁ নিঃশ্বাসের শব্দ, বুঝলে কিনা, কতকটা তোমার মতোই, ভাসন্তজন হয়ে আছে ঘরের ফাঁকার… এমনসময় আমার কেন যে প্রচণ্ড দেখা পেল, বারান্দার দিকটাতে… আর… বারান্দার…যেন… বেশ…বেশ… উসখুস জেগেছে, রেলিং টানটান করে শোয়া এই অবস্থা থেকে স্লাইট অপেক্ষা উঠে আছে,পৃথিবীত কিছুই নেই আর এককণা, নির্ণিমেষ মনে তাকিয়ে রয়েছে তো রয়েইছে… কোনো সুদূর বল্লম চক্ষুর দিকে উদ্যত… ঘামগন্ধে ভারি ও ভেজা ওপরে হাওয়ার চাঙড়খানি আর কোথাও অল্প অল্প করে টলটল হয়ে উঠছে জল তার আভাস আসছে…আর কোথাও কিচ্ছু নেই বিশ্বাস করো, আমার পাওয়া খুব দেখা আর আমাকে ছুঁয়ে নেই, নিজেকে পাতিয়েছে বারান্দার গায়ে… ঠিক মনে আছে, কোথথেকে একটা দমবন্ধ কাঁধে শিরশির বিদ্যুচ্চমকের মতো এলো আর পৃথিবীর সর্ব্বোচ্চ টানটান সমস্তে নেমে এলো………এটাই মুহূর্ত,কোথথেকে সাঁ উড়ে এসে বারান্দা ভেদ করে গেল একটা দোয়েল। ভেতরের রেলিং অবধি ঢুকে টাঙানো দড়িতে নিজেকে ছটফট ছটফট করে শক্ত করলো প্রথম দু চার সেকেন্ড… আর তার পর ট্যু-ই-ই-ই ট্যু-ই-ই-ই…

তখনই বুঝলে, আমার দ্বিতীয় ও শ্রেষ্ঠ অবা– আরে, অমন দাঁড়ানো বেঁটে ল্যাম্পপোস্টের মতো আলো ফ্যালফ্যাল করে কেউ অমন গপ্পো শোনে? তাও এই ঘুমচুম রাত্তিরে? আমি আবার পৃথিবী থামিয়ে দুপুর থেকে নিঝুম ভাজিয়ে আনলাম গরম গরম, যাতে জম্পেশ ঈশ্বরীর মতো দেখায় তোমাকে গল্পের সাথে?… অতিষ্ঠ অতিষ্ঠ এখনো অতিষ্ঠ করতে শিখলে না… মা গো, ভবিষ্যৎএ ওই কুচো টিপ ছাড়া তোমার কপালে যে কি আছে আমি জানিনা… দাঁড়াও, গল্পের বাক্যগুলো একটু সরাই, এখানে বোসো দিকিনি কাছের গায়ে, আর তোমার ওই ফ্যালফ্যাল ছাড়ানো অসম্ভব… একটা কাজ কোরো, তুমি তো আবার নারী, হা হা, ওই ওখান থেকে একটা দীর্ঘ-ঈ কেটে এনে ফ্যালফ্যালে পরিয়ে দিতে পারো, এ্যাটলিস্ট ফীল ফীল তো করবে…

হ্যাঁ, দীর্ঘ-ঈ, দীর্ঘ-ঈ, মানে কি যেন বলছিলাম… হুঁ, কোথথেকে সাঁ এসে বারান্দা ভেদ করে গেল একটা দোয়েল। ভেতরের রেলিং অবধি ঢুকে গেল, দিয়ে টাঙানো দড়িতে নিজেকে ছটফট ছটফট করে শক্ত করলো প্রথম দু চার সেকেন্ড… আর তার পর ট্যু-ই-ই-ই ট্যু-ই-ই-ই… এইটার সাথেই আমি দেখলাম আসল অবাক তো আমাকে গা করেই নি এখনো, এইবার করলো… ওই শিস থেকে শিথিল বেরিয়ে তারপর টান খেতে খেতে একটা ঋজু তীক্ষ্ণ ড্যাগার হয়ে হ্রস্ব-ই সটান গেঁথে গেল আমার দেখার ভেতরে একটি ছ্বলাৎ এ… আর আমি বুঝলাম যা আমি এতক্ষণ ভাবছিলাম যে বারান্দাটা কিছু একটা উত্তেজনায় আছে, আসলে তা নয়… যা ছটফট উসখুস নিচ্ছিল ক্রমাগত সেটা বারান্দা নয় দেখা… বারান্দা তো নিজেকে দেখার তলায় আছির মতো মেলে স্থির… আর দেখার মধ্যে তোলপাড় বেঁধে গেল… ওর আর চোখের সাথে সংস্পর্শই নেই, এক অন্য আদুড় গা হয়ে আছে… আর লোকে বলতো বটে আমার চোখ নাকি বহুদূর দেওয়া, কিন্তু আমি জানতামই না,হ্রস্ব-ই না গাঁথলে যে দেখার মধ্যে এমন লুকোনো গভীরও ছিল… এতোই গভীর যে একটা গোটা জলপ্রপাত খাড়া দাঁড়িয়ে পড়তে পারে আর তুমি শুধু দেখতে পাবে জলপ্রপাতের মাথার ওই ছোট ছোট জলের চুল!!… আর দেখা যে এমন আছাড়ি পিছাড়ি খেতে পারে আমার চোখের বহুদূরে, এ কে বিশ্বাস করবে… তারপর দোয়েলের লেজটা খালি টুক টুক করে নড়ে আর একটা ট্যু-ই-ই-ই যেন ওপর থেকে বারবার গেঁথে যায় দেখায়… হাওয়ার বদলে শুধু শ্বাসমাখানো হ-ধ্বনি তে মূর্হুমূহু ভরে আছে বারান্দার ওপর… আমি লক্ষ্যই করতাম না, চিত্রার্পিত চোখের ইশারায় দেখি দোয়েলের ওই ডীপ ব্রাউন ঠোঁট, মানে পাখিদের যেমন হয়, ওই ঠোক্কর ঠোঁট আসলে দেখার স্তনের বৃন্ত, শক্ত হয়ে আছে… আর এক একটা হ্রস্ব-ই কে আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় গভীর আঁচড় হয়ে ডুবে যাচ্ছে দেখার নখ… আর মায়ার তীব্র হচ্ছে ওই ধারালো হ্রস্ব-ই প্রবেশের মুহূর্তে দেখার চোখ মুখ শ্বাসরোধী বিস্ময় তুঙ্গ আনন্দিত হলে যেমন দেখায় আর তাতে হাল্কা লেগে আছে ওই টুকরো সুখের দোয়েল… সময় বলে কোনো কিছু নেই স্থানে, থাকতেও পারে না, নিঃশ্বাস দিয়ে মাপা যেতে পারে… তা ক নিঃশ্বাস আমি বলতে পারবো না, দোয়েলটা একটা জোরালো ট্যুইইইই করে উড়ে গেল সেই বারান্দা ভেদ করে আবার… আর আমি বুঝলাম কে যেন স্রোতের দৌড়ে আমার শরীর ছেড়ে চলে যাচ্ছে আর হাল্কা লাগানো হচ্ছে আমার মধ্যে…… বারান্দায় শান্ত এলিয়ে পড়ে দেখা রোদের এলামাটির মধ্যে মিশে যাচ্ছে… তো তারপর কি আর ঘরে থাকা যায়… ভাবলাম যাই ওই তোমার বড় আটপৌরে গা করে আসি… অপেক্ষায় কাঁটা হয়ে আছি… হাসছো যে বড়, জানোনা যা ফুটে যায় সে তো বস্তুত কাঁটা… মাটির কাঁটা গাছ, দেখার কাঁটা শব্দ… বোঝোনি কখনো, ফুল ফোটে, কাঁটা ফুটে যায়…

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...