২০৫০ এর একটি দিন
ঝর্না বিশ্বাস

আজ খুব সকাল সকাল খুব ভাঙল পিউয়ের। উঠেই দেওয়ালে টাঙানো একটা বড় আয়নার দিকে চোখ গেল।

একি! মাথার সামনে একগোছা পাকা চুল, চোখে মুখেও কেমন অস্পষ্টতার ভাব।

আলতো হাতে চুলগুলো সরিয়ে আরও কিছুক্ষণ ও  দাঁড়াল ওখানে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসার ঘরে এসে বসল।

বাইরে তখন বেশ জোরে হাওয়া দিচ্ছে। জানালার পর্দাটা আরো কিছু সরে গেলেও পুরো আলো আসছিল না। মনে হল যেন কত কাল ধরে বন্ধ এ ঘরে পিউ একাই আছে। সম্পূর্ন একা।

রান্নাঘর থেকে তখনই দুধসাদা শাড়িতে একজন ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন,

– দিদি, আপনার চা। বাবু হাঁটতে গেছেন।

ওর কথায় পিউ সম্বিৎ ফিরে এলো। এ মুখ ওর চেনা। খুব চেনা। কোথাও যেন দেখেছে। তবে এই বাবুটি কে যার কথা ও বলছে।

আজকাল আর কিছুই মনে রাখতে পারে না পিউ। সেদিন শপিংএ বেরিয়েও একই ঘটনা ঘটে গেল। দিশেহারা হয়ে বাড়ির গলিতেই  ঘুরে বেড়াচ্ছিল অথচ নিজের বাড়ির গেটটাই  চিনতে গিয়ে মহা ভুল।

ডাক্তার এমন আরো কিছু ঘটনাকে মিলিয়ে বলছেন “অ্যালজাইমার্স” – মানে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এ অসুখ আরও বাড়বে।

পিউ যদিও এ ব্যাপারে উদাসীন তাও একদিন ফোনেতেই শোনা গেল তাঁর আপশোসের কথা –

– এমনটাতো হওয়ারই ছিল! আমি দিন কে দিন পাগল হয়ে যাচ্ছি জানিস্‌! সবাই এমন বলে…।

যদিও ওকে বোঝানোর চেষ্টায় ওপাশ থেকে অনেক পুরনো কথা মনে করিয়ে দিতে হয়। এই সেদিন যেমন,, 

–  ঐ গানটা মনে আছে পিউ? এক সময় শ্রীকান্ত আচার্য গাইলে তোর চোখে জল আসত!

পিউ ঢোক গিলে বলে,

– এখন আর অমন কিছু হয় না রে, সব ভুলে গেছি!

ডাক্তারদের এই মহা রোগ, একসাথে এতগুলো পরীক্ষা করা চাই। যথারীতি পিউকে নিয়ে মিস্টার সেন সেদিন রায়ের ক্লিনিকে।

প্রাথমিক পরীক্ষায় বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন উনি, আর পিউয়ের মনে পড়লো – কাঠের ব্রীজ, স্কুল মাঠ, মনোরথ স্যার ও আরও অনেক নাম যা এই মুহুর্তে সবার সামনে বলে ফেলা যায়না।

ডাক্তার তাও বললেন,

– ইদানিংকার কিছু, মানে এখন যা আপনার ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে –

পিউ হকচকিয়ে কী বলবে ভেবে চুপ হয়েই রইল।

কিন্তু ওকে এমন দেখে মিস্টার সেনের ভ্রু কুঁচকে গেল। পিউ তাহলে সত্যিই ভুলে যাবে সব! তাও নিজের খারাপলাগাটা উনি তখন চেপে গেলেন। আর ডাক্তার পিউকে বাইরে বসতে বলে অনেক কথাই বললেন যার মধ্যে মূখ্য ছিল – ওনার ভুলে যাওয়াটা এখন হরদমই হতে পারে!

এখানকার জানালায় বরফকুচি পড়ে রে, শিলাবৃষ্টি না। এমনটাই বলছিল পিউ –

আর ওপারের মানুষটা শোনাচ্ছিল তাঁর ভেঙে যাওয়ার গল্প। কথায় কথায় তখন আরো শোনা গেল…

– তুই কিন্তু বেশিই বুড়িয়ে যাচ্ছিস পিউ!

এসব শোনা মাত্র পিউয়ের রাগ আরো দ্বিগুণ হয়ে যায়। ও তখন আর কিচ্ছুটি বলে না।

সেও হয়তো এমনই চায়, মানে এই শেষবেলায় যখন আর কারো কিছু বলার থাকেনা তখন এভাবেই ফোন রাখতে হয় দুজনকে।

আজ সারাটা দিন মাথা ঝিম ঝিম করছে। এদিকে পিউ কতক্ষন যে এখানে এসে বসেছে খেয়াল নেই। বাইরে চোখ পড়তে ও দেখল গাড়িগুলোও কেমন ছুটে ছুটে চলেছে। কারো কোথাও দাঁড়াবার সময়টুকু নেই।

এরই ফাঁকে মিস্টার সেন গুচ্ছের ওষুধ দিয়ে গেলেন আর ওই চেনা মুখের মানুষটা দিল জল ও খাবার।

কিছুক্ষণ পরে পিউকে নিজের ঘরে দেখা গেল। এক অসম্ভব ছটফটানিতে ওর মনে পড়ছিল কারা যেন আজ আসার কথা বলেছিল! পিউয়ের চোখ ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিল, ও ছটফট করছিল বিছানায়। ওর মনে হচ্ছিল পাশে বসা ডাক্তার তখন খুব জোরে চেপে ধরেছে হাতটা – সাথে ক্রমাগত চিৎকার,
– ওনাকে এখুনি একটা ইঞ্জেকশন দিতে হবে…।

পাশের ঘর থেকে মিস্টার সেন ছুটে এলেন। আজও ঘুমে নির্ঘাত উলটোপালটা বকছে পিউ। নমিতা এসে পাখাটা আরও জোরে করে দিল।

একটু পরে চোখ খুলল পিউ। ক্রমাগত ও তখন খুঁজে চলেছে হাতের নীল দাগটা। 

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...