ভাগশেষ
শরণ্যা মুখোপাধ্যায়
।।কথামুখ।।
“লেপচা ভাষায় লেখা? সেটা আবার আলাদা কোনো ভাষা নাকি?”
“একদমই আলাদা ভাষা। ওদের আলাদা অক্ষরও আছে। দার্জিলিং থেকে সিকিং, এ সমস্ত পাহাড়ি জায়গায় এই ভাষাই চলে। কিন্তু এই লেখাটা প্রাচীন লেপচা। সেটাই মুশকিল হয়েছে।”
“সে ভাষা আজকাল কেউ ব্যবহার করে? মানে কাউকে দিয়ে এটার পাঠোদ্ধার করানো যাবে?”
“জানি না। এই পুথি বহু প্রাচীন। কবে লেখা হয়েছিল সে নিয়েও প্রচুর ডাউট আছে। আধুনিক, কথ্য লেপচার সঙ্গে এর মিল থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু স্যারের মুখ থেকে শুনে যতটুকু বুঝলাম, এতে যা লেখা আছে, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমরা একটা বিরাট আবিষ্কারের খুব কাছাকাছিই দাঁড়িয়ে আছি।”
“কী করবি তাহলে এখন?”
“দুজোমের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা। তিনি এই লিপির পাঠোদ্ধার পারবেন বলেই আমার মনে হয়।”
“সে তো আজ একমাস ধরে করছি আমরা। কিন্তু তুই আগে আমাকে আসল কারণটা খুলে বলিসনি।”
“আজও বলতাম না, যদি না তুই আমার মোবাইল দেখে ফেলতিস।”
“কিন্তু কেন? আমরা এতদিন একসঙ্গে ঘুরছি, তুই কি আমাকে এতটুকুও বিশ্বাস করিস না?”
“এটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয়। কাজ হবার আগে কথা বলে দিলে সে কাজ ভেড়ে দেয়।”
“কী দেয়? ভেড়ে? মানে?”
“মানে ভেস্তে দেয়।”
“কে ভেস্তে দেবে? এই পাণ্ডববর্জিত বরফ-জঙ্গলে কে আছে তুই-আমি ছাড়া?”
“সে-ই দেবে, যার খোঁজে আমরা এতদূর ছুটে এসেছি।”
।।১।।
চিমনীগ্রামে সন্ধ্যা নেমে আসছে। হিলকার্ট রোড ধরে সোজা যে রাস্তাটা পাঙ্খাবাড়ির দিকে যায়, তার থেকে ডানদিকে বেঁকে অগনিত সময় ধরে উপরের দিকে উঠতে উঠতে হঠাৎ করেই পাওয়া যায় এই গ্রাম। পাইন বনের ভিতর দিয়ে যাঁরা ট্রেক করে কার্শিয়াং-এর বাগোরায় যান পাখির খোঁজে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ জানেন এই চিমনী গ্রামের কথা। কেউ কেউ-ই, কারণ সমতল থেকে প্রায় আট-হাজার ফুট উঁচু এই গ্রামে দেখার মতো তেমন কিছুই নেই। জায়গাটাকে এখন আর গ্রাম বলা যায় কিনা, তাতেও সন্দেহ আছে। মাত্র পাঁচঘর মানুষ থাকেন এখানে। সবাই লেপচা জাতির। বাকিরা উন্নত জীবনের খোঁজে নিচে নেমে গিয়েছে। কয়েকজন এখনো রয়ে গেছে তবু পাহাড়ী কুয়াশার রহস্য আড়ালে।
দাখমাদের পরিবার সেরকম উদাহরণগুলির একটি। শেষ-নভেম্বর মাসে সন্ধ্যা ছ’টায় এ সব অঞ্চলে গভীর রাত নেমে আসে। দাখমাদের বাড়িটা পাইনবনের ধার দিয়ে যে তিলতং ঝরনা বয়ে গিয়েছে, তার ঠিক পাশেই। অন্য দিন হলে দাখমা এতক্ষণে মা-কে মাংসের পোরিজ আর সুজোম খাইয়ে নিজের কাজে বসে যেত। তার ছোট্ট ঘরের বন্ধ কাচের জানালায় দূর থেকে যদি কেউ চোখ রাখত, তাহলে দেখতে পেত, একটা ফুটফুটে পাহাড়ী ফুলের মতো মেয়ে একমনে দাদুর জন্য দুম্প্রা বুনে চলেছে। পুরনো পোশাকটা বড্ড ছিঁড়ে গেছে যে। পাইন-ঘন অন্ধকারের বুকে একবিন্দু হলদে জোনাকির মতো জানালাটা এতক্ষণে জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু আজকের দিনটা অন্যরকম।
দাদু এখনও ফেরেনি।
তাদের বাড়িটা কাঠের। বছর-পঞ্চাশ বয়স হয়েছে। এক ইংরেজ সাহেবের তৈরি। এমনিতে বেশ শক্তপোক্তই। কিন্তু এখানে ইলেকট্রিক লাইন ততটা ভালো নয় এখনও। রাতের দিকে অনেক সময়ই আলো চলে যায়। আজকেও তেমন একটা দিন। মা এখনও জেগে। ঘরের তাকে রাখা শুভ্রবর্ণ বুদ্ধমূর্তির সামনে মোম জ্বেলে বসে আছে চুপ করে। দাদা চলে যাবার পর থেকেই মা খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। ততটা বয়স না হলেও অথর্ব হয়ে গিয়েছে। মায়ের দুলদুলে ছায়াটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে দাখমা। মা খুব ভয় পায়। দাদুর জন্য। তার জন্য। দাখমা জানে মায়ের ভয়টা হয়ত অমূলক নয়। কিন্তু… দুম দুম দুম। বাইরের দরজায় তিনবার ঘা পড়েছে। কেউ ডাকছে তাদের। এই শূন্যতায় ডাক পড়া একটা অদ্ভুত ব্যাপার। রাতের ডাক আর দিনের ডাক এক নয়। বিশেষত নিঝুম পাহাড়ে। দিনের ডাকের একটা নির্দিষ্ট নিষ্পাপ চরিত্র আছে, যেটা সূর্য ডুবলেই পাইনবনের না দেখা আলোর মতো বদলে যায়। ঘন নীল রঙের দামদিমটা বাঁ হাতে গুটিয়ে দাখমা দৌড়ে এলো। সে দাদুর হাতের আওয়াজ চেনে। সে জানে আজ পূর্ণিমা রাতে দাদু ওকে খাওয়াতে যাবে। খাইয়ে ফিরে এসে তাকে ডাকবে। সেই ফিরে আসার হাতের তালুর ছাপ যখন তাদের বাড়ির দরজার কঠিন কাঠে পড়ে, তাতে ক্লান্তি আর অবসন্নতার সঙ্গে মিশে থাকে তৃপ্তি। সেই ধাক্কায় কোনো ব্যস্ততা থাকে না। কারণ দাদু জানে আরো একটা মাসের জন্য সে নিজের কথা রাখতে পেরেছে। দুকো সামানকে দেওয়া কথার খেলাপ হয়নি আরও একটা বারের জন্য। কিন্তু এ ধাক্কায় সেই সুখানুভূতি নেই। এ যেন রাতের অজানা পেয়াদা। সেই যে, তাদের মুনপুরাণে লেখা আছে, দেবতা ইতবু রাম যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফ দিয়ে এই জীবজগত রচনা করছিলেন, তখন দু-একটা কালো পাথরও নিজেদের গায়ে বরফ মুড়ে দেবতার পরশ পাবার লোভে মিশে গিয়েছিল ভিড়ে। তার থেকেই তো রাতের যাদুদৈত্য এলো। এ ধাক্কা যেন সেই রাতের দৈত্যের!
“দাখু! দরজাটা খোল। আমি এসেছি।”
ভাবনার স্রোতে শব্দের পলি পড়ল। চমকে উঠল দাখমা। এ তো দাদুরই গলা। কিন্তু সে গলাখানা এত দুর্বল লাগছে কেন? বাইরের ঘনিয়ে আসা অন্ধকার আর বাড়তে থাকা নিঃশব্দ প্রান্তরে এ কোন অশনির সঙ্কেত?
চকিতে দরজাটা খুলল দাখমা। আর খুলেই চমকে গেল।
দাদুকে চ্যাংদোলা করে তুলে দাঁড়িয়ে আছে দুজন অচেনা মানুষ।
“প্লিস, আমাদের ঢুকতে দিন।” একজন পরিস্কার ইংরেজীতে বলল।
ভয়ে স্থবির হয়ে যাওয়া দাখমা যন্ত্রের মতো সরে দাঁড়ালো দরজা থেকে। দাদুর মাথা ফেটে গেছে। গায়ের পুরনো দুম্প্রাটা ফেঁড়ে গেছে এদিক সেদিক। সেই জায়গাগুলোয় লাল রঙের আঁচড় ফুটে উঠেছে।
“কী হয়েছে?” মা ঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে।
“তুমি ভেতরে যাও মা। আমি দেখছি।” মাকে দ্রুত ঠেলে ঘরের ভিতরে পাঠিয়ে দিল দাখমা।
।।২।।
“আসার কথা না থাকলেও যে আসে, সে বড় দুর্ভাগা হয়।”
দাদুর স্বর ক্ষীণ কিন্তু আগের থেকে অনেকটাই স্থির। শান্ত। নিস্তরঙ্গ। ইলেকট্রিক কানেকশন ফিরে এসেছে। দাদুর ঘরে এখন কম পাওয়ারের দুটো আলো জ্বলছে। ছোট্টো খাট, একটা আলমারি আর বইপত্রের তাকে খেলা করছে আলো–ছায়ার কুয়াশা।
“আপনাদের একটু স্টু দিই?”
দাখমা দাদুর খাটের পাশে এসে দাঁড়াল। দুই যুবকদের একজন বসে আছে দাদুর পায়ের কাছে। আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে মাথার কাছে। মাথার কাছের জন ব্যান্ডেজ বাঁধছে এখন। দাখমা ওদের কথামতো গরম জল, তুলো এনে দিয়েছে। এখন নিয়ে এসেছে ওদের নিজেদের তৈরি তিনেং তেল। বাটিটা প্রথম জনের হাতে এগিয়ে দিতে দিতেই কথাটা জিজ্ঞেস করল ও। তারপর বলল, “ব্যথা বা কাটায় লাগালে তাড়াতাড়ি কমে।”
দুজনেরই হাতে আর গালে অল্প কাটাছেঁড়া দেখা যাচ্ছে। জঙ্গলে চলার অভ্যাস নেই।
“হ্যাঁ, আমাকেও দে। আমারও খিদে পাচ্ছে এবার।” দাদুর কথা শুনে দাখমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল দ্রুত পায়ে।
“একটু সুস্থ লাগছে তো?”
ঘাড় নাড়লেন অশিতিপর লেপচা মানুষটি।
“এবার বলুন, কী জানতে চান আপনারা? আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। আপনাদের কথা রাখা আমার কর্তব্য। বলুন।”
ছেলে দুটি আশ্চর্য হয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল। তারপর মাথার জন বলল, “আপনি চেনেন আমাদের? জানেন কেন এখানে এসেছি আমরা?”
“দেখুন বাবুরা, আমার বয়স হয়েছে। এই দুনিয়া কম দেখিনি আমি। কোলকাতা থেকে এই রাতবিরেতে, এই ঠাণ্ডায় কোনো টুরিস্ট আসবেন না এখানে। এটা কোনো টুরিস্ট-স্পটও নয়। তাও আপনারা এসেছেন রাতে। ডাও হিলের দক্ষিণ পারের এই জঙ্গলে আসা নিষেধ। আপনারা জানেন না? সরকারি নোটিশ দেখেননি? ডিয়ার পার্কের এপারে আসা বারণ লেখা আছে যাতে? তা সে সব দেখার পরেও যখন সন্ধ্যের আঁধারে এই জঙ্গলে এসেছেন, তখন আপনাদের বিশেষ কিছু চাই, এ তো নিশ্চিত। তাই বলুন। কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি।”
“দেখুন, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমার নাম হেমন্ত আর ও কুমায়ুন। নাম শুনেই বুঝেছেন নিশ্চয়ই, ওর বাবা-মা পাহাড় ভালোবাসতেন। ছেলের নাম তাই এরকম রেখেছেন। আমি আর ও দুজনেই বিজ্ঞানের ছাত্র। ও শারীরবিদ্যা, মানে ফিসিওলজি পড়েছে আর আমি জুলজি। কিন্তু আমি শেষ তিন-চার বছর একটু অন্য ধরণের গবেষণায় চলে গিয়েছিলাম।”
“ক্রিপ্টোজুওলজি?”
আবারও অবাক হবার পালা হেমন্তদের।
“ভাবছেন কীভাবে জানলাম? কারণ আমার গুরু আমাকে জানিয়েছিলেন।”
“গুরু?”
“হ্যাঁ। আমরা এখানকার একমাত্র জীবিত মুং পুরোহিত পরিবার।”
“মুং পুরোহিত!” চমকে উঠল হেমন্ত। “তার মানে আপনিই দুজোমে?”
“হ্যাঁ, কিন্তু আপনারা কীভাবে আমার সন্ধান জানলেন?”
দাখমার এনে দেওয়া সদ্য গরম চিকেন স্যুপটা হাতে নিয়ে হেমন্ত বসে পড়ল বিছানার ওপর। তার এতদিনকার স্বপ্ন এভাবে সত্যি হয়ে যেতে পারে, তা সে ভাবতেও পারছে না। হেমন্তের অবস্থা দেখে কুমায়ুন উত্তরটা দিল।
“হেমন্ত একজন ক্রিপটোজুওলজিস্ট। আপনি তো জানলেনই। বেশ কিছুদিন ধরেই একটা বিশেষ প্রাণীর সন্ধানে ও ঘুরছে। অনেক লোককথা বা উপকথায় এর নাম আছে। বিশেষতঃ সিকিম, নেপাল বা তিব্বত সীমান্তে এই প্রাণীদের দেখা নাকি অনেকেই পেয়েছেন। কিন্তু হাতে-কলমে খুব তাগড়া কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। ক্রিপটোজুওলজিস্টরা সাধারণত এই ধরণের প্রাণীর খোঁজই করে থাকেন।সেই সূত্রেই…”
“বুঝলাম। আপনারা ইনুর খোঁজে এসেছেন।”
ম্লান হাসলেন দুজোমে।
“ইনু?”
“ইয়েতিকে ওরা এই নামেই ডাকে কুমু।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই জঙ্গলের দূরতর কোনো প্রান্তে একটা আদিম চিৎকার ভেসে উঠল কয়েক সেকেণ্ডের জন্য। খুবই অল্প সময়। হয়ত দুই বা তিন সেকেণ্ড। কিন্তু তাতেই যেন থরথর করে কেঁপে উঠল পাহাড়ি অন্ধকারে স্থানু হয়ে থাকা প্রাচীন বাড়িটা। মেঘ নেমে এসেছে চারপাশে। ঘড়িতে রাত ন’টা বাজছে। চাঁদ ঢেকে যাওয়া অন্ধ বনভূমিতে কোন প্রাণী এভাবে ডাকছে? ডাক নয়, এ যেন হাহাকার।
“কী ডাকছে?”
কুমায়ুনের গলাটা কি অল্প কেঁপে গেল প্রশ্ন করার সময়?
“যার হাত থেকে আপনারা আমাকে বাঁচিয়ে নিয়ে এলেন, সে।”
“মানে?”
“আজ ওর মন ভালো নেই। পৌষের পূর্ণিমা এলে ওর মন খারাপ হয়ে আসে। প্রতি বছর পৌষ আর মাঘে ও এরকম করে। ডাকে, খোঁজে। কিন্তু…”
“আপনি কী বলতে চাইছেন, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু খুলে বলবেন? আপনি আজ জঙ্গলে আহত হয়ে ওভাবে পড়েই বা ছিলেন কেন? আমরা ভেবেছিলাম আপনাকে ভাল্লুক আক্রমণ করেছে। আমরা দূর থেকে দেখেওছি একটা ছায়া সরে যেতে।”
“আপনারা এসে গেলেন বলেই ওকে আজ খাবার দেওয়া হলো না। ও ক্ষুধার্ত। কিন্তু ক্ষুধার্ত নয়। আমার খাবারে ওর তৃষ্ণা মিটবে না জানি। তাও আমার গুরু দুকো সামানকে দেওয়া কথা রাখতে আমি আজও ওকে খাওয়াতে গিয়েছিলাম। মুরগির কাঁচা মাংস, সব্জি, ফল।”
“আপনি যদি দুজোমে হন, তাহলে এই লেখাটা আপনি পড়তে পারবেন।”
হেমন্ত ধাতস্থ হয়েছে এতক্ষণে। নিজের ট্যাবে থাকা পুথির ছবিটা সে দেখাল প্রবীণ মানুষটিকে। চমকে উঠলেন ভদ্রলোক।
“এ জিনিস কোথায় পেলেন আপনি?”
“আমার স্যারের থেকে। অনেক দিন আগে এখানে এসেছিলেন। তখন পাহাড়ি জনজাতিদের একটা সেলিব্রেশন চলছিল। ওদের গ্রামে গ্রামে নানারকমের প্রাচীন জিনিস দিয়ে মেকশিফট মিউসিয়াম গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানেই একটা গ্রামে, এক সামানের বাড়ির উঠোনে এই পুথিটা টাঙানো ছিল। আমার স্যার কোনোরকমে ছবিটা তুলতে পেরেছিলেন। অন্যান্য ছবি তোলা গেলেও এই ছবিটা তুলতেই সামান আর তার সঙ্গীরা দৌড়ে আসে, ক্যামেরা কেড়ে নিতে চায়। ওদের দেখিয়ে ছবিটা ডিলিট করতে হয় স্যারকে। তবে ক্যামেরার ভিতরের আরেকটা ফোল্ডারে অটোম্যাটিক কপি হয়েছিল ছবিটা। সেটা ওরা ধরতে পারেনি। কিন্তু ওদের এই অনাবশ্যক উত্তেজনা দেখে স্যারের মনে সন্দেহ জাগে। আর তখনই উনি জিনিসটা অনুবাদের চেষ্টা করেন।”
“কিন্তু পুরোপুরি বুঝতে পারেননি।”
“না। একেই তিনি ব্রিটিশ। তারপর এই ভাষা প্রাচীন-লেপচা। ওখানে কেন, এখানেও কেউ জানে কিনা…”
“এই ভাষায় কথা বলতেন লেপচা জগতের পুরনো মানুষেরা। আমাদের মুং ধর্মে যে আদি পাহাড়ের কথা বলা আছে সেই পাহাড় আমাদের আসল দেবতা। এই ভাষা সেই পাহাড়ের ভাষা। প্রকৃতির ভাষা। এর অর্থ বোঝা আপনাদের পক্ষে সম্ভব নয় বাবু।”
ভাঙা ইংরেজিতে বলা কথাগুলো কঠিন হয়ে এলো ক্রমশ।
“কিন্তু দুজোমে, আমার স্যার বলেছিলেন এই পুথি তিনি যতটুকু পড়তে পেরেছেন, তাতে এটুকু বুঝেছেন যে এই পুথিতে বলা হয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘার এই অঞ্চলে একজন রক্ষক রাখা হয়েছে তাঁদের দেবতার জন্য। যিনি এই দেবতার বাসস্থান দেখাশোনা ও তাঁকে ভোগ দেবার কাজ করবেন। আপনার নাম ছিল তাতে। পুরোহিত বংশের প্রতিনিধি হিসাবে।”
“আপনারাও বিদেশীদের কথামতোই চলবেন? কী করে জানলেন উনি আমাদের দেবতা? কবে হেনরি নিউম্যান সাহেব স্টেটসম্যানে লিখেছিলেন অ্যাবোমিনেবল স্নো-ম্যান, তিনি তিব্বতি শব্দটার মানেই বোঝেননি। প্রকৃতি ভয়ানক নয়। সে আমাদের শক্তি।”
মৃদু হাসি ছড়িয়ে পড়ল কেঠো ঘরে।
“তাহলে?”
“আপনারা বুঝবেন না বাবু। ভোর হলে আপনারা চলে যান।”
“দেখুন দুজোমে, আমি অনেক কষ্টে অনেক সন্ধান করে, তবে এই জায়গাটায় এসেছি। আপনাকে খুঁজে বার করেছি। ব্রিটিশদের ১৮৩৫-এর সনদে দার্জিলিং আর তার সংলগ্ন অঞ্চলগুলোয় লেপচা জনজাতিদের ভাগ করা হয়েছিল। সেই ইতিহাস খুঁড়ে বার করেছি আপনার খোঁজ পেতে। আমার স্যার বলেছিলেন মুং ধর্মের অস্তিত্ব এখন আর নেই। কিন্তু তাদের পুরোহিতদের একটা গ্রাম ছিল। যেখানে তারা থাকত এবং তাদের মূল কাজ ছিল প্রকৃতির সম্পদ পাহারা দেওয়া। তারা এ পৃথিবীর ভাষায় কথা বলত না। তাদের জীবন, তাদের অস্তিত্ত্ব প্রকৃতির সঙ্গে এক তারে বাঁধা ছিল। আপনি যা বলছেন, সে সবই মিলে যাচ্ছে স্যারের কথার সঙ্গে।”
“আপনার স্যার বলেছিলেন আমরা ইয়েতির পাহারাদার, তাই তো?”
“হ্যাঁ, বলেছিলেন আপনারাই জানেন ওই প্রাণীকে কোথায় পাওয়া যায়। স্যার এটাও বলেছিলেন যে ডাও-হিলের ভুতুড়ে বদনামটাও আপনারাই করিয়েছেন, যাতে মানুষ এদিকে না আসতে পারে, না জানতে পারে। দেখুন, আমি ওই প্রাণীটিকে ধরতে বা মারতে চাই না। শুধু…”
“শুধু খাঁচায় ভরে নিয়ে যেতে চান শহরে, সেখানে পোষা জানোয়ারের মতো দেখাতে চান ওকে। দেখাতে চান যে মানুষ কীভাবে সবার প্রভু হয়ে উঠতে পারে, তাই না?”
“আপনি আমায় ভুল বুঝছেন দুজোমে। আমি কয়েকটা ছবি নিতে চাই। আমি অনেক কষ্ট করে, অনেক খরচ করে…”
হেমন্তের কাকুতি চাপা পড়ে গেল অপার্থিব আর্তনাদে। আবার সেই অদ্ভুত ডাক। কষ্টের ধূসর বাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে চাঁদেলা পাহাড়ে। কুমায়ুনের হাত থেকে কাঠের স্যুপ-চামচটা ঠক করে পড়ে গেল কাঠের মাটিতে।
“ও না দেবতা, না দানব, আর না ভৃত্য। ও আমাদের বন্ধু। রক্ষাকর্তা।” গমগম করে উঠল দুজোমের স্বর। আপনাদের শহুরে হিসেবের সঙ্গে ওকে মেলাতে যাবেন না। ও একলা হয়ে আছে, ওকে একলা থাকতে দিন। শান্তিতে যেতে দিন।”
এ পর্যন্ত বলেই হঠাৎ কেঁপে উঠলেন দুজোমে। হেমন্ত নিচু হয়ে নিজের সোয়েটার থেকে একটা ধূসর লোম তুলে নিবিষ্ট মনে দেখছে।
“এ লোম কোন জানোয়ারের? আগে দেখিনি তো? পাহাড়ে ঘুরছি আজ চার বছর। তার মানে… আপনি আজ ওকেই খাওয়াতে গিয়েছিলেন? কিন্তু ও আপনাকে আক্রমণ করল কেন দুজোমে?”
স্থিরচোখে হেমন্তের দিকে তাকালেন দুজোমে।
“আমাদের লেপচা-সংহিতায় আছে, পৃথিবীর প্রথম জন্মদাত্রী ও জন্মদাতা মিলে সাতটি প্রাথমিক সন্তান সৃষ্টি করেছিলেন এই পাহাড়ে। তারা সরাসরি প্রকতির সন্তান ছিল। মানুষ আসে অনেক পরে। মানুষ পাহাড়ে এসেছিল শুধু নিতে। পশুপাখি, ফুল-ফল, গাছ। সব। সব কিছু কাড়তে এসেছিল মানুষ। সাদা চামড়ারা এসে সেই নেওয়াটাকে বাড়িয়ে দিল। আমাদের গ্রাম থেকে সব ছেলেরা শহরে পড়তে গেল। কাজে গেল। ব্যবসায় গেল। আমার নিজের ছেলের শহরে দশখানা গাড়ি চলে। দুখানা ফ্ল্যাট তার। সে মুং ধর্ম মানে না। কেউই আর মানে না তেমন। সে বলে আমি নাকি শয়তানকে পুষছি! বোকা! শয়তানকে কখনও পোষা যায় না। ভগবানকেও না। সবাই বেনিয়া হয়ে গেল বাবু। আপনারা সব বেনিয়া।”
দমকে দমকে কাশি এসে থামিয়ে দিল দুজোমেকে। ছুটে এলো দাখমা।
“আপনারা দাদুকে আর কথা বলাবেন না। দাদুর শরীর ভালো নেই, দেখছেন তো। আপনারা বাইরের ঘরে থাকুন। সকাল হলে চলে যাবেন।”
বাধ্য হয়েই ঘন রাতে বাইরের ঘরে বসল ব্যর্থমনোরথ হেমন্ত-কুমায়ুন।
“কুমু চল, একবার বার হওয়া যাক।”
“এখন? কোথায়?”
“প্রাণীটা ক্ষুধার্ত, শুনলি তো, খাবার পায়নি। এখানেই ঘুরছে। ডাকছে।”
“তুই… তুই…” কুমায়ুনের কথা আটকে যায় বিরক্তি আর বিস্ময়ের ভাবসম্মিলনে।
“তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এই রাত্রে, ওই জঙ্গলে!”
“হ্যাঁ, খারাপ হয়ে গিয়েছে। চারটে বছর ধরে নিজের সমস্ত সম্পদ আর এনার্জি দিয়ে একটা এক্সপিডিশন চালিয়ে যাচ্ছি আমি। আর সম্ভব নয়। লক্ষ্যের এত কাছে এসে আমি হারতে পারি না। তুই আসতে না চাইলে এখানেই থাক। আমি একাই পারব। আর হ্যাঁ, আমার কাছে অস্ত্রও আছে। ও আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
অবাধ্য দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল হেমন্ত। নিরুপায় কুমায়ুন বাধ্য হলো বন্ধুর পিছু নিতে। কোনোমতে দাখমা-কে ডেকে দরজাটা বন্ধ করতে বলেই দৌড়ে এগিয়ে গেল কালো পাইনবনের গাঢ় গভীরে। মেঘ সরে গেছে। আকাশে নিষ্কলঙ্ক পূর্নিমা তেল ফুরনো প্রদীপের মতো দপদপ করছে। পাহাড়ে জোৎস্না যারা দেখেনি, তারা এই মূহূর্তের মাহাত্ম্য বুঝতে পারবে না। ভয়, চিন্তা বা উদ্বেগ নামের আবেগগুলো কাজ করে না এই পরিবেশে। যেটুকু থাকে, তা শুধু জীবন্ত প্রকৃতির একজন হয়ে বেঁচে থাকার অনুভব।
খুব বেশিদূর যেতে হলো না ওদের। তার আগেই ডাকটা শোনা গেল আবার। শব্দ লক্ষ্য করে একশো মিটার মতো যেতেই চোখে পড়ল দৃশ্যটা।
একটা দীর্ঘ পাইন গাছের গুঁড়িকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরে আছে একটা অতিদীর্ঘ ধূসরলোম প্রাণী। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা হেমন্তের কাঁধে সাবধানী হাত রাখল কুমায়ুন। প্রাণীটার দূরত্ব তাদের থেকে খুব বেশি হলে মিটার তিনেক। গাছটাকে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে মুখ করে সে গুমরোচ্ছে। মাঝে মাঝে এই গুমরানোটা বেড়ে চিৎকার হয়ে যাচ্ছে।
“ছবি তুলবি না?”
রোবটের মতো মাথা নাড়ল হেমন্ত।
“কী হলো?”
মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলল হেমন্ত। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। কতক্ষণ, কেউ জানে না। তারপর আস্তে আস্তে হেমন্ত বলল, “তিব্বতি শেরপারা যাকে “ইয়েহ তে” বলত, তার অর্থ ছিল বিশেষ ধরণের লাল ভাল্লুক। এদের হাইবারনেশন হয় না। শীত বরং এদের মিলনঋতু। লোম আর মাংসের জন্য মানুষ এদের শেষ করে ফেলেছে। লাল-ভাল্লুক বিলুপ্ত বলেই জানতাম রে। আজ নিজের চোখে দেখে বুঝলাম দুজোমে কী বলতে চাইছিলেন। ওরা দ্বাররক্ষক কুমু। পৃথিবী মায়ের যে আদি সন্তানদের মানুষ মেরে ফেলেছে নিজেদের স্বার্থে, তাদের রক্ষা করার ভার ওদের ধর্ম, ওদের শাস্ত্র দিয়েছে ওদের। ও জানে এই ভাল্লুকটা এন্ডলিং। এই শীতে, পূর্ণিমার আলোয় ও নিজের সঙ্গিনীকে খুঁজছে, কিন্তু ওর প্রজাতির আর কেউ বেঁচে নেই এই রিক্ত পৃথিবীতে।
এই একাকীত্বের ছবি তোলা যায়? এই বিরহকে বিক্রি করা যায়?”
চাঁদের মুছতে থাকা আলোয় হেমন্তের দ্বিধাপ্রশ্ন মিশে গেল এ মরজগতের শেষতম প্রাণের হাহাকারের সঙ্গে।