হাসিখুশি মেয়েদের গল্প
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


মাস্টারমশাই চলে গেলেন।

আমাদের পাশের বাড়িতে মাস্টারমশাইরা থাকতেন। সেই যখন ছেলেবেলা থেকে মেয়েবেলাকে আলাদা করতে পারতাম না, তখনকার কথা। পাড়ার সবাই অবশ্য বলত, হাসিখুশিদের বাড়ি। মাস্টারমশাইয়ের দুই মেয়ে, হাসি আর খুশি। মা–মরা দুই বোন, খুশি আমার সমবয়সী, হাসিদি দু’-বছরের বড়। আমাদের বাড়ির পুব দিকে একটা পুকুর ছিল। বিকেলবেলা পুকুর-পাড়ে ছেলেমেয়েরা মিলে আমরা কোনওদিন কুমির-ডাঙা, কোনওদিন লুকোচুরি, উবু, দশ, কুড়ি… খুশি তখনও কুঁড়ি, ফুল হয়ে ফুটে ওঠেনি। আরও কারা কারা যেন খেলতে আসত, পুকুরের উল্টোদিকের ক্যাঁটকেঁটে হলুদ রঙের তিন-তলা বাড়িটার থেকে কেশব, মিতালী, ঘোষবাড়ির নেতাই…। আলো পড়ে এলে অন্য সব ছেলেমেয়েরা ফিরে যেত। শুধু আমি, হাসিদি আর খুশি, আমরা তিনজনে মিলে ঘাটের সিঁড়িতে বসে গল্প করতাম। এলোমেলো ছেলেমানুষি গল্প, বাউল গানের মত যে সব গল্পের কোনও পূর্ব নির্ধারিত গন্তব্য থাকে না। খুশি বুনোগাছের ফল ছিঁড়ে, নখ দিয়ে খুঁটে পুতুলের মুখ দেখাতো। কুতকুতে দুটো চোখ, ছোট্ট একফোঁটা গোলাপি ঠোঁট। এক একদিন আমি খেলার ছলে গোড়ালি-ডোবা জলে নেমে দাঁড়াতাম, ওরা ঘাটের ওপরে দাঁড়িয়ে দেখত, স্বচ্ছ জলের নিচে তে-চোখা মাছের ঝাঁক আমার পায়ে ঠোক্কর দিয়ে যাচ্ছে। আঁধার হতে পারত না, হাসিদি ডাকত, “বিজু উঠে আয়, এক্ষুনি তোদের বাড়িতে শাঁখ বেজে যাবে।”

নিয়ম ছিল শাঁখ বাজার আগে বাড়ি ঢুকতে হবে। ক্লাস এইটে আমরা বাসা বদলে অন্য পাড়ায় চলে গেলাম। খুব দূরে নয়, সাইকেলে মিনিট পাঁচেক। মাঝেমাঝে যেতাম ওদের বাড়ি, আড্ডা দিতে। হাসিদির বিয়ের ঠিক হল। ছেলে ম্যানেজমেন্ট পাস, মুম্বাইতে চাকরি করে। আমি তখন ইঞ্জিনিয়ারিং সেকেন্ড ইয়ার, খুশি ইকনমিক্স অনার্স। হাসিদি প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। বলেছিল, আমি চলে গেলে বাবাকে দেখবে কে? খুশি বলেছিল, তুই ভাবিস না দিদি, আমি তো আছি। আমি বলেছিলাম, হাসিদি তুমি সত্যিই হাসালে, মুম্বাই আর কত দূর? টুক করে এরোপ্লেনে চাপবে আর চলে আসবে। তখন কি আর জানতাম এমন দিন আসবে যখন মুম্বাইয়ের দূরত্বটা আর কিলোমিটারে মাপা যাবে না! সরকারি বিধি-নিষেধ মেনে সমস্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে, এরোপ্লেনগুলো ডানা গুটিয়ে বসে পড়বে। মানুষের তো আর দিব্যদৃষ্টি থাকে না।

সে যাক! পরিমলদার সঙ্গে হাসিদির বিয়ে হয়ে গেল। আমরা কবজি ডুবিয়ে ভোজ খেলাম, সেও হয়ে গেল প্রায় বছর আট-দশ। একবার ওদের বাড়ি গিয়ে দেখি হাসিদি এসে রয়েছে। গালে মেচেতার দাগ, চোখের নিচে কালি। খুশি বলল, “জানিস বিজু, জামাইবাবু দিদিকে খুব কষ্ট দেয়।”

আমি তখন সেভেন্থ সেম, ক্যাম্পাস থেকেই একটা চাকরি জুটে গেছে। খেলার ছলে বলেছিলাম, “খুশি, আমায় যদি কোনওদিন বিয়ে করিস আমি কিন্তু তোকে একটুও কষ্ট দেব না।”

খুশি বলেছিল, “ধ্যুস, বিয়ের পর যদি বদলে যাস! তাছাড়া আমি চলে গেলে বাবার কী হবে?”

একদিন পরিমলদা এসে হাসিদিকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। খুশি বলত দিদি মানিয়ে নিয়েছে। ওদের বাচ্চা হবে। খুশি এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে একটা সেকেন্ডারি স্কুলে কাজ নিয়েছিল। ওর স্কুল ব্যান্ডেলে, আমার অফিস সল্টলেক, সেক্টার ফাইভ। স্টেশান থেকে আমি ডাউন ব্যান্ডেল লোকাল ধরতাম, ও ধরত আপ। আমার আটটা একুশ, ওর নটা সাতাশ। নেহাত সময়ের এদিক ওদিক না হলে দেখা হত না, ফোনে কথা হত। ছুটিছাটায় ওদের বাড়ি যেতাম। আমাদের বন্ধুত্বটা সহজ ছিল, মাস্টারমশাই জানতেন, মেলামেশার জন্য আড়াল-আবডালের দরকার পড়ত না। মাস্টারমশাইয়ের শরীর ভাঙছিল। কলকাতায় বাজার-দোকান করার দরকার পড়লে খুশি আমায় ডেকে নিত। নিউ মার্কেটে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করতে ভালবাসত খুশি। শীতের আগে সোয়েটার, সালোয়ার স্যুটের কাপড়, সংসারের টুকিটাকি সরঞ্জাম… অফিস টাইমের ভিড়-ভাট্টা এড়িয়ে আমরা ফিরতাম। ট্রেনে জানলার ধারে সীট পেলে খুশি বাচ্চাদের মত উৎফুল্ল হয়ে উঠত। পাশাপাশি বসে দু’-চারটে হাবিজাবি কথা, দিশাহীন গল্প, ওইটুকুই যা নির্জনতা ছিল আমাদের মধ্যে।

আমি আর কোনওদিন খুশিকে কিছু বলিনি। জানতাম জোর করে কিছু পাওয়া যায় না। খুশি ওর স্কুল, বাচ্চাদের পড়ানো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, আমিও অফিস নিয়ে। আমাদের দেখা হওয়ার মধ্যে সময়ের দূরত্ব বাড়ছিল। গোদের ওপর বিষফোঁড়া, মার্চ ফুরোতে পারল না, পৃথিবী জুড়ে মড়ক লাগল। সারা দেশে লকডাউন শুরু হয়ে গেল, আমাদের ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অফিসে গেলে কাজের সময় বাঁধা থাকে, বাড়ি বসে কাজ করলে সে সবের আর নির্দিষ্ট সীমা থাকে না। কবে বেঞ্চে বসতে হয়, ভয়ে কেউ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না, ঘাড় নিচু করে কোডিং করে যায়। খুশির সঙ্গে ফোনে, মেসেজে কথা হত। ওরও অনলাইন ক্লাস চলছিল। এমনিতে অসুবিধে ছিল না, মাছ, আনাজ-পাতির গাড়ি আসত ঘরের দোরগোড়ায়। দু’জন নিখাগি মানুষের সংসার! কতটুকু আর লাগে! সমস্যা হচ্ছিল মাস্টারমশাইকে নিয়ে। শ্বাসকষ্ট বাড়ছিল। একদিন রাত্রে বাথরুমে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। খুশি কোনোওমতে টেনে-হিঁচড়ে মাস্টারমশাইকে খাটে শুইয়ে, আমায় ফোন করল।

গাড়ির বন্দোবস্ত করে মাঝরাতে খুশিদের বাড়ি পৌঁছোলাম। আজকাল পাশের বাড়ি রাত্তিরে ডাকাত পড়লেও পাড়া-প্রতিবেশীরা সাধারণত দরজা খোলে না। তাও দু’-একজন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। তাদের ডেকে মাস্টারমশাইকে ধরাধরি করে গাড়িতে তোলা হল। আসল ঝামেলা শুরু হল তারপরে। মফস্বলের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে লাভ নেই। হয়তো সারারাত বিনা চিকিৎসায় মেঝেতেই ফেলে রাখবে। টাউনের সবথেকে পুরোন নার্সিংহোমটা বন্ধ। সেখানে ক’দিন আগেই দু’জন ডাক্তার আর একজন প্যারামেডিকের করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। ভালো চিকিৎসা হয় বলে অন্য যে নার্সিংহোমটার নাম শোনা যায় সেটায় ঢুকতেই দিল না। রিসেপশান থেকে একরকম তাড়িয়েই দিল। তাদের নাকি বেড খালি নেই। আরও দু’-তিন জায়গায় ধাক্কা খেয়ে শেষে মাঝারি গোছের একটা নার্সিংহোমে মাস্টারমশাইকে অ্যাডমিট করা হল।

নার্সিংহোমটা এমনিতে মন্দ নয়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সকাল সকাল একজন মাঝবয়সী ডাক্তার ভিজিটে এসে ওষুধ-পত্রের বন্দোবস্ত করে দিয়ে গেলেন। ইলেকট্রোলাইট ইম্ব্যালেন্স হয়েছিল মাস্টারমশাইয়ের। বয়স্ক মানুষদের নাকি ‘কমন’ সমস্যা, ডাক্তার বললেন, দু’-এক দিন ‘অবজারভেশানে’ রেখে ছেড়ে দেবেন। মাস্টারমশাইয়ের জ্ঞান ফিরে এল, কথা বললেন আমাদের সঙ্গে। বললেন, দুর্বল লাগছে একটু, তাছাড়া আর কোনও অসুবিধে নেই।

হাসিদি বারবার ফোনে বলেছিল, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সিংগল কেবিন পাওয়া গেল না। মাস্টারমশাইকে অন্য একজন পেসেন্টের সঙ্গে শেয়ারিঙে থাকতে হল। আর সেটাই হল কাল। পরের দিন গিয়ে দেখলাম অক্সিজেন চলছে। অন্য পেসেন্ট ভদ্রলোকটি দিন দশেক আগে শ্বাসের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, অল্প জ্বর, সোয়াব টেস্টের রিপোর্ট এসেছে পজিটিভ। নার্সিংহোমে করোনা ওয়ার্ড নেই বলে পরিবারের লোকেরা ওঁকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেল। একই কামরায় রাত কাটিয়েছেন বলে মাস্টারমশাইয়েরও সোয়াব স্যাম্পেল নেওয়া হল। রিপোর্ট আসতে এক সপ্তাহ। তার আগেই প্রশাসন থেকে নির্দেশ এল নার্সিংহোম বন্ধ করে দিতে হবে। নার্সিংহোম কতৃপক্ষ জানালেন তাঁরা অনন্যোপায়, পেসেন্ট রাখতে পারবেন না। যে ডাক্তার মাস্টারমশাইকে দেখছিল সে সেলফ-কোয়ারিন্টিনে গেছে। আর কোনও ডাক্তার ভিজিটে আসছে না। তাছাড়া নার্সিংহোম পুরো খালি করে স্যানিটাইজ করতে হবে।

এদিকে মাস্টারমশাইয়ের শরীরের অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। হাসিদি ফোনে কান্নাকাটি করছে। মুম্বাই থেকে আসার সব রাস্তা বন্ধ। পাশে এসে যে দাঁড়াবে তার কোনও উপায় নেই। কাছাকাছি কোনও নার্সিংহোম পেসেন্ট নিতে রাজি হচ্ছে না। মাস্টারমশাইকে কোথায় নিয়ে যাব, কী করব দিশেহারা পরিস্থিতি। শুনেছিলাম কেশবের সঙ্গে লোকাল কাউন্সেলরের চেনাজানা আছে। ওকে ফোন করলাম। কেশব কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলল। তিনি ফোনে কাদের কী নির্দেশ দিলেন। যে নার্সিংহোমগুলো দু’দিন আগেই বেড নেই বলে ফিরিয়ে দিয়েছিল তাদেরই একটা পেসেন্ট অ্যাডমিট করতে রাজি হল। কাউন্সেলরের হুকুম বলে কথা! অন্যথা হলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা হল, অক্সিজেন লাগিয়ে মাস্টারমশাইকে নিয়ে রওনা দিলাম আমি আর খুশি।

নার্সিংহোমে যাবার পথেই খুশির কোলে মাথা রেখে মাস্টারমশাই চলে গেলেন।


“অ্যাই খুশি কোথায় যাচ্ছিস?”

খুশি কোনওদিকে না তাকিয়ে হাঁটুজল থেকে কোমর-জল, কোমর থেকে বুক… নদীর ভেতর নেমে যাচ্ছে, নেমেই যাচ্ছে, কানে কথা নিচ্ছে না।

শেষ কাজ খুশিই করেছে। করোনা রিপোর্ট হাতে আসেনি। ছেড়ে আসা নার্সিংহোম, পৌঁছোতে না-পারা নার্সিংহোম দুজনের কেউই ডেথ সার্টিফিকেট দিতে চায়নি। শেষে সেই কাউন্সেলর ভদ্রলোকই জোগাড় করে দিলেন। যে ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেটে সই করেছে সে মাস্টারমশাইকে একবার চোখের দেখাও দেখেনি। হয়তো চিনত মাস্টারমশাইকে। কে জানে? কেশব সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে আসতে সন্ধে গড়াল, শ্মশানে পৌঁছোতে-পৌঁছোতে মাঝরাত। খুশি মাস্টারমশাইয়ের দেহ ছুঁয়ে বসে রইল। ফুল-টুল পাওয়া দুষ্কর। একজন পুরুত দূরে দাঁড়িয়ে, মুখে রুমাল বেঁধে অবোধ্য উচ্চারণে কী সব মন্ত্র আউড়ে গেল। সামাজিক দূরত্বে দাঁড়িয়েও মন্ত্রর সঙ্গে উড়ে আসা দেশি মদের গন্ধ পাচ্ছিলাম। খুশি চুপ করে বসে ছিল, কথা বললে জবাব দিচ্ছিল না। ওর মোবাইলটা আমার কাছে রাখা ছিল। হাসিদির ফোন এলে আমি রিসিভ করছিলাম। দাহ-কার্য শেষ হবার পর অস্থি ভাসাতে গঙ্গায় নেমেছিল খুশি। জলের গভীরে নেমে যাচ্ছে দেখে আমি খুশির হাত টেনে ধরলাম। খুশির যেন হুঁশ ফিরল। আমি বললাম, “পাগল হলি নাকি?”

সকাল থেকে মুখে একটা দানা কাটেনি, সোডিয়াম ভেপারের হলুদ আলোয় খুশিকে খুব রোগা আর মলিন লাগছিল। আমার হাত ধরে জল থেকে উঠে এল। পরনের কামিজটা একদম ভিজে গেছে, টুপটুপ করে জল পড়ছে, বিড়বিড় করে বলল, “সব শেষ হয়ে গেল রে বিজু।”

আমি ওর মোবাইলটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, “হাসিদির সঙ্গে কথা বল না একবার…”

খুশি নিল না, বলল, “কিচ্ছু ভাল লাগছে না, কী কথা বলব বল তো!”

ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে তিনটে। বাকি বন্ধুবান্ধব যারা এসেছিল ফিরে গেছে, কেশব ছিল, বলল, “তুই খুশিকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে যা বিজু।”

কবে যেন বুদ্ধ পূর্ণিমা, ফটফটে জ্যোৎস্নার মধ্যে ভিজে পোষাকে খুশি আমার মোটরবাইকের পিছনে উঠে বসল। শ্মশান থেকে বেরিয়ে পাথর বাঁধানো গলিটা দু’-চারটে ঘুমন্ত কুকুরকে পাশ কাটিয়ে জি টি রোডে গিয়ে উঠেছে। অন্যসময় মাতাল-চাতাল-কবিরা রাতের রাস্তা শাসন করে, এখন নিরঙ্কুশ নৈঃশব্দ। মাঝেমধ্যে দূর থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সের হুটারের আওয়াজ। রাস্তায় পড়ে থাকা সারিসারি আলো-অন্ধকার বুক দিয়ে ঠেলে-ঠেলে বাইক চালাতে রীতিমত কষ্ট হচ্ছিল। টের পেলাম আমার আমার কাঁধের ওপর আলগা করে ফেলে রাখা খুশির হাতটা থিরথির করে কাঁপছে। মুহূর্তের জন্য অসাবধান হয়েছিলাম, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম খুশি ঠিক আছে কি না। উল্টোদিক থেকে উড়ে আসা একটা লরির হেড লাইটের আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সামলে নিলাম, ব্রেকের ওপর পায়ের চাপ বেড়েছিল সম্ভবত। খুশি আমার পিঠের ওপর ঝুঁকে এল, বলল, “একটু আস্তে চালা বিজু, আমার শীত করছে।”

ওদের বাড়ির সামনে বাইক দাঁড় করালাম। খুশি টলোমলো পায়ে বারান্দা ডিঙিয়ে তালা খুলে বাড়িতে ঢুকল। পাশের বাড়ির রত্নাবৌদির কাছে ডুপ্লিকেট চাবি থাকে। বসার ঘরের টেবিলের ওপর তিনিই বোধহয় একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে গেছেন, পাশে একটা স্টিলের প্লেটে নিমপাতা আর একগুচ্ছ পুরনো লোহার চাবি। দাঁতে নিমপাতা কেটে, লোহা আর আগুন ছুঁয়ে মাস্টারমশাইয়ের আরামকেদারাটার দিকে তাকিয়ে মনটা হু-হু করে উঠল। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, যখনই এ বাড়িতে এসেছি, দেখেছি ওখানেই বসে আছেন, একখানা বই হাতে করে। এতক্ষণ এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি খুশি। ঘরে ঢুকে ডুকরে কেঁদে উঠল। টলে পড়ে যাচ্ছিল, আমি ওকে ধরে-ধরে পাশে রাখা ডিভানের ওপর বসালাম। খুশি আমার বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। কাঁদার জন্য একটা আশ্রয় লাগে, নির্ভর করার জন্য একটা মানুষ। আমি খুশির পিঠে হাত রাখলাম, খুশির জামা এখনও স্যাঁতসেঁত করছে, বললাম, “শান্ত হ, খুশি, শরীর খারাপ হবে।”

“আমায় ছেড়ে যাস না বিজু,” খুশি আচমকা আমার টি-শার্টের বুকের কাছটা খিমচে ধরল, জবা ফুলের মতো লাল চোখ তুলে বলল, “বল, কোনোদিন আমায় ছেড়ে যাবি না।”

বুঝলাম খুশি আশ্রয় খুঁজছে। ওর জন্য আমার বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল। বলার ইচ্ছা করছিল, তোকে ছেড়ে কোথায় যাব রে, পাগলি? তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই, কোথাও যাবার জায়গা নেই। কিন্তু সেই সহজ কথাটা বলতে গিয়ে আমার জিভ জড়িয়ে গেল। কারণ ততক্ষণে আমার শরীরে অসময়ের ধস নেমেছে। চাঁই চাঁই পাথর গড়িয়ে হড়পা বান ঢুকে পড়ছে শরীরের আনাচে কানাচে। জলের স্রোত ক্রমাগত পাড় খসাচ্ছে, শেকড় ওপড়াচ্ছে, আমি বুক চিতিয়ে, দু’-হাত ছড়িয়ে দিয়েও প্লাবনের গতি রোধ করতে পারছি না।

খুশির স্থলপদ্মর মতো নরম শরীরটা আমার হাড়-সর্বস্ব শরীরের ওপর ভর দিয়ে রয়েছে। খুশির ভিজে বুকের গন্ধ পাচ্ছি আমি। মাস্টারমশাইয়ের মৃত্যুশোক ছাপিয়ে গন্ধটা আমার বোধবুদ্ধি অবশ করে দিচ্ছে। ভালবাসার সঙ্গে অধিকার বোধের কি কোনও গূঢ় সম্পর্ক আছে? আমি তো বলতে চাইছিলাম, শোন খুশি, যতক্ষণ আমি আছি, দেখে নিস, পৃথিবীর আর কোনও দুঃখ তোকে ছুঁতে পারবে না। আমি তো সত্যিই ওর শরীরের দখল নিতে চাইনি। তা’হলে আমি শক্ত হয়ে উঠলাম কেন? খুশিকে কোন ছোটবেলা থেকে দেখছি, আগে কোনওদিন এমন হয়নি। নিজের ওপর ভয়ঙ্কর রাগ হচ্ছিল, আমি খুশির গায়ে ঠেলা দিয়ে কর্কশ গলায় বললাম, “ভিজে জামা পালটে আয় খুশি, ঠান্ডা লেগে যাবে।”

খুশি বোধ হয় আশ্চর্য হল। সামান্য সরে বসল। আমার হাতটা তখনও ধরে ছিল। বুক পকেটে রাখা মোবাইলটা বাজল, হাসিদির ফোন। আমি খুশির হাত ছাড়িয়ে ফোন ধরলাম। হাসিদি বলল, “ফিরে এসেছিস তোরা? খুশি ঠিক আছে?”

আমি খুশির হাতে ফোনটা দিলাম, “খুশি কথা বল…”

খুশি বাধ্য মেয়ের মতো ফোনটা হাতে নিল বটে কিন্তু হুঁ-হাঁ ছাড়া কিছুই বলল না। শেষে ফোনটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “দিদি তোর সঙ্গে কথা বলবে…”

হাসিদি বলল, “অনেক রাত হয়ে গেছে বিজু। এখন আর বাড়ি গিয়ে মাসিমাকে ডেকে তুলিস না। রাতটা আমাদের ওখানেই থাক।”

আমি বোধ হয় দু’-মুহূর্ত চুপ করে ছিলাম। ভাবছিলাম থাকাটা সমীচীন হবে কি না। একটু আগে অসাবধানে আশ্লেষের কৌটো খুলে ফেলেছিলাম। আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের শরীর-টরির নিয়ে বিশেষ কোনও শুচিবায়ু নেই। আমরা শূন্য দশকে যৌনতা চিনেছি। তার জন্য আন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা বিনোদন সামগ্রীর অভাব হয়নি। কিন্তু এই পরিস্থিতির মধ্যে… নিজেকে অমানুষ মনে হচ্ছিল। একটা বিতৃষ্ণা ছড়িয়ে পড়ছিল মাথার মধ্যে। চোখের সামনে কয়েক ঘন্টা আগে মাস্টারমশাইয়ের শরীরটা দাউদাউ করে জ্বলে যেতে দেখেছি। হাসিদির গলায় উদ্বেগ টের পেলাম, “বিজু, আজকের রাতটা খুশিকে একা ছাড়িস না।”

খুশি উঠে ভেতরে গেল, আমি অন্যমনস্ক হয়ে বললাম, “আচ্ছা।”

মিনিট দশ-পনেরো হয়ে গেল, খুশি আসছে না। বসে বসে ভাবছিলাম কী হল। খুশি মাস্টারমশাইয়ের এক সেট পাজামা পাঞ্জাবি হাতে করে ঘরে ঢুকল, বলল, “চান করে আয় বিজু, আমি চা বানাচ্ছি।”

ও নিজেও চান করে, পোষাক বদলে এসেছে। আমি কথা না বাড়িয়ে উঠলাম। খুশি গীজার চালিয়ে রেখে গিয়েছিল। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে স্বস্তি হল। পাপবোধ না হোক, গরম জল আর সাবানের ফেনার সঙ্গে অনেকখানি ক্লান্তি ধুয়ে নর্দমার জালির মধ্যে দিয়ে নেমে গেল। পাজামা পাঞ্জাবিগুলো গায়ে চড়িয়ে দেখলাম ঢলঢল করছে। ইদানীং মাস্টারমশাই রোগা হয়ে গিয়েছিলেন খুব। এগুলো বছর দশেক আগেকার হবে মনে হয়। ন্যাপথলিনের গন্ধ বেরোচ্ছে।

খুশি চায়ের সঙ্গে বাটার টোস্ট করে এনেছিল, মরীচ ছড়িয়ে। সারাদিনের পরে মুখে অমৃতর মতো লাগল। চা শেষ করে খুশিকে বললাম, “তুই ভেতরে গিয়ে শুয়ে পড়। আমি এই ডিভানেই একটু গড়িয়ে নেব।”

খুশি চলে যাচ্ছিল। আমি পিছন থেকে গলা তুলে বললাম, “কোনও অসুবিধে হলে ডাকবি, খুশি…”

খুশি দরজা ভেজানোর আগে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, কথার জবাব দিল না।

হাসিদি বলল, “মুম্বাইতে তুই যেখানেই থাকিস না কেন দু’-পা হেঁটে গেলেই সমুদ্র।”

মাস্টারমশাইয়ের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিল। আমরা আবার যে যার মত স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলাম। আনলকডাউনে বিমান চলাচল শুরু হতেই হাসিদি এসে পৌঁছল। কী সুন্দর মোটাসোটা গিন্নি-গিন্নি চেহারা হয়েছে হাসিদির। ছেলেকে নিয়ে আসেনি, তার অনলাইন ক্লাস চলছে, পরিমলদার অফিস। শাশুড়ি সঙ্গে থাকেন বলে দুজনকে তাঁর জিম্মায় ছেড়ে এসেছে। ওদের বাড়িতে বসেই আড্ডা হচ্ছিল। আমি বললাম, “বাহ, তাহলে তো ইচ্ছে হলেই জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকা যায়।”

হাসিদি বলল, “হ্যাঁ, চৌপাট্টিতে গেলে তুই জলের মধ্যে পা ডোবাতে পারবি। তবে জল খুব নোংরা আর বেশির ভাগ সমুদ্রতটই ম্যানগ্রোভদের দখলে। লোকাল লোকে বলে মুম্বাইয়ের ফুসফুস। জোয়ারের সময় জল এসে তাদের শ্বাসমূল ছুঁয়ে যায়। জল সরে গেলে পাথুরে কাদামাটি, জায়গায়-জায়গায় সল্টবেড, নুনের স্তূপ।”

আমি বললাম, “আমাদের হেডঅফিস মুম্বাইতে। মাঝখানে কথা হচ্ছিল আমাদের কলকাতার অফিস বন্ধ হয়ে যাবে। সবাইকে মুম্বাই ট্রান্সফার করে দেবে।”

হাসিদি যেন আমার কথা শুনতে পেল না, বলল, “একবার একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলাম জানিস, পুজোর ঠিক আগে আগে গাছগুলোর সব সবুজ পাতা উধাও, কাটি কাঠি বিবর্ণ ট্যুইগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম শুঁয়োপোকারা পাতা খেয়ে শেষ করেছে। অবশ্য দু’-তিন মাসের মধ্যেই যে-কে-সেই… সবুজ পাতায় ছেয়ে গেল।”

খুশি চুপ করে বসেছিল এতক্ষণ। হাসিদির কথা শেষ হতে না হতেই আমার দিকে ফিরে বলল, “তুই যদি মুম্বাই চলে যাস, মাসিমা এখানে একা থাকবে কী করে? সঙ্গে করে নিয়ে যাবি নাকি?”

আমি ঠোঁট ওলটালাম, “ভাবিনি এখনও। মা এক বর্ণ হিন্দি বোঝে না। জানিস তো কীরকম বকবক করা স্বভাব। মুম্বাই গেলে কথা বলতে না পেরে পেট ফুলে ঢোল হয়ে যাবে।”

হাসিদি বলল, “তোরা গল্প কর, আমি একটু ব্যাংকের কাজ সেরে আসি।”

হাসিদি পোষাক বদলে বেরিয়ে গেল। আমি আর খুশি বসে রইলাম। খুশি আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল, বললাম, “কী হল?”

খুশি জিজ্ঞেস করল, “পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াচ্ছিস কেন?”

“কোথায় পালাচ্ছি?” বললাম বটে কিন্তু খুশির চোখ থেকে চোখ সরিয়ে ওদের বসার ঘরের জানলার বাইরে গন্ধরাজ গাছটার দিকে তাকালাম। মাস্টারমশাই একবার রথের মেলা থেকে চারা কিনে এনে লাগিয়েছিলেন। প্রায় সারা বছরই দু’-চারটে করে ফুল ফোটায়। মাস্টারমশাই মারা যাবার পর থেকে কতকটা ইচ্ছে করেই খুশির সামনে আসিনি। খুশি সেটা নজর করেছে।

খুশি বলল, “আমি কী জানি? কোথায় পালাচ্ছিস, কেন পালাচ্ছিস… সেটা তো তুই বলবি।”

আমি ওকে থামাবার জন্য বললাম, “দিদিমণিমার্কা কথা বলিস না তো।”

খুশি রেগে গেল, “কী বললি? দিদিমণিমার্কা?” চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমার লকডাউনের সযত্ন লালিত লম্বা চুল মুঠো করে ধরে ঝাঁকিয়ে দিল। চুলের গোড়ায় ব্যথা পেয়ে আমি ‘উঃ’ বলে চেঁচিয়ে উঠলাম। খুশির বোধ হয় সংবিৎ ফিরল, বলল, “আহা রে, খুব লাগল?”

আমি খিঁচিয়ে উঠে বললাম, “তোর চুল টেনে দেখাব, লাগে কি না?”

খুশি মুখ ভ্যাংচাল, “চেষ্টা করে দেখ না, খিমচে রক্ত বার করে দেব…”

আমি ওর হাতের লম্বা লম্বা নখগুলোর দিকে তাকিয়ে দমে গেলাম। যত্ন করে গাঢ় রঙের নেল পালিস লাগিয়ে রেখেছে। বললাম, “রাক্ষুসিদের মতো নখ রেখেছিস কেন?”

খুশি দু’-হাত বাড়িয়ে বলল, “তোর গলা টিপে দেব বলে। এবার বলবি কেন আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিস? না-হলে কিন্তু সত্যি সত্যি…”

আমি ডিভানে বসে ছিলাম, খুশি আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। খুব ইচ্ছা করছিল ওর পাখির মত শরীরটা দুই হাতের মধ্যে টেনে নিয়ে কোমরের ভাঁজে মাথা রাখি। যা থাকে বরাতে, বললাম, “শোন, তোর সামনে এলেই আজকাল আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, শরীর ছমছম করে, মাথার মধ্যে অদ্ভুত অদ্ভুত ইচ্ছে আসে… মনে হয় তোকে জড়িয়ে ধরে আদর করি…”

কথার খেই হারাচ্ছিলাম। খুশি কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন আমি হিব্রুতে কথা বলছি, সাবটাইটেল ছাড়া, মানে বুঝতে পারছে না। দেখলাম ওর মুখ আস্তে আস্তে লাল হয়ে উঠছে। আমার কাছ থেকে সরে গিয়ে খুশি নিজের চেয়ারে বসে পড়ল। আমার ভয় হল, কী বলতে কী বলে ফেললাম। ডুবন্ত মানুষের মতো কোনওমতে হাঁকুপাঁকু করে বললাম, “তোর ইচ্ছে হয় না?”

খুশি খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার শুধু ইচ্ছে হয় তোর হাত ধরে বসে থাকি, ঘন্টার পর ঘন্টা…”

ওর গলার স্বর শুনে মনে হল সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, শেষ দিকটা ঢেউয়ের শব্দে মিলিয়ে গেল। ঢেউটা যে আমার বুকের মধ্যেই উঠেছিল বুঝতে আমার একটু সময় লাগল। সামলে নিয়ে বললাম, “ব্যাস, আর কিছু না?”

খুশি শয়তানি হাসি হেসে বলল, “তোকে বলব কেন? তুই মুম্বাই যা।”

আমিও হাসলাম, “আরে সত্যিই যাচ্ছি নাকি? তুইও যেমন!”

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। খুশি বলল, “সকালে চাওমিন বানিয়েছিলাম, গরম করে এনে দেব, খাবি?”

আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই উঠে গেল। ওদের কিচেনটা ডাইনিং স্পেসের লাগোয়া, ভেতর থেকে কাচের বাসন নামানোর শব্দ পাচ্ছিলাম। আমি উঠে গিয়ে মাস্টারমশাইয়ের বুককেসের সামনে দাঁড়ালাম। কত যে বই… বাংলা, ইংরিজি… পড়ার ব্যাপারে মাস্টারমশাইয়ের বাছবিচার ছিল না, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে মার্কস, এঙ্গেলস, টি এস এলিয়ট, সমারসেট মম… মায় হালফিলের মার্কেজ পর্যন্ত। কট্টর বামপন্থী ছিলেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত, যদিও স্থানীয় রাজনীতির সুবিধেবাদী স্খলনে যার পর নাই লজ্জা পেতেন। কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে ইংলিশে এম এ, পরে নিজে নিজে ফ্রেঞ্চ শিখেছিলেন ওরিজিনাল মপাসাঁ পড়বেন বলে।

বুককেসের মাঝের তাকে একটা বাউন্ড ভল্যুম বই দেখে আশ্চর্য লাগল, ‘পোয়েমস অভ আর্থার কোনান ডয়েল’। ভদ্রলোককে শার্লক হোমসের স্রষ্টা বলেই জানতাম। তিনি যে কবিতাও লিখে গেছেন জানতাম না। বইটা তাক থেকে নামিয়ে পাতা ওল্টালাম। বেশ লম্বা লম্বা কবিতা। ঘাড় ফিরিয়ে বসার জায়গা খুঁজতে গিয়ে জানলার পাশে রাখা মাস্টারমশাইয়ের আরামকেদারাটা চোখে পড়ল। বার্মা টিকের তৈরি পুরনো আরামকেদারাটা দেখে লোভ লাগল। কোনান ডয়েলকে নিয়ে বসলাম গিয়ে। কিচেনে মাইক্রোওয়েভ ওভেনটা জানান দিচ্ছে চাওমিন গরম হয়ে গেছে। খুশি বোধ হয় কফি বানাচ্ছে, হাওয়ায় ফিল্টার কফির খুশবু উড়ে এল। কোনান ডয়েলের মিঠে-কড়া শব্দ-ঝংকার পড়তে পড়তে বেশ নেশা লাগছিল। গ্রিলের গেট খোলার শব্দ পেলাম মনে হল। কে জানে কে এল! কোনও ফেরিওলা-টোলা হবে হয়ত। খুশি এসে দেখবে নিশ্চয়ই। আমি মন দিয়ে পড়ছিলাম, “So one last cup, and drink it up/ To the man who carries the gun!”

চমকে ওঠার একটা অস্ফুট আওয়াজ পেয়ে চোখ তুললাম। দেখলাম মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসিদি দাঁড়িয়ে আছে। বলল, “সরি বিজু, বিশ্বাস করবি না, এক মুহূর্তের জন্য মনে হল তুই নোস, ইজিচেয়ারে বাবা বসে আছে।”

হাসিদি কখন চুপিসাড়ে ঘরে এসে ঢুকেছে খেয়াল করিনি। গ্রিলের গেট খোলার শব্দটা তার মানে হাসিদির ফিরে আসার। বসার ঘরের অন্য দরজায় খুশি এসে দাঁড়িয়েছিল। হাতের ট্রেতে কফি আর চাওমিন। বলল, “আশ্চর্য কী? চুলদাড়ি না কেটে যেমন বুড়োটে মার্কা চেহারা বানিয়ে রেখেছে! ভুল হবারই কথা।”
হাসিদির ঘোর তখনও কাটেনি, বলল, “লক্ষ করে দেখেছিস খুশি, পাশ থেকে বিজুটাকে অনেকটা বাবার মতন দেখতে লাগে।”

খুশি সে কথার উত্তর করল না। আমি বললাম, “এত তাড়াতাড়ি তোমার ব্যাঙ্কের কাজ হয়ে গেল? ভিড় ছিল না?”

হাসিদি বলল, “না রে, পাশবই নিতেই ভুলে গিয়েছিলাম। আবার যাব।”

হাসিদি আবার ফিরে যাবে শুনে খুশি কি একটু খুশি হল? পাশের টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখার সময় দেখলাম যেন ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ঝিকমিক করছে। রাক্ষুসির মাথায় কখন যে কী খেলে! আমি গা এলিয়ে বসে কোনান ডয়েলে মন দিলাম। অথবা শুধু মন দেবার ভান করলাম। কারণ ততক্ষণে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আমায় আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল। অক্ষরগুলো এলোমেলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। শুনতে পাচ্ছিলাম দুই বোনের কলাকাকলিতে ঘর ভরে উপচে পড়ছে। আহা, কতদিন পর আবার হাসিখুশি হয়ে উঠেছে বাড়িটা! আমার মাথার মধ্যে ভালবাসা, নির্ভরতা আর অধিকার বোধের মায়াসুতো ইকড়িমিকড়ি প্যাটার্ন বুনছিল, আসন সেলাইয়ের ছুঁচ যেমন ফোঁড় তোলে ঢেউয়ের মত। একটা দুলুনি টের পাচ্ছিলাম শরীরের মধ্যে, ছুঁচের ধাক্কায়। কিংবা আমিই অন্যমনস্ক মানুষের মত পা দোলাচ্ছিলাম। কে জানে?

7 Comments

  • যুগান্তর মিত্র

    Reply March 13, 2021 |

    অসম্ভব ভালো গল্প। টানটান।

  • অনিরুদ্ধ সেন

    Reply March 13, 2021 |

    আপনার আগের গল্পগুলিতে প্রায়ই একটা দুষ্টুমির প্যাঁচ থাকত। ভালো লাগত। ইদানীং আপনি বোধহয় একটু ‘সহজিয়া’। সেটাও ভালো লাগে, অন্তত এই গল্পটি খুব ভালো লাগল। সহজ ভাষা, সহজ প্লট, কিন্তু কোমল তুলিতে ঠিক সময় ঠিক ইমোশন ও মুডটি ফুটিয়ে তোলা, অপূর্ব কারুকার্য। শেষ হতে হতেও হল না, তাই শেষটা আরও সুন্দর।
    আপনি আরও উচ্চস্তরে নিয়ে যান আপনার শিল্পকর্মকে, এই কামনা রইল।

    • bdmagadmin

      Reply March 13, 2021 |

      দাদা, আপনি শুধু সুলেখকই নন, মনোযোগী পাঠকও। লেখার সময় মনে হয়েছিল প্যাঁচ কষলে গল্পটি রসভ্রষ্ট হবে। তাছাড়া আমি সত্যিই চেষ্টা করছি নিজের পুরনো শৈলী থেকে বেরিয়ে আসার। যতদূর মনে পড়ছে এই পরামর্শটাও আপনার দেওয়া।

      • Pradip Roy Chowdhury

        Reply March 14, 2021 |

        চমৎকার লাগলো সিদ্ধার্থ ! তুমি জাত লেখক ।
        গল্পের ঠাসবুনোট , ভাষা , দুই চরিত্রের অনুভূতি , অতিমারীর সময় মানুষের অসহায় অবস্থা অনবদ্য ভাবে ফুটে উঠলো তোমার লেখায় ।
        পাঠককে মনযোগী রাখার অসাধারণ লেখনশৈলী তোমার । এগিয়ে চলো ।

  • গৌতম বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়

    Reply March 14, 2021 |

    একেবারে মুগ্ধ; লেখক কতো কতো অনুভূতিতে ভেঙে যাচ্ছেন, কতো ভাঙা অনুভূতি কুড়িয়ে নিচ্ছেন, এগিয়ে যাচ্ছেন আমাদের নিয়ে এক হাসিখুশি বাড়ির দিকে…

  • Gorachand Chakraborty

    Reply March 14, 2021 |

    খুব ভালো লেগেছে।

  • ঝর্না বিশ্বাস

    Reply March 15, 2021 |

    একটা ভীষণ প্রিয় গল্প হয়ে থাকবে এই গল্পটা।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...