অলীক সাজ
অদিতি ঘোষদস্তিদার
ধমাস ধমাস শব্দ দরজায়।
“ওঠ, ওঠ, সব্বোনাশ হয়ে গেছে…”
চোখের পাতাগুলো এখনও ভারী। চারদিকে এখনও আবছা অন্ধকার। কাল দুপুর থেকে জ্বর এল, সঙ্গে সারা শরীর জুড়ে ঝনঝনে ব্যথা। দুটো ক্রোসিন পড়ার পর ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল। এখন এ আবার কী উৎপাত?
আবার ধাক্কা।
“খুলছিস না কেন রে হারামজাদি, আমি জানি ঘরে তুই একা!”
প্রায় টলতে টলতে কোন রকমে দরজা খোলে রোশনি।
“সক্কাল সক্কাল এতো মুখ খারাপ করছ কেন গো মাসি? হয়েছেটা কী?”
“তখনই বলেছিলুম ওই ফটো তোলা ছোকরাটার সঙ্গে অত ঢলাঢলি করিস না। বললে তো কথা কানে নিবি না, এখন কী যে আছে তোর কপালে..”
কথা বলতে বলতেই আঁচলের নিচ থেকে একখানা খবরের কাগজ বের করে আনে মালতী।
“সকালের আলো এখনো ফোটেনি, এই বেলা গা ঢাকা দে, নইলে…”
মেলে ধরেছে মাসি কাগজটা।
এই ছবি কাগজে বেরিয়েছে?
“প্ল্যানটা এমন ঘুরছে মাথায়, কিন্তু কাউকে পাচ্ছিনা। একটা, শুধু একটা স্পেশ্যাল ছবির মডেল হবে তুমি রোশনাই?”
এই নামেই রোশনিকে ডাকত ফটোগ্র্রাফার অলীক।
স্পেশ্যাল ছবি! মডেল!
কত রঙ্গ জানে যে এই ব্যাটাছেলেগুলো! নিজের মনেই হেসেছিল রোশনি।
শরীরটাকে নিয়ে রোজ কত খেলাই চলে!
একবার একজন একটা ছুরি এনেছিল আর সঙ্গে বান্ডিল বান্ডিল টাকা!
আবদার ছিল একটু একটু করে ওর গা চিরবে আর রক্ত চাটবে। পয়সা দেবে যত লাগে।
কোনরকমে সুখো মস্তানকে ডেকে নিস্তার পেয়েছিল সে যাত্রা।
জামা কাপড় না পরিয়ে শুধু টর্চের আলোয় সারারাত দেখেছিলো একজন ঘন্টার পর ঘন্টা। টাকা দিয়েছিলো বিস্তর।
শীতের রাতে ঠক ঠক করে কেঁপেছিল রোশনি পয়সার লোভে।
বুকে সর্দি বসে প্রায় যায় যায় অবস্থা হয়েছিল সেবার।
তা এ বাবুটা ঠিক তেমন ছিল না। শুধু ছবি তুলতে চাইত নানা রকমের।
কখনও গাদা গাদা চোখের ছবি, কখনও শুধু চুল আবার কখনও বা শুধু উদোম বুকের।
হাসি পায় রোশনির এই সব পাগলদের দেখলে। তবে লোকটা খুব একটা উত্যক্ত করতো না, পয়সাও ভালো দিত।
ওই দিনটার কথা স্পষ্ট মনে আছে। বাবুটা ঢুকেছিল গম্ভীর মুখে। হাতে একটা ছোট ব্যাগ।
সেই দিনই ওই মডেল হবার কথাটা পেড়েছিল।
“তোমায় বেশি কিচ্ছু করতে হবে না, শুধু আমি যেমনটা বলবো তেমন সাজতে হবে। না বলো না প্লিজ।”
পয়সা দিয়ে কেনা মেয়েমানুষকে সাজার অনুরোধ! ন্যাকামির একটা সীমা থাকে। কিন্তু একটাও কথা না বলে চুপচাপ রঙ্গ দেখে যাচ্ছিল রোশনি।
ছোট্ট ব্যাগটা থেকে বেরোল একগোছা পান, একটা কনের শোলার মুকুট আর একটা গাছকৌটো!
মতলবটা কি? বিয়ের কনে সাজাবে বাজারের মেয়েছেলেকে? কেন?
“ব্যাপার তো কিছুই বুঝছি না গো বাবু! ঝেড়ে কাশো দিকিনি কী চাও!”
ছবিটার দিকে তাকাল রোশনি। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দেখলো। আগের বার অলীকের ডিজিটাল ক্যামেরায়।
কপালে দগদগে লাল সিঁদুরের টিপ। মাথায় মুকুট।
একটাও সুতো নেই শরীরে। বুকের একদিক ঢেকেছে ঘন কালো চুলের গুচ্ছ। আধখানা মুখ ঢেকেছে একটা হাত জোড়া পানপাতায় আর সেই হাতের কনুই দিয়েই ঢাকা বুকের আরেকদিক। বাকি অংশটা খবরের কাগজের ছবিতে নেই।
বাকি হাতটায় গাছকৌটো ধরিয়ে যোনি ঢাকিয়েছিলো অলীক।
তারপর কী যেন সব বলেছিলো, নারী দেহ, পণ্য, আরো কত শক্ত শক্ত কথা। তারপর ছড় বেছড়ে ইংরিজি। টেনেটুনে এইট পাশ রোশনি কিচ্ছু না বুঝে তখন শুধু গেলাসে আরো মদ ঢেলে দিয়েছিল। তবে এটুকু বুঝেছিল যে বাবু খুব খুশি।
সেদিনের পর আর আসেনি অলীক।
“উফফ মাসি, এই জন্যে তুমি একেবারে হেদিয়ে গিয়ে বাড়ি মাথায় করলে। ধন্যি মাইরি! শরীর ভালো নেই বলে কাল ভাল বাবুটাকে ফিরিয়ে দিলুম, তাও দিলে কাঁচা ঘুমটা চটকে!”
স্পষ্ট বিরক্তি রোশনির ঘুম জড়ানো গলায়।
“ধুর মাগি। ভয়ডর নেই না কি রে শরীরে। বলি একটু আধটু বাঙলা তো পড়তে পারিস না কি! ওই ফটোবাবুকে কেমন ভয় দেখিয়েছে, খুনের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে, দেখতে পেলি তো!”
“ধমকি পাবে, পেপারে নাম তুলবে তাই জন্যেই তো এসব করা মাসি! ভাইরাল বোঝো, ভাইরাল! তাই করতে চেয়েছে গো! মরুকগে যাক! আমাদের কী তাতে।”
হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলে রোশনি।
“তোর মনে কি একটু দুখ দরদও নেই গা? তখন মনে তো হচ্ছিল এক্কেরে রাসলীলে চলছে।”
“পয়সা দিয়েছে, চেয়েছে মডেল, আমি হয়েছি। ব্যস ফুরিয়ে গেছে। অভিনয় মাসি, অভিনয় বুঝলে?”
টুসকি মারে মাসির গালে রোশনি।
মাসি এখনো হাল ছাড়ে না।
“কিন্তু পেপার দেখে কেউ যদি হামলা করে এখেনেও? যতই পানপাতা দিয়ে ঢাক মুখ তো পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। গাছকৌটো অমন জায়গায় রেখে ছবি তুলিছিলি সেটাও তো লেখা আছে। লক্ষ্মী বলে কথা! তোকে ছাড়বে ভাবছিস?”
মাসির কথায় হেসে এবার লুটিয়ে পড়ে রোশনি। নিজেকে সামলে আস্তে আস্তে বলে, “তুমি তো শুনিছি বামুনের ঘরের বৌ ছিলে, কি সব বচন কপচাও মাঝে মাঝে ব্যবসা বাণিজ্যি আর লক্ষ্মী নিয়ে, বলো না গো, পেটে আসছে মুখে আসছে না।”
মালতির মাথায় কথাটা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়েই ছেড়েছিলো পোড়ারমুখো বামুনটা। ব্যবসায় তো সেই নামালো। ওর জন্যেই তো এই দশা আজ! মনে মনে একটা কাঁচা খিস্তি আউড়িয়ে মালতী বললো “বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী!”
“হ্যাঁ, তাই তো বলছি, যখন জাত ধম্মো নিয়ে বড় বড় বুলি কপচানো জানোয়ারের বাচ্চাগুলো আসবে মুখ নাড়তে, তাদের একটাই প্রশ্ন করবো,’তোমরা আমাদের ব্যবসায় লক্ষ্মীর আসনটা ঠিক কোথায় এখনো জান না বুঝি? রাতের বেলা এস মালকড়ি নিয়ে, ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেব। যত্তসব ন্যাকার দল! তুমি নিশ্চিন্তে ঘরে যাও মাসি, কোন ঝামেলা হবে না। আমি ঠিক সামলে নেব।”
মানদা পেছন ফিরতেই রোশনি আবার বলে, “লখনাকে বলো না গো কড়া করে আদা চা পাঠাতে। গায়ে গতরে এখনো খুব ব্যথা। জানি না রাতে আবার কোন হিরোকে সামলাতে হবে! ও হ্যাঁ দু’কাপ। তোমার চায়ের দামটাও আমি দেব গো। প্রথমবার পেপারে ছবি বেরিয়েছে বলে কথা আর তুমিই তো সেটা দেখালে! আর ও মাসি, কাগজটাও রেখে যাও না গো।”
মালতী চলে যেতে ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঁচিটা বের করল রোশনি।
ছবিটা আবার ভালো করে দেখল। কাটিংটা রেখে দেবে।
গাছকৌটো যেখানেই থাকুক, কাগজের ছবিটা তো কনের সাজের!
(এই লেখার প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক )