দশমহাবিদ্যা
অরিজিৎ বাগচী
●মহাকালী
প্রেম ও মৃত্যুর মাঝে আত্মীয়
আমার কালো মেয়ে।
কালের বুকে এক পা নীরবতার উপকথা,
এক পা হননের কারিগর।
এক ধ্বংসের যুবতী।
নষ্ট হয়ে যাওয়া আলো থেকে সে করাল বদনা।
অহংকার শূন্যতার নরমুন্ড গলায়,
মানুষকে সুখী করার নির্মল আনন্দে
আমার মা তমসানন্দিত।
রজঃগুণে রূপান্তরিত হয়ে মেয়ের লাল জিভ বেড়িয়ে আসলে সত্ত্ব গুণের সাদা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে, অন্ধকারকেই অন্ধকার দিয়ে ধ্বংস করে চলেছে একটানা, আমার কালো মেয়ে।
●মহাতারা
আকাশ পিষেছে অলীক একশক্তি নীল হাতে,
সরস্বতীর বাম পায়ে মহাকাল, কপালে খেলা করে চাঁদ ও নদী একসাথে।
কবির বুকের তন্তু তার প্রিয় ভোজ
এখানে, শিব এই কার্নিশে সন্তান ,
ওই কার্নিশে মৃতদেহ।
বাতাসে হিল্লোল নিয়ে মগ্ন চৈতন্য মা আমার
ব্যাঘ্রচর্ম বসনা।
সৎ ও সর্বকালের সর্বনাশে আমার নীল মেয়ে।
● ত্রিপুরা সুন্দরী
স্বপ্নে দেখার মতো ছবি, মন চিত্ত ও বুদ্ধিতে
বিলি কাটছে ত্রিনয়নের মিঠে রোদ।
আয়ু ছিঁড়ে যায়, অরূপ জ্যোতির ছটায়।
ছোট গন্ডিতে গলিত স্বর্ণের মতো স্বর্গরূপ।
বাস্তবে আর কোথায় পাবে তুমি এমন
ষোড়শী রূপ?
● ভুবনেশ্বরী বা জগদ্ধাত্রী
বুক মুচড়ে নেমে আসে প্রতিবিম্ব,
রাত্রি মাখা নগ্নতা,
স্তন উঁচু হয়ে আছে সন্তানবাৎসল্যে।
কোমরে জন্মান্তরবাদের কাটা হাত,
কর্মফল থেকে যোনিলাভের আশায় ঝুলে থাকা এক অবিস্মরণীয় স্রোত
ধাক্কা খেল কালের বুকে।
মুখ চুন হয়ে আসে,
সেই হাহাকার শুধু নিজেই শুনতে পায় কালো মেয়ে।
উন্মত্ত ষোড়শী রূপ থেকে স্থির হয় মা,
অবতীর্ণ হয় জগদ্ধাত্রী রূপে।।
● ভৌরব কন্যা
আঙুলের ডগা থেকে,
প্রেম নয় ভালোবাসা নয়
দুলছে গা ছমছমে মৃত্যুর পথ,
শরীর ফুরিয়ে বয়ে যায় কামনা ও প্রলোভনের
দেবীছায়া।
ভেঙে পড়ে অলিন্দ থেকে নিঃসঙ্গ চিলের ডাক।
অস্ত্রহীনা এই যোগিনীরূপ জীবন ও মৃত্যুর মাঝে
এক ভয়ংকরিনী মনস্কামের সাঁকো মাত্র।
● ছিন্নমস্তা
নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে বেড়ে দিলে
কাঙাল যোগিনীদের মুখে শেষ খাদ্যকণা ,
মা সন্তানের জন্য নিজেকে খাদ্য বানাতে পারে
তুমিই তার উদাহরণ।
শূন্যরূপা সনাতনী এই মেয়ে –
কখনও সংযমের ভেতর ডুবে যাচ্ছে
কখনও বা যৌনশক্তির প্রতীক হয়ে জ্যোৎস্নার মতো দুলতে থাকছে কামদেবের বুকের ওপর।
নিজের হাতে নিজে ধরে আছে নিজের কাটা মুন্ডু,
গা ছমছম করে ওঠে গোলোক ধাঁধাঁয়।
কখনও প্রখর ভাবে জীবনদাত্রী , আবার কখনও জীবন হন্তারকের মতো আয়ু বিসর্জন করে দেয়।
মুক্তকেশীর চিরবৈরাগ্য এই জন্ম মাটিতে
লেগে আছে রক্তের তীব্র আঁচ।
● ধূমাবতী
খসে পড়েছে সাদা জবা,
পুড়ে গেছে সময় চিহ্ন,
অগ্নিস্নাত সমস্ত পৃথিবী এখন ধুলোময়।
ধোঁয়ার জটে কালো মেয়ে অলক্ষ্মীর অবক্ষয়চিহ্ন আজ,
এক জন্মদাগে বিধবা মূর্তি।
প্রচন্ড এক খিদের সামনে মায়ের কোনো ভয় নেই, আশা নেই,
মায়া নেই।
নিজের স্বামীকে অন্নের বদলে গ্রাস করে ম্লান ও বিবর্ণ হয়ে গেলে, সংসার ডুবে যায় ধুলোয়।
● বগলামুখী
মানসিক ভ্রম বিভৎস গলায় চেঁচিয়ে উঠলে
নড়ে ওঠে অন্তত শয্যা।
সংসার রসাতলে যাওয়ার আগেই
শিব নয় শব বা প্রেতকে বাহন করে
হাতে মুগুর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মা,
শূন্যে উড়ে যায়, ঝাপসা হয়ে ফুটে ওঠা
ঈর্ষা ঘৃণা ও নিষ্ঠুরতার কালো মেঘ।
সারস মুন্ড রূপে মা অন্ধকার ভেঙে ভেঙে খায়।
●মাতঙ্গী
মায়ের ক্ষুধার্ত শরীরে এখানে মানুষের উচ্ছিষ্ট ভোগ হয়। মানুষই এখানে ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব,
প্রতিটি মানুষই চণ্ডালিনী এই মায়ের কাছে একটুকরো রোদ। শক্তি ও জ্ঞানের এক পীঠ,
যা একমাত্র পাপের যবনিকাপাত ঘটাতে পারে,
ঘামের নুনও এখানে অমৃত হয়ে যায়।
বাতাসে কাগজঘুম দুলে উঠলে
দেবী সরস্বতীর তন্ত্র রূপের আবির্ভাব ঘটে।
● কমলাকামিনী
গোলাপি রাঙাবৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসে মা,
নারায়ণের নাভি পদ্ম থেকে মহালক্ষী
তান্ত্রিক মতে অবতীর্ণ হয়।
জলে চাঁদের মতো লুটোপুটি খায় সময়,
মা প্রকট হয় শুদ্ধ চৈতন্যের দেবী রূপে।
( উৎসর্গ কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় কে)
| ReplyForward |