অপরাজিত অজিত এবং ধ্বস্ত বালুকা বেলা
মানসী কবিরাজ
সালটা ছিল ২০১৬ । ‘শহর’ নামে একটি লিটল ম্যাগের যে সংখ্যাটির সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই তার বিষয় ভাবনাতেই ছিল চমক। বিষয় ছিল ইনসেস্ট অর্থাৎ অজাচার। সম্পাদক অজিত রায়। এর আগে না শুনেছি তাঁর নাম না তাঁর পত্রিকার নাম। কিন্তু সেই পত্রিকা পাঠই ছিল আমার অজিত রায়কে জানার প্রথম ধাপ। তারপর এই ‘শহর’ পত্রিকায় লেখার সুবাদে প্রাথমিক ভাবে আমার কিছু ইনবক্সালাপ হয়েছিল তাঁর সঙ্গে এবং সেই স্বল্প-কথাবার্তার মধ্যেই কেঠো বা কেজো নয় কেমন একটা প্রাণবন্ত ব্যাপার ছিল ঠিক বলে বোঝানো যাবে না। কাজেই সব মিলিয়ে অজিত রায়কে চেনা আমার বছর পাঁচেক। যদি অঙ্কের হিসাবের বাইরেও আর কোনও হিসাব থাকে তাহলে আজ এই ২০২২ এসে মনে হয় ঐ পাঁচ বছরের আলাপ আদতে পাঁচ বছর নয় যেন আর অনেক বেশি। এতটাই ছিল সেই আলাপচারিতার বিস্তার। আর কী আশ্চর্য, পত্রিকার বাইরে অজিত রায়কে আমি প্রথম পড়ি তার ‘ যোজন ভাইরাস’ উপন্যাসে। আর এই একটা পাঠ আমাকে দিয়ে অবধারিতভাবে খুঁজিয়ে নেয় অজিত রায়ের অন্যান্য লেখাগুলো। যোগাযোগ করি নিজেরই তাগিদে। কিছু ডাক যোগে আনিয়ে নিই কিছু তাঁর কাছ থেকে সরাসরি।অজিত মানে অপরাজিত। সত্যিই তিনি সার্থকনামা । বাংলা গদ্য সাহিত্যে সত্যিই তিনি ‘অজিত’ । এখন মনে হয় কী মাহেন্দ্রক্ষণেই না ‘যোজন ভাইরাস’ আমার হস্তগত হয়েছিল! নইলে গদ্য সাহিত্যের এক অনন্য ধারা আমার না পড়াই থেকে যেত !
অজিত রায়ের প্রথম উপন্যাস “ দোগলাচরিত” ( ১৯৮৮) তাঁর নিজের কথাতেই যা অনেকটাই সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় প্রভাবিত স্টাইল। এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার যে সফল মরিয়া প্রচেষ্টা তার ফলাফল আমরা দেখি “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না” (১৯৯২) উপন্যাসে এক সম্পূর্ণ অজিতীয় গদ্য-ভাষা , যদিও নামকরণে নবারুন উঁকি দিয়েছেন। তারপরেই এলো “ যোজন ভাইরাস” ( ১৯৯৮) ।
অজিত আসলে জীবনকে লেখেন, যে যাপন তিনি করেন তাঁকেই লেখে তাঁর কলম। যিনি নিজেকে খুব সহজেই রাগী জেদী অহংকারী বলতে পিছুপা হন না আবার এটাও বলেন যে আসলে তাঁর মধ্যে নানা প্রকারের ভিন-মেজাজি মানুষ মিশে আছে, তাদের কেউ ফড়ে, কেউ সামান্য উদাসীন কেউ বা মওকা বুঝে খ্যাপা বা খেয়ালি, নাস্তিক, মারকুটে খিস্তিবাজ বা প্রবল অরাজকতাবাদী। লিখছেন বলেই দেওতা ( দেবতা ) বনে যাওয়ার বা দেওতা ভাব দেখানোর কোনও অভিপ্রায় তাঁর নেই এটা অজিত রায় নিজেই বলেছেন দিগ্বলয়ঃ পত্রিকাতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। এবং এই তথাকথিত দেওতা নয় বলেই হয়তো তাঁর সঙ্গে বয়সের পার্থক্য আমাদের পরবর্তী কালে বন্ধুত্বের অন্তরায় হয়নি। দিন তারিখ মনে নেই ঠিক কবে যে আমাদের আলাপ! অজিতদা আপনি দিয়ে শুরু হয়ে সেটা কখন অজিত তুমি’র চৌকাঠ পেরিয়ে কখনো কখনো অজিত তুই’এও পৌঁছে গেছিল !
অজিত রায় দেওতা নয় , আর দেওতা নয় বলেই তাঁর লেখাও দেওতার চালিশা নয় বরং একদম স্ট্রেটকাট। তবে স্ট্রেটকাট মানে তিনি কোনও তালগাছ নন বরং প্রায় চল্লিশ বছরের সাহিত্য সাধনায় এই পর্যন্ত ২৫টি উপন্যাস , প্রবন্ধ , কবিতা, গদ্য , গবেষণা গ্রন্থ , অনুবাদ, পত্রিকা সম্পাদনা ইত্যাদি নিয়ে তিনি এক বহু ঝুরি সমন্বিত বট গাছ। আশির দশক থেকে তাঁর লেখালিখি শুরু এবং প্রথমে কবিতা দিয়ে শুরু করলেও পরে পাকাপাকি ভাবে গদ্যে চলে আসেন।
অজিত রায়ের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা তৎকালীন বিহারের ধানবাদে। বাংলা ভাষার একেবারে পশ্চিম সীমান্তে, ফলত একটা মিশ্র ভাষার জলহাওয়ায় তাঁর প্রতিপালন। সেটা আমরা তাঁর সব লেখাতেই খুঁজে পাই। তবে উপন্যাসের মতো অজিত রায়ের লেখা ছোট গল্পগুলি কিন্তু তেমনভাবে গ্রন্থায়িত হয়নি। হয়তো উপন্যাস লেখায় তাঁর প্রবল মনোযোগ থাকার কারণে ছোট গল্প সংকলিত করার দিকে খুব একটা খেয়াল হয়নি। অজিত রায়ের প্রথম ছোট গল্প সঙ্কলন ‘বাছাই গল্প’ প্রকাশিত হয় ২০১৯ -এ। মোট ন’টি গল্প নিয়ে। প্রত্যেক গল্পই প্রত্যেক গল্প থেকে একদম আলাদা, আবার প্রত্যেক গল্পেই থাকে এক ‘আউটসাইডার’ যা আসলে লেখকেরই ‘আদার সেলফ। আবার কখনো তাঁর অমসৃণ টেক্সটই হয়ে ওঠে তাঁর ডায়াসপোরিক মনোভঙ্গীর দ্যোতক।
অজিত রায় এমনই এক মানুষ যে কোনোরকম অতিরঞ্জন ছাড়া একদম ট্রান্সপারেন্ট ভাবে সত্যের স্বপক্ষে ‘ ধানবাদ ইতিবৃত্ত’ রচনার করেন এবং এই বইএর জন্য তাঁর সরকারি চাকরিও চলে যায় , ব্যক্তিগত জীবনে ঝড় ওঠে। তবু তিনি আপোষ করেননি। লেখা তাঁর কাছে কোনও অবসর বিনোদন ছিল না। শুধুই লেখাকে সম্বল করে জীবিকা নির্বাহ আমাদের মতো দেশে কী পরিণাম হতে পারে অজিত রায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ।আর্থিক অস্বচ্ছলতা তার চিরসঙ্গী হয়ে গেছিল।
অজিত রায়ের লেখা ‘ জোখিম কোরকাপ’, ‘ ঘামলাঘাট’, ‘ কৌরব ও পাপারাৎজি’, ‘রত্নিসুখের উপপাদ্য’, ‘খানাখারাব, ‘ নভাক যামিনি’, ‘মায়ামঘর’ তাঁর অজিতীয় কলমের কৃতি বহন করলেও আমার ব্যক্তিগত অভিমত ‘যোজন ভাইরাস’-ই তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। এই উপন্যাসের অবয়ব আসলে দীর্ঘদিন ধরে অজিত রায়ের নিজের ভিতরেই ঘটতে থাকে ক্রমাগত, মজতে থাকে নিজে নিজেই এবং শেষে ঘটনা চরিত্র এবং সংলাপ হয়ে বেরিয়ে আসে। এ যেন নিছকই এক নর-নারীর যৌন যাপন নয়, এক ফিলোজফিক্যাল ডিসকোর্স। অজিত রায়ের এই খোলামেলা কলমের সামনে অনেকেই হয়তো কিছুটা ইতস্তত করেন কিন্তু তাঁর ব্যতিক্রমী ধারাকে এড়িয়ে যেতে পারেন না কিছুতেই। আসলে জীবনকে নিংড়ে দেখে নেবার জেদই অজিত রায়ের লেখাকে এমন অজিতীয় করে তুলেছে যা এক্কেবারে নিজস্ব রিদমে এগিয়ে গেছে কোথাও কিছু আরোপিত মনে হয়নি ।
অজিতীয় গদ্যকে সহজেই আলাদা করা যায় তার শব্দ ব্যবহারের অননুকরণীয় মুনশিয়ানায়। তার গদ্যে প্রচুর বঙ্গেতর শব্দের প্রয়োগ ঘটেছে। বাংলার ভাষার গায়ে এমন অব্যর্থ হিন্দির যোজনা প্রকৃত অর্থেই বিরল। তাছাড়াও নিতান্ত দিশি , ঘরোয়া , ফুটপাথিয়া/ স্ল্যাং কিছুকেই তিনি তার গদ্যে ব্রাত্য করেননি। সচরাচর ধারার বাইরে কিছু লেখার তাগিদে তিনি ঢুঁ মারেননি এমন কোনও শব্দের গলি নেই এবং এটাই তাঁর গদ্য ভাষাকে জারা হটকে করেছে। অথচ অজিত রায় তাঁর লেখায় চলতি প্রথার বাইরে অবস্থান করেও , প্রকাশভঙ্গির শ্বাসরোধ করেননি। তাঁর গদ্য একাধারে রাগী ও নির্মল , চটুল আবার চমকপ্রিয় , প্রচণ্ড কাব্যিক কিন্তু মোটেই তুলতুলে নয় এবং চূড়ান্তভাবে রসবোধ সম্পন্ন। বারীন ঘোষাল অজিত রায়কে বলেছেন ‘গদ্যের ভাস্কর’। এই মন্তব্যের যথার্থতা অজিতের পাঠকরা অবশ্যই স্বীকার করেন। আপাত দৃষ্টিতে ভীষণভাবে আনরিয়ালিস্টিক বিষয়ও কিন্তু অজিত রায়ের গদ্যভাষার গতি এবং তার যথাযথ প্রক্ষেপণে তাঁর পাঠকদের কাছে বাস্তব হয়ে উঠেছে। যে কোনও প্রচলিত ভাষা-মিথকে অজিত ভেঙ্গে দিয়েছেন তাঁর উইট দিয়ে, তাঁর হিউমার দিয়ে এবং তাঁর এই পুরো স্টাইলটার মধ্যে মিশে থাকে তাঁর চোরাগোপ্তা হাসি অথচ যা আক্রমণাত্মক নয় আবার খেলোও নয়। চাইলেই অজিত রায় মানুষটা একটা স্বচ্ছল জীবন কাটিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি হতে চেয়েছিলেন হোলটাইমার লেখক অথচ যে কিনা পেশাদার নয়! তবুও তাঁর লেখারা থেকে গেছে একদম নিজস্ব স্টাইলে এবং প্রকৃত সাহিত্য প্রেমী মানুষ তার লেখা খুঁজে নিয়ে পড়েছে এবং ভবিষ্যতেও পড়বে। পড়বে কারণ অজিত রায়ের গদ্যে সে অর্থে তথাকথিত বিশুদ্ধ ড্রয়িং রুমের সাজানো শোভনতা নেই, নেই সামাজিক হয়ে ওঠার দায়বদ্ধতা।
অনেকেই অভিযোগ করেন অজিত রায় নাকি নানা বাহানায় নর- নারীর যৌন যাপন তুলে আনেন তাঁর লেখায় । দোষ অজিত রায়ের নয় , দোষ হল অজিত রায়কে খণ্ডিত ভাবে পড়ার। যদি কোনও ইচ্ছুক পাঠক তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসগুলো সম্যক ভাবে পাঠ করেন তাহলেই তিনি বুঝে যাবেন কতটা অসার সেই অভিযোগ কারণ অজিত তাঁর লেখায় ঘোমটার নীচে খ্যামটা নাচের মতো নয়, যৌনতাকে এনেছেন এমন ভাবে ঠিক যেভাবে সেটা আনা দরকার। সেখানে না আছে অহেতুক রগরগে বাড়াবাড়ি না আছে না নেকুপুষু ধাস্টামো। আর এভাবেই ‘যোজন ভাইরাস’-এ অজিত যৌনতাকে বিষয় হিসাবে রেখেও শেষ অব্দি পৌঁছে গেছেন এক দর্শনে। তাঁর ভাষার অনবদ্য ট্রিটমেন্ট , নিজস্ব শব্দবন্ধের ধুমধাড়াক্কা আমাদের সেই ভিতরটাকে দেখিয়ে দেয় যা আসলে আমরা ঢেকে রাখতে চাই , অবদমিত করে রাখতে চাই আবার তার থেকে মুক্তিও পেতে চাই! আর অজিত রায়ের গদ্য আলটিমেটলি আমাদের সেই তৃপ্তি দেয় যা আসলে আমরা অবচেতনে পেতে চেয়েছিলাম , পেতে চাই । পেতে চাই তাঁর লেখার মধ্যে দিয়েই অথচ আরও অনেক অনেক তীব্র লেখা বুকে জমিয়ে রেখে অজিত রায় চলে গেলেন । চলে গেলেন অমৃতলোকে ।
২০১৯ এর বইমেলায় তাঁর সঙ্গে আমার শেষ প্রত্যক্ষ আড্ডা । মাঝের দুই বছর বাদ দিয়ে , কোভিডের ছোবল পেরিয়ে ২০২২ এ বইমেলা আবারও ফিরে আসল, শুধু এবার আর লিটল ম্যাগ প্যাভিলিয়নে অজিত রায়ের ‘শহর’ এর স্টল থাকল না , থাকল না অজিতীয় আড্ডার টক ঝাল মিষ্টি যেটা আমার মতো অনেকের কাছেই ছিল বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ। জানি সমুদ্রের ঢেউ যেমন তীরে এসে আছড়ে পড়ে তেমন আবার ফিরে চলেও যায় । শুধু সেই ঢেউ জানতে পারে না ঝাপটার তীক্ষ্ণতা কী ক্ষত রেখে গেল বালুকা বেলার বুকে!