সম্পাদকীয়
অর্ঘ্য দত্ত

“সেই একই গর্দান, বাঁকা হয়ে দাঁড়ানো, ছানবিন চোখ,… আর হ্যাঁ, যে-খানি কেয়াস ছিল, অথচ চোখে পড়েনি অডিয়েন্স-দূরত্ব থেকে, সেই ভ্যানতাড়াহীন না-ছোপানো একপাটি ছোপদাঁত, ও তার হাসি।” অজিত রায়কে ২০১৯- এর বইমেলায় যখন প্রথম দেখি তখন অবশ্যম্ভাবীভাবে মনে পড়ে গিয়েছিল ওঁর ‘জোখিম কোরকাপ’-এর এই লাইনগুলো। নায়ক আকাশকে বর্ণনা করে লেখা। কী দেখছ? প্রশ্ন করেছিলেন অজিত। বলেছিলাম। এও বলেছিলাম, ‘জোখিম কোরকাপ’-এ একজায়গায় ‘আকাশ’-এর জায়গায় ভুল করে অজিত টাইপ ছাপা হয়ে গেছে। হাসলেন। “… ছোপ দাঁত, মায় প্রাণের শিহরে ক্ষণপ্রভার মতো মাড়ির খাঁজে ফেঁসে থাকা এলাচ কিংবা বনমৌরী”। বললেন, তার মানে বইটা মন দিয়ে পড়েছ। সত্যিই পড়েছিলাম। আর মনে পড়ছে অজিত রায়ের এই ‘জোখিম কোরকাপ’-এই বেশ কয়েকবার এসেছে নাগপুরের সুকুমারের কথাও।
অজিত রায় এবং সুকুমার চৌধুরী, দুজনের কারো সঙ্গেই আমার সখ্য ছিল না। যদিও ব্যক্তিগতভাবে দুজনের সঙ্গেই পরিচয় ছিল, ফোনে কথা হয়েছে, দেখাও হয়েছে একাধিকবার। এই সখ্য না থাকার কথাটা উল্লেখ করলাম এটা পরিস্কার করে বোঝাতে যে এই স্মরণ সংখ্যা করার কারণটির পেছনে কোনো ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব নয়, একজন লেখক-সম্পাদকের প্রতি তার পাঠকের যে মুগ্ধতা বা সম্ভ্রম তৈরি হয়, নিখাদ সেটাই হল একমাত্র কারণ। আর একরকম একাত্মতার অনুভূতি, যা অজিত রায় এবং সুকুমারের অসময়ে চলে যাওয়ার পরেই যেন আরো তীব্র করে অনুভব করেছিলাম। সেই একাত্মতার কারণগুলো কী এই যে আমরা তিনজনেই পশ্চিমবাংলার বাইরে বসে বাংলা লেখালেখি করেছি বা করি! তিনজনেই নিজস্ব পত্রিকা সম্পাদনা করি! তিনজনেই চাঁচাছোলা কথা বলি! এবং তিনজনেরই একই বছরে জন্ম! ব্লার্বের তথ্য অনুযায়ী অজিত রায় আমার চেয়ে দেড় মাসের ছোটোই বরং। অজিত রায়ের সঙ্গে আলাপ বম্বেDuck-এর জন্য লেখা চাইতে গিয়ে। ২০১৭-তে। তার অব্যবহিত আগেই ওঁর থেকে কুরিয়ার পাঠিয়ে কিনে এনেছি ওঁর অনেকগুলো বই ও পত্রিকা। এবং পড়ে ফেলেছি যোজন ভাইরাস এবং জোখিম কোরকাপ। যে বইয়ের পাঠপরবর্তী মুগ্ধতা ও বিস্ময়ের ঘোর আজও অম্লান। ‘শহর’-এর সম্পাদনার জন্যও অজিতের প্রতি একটা আলাদা সম্ভ্রম ছিল। ‘রাতজীবন’-সংখ্যার জন্য মুম্বাইয়ের নৈশজীবন নিয়ে লেখার অনুরোধ করেছিলেন, লিখতে পারিনি।

সুকুমারের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল অম্ল-মধুর। দিল্লি ও মুম্বইয়ে নিবিড় আড্ডা হয়েছে ওর সঙ্গে। আর হয়েছে প্রচুর মতবিরোধ, তর্কাতর্কিও। তবু ওর প্রতিও একটা সম্ভ্রম ছিল এবং সেটাও ঐ ‘খনন’-এর কারণেই। নাগপুরে বসে অতবছর টানা অমন একটা উচ্চমানের বাংলা পত্রিকা করে যাওয়া সহজসাধ্য নয় মোটেই।
দুজনের অকালপ্রয়াণের পর তাই একটা স্মরণসংখ্যা করার ভাবনাটা স্বাভাবিক ভাবেই এসেছিল। মনে হয়েছিল বহির্বঙ্গ থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকা হিসেবে এটা কর্তব্য এবং দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। তবে আরও অনেক বেশি লেখা আশা করেছিলাম। অজিত রায়ের সাহিত্য নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা পেলেও, সুকুমার চৌধুরী-র লেখালিখি নিয়ে তেমন তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা বেশি পেলাম কই! সুকুমারের একটি ছোট্ট সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, সেটাই পুনঃপ্রকাশ করলাম।অজিত রায়ের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোনো কোনো লেখক যেসব কথা উল্লেখ করেছেন সম্পাদক হিসাবে তার সত্যতা যাচাই করার কোনো রাস্তা আমার ছিল না। তবু সম্মাননীয় আমন্ত্রিত লেখকদের সেসব লেখা অপরিবর্তিত প্রকাশ করেছি, শুধুমাত্র তাঁদের লেখার ওপর বিশ্বাস রেখেই।
কবি-সাহিত্যিকরা চলে যান, রেখে যান তাদের সৃষ্টি। চাইব ভবিষ্যতেও ওদের সৃষ্টি নিয়ে আরও আলোচনা হোক। যোগ্য কারও সম্পাদনায়, প্রকাশিত হতে থাকুক শহর এবং খনন, তাদের চরিত্র বজায় রেখে।
অজিত রায় এবং সুকুমার চৌধুরীর স্মরণে বম্বেDuck-এর এই সামান্য আয়োজনে জানি খামতি থেকে গেল অনেক। তবু এই সংখ্যা ওদের লেখালেখির প্রতি গুটিকয়েক পাঠকের মনোযোগ বাড়াতেও যদি কিছুমাত্র সাহায্য করে তাহলেই এই প্রচেষ্টা সার্থক বলে মনে করব।
দেবাশিস ঘোষ
May 20, 2022 |অজিত রায়, সুকুমার চৌধুরীর স্মরণে এই সম্পাদকীয়তে পরিস্কার যে তারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন। শ্রদ্ধা জানাই তাদের।
Tanima Hazra
May 20, 2022 |সাবলীল এবং আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য কলমের সহযোদ্ধাদের জন্য।
সমরেন্দ্র বিশ্বাস
May 20, 2022 |বোম্বেডাকের পক্ষ থেকে এটা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাজ!